ট্রাম্প নিয়ে ইউরোপের ‘ওয়েস্টালজিয়া’র ট্র্যাজেডি

ডোনাল্ড ট্রাম্পছবি: এএফপি

ইউরোপের নেতারা যেন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছেন। গত সপ্তাহে তুরস্কের আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ বৈঠক থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিদায় নেওয়ার পর সেই স্বস্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বৈঠকের মধ্যে কিছু অস্বস্তিকর মুহূর্ত অবশ্যই ছিল। কারণ, ট্রাম্প বৈঠকের আগে আবারও গ্রিনল্যান্ড দখলের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। এমনকি স্পেনের সঙ্গে সব বাণিজ্য বন্ধ করার মতো অযৌক্তিক নির্দেশও দিয়েছেন। তবু শেষ পর্যন্ত বড় কোনো বিপর্যয় ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ট্রাম্প ইউরোপ থেকে মার্কিন সেনা সরিয়ে নেওয়ার কোনো ঘোষণা দেননি। ন্যাটো ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার কথাও বলেননি। বরং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সম্পর্কে ইতিবাচক মন্তব্য করেন। ইউক্রেনকে নিজেদের দেশে প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির লাইসেন্স দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন। বৈঠকের শেষে ট্রাম্প নিজেই বলেন, চারপাশে যেন ‘ভালোবাসার আবহ’ তৈরি হয়েছে।

কিন্তু এই বাহ্যিক সৌহার্দ্যের আড়ালে পুরো বৈঠক ছিল একধরনের প্রহসন। ন্যাটো নেতারা প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের ৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিজেদের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেন। অথচ সবাই জানেন, এই সংখ্যা বাস্তবে খুব একটা অর্থ বহন করে না, যদি সামরিক সক্ষমতা নিয়ে গভীর আলোচনা না হয়। এই ৫ শতাংশের লক্ষ্য গত বছর হঠাৎ করেই নির্ধারণ করা হয়েছিল মূলত ট্রাম্পকে সন্তুষ্ট করার জন্য।

বৈঠকের আগে কয়েক মাস ধরে ইউরোপীয় নেতারা উদ্বিগ্ন ছিলেন। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, ট্রাম্প হয়তো ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেবেন বা ইউরোপে মার্কিন উপস্থিতি অনেকটাই কমিয়ে দেবেন। তাতে ইউরোপ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রভাবের মুখে পড়ে যেত। এই ভয় থেকেই বৈঠকটি এমনভাবে সাজানো হয়েছিল, যাতে কোনো অনিয়ন্ত্রিত বা অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি তৈরি না হয়।

ট্রাম্পের অস্থির স্বভাব নিয়ে ইউরোপীয় নেতাদের উদ্বেগ ছিল প্রবল। তাই তাঁরা বৈঠকের প্রতিটি মুহূর্ত নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেয়েছিলেন। বাস্তবে দেখা গেল, তাঁরা ট্রাম্পকে সন্তুষ্ট করতেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এমনকি ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুতে পর্যন্ত প্রকাশ্যে ট্রাম্পের প্রশংসায় এগিয়ে আসেন। অনেকেই বলেন, ন্যাটোকে টিকিয়ে রাখার জন্য এই আত্মসমর্পণ গ্রহণযোগ্য। কিন্তু এই আচরণের মধ্যে লুকিয়ে আছে বড় ঝুঁকি।

আরও পড়ুন

এ প্রসঙ্গে ইতিহাসের দিকে তাকানো দরকার। বার্লিন প্রাচীর পতনের পর একসময় জার্মানির পূর্বাঞ্চলে বড় পরিবর্তন আসে। প্রথমে আনন্দের ঢেউ এলেও পরে বহু মানুষ সেই অঞ্চল ছেড়ে চলে যান। অন্যদিকে পশ্চিম জার্মানি থেকে ধনী মানুষের আগমনে সম্পত্তির দাম বাড়ে। এর ফলে হারিয়ে যাওয়া জীবনের প্রতি একধরনের আবেগ তৈরি হয়। সেই আবেগ ফুটে ওঠে ‘গুড বাই, লেনিন!’-এর মতো চলচ্চিত্রে।

এই অনুভূতির নাম দেওয়া হয় ‘ওস্টালজিয়া’। প্রায় চল্লিশ বছর ধরে এটি জার্মান সমাজ ও রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছে। অনেক লেখক এই আবেগের সমালোচনা করেছেন। তাঁদের মতে, এতে পূর্ব জার্মানির দীর্ঘদিনের দমন-পীড়নের ইতিহাসকে হালকা করে দেখা হয়।

তবে অন্যরা মনে করেন, এই আবেগ বুঝতে পারলে পূর্ব জার্মানির বর্তমান সমস্যাগুলোও বোঝা যায়। সেখানে এখনো অনেক মানুষ মানতে চান না যে বিশ্ব বদলে গেছে। অনেকেই অন্যের সাহায্যের ওপর নির্ভর করতে অভ্যস্ত। কখনো কখনো তাঁরা ইউক্রেন প্রসঙ্গে রাশিয়ার বক্তব্যও অন্ধভাবে পুনরাবৃত্তি করেন।

আজ ইউরোপের সমস্যাটি আরও জটিল। শুধু ওস্টালজিয়া নয়, এক নতুন মানসিকতা তৈরি হয়েছে, যার নাম ‘ওয়েস্টালজিয়া’। আঙ্কারার বৈঠকে এ প্রবণতা স্পষ্টভাবে দেখা গেছে।

ইউরোপের উচিত ছিল নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া। ট্রাম্পকে খুশি করতে বিপুল অর্থ ব্যয় করার বদলে তাদের ভাবা উচিত, প্রয়োজনে তারা নিজেরাই কীভাবে বড় যুদ্ধ মোকাবিলা করবে। প্রতিরক্ষা খাতে নির্দিষ্ট শতাংশ ব্যয় করার বদলে তাদের বাস্তব প্রয়োজন অনুযায়ী বিনিয়োগ করা দরকার।

ওয়েস্টালজিয়ার প্রথম লক্ষণ হলো বাস্তবতা অস্বীকার করা। ইউরোপ এখনো মনে করতে চায়, আমেরিকার নিরাপত্তা নিশ্চয়তা আগের মতোই অটুট রয়েছে, যেমনটি ছিল রোনাল্ড রিগান ও জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের আমলে। তারা এখনো আমেরিকার অস্ত্র কিনে চলেছে, যেন অতীতকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমেরিকা বদলে গেছে। ২০২৯ সালে যদি নতুন প্রশাসনও আসে, তবু এ পরিবর্তনের ধারা চলতেই থাকবে।

অতীতকে রঙিন চোখে দেখার প্রবণতাও এখানে কাজ করছে। ঠান্ডা যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ইউরোপ আমেরিকার শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। এতে তাদের নিজস্ব সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন তারা রাশিয়া, আমেরিকা এবং চীনের মতো শক্তির মধ্যে থেকেও নিজেদের শক্তিকে খাটো করে দেখে।

দ্বিতীয় লক্ষণ হলো বিনা খরচে সুবিধা নেওয়ার মানসিকতা। জার্মানির পূর্বাঞ্চলের মতোই ইউরোপ দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকার নিরাপত্তা ব্যয়ের ওপর নির্ভর করেছে। এর ফলে তারা প্রতিরক্ষা খাতের পাশাপাশি শিল্প, প্রযুক্তি ও জ্বালানি স্বাধীনতায় যথেষ্ট বিনিয়োগ করেনি।

ইউরোপের উচিত ছিল নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া। ট্রাম্পকে খুশি করতে বিপুল অর্থ ব্যয় করার বদলে তাদের ভাবা উচিত, প্রয়োজনে তারা নিজেরাই কীভাবে বড় যুদ্ধ মোকাবিলা করবে। প্রতিরক্ষা খাতে নির্দিষ্ট শতাংশ ব্যয় করার বদলে তাদের বাস্তব প্রয়োজন অনুযায়ী বিনিয়োগ করা দরকার।

তৃতীয় লক্ষণ হলো এই নির্ভরতার প্রকাশ্য রূপ। ইউরোপীয় নেতারা অনেক সময়ই তাঁদের এই অবস্থান আড়াল করতে পারেন না। ফলে ট্রাম্প, পুতিন কিংবা চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং—কেউই তাঁদের যথেষ্ট গুরুত্ব দেন না। ইউরোপ তখনই সম্মান পাবে, যখন তারা নিজের পায়ে দাঁড়াবে।

ওস্টালজিয়া সাধারণ মানুষের আবেগ থেকে জন্ম নিয়েছিল। কিন্তু এটিকে বিস্তৃত করছে ইউরোপের রাজনৈতিক নেতৃত্ব। তারা জনগণের ভয় দূর করতে চাইছে ঠিকই, কিন্তু ভুল পথে। একবিংশ শতাব্দীতে সফল হতে হলে অতীতের স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে থাকা যাবে না। ভবিষ্যতের বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে।

  • মার্ক লিওনার্ড ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের পরিচালক।

স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট। ইংরেজি থেকে অনূদিত।