সৈয়দপুরে শতবর্ষী গাছগুলো কি সত্যি ঝুঁকিপূর্ণ

সৈয়দপুর বিমানবন্দর সড়কে রেলওয়ের ঝুঁকিপূর্ণ শতবর্ষী একটি গাছ। এ রকম ৩৩টি গাছ কাটার অনুমতি দিয়েছেন রংপুর বিভাগীয় বন কর্মকর্তা। শনিবারের ছবিপ্রথম আলো

নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর একটি পৌর শহর। এই শহরের ৩৩টি বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কেটে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছিল সৈয়দপুর রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। গত ১২ জুলাই ২০২৬ প্রথম আলোয় ‘ঝুঁকিপূর্ণ তেত্রিশ গাছ কাটবে রেলওয়ে’ শীর্ষক একটি খবর প্রকাশিত হয়।

প্রকাশিত খবর সূত্রে জানতে পারলাম, গাছগুলো ভেঙে পড়তে পারে এ আশঙ্কায় কেটে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন বিভাগ গাছগুলো কাটার অনুমতি দিয়েছিল। পত্রিকায় এই গাছগুলো কাটার খবর প্রকাশিত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা হয়। বর্তমানে গাছ কাটা স্থগিত রয়েছে।

সৈয়দপুর শহরের গোড়াপত্তন হয়েছে ব্রিটিশদের মাধ্যমে। ১৮৭০ সালে সৈয়দপুরে রেলওয়ে কারখানা স্থাপন করা হয়। তখন এখানে ব্রিটিশসহ বিভিন্ন এলাকার বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ কাজের সূত্রে এসে বসতি গড়ে তোলে।

এই শহরের অনেক ভবনে, সড়কে, কারখানায় ঔপনিবেশিক ইতিহাসের ছোঁয়া লেগে আছে। এই ছোট শহরে আছে একটি বিমানবন্দর। অনেকে নীলফামারী জেলাকে না চিনলেও নীলফামারীর এই সৈয়দপুরকে চেনেন। নীলফামারীতে যে রাজস্ব আদায় হয়, তা সিংহভাগ এই শহর থেকে। শহরের প্রধান সড়কের দুই পাশে এখনো অনেক প্রজাতির বড় বড় গাছ দেখা যায়।

সৈয়দপুরের পুরোনো গাছগুলো কেটে ফেলা হবেÑজানতে পেরে আমি সরেজমিন গাছগুলো দেখতে গিয়েছিলাম। প্রথমে যাই সৈয়দপুর অফিসার্স ক্লাবের উল্টো দিক পুরোনো বাবুপাড়ায়। সেখানে বিশালাকার একটি শিলকড়ইগাছ দেখতে পাই। জানলাম ওই গাছটি কেটে ফেলা হবে। গাছটির প্রস্থ মেপে দেখলাম প্রায় ২২ ফুট। এই গাছের চেয়েও বড় বড় গাছ সেখানে আছে। অপ্রয়োজনীয় কিংবা কোনো ব্যাঘাত সৃষ্টি করে এমন ডাল কাটা যেতে পারে। গাছটি কাটা সমীচীন বলে মনে হলো না।

পুরোনো বাবুপাড়া থেকে বের হয়ে অফিসার্স ক্লাবের সড়ক ধরে হাঁটতেই চোখে পড়ল একটি বিশালাকার কুম্ভীগাছ। আগেকার দিনে পাতার বিড়ি তৈরি করতে কাগজের বদলে যে পাতা ব্যবহার করা হতো, তা কুম্ভীগাছের পাতা। রংপুর বিভাগে আর কোথাও এত বড় কুম্ভীগাছ আছে বলে আমার মনে হয় না। এ গাছের ফুলও সুন্দর।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

আরেকটু সামনে যেতেই একটি গাছ চোখে পড়ল, দেখতে কিছুটা কুরচিগাছের মতো। কালিদাসের সংস্কৃত ‘মেঘদূত’ কাব্যে কুরচিগাছের বর্ণনা আছে। এই কুরচিগাছে অসময়ে ফুল দেখে প্রথমে ভ্রম হয়েছিল, এটি আদৌ কুরচিগাছ কি না। পরবর্তী সময়ে বৃক্ষবিদ মোকারম হোসেন জানালেন কুরচিরই একটি জাত এটা। বর্ষায় ফোটে। আরেকটু সামনে যেতেই দেখলাম একটি পুরোনো মহুয়াগাছ। কুম্ভী, কুরচি কিংবা মহুয়া উল্লিখিত ৩৩ গাছের তালিকাভুক্ত নয়।

সরকারি চাকরিতে জবাবদিহি না থাকার কারণে যার যা ইচ্ছা করতে পারে। বন বিভাগের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। যদি গাছ কাটার বিকল্প না থাকে, তাহলে তারা স্থগিতই–বা করছে কেন? আমাদের দেশে পুরোনো গাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। অনিবার্য না হলে যাতে আমাদের দেশের পুরোনো গাছগুলো কাটা না হয়, সে জন্যই বন বিভাগের অনুমতি নিতে হয়।

আরও খানিকটা সামনে এগিয়ে দেখলাম সৈয়দপুর বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ। কলেজের ভেতরেই দেখলাম কয়েকজন শিক্ষার্থী খেলছে। সামিয়া এবং রুহি নামের দুজনের সঙ্গে কথা হলো। এরা দুজনের কেউ জানে না ওই ক্যাম্পাসের বাইরের পাশের গাছ কাটা হবে। আমার কাছে জানতে পেরে বলল, পরের দিন তাঁরা তাঁদের স্যারদের কাছে জানবে কেন গাছ কাটা হবে। একটি বিশালকার আমগাছ দেখলাম। বেশ সুঠাম। এই সুঠাম সুউচ্চ আমগাছটি কেন কাটতে হবে, কী অসুবিধা করছে, সেটি বুঝতে পারলাম না।

পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানতে পেরেছি, গাছগুলো কাটার জন্য স্থানীয়দের দাবি ছিল। কিন্তু কেউ লিখিত আবেদন দিয়েছে—এ রকম কোনো তথ্য পেলাম না। সারা দেশে যেখানেই পুরোনো গাছ আছে, সেখানেই শুধু নয়, মাঝবয়সী অনেক গাছও উপড়ে পড়ে, ডাল ভেঙে পড়ে, এটা নতুন কোনো ঘটনা নয়। বৃক্ষবিজ্ঞান কিংবা আমাদের দেশের কোনো নীতিমালায় যদি থাকত প্রজাতিভেদে গাছের বয়স অনুযায়ী কেটে ফেলতে হবে, তাহলেও বুঝতাম বয়সের কারণে গাছগুলো কাটা হবে।

বন বিভাগ কিসের ভিত্তিতে গাছগুলো কাটার অনুমতি দিয়েছিল, সেটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। জনসাধারণের ক্ষতি হতে পারে, এ কারণে যদি গাছগুলো কাটা হয়, তাহলে তার পক্ষে ব্যাখ্যা থাকতে হবে। যে গাছগুলো কাটার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সে গাছ উপড়ে পড়ার আশঙ্কা আছে কি না, তা কেবল গাছ চোখে দেখেই বোঝা যাওয়ার কথা নয়। আমি যে গাছগুলো দেখেছি, তার একটিরও গোড়ার মাটি ধুয়ে যায়নি। কিংবা শিকড়বাকড় দৃশ্যমান হয়ে ওঠেনি।

এমনকি গাছগুলো এমন কোনো সড়কের পাশেও নয় যে সড়ক ঢালু আছে। বরং গাছগুলো সমতলে আছে। এই গাছগুলোর কোনোটি যদি উপড়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে তারও পরীক্ষা-নিরীক্ষার দরকার আছে। গাছ উপড়ে পড়ে মানুষ মারা যাওয়ার সমূহ আশঙ্কা থাকলে সেটাও আমলে নিতে হবে।

বন বিভাগ নির্দেশনা দিয়েছে একটি করে গাছের পরিবর্তে তিনটি করে গাছ লাগাতে হবে। আর রেল বিভাগ বলছে, তারা ৩৩টি গাছের বিনিময়ে ৫ হাজার গাছ রোপণ করবে। যদি সৈয়দপুরে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের গাছ রোপণের মতো কোনো স্থান থাকে কিংবা সড়কের পাশে ফাঁকা জায়গা থাকে, যেখানে ৫ হাজার গাছ রোপণ করা যাবে, তাহলে এই ৩৩টি গাছ কাটার কী সম্পর্ক?

আমি যে গাছগুলো দেখলাম, সেই গাছ কেটে সেখানে ১০০ চারাও রোপণ করা যাবে না। সৈয়দপুরে রেলওয়ের অনেক জমি আছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ সেই স্থানেই হয়তো পাঁচ হাজার চারা রোপণের কথা বলেছে। এখন তো গাছ কাটা স্থগিত। তাহলে কি তারা পাঁচ হাজার চারা রোপণ করবে না? চারা রোপণের সুযোগ থাকলে আগেই সেসব স্থানে গাছ রোপণ করা উচিত ছিল।

সরকারি চাকরিতে জবাবদিহি না থাকার কারণে যার যা ইচ্ছা করতে পারে। বন বিভাগের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। যদি গাছ কাটার বিকল্প না থাকে, তাহলে তারা স্থগিতই–বা করছে কেন? আমাদের দেশে পুরোনো গাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। অনিবার্য না হলে যাতে আমাদের দেশের পুরোনো গাছগুলো কাটা না হয়, সে জন্যই বন বিভাগের অনুমতি নিতে হয়।

বন বিভাগ ঠিকমতো যাচাই-বাছাই না করে গাছ কাটার অনুমতি দিলে আমাদের দেশের বৃক্ষের টিকবে না। সে জন্য ৩৩টি পুরোনো গাছ কাটার অনুমোদনে বন বিভাগের কর্মকর্তার দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণিত হলে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করতেই হবে। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

তুহিন ওয়াদুদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক