সম্প্রতি ঢাকায় কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন ও বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্টাল নেটওয়ার্কের (বাপা-বেন) আয়োজনে দুই দিনব্যাপী জাতীয় পরিবেশ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেই সম্মেলনে উপস্থাপিত একটি গবেষণা প্রেজেন্টেশনের সূত্র ধরে প্রথম আলো যে খবর ও সম্পাদকীয় প্রকাশ করেছে, তা বিশেষত নদীপারের যে কারও দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। সেই প্রেজেন্টেশনে উঠে এসেছে, ২০২০ সালে তিস্তাপারে প্রায় ৯০ হাজার বাড়ি ভেঙে বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
এটাই বোধ করি তিস্তায় সর্বোচ্চ নদীভাঙন। তিস্তা নদীতে প্রতিবছরই তীব্র ভাঙন হয়। মোট কতজনের বাড়ি-ভিটা তিস্তায় বিলীন হয়েছে, এ তথ্য সরকারের কাছে নেই। ১৭ বার বাড়ি ভেঙেছে—এমন ব্যক্তির সঙ্গেও দেখা হয়েছে। তিস্তায় চার-পাঁচবার বাড়ি ভেঙেছে, এমন অসংখ্য মানুষ আছে।
তিস্তাপারে গিয়ে প্রবীণ ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বললে জানা যায় নদীভাঙন কত ভয়ংকর! তিস্তার বাঁ তীরে লালমনিরহাটের মহিষখোচায় কিছুদিন আগে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। সেখানে একজন বয়স্ক ব্যক্তি বলছিলেন, যে স্থানে তাঁর বাড়ি ছিল, সেই স্থান এখন নদীর চার-পাঁচ কিলোমিটার ভেতরে। ডান তীরে অনেককে বলতে শুনেছি, তাঁদের বাড়ি তিস্তার চার-পাঁচ কিলোমিটার ভেতরে ছিল।
এতে বোঝা যায়, নদীর দুপারেই কয়েক কিলোমিটার করে প্রস্থে ভেঙেছে। গত বছর কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার ঘড়িয়ালডাঙা ইউনিয়নের গতিশয়াশামে একটি জরিপ করেছি। ২০২৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে ওই স্থানে প্রায় ছয় শ বাড়ি, সড়ক, স্কুল, মসজিদ, মাদ্রাসা ভেঙেছে। জরিপে উঠে আসা চিত্রে দেখা যায়, সরকার ওই ভাঙনকবলিত পরিবারের কাউকে বাড়ি করে দেয়নি।
প্রতিবছর তিস্তা নদী থেকে হাজার হাজার বাড়ি-ভিটা বিলীন হয়। আমরা প্রতিবছর তা–ই দেখে আসছি এবং প্রবীণদের কাছেও এ তথ্যই পাচ্ছি। এই ভাঙনের ইতিহাসে ২০২৫ সালে একটি ভিন্ন চিত্র আমরা দেখেছি। এ বছর নদীতে মানুষের বসতভিটা ভেঙে যাওয়ার পরিমাণ সর্বকালের কমসংখ্যক।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের একাধিক প্রকৌশলী বলেছেন, বর্ষা এলে তাঁরা তটস্থ থাকতেন তিস্তা নদীর ভাঙন নিয়ে। দিনে-রাতে তাঁরা ছুটে বেড়াতেন। যদিও তাঁদের সেই ছোটাছুটিতে ভাঙন রোধে তেমন কাজ হতো না। অন্য যেকোনো বছরের তুলনায় বর্ষায় এবার কর্মকর্তাদের আগের মতো তটস্থ থাকতে হয়নি। যতটুকু জানা গেছে, এ বছর সর্বসাকল্যে এক শ বাড়িও সরাতে হয়নি।
গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসে পানিসম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান রংপুরের কাউনিয়ায় ‘তিস্তা নিয়ে করণীয়’ শীর্ষক গণশুনানি অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। তখন তিনি তিস্তা নদীর অতি ভাঙনপ্রবণ ৪৫ কিলোমিটার ভাঙন রোধের জন্য ২৪৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছিলেন। ৪৫ কিলোমিটারের মধ্যে যে ২০ কিলোমিটার ভীষণ ভাঙনপ্রবণ ছিল, সেই ২০ কিলোমিটারের কাজ দ্রুততম সময়ে গত বছর শুরু হয়।
গত বছর যে টাকা বরাদ্দ হয়েছিল, সেই টাকায় করা প্রতিরোধমূলক কাজ তিস্তা নদীর ভাঙন ঠেকিয়েছে। যুগের পর যুগ যে কাজ করা হয়নি, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সেই কাজে বিলম্ব করেননি। কারণ, তিনি তিস্তাভাঙনের ভয়াবহতা সম্পর্কে জানতেন। উপদেষ্টা হওয়ার আগেও অতীতে তিনি কয়েকবার তিস্তা ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছিলেন। এই দুঃখ-দুর্দশা তাঁর নিজ চোখে দেখা।
তিস্তাপারের মানুষ ভাঙনের স্থায়ী সমাধান চায়। নদীর গভীরতা না থাকায় সামান্য পানিতে যে বন্যা হয়, সেই বন্যা থেকে মুক্তি চায়। স্থায়ী সমাধান যত দ্রুত হবে, ততই কল্যাণ
তিস্তা নদীর বয়স ২৪০ বছর। তিস্তা নদী সৃষ্টির পর এত বৃহৎ পরিসরে ভাঙন রোধে কখনো কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার ইতিহাস জানা যায় না। অতীতে যখন নদীর ভাঙন সীমাহীন পর্যায়ে পৌঁছাত, তখনো কোনো সহায়তা সরকার থেকে পাওয়া যেত না। আমি নিজে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক বরাবর আবেদন করেও সাড়া না পাওয়ার ঘটনা আছে। তিস্তাপারে এমনও স্থান আছে, যেখানে পাঁচ কোটি টাকা ব্যয় করলে পাঁচ শ কোটি টাকা সাশ্রয় হতো। হাজার হাজার বাড়ি ভাঙন থেকে রক্ষা পেত। এই সামান্য টাকাও অতীতে বরাদ্দ দেওয়া হয়নি ভাঙন রোধে।
তিস্তায় ২৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ে যে ভাঙন বন্ধ হচ্ছে, এতে লাখ কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে। বিগত সরকারের সময়ে তিস্তা মহাপরিকল্পনার দোহাই দিয়ে দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর ছেলেভোলানো গল্প শোনানো হয়েছে। না হয়েছে মহাপরিকল্পনা, না হয়েছে ভাঙন রোধে কোনো কাজ।
তিস্তাপারের মানুষের জন্য জরুরি ছিল ভাঙন বন্ধ করার কাজ সচল রেখে মহাপরিকল্পনার সমীক্ষা বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে নেওয়া। তা না করে মহাপরিকল্পনার নামে ভাঙন বন্ধে কোনো কাজই করেনি। সেই কাজটি করেছে অন্তর্বর্তী সরকারের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়।
অতীতের সরকার যদি তিস্তা ভাঙন রোধে সাময়িক কাজ চলমান রেখে স্থায়ী ভাঙন রোধের চেষ্টা জারি রাখত, তাহলে অন্তত লাখ লাখ মানুষ ভাঙনের কারণে উদ্বাস্তু হতো না। প্রতিবছর যে হাজার হাজার মানুষ এলাকা ছেড়ে চলে যায়, সেটিও ঘটত না। নদীভাঙন রোধ কেবল আর্থিক লাভালাভের বিষয় নয়। ভয়াবহ অমানবিকতা থেকেও নদী তীরবর্তী জনগণকে রক্ষার কাজ।
তিস্তা নদীর প্রতি অতীতের সরকার কখনো ন্যায়বিচার করেনি। সরকার যদি সারা দেশের যেকোনো প্রকল্পের সঙ্গে তিস্তা সুরক্ষার প্রকল্পের তুলনা করত, তাহলে তিস্তা সুরক্ষায় কাজ করত সবার আগে। বিগত সরকার যে তিন লাখ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০টি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে, সেগুলোর আগে তিস্তা সুরক্ষার কাজ করত। সরকার যে মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করেছে, সেগুলো ছিল মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য। তিস্তা মেগা প্রকল্প হতো মানুষের বেঁচে থাকার প্রকল্প।
তিস্তা নদীতে উল্লিখিত ভাঙনকবলিত ৪৫ কিলোমিটার ছাড়া আরও কিছুটা অংশ ভাঙনপ্রবণ আছে। এই অংশটুকুতেও ভাঙন বন্ধে যদি অনুরূপ কাজ করা যায়, তাহলে তিস্তাপারে ভাঙন ন্যূনতম পর্যায়ে আসবে। যতটুকু জানতে পেরেছি, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সেই কাজও করছে।
সম্প্রতি সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান চীনের রাষ্ট্রদূতকে সঙ্গে নিয়ে তিস্তা নদী পরিদর্শন করেছেন। গণমাধ্যমে তিনি জানিয়েছেন বাংলাদেশের পক্ষে সব কাজ সম্পন্ন করে চীন সরকারের কাছে দেওয়া হয়েছে। চীন সরকার যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে মহাপরিকল্পনার ঋণ প্রদানের বিষয় চূড়ান্ত হবে। চীনের রাষ্ট্রদূতও আশা ব্যক্ত করেছেন। রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছা আছে বলেই চীনের রাষ্টদূত নিশ্চয়ই তিস্তায় এসেছিলেন।
তিস্তাপারের মানুষ ভাঙনের স্থায়ী সমাধান চায়। নদীর গভীরতা না থাকায় সামান্য পানিতে যে বন্যা হয় সেই বন্যা থেকে মুক্তি চায়। স্থায়ী সমাধান যত দ্রুত হবে ততই কল্যাণ।
তুহিন ওয়াদুদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক
