অভিমত–বিশ্লেষণ
জুলাইকে কেন বিপ্লব না বলে অভ্যুত্থান বলা হয়
জুলাই কোনো সমাপ্ত বিপ্লব নয়; বরং একটা অবরুদ্ধ বৈপ্লবিক সম্ভাবনা, যে সম্ভাবনাকে অনেকে শেষ বলে ধরে নেন। তবে মনে রাখা দরকার, ইতিহাসের দীর্ঘ বাঁকে দুই বছর বড় অল্প সময়। জুলাই মানুষের মনে যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা জ্বালিয়েছে, তা আজও দেদীপ্যমান। লিখেছেন অনুপম দেবাশীষ রায়
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ডক্টরাল গবেষণার সুপারভাইজার মাইকেল বিগস প্রায়ই জিজ্ঞেস করেন, আমরা জুলাইকে ‘অভ্যুত্থান’ কেন বলি, ‘বিপ্লব’ কেন বলি না?
প্রশ্নটা কৌতূহলোদ্দীপক। আসলে আমরা জনপরিসরে এটিকে অভ্যুত্থান হিসেবেই গ্রহণ করেছি। কেউ এখনো এটিকে ‘শ্রাবণবিপ্লব’ বা ‘বর্ষাবিপ্লব’ বললেও মূলধারায় অভ্যুত্থানই বলা হচ্ছে। এমনকি জুলাইয়ের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারও ‘অভ্যুত্থান’ শব্দই ব্যবহার করেছে। এটি কি কেবলই ভাষাগত খুঁটিনাটি, নাকি আসলে এক বাস্তবতার প্রতিফলন, তা নিবিড়ভাবে ভাবা প্রয়োজন।
বিপ্লবের প্রশস্ততর সংজ্ঞা মেনে চললে অবশ্যই জুলাইকে একটি বিপ্লব বলা যায়। একটি সংঘবদ্ধ আন্দোলনের ফলাফল হিসেবে সরকারের পরিবর্তন ঘটেছে, এটিকে অন্তত একটি রাজনৈতিক বিপ্লব বলাই যায়। কিন্তু তবু আমরা অভ্যুত্থান বলছি, এর পেছনে একটা গভীর কারণ আছে বলেই আমার মনে হয়।
মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী চার্লস টিলির ভাষায় বলা যেতে পারে, জুলাইয়ে নিঃসন্দেহে একটি বৈপ্লবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তার বৈপ্লবিক পরিণতি না হয়ে বরং সম্ভাবনার মৃত্যু ঘটেছে একটি মধ্যস্থতাকারী শ্রেণির আয়োজনে। এই অর্ধপরিপক্ব অবস্থানটিই আমাদের দেশে অভ্যুত্থানের বিশেষ একটি বর্গকে হাজির করেছে, যা আন্দোলন আর বিপ্লবের মাঝামাঝি কোথাও অবস্থান করছে।
কিন্তু এই বৈপ্লবিক পরিস্থিতি কেন বৈপ্লবিক পরিণতি পেল না? আমার উত্তর হচ্ছে, বিপ্লবের ‘পরোক্ষকরণ’।
ইতালীয় তাত্ত্বিক ভিনসেনজো কুয়োকো যাকে প্রত্যক্ষ বিপ্লব বলেছেন, সেটা বাংলাদেশে ঘটে যাওয়ার একটা দৃঢ় সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে যা নির্মিত হয়েছে, তা আন্তোনিও গ্রামসির ভাষায় একটি পরোক্ষ বিপ্লব। এই যে একটি প্রত্যক্ষ বিপ্লবের সম্ভাবনাকে পরোক্ষ বিপ্লবের দিকে ধাবিত করার প্রক্রিয়াকেই আমি বলছি পরোক্ষকরণ।
প্রথমে আসি বৈপ্লবিক পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার গল্পে। সবাই জানেন, তবু আলাপের প্রয়োজনে বলে নেওয়া যাক। শিক্ষার্থীদের ওপর গুলিবর্ষণের পর কোটা আন্দোলনের চিত্র আমূল বদলে যায়। আমি শিক্ষার্থীদের, বিশেষত ‘অহিংস অরাজনৈতিক শিক্ষার্থী’দের কথা বলছি। কারণ, তাঁরাই ছিলেন সেই বিশেষ বর্গ, যাঁদের হত্যাকাণ্ড দেশের মানুষ মেনে নিতে পারেনি। শিক্ষার্থীদের বাইরেও শিশু রিয়া গোপ বা সাংবাদিক প্রিয়ও নিহত হয়েছেন, কিন্তু আন্দোলনের প্রধানতম প্রতীক হয়ে উঠেছে—আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ফাইয়াজ, ইয়ামিন, হৃদয় তরুয়া ও আনাস।
এই বিশেষ বর্গের যে একটি বিশেষ আবেদন ছিল, তা আমার গবেষণার একটি জরিপ থেকেও দেখা যায়। এই বর্গের বিশেষ আবেদনের কারণ আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও যাপনের মধ্যে নিহিত আছে। ছোটবেলায় আমরা যখন ‘ছাত্রজীবনের দায়িত্ব ও কর্তব্য’ নামের রচনা লিখতাম, তখন প্রায়ই লেখা হতো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো ছাত্রদের কর্তব্য। অর্থাৎ ছাত্ররা যে পরিবর্তন আর প্রতিবাদের ‘ভ্যানগার্ড’ হবে, এটা আমাদের সামষ্টিক কল্পনার মধ্যে মিশে আছে।
প্রাচীন রোমান আইনি কাঠামোর সঙ্গে তুলনা করলে বলা যায়, আমাদের অহিংস ও অরাজনৈতিক শিক্ষার্থীরা যেন ছিলেন আধুনিক ‘ট্রিবিউনি প্লেবিস’ বা সাধারণ জনতার প্রতিনিধি। প্রাচীন রোমে ট্রিবিউনদের যেমন ‘ইন্টারসেসিও’ বা যেকোনো অন্যায্য আইনে ভেটো দেওয়ার ও প্রতিরোধক্ষমতা ছিল, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা রাজপথে ঠিক সেই ভূমিকাই পালন করেছেন।
রোমান রীতি অনুযায়ী, ট্রিবিউনদের ক্ষতি করলে অপরাধী নিজেই সমাজে ‘স্যাকের’ বা সুরক্ষাহীন হয়ে পড়ত। জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলনে রাজপথে আমাদের ছাত্র-ট্রিবিউনদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী প্রকৃতপক্ষে নিজেদের নৈতিক ও আইনি সুরক্ষাকেই ধূলিসাৎ করে ফেলেছিল। এতে রাষ্ট্রযন্ত্র সম্পূর্ণ বিকল হয়ে পড়ে এবং নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যকার লিখিত সাংবিধানিক বা অলিখিত সামাজিক চুক্তি পুনর্বিবেচনার এক অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি হয়।
তবে সম্পূর্ণ নতুন সাংবিধানিক চুক্তিতে না গিয়ে দুই বছর আগে গঠিত হয় একটি অন্তর্বর্তী সরকার, যেখানে ছিলেন আমাদের কয়েকজন ট্রিবিউন বা ছাত্র আন্দোলনকারী নেতা। মজার বিষয় হলো, রোমান আইনি কাঠামোয় ট্রিবিউনদের ‘ইম্পেরিয়াম’ বা নির্বাহী শাসনক্ষমতা ছিল না। শাসনব্যবস্থার অংশ হতে হলে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রক্রিয়া মেনে, ট্রিবিউনের মর্যাদা ত্যাগ করেই তবে ইম্পেরিয়াম ক্ষমতা অর্জন করতে হতো।
প্রশ্ন ওঠে, বাংলাদেশে কি তা ঘটেছে? বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই ট্রিবিউন সরাসরি ইম্পেরিয়াম ক্ষমতার অংশ হয়ে গেলেন। জনগণের মানসপটে তাঁদের এই রাজনৈতিক রূপান্তরের জন্য কি যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছিল?
আরেকটু পেছনে গেলে, আমাদের এই অন্তর্বর্তী সরকারের আগমনকেই বিশ্লেষণ করতে হবে। শিক্ষার্থী-জনতা আন্দোলন করে সরকারের পতন ঘটালেন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই সামরিক আয়োজনে দেশের এনজিওভিত্তিক সুশীল সমাজ ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক বিদ্বৎসমাজ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল যে তাঁরা রাষ্ট্রক্ষমতা বুঝে নেওয়ার মতো যোগ্যতা অর্জন করতে পারেননি।
এই বিদ্বৎসমাজ সিদ্ধান্ত নিল যে ক্ষমতার মোড়কে আসতে গেলে অবশ্যই তাঁদের প্রত্যয়ন ও মধ্যস্থতা ছাড়া সেখানে যাওয়া সম্ভব নয়। মধ্যস্থতা করতে এসে এই বিশেষ সমাজ মধ্যস্বত্বভোগী হয়ে উঠল। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে উড়িয়ে এনে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান করা হলো। অনেকে হয়তো বলবেন, আন্তর্জাতিক ও জাতীয় রাজনীতির নানা মারপ্যাঁচের কারণে এর চেয়ে বেশি কিছু সম্ভব ছিল না। এটা যদি মেনেও নিই, তবু স্বীকার না করে উপায় নেই যে এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বিপ্লবকে প্রত্যক্ষতা থেকে বিচ্যুত করে দিল।
এরপর যে প্রক্রিয়াটি শুরু হলো, তা স্পষ্টত পরোক্ষ বিপ্লব; গ্রামসির ভাষায়, বিপ্লববিহীন বিপ্লব। প্রশ্ন জাগে, শিক্ষার্থীরা যদি এই অন্তর্বর্তী সরকারে যোগ না দিতেন এবং তিন মাসের মধ্যে একটি দ্রুত নির্বাচনের সুযোগ তৈরি হতো, যেখানে তাঁরা নিজেদের আমূল সংস্কারের ইশতেহার নিয়ে সরাসরি অংশ নিতে পারতেন, তবে পরিস্থিতি কেমন হতো? তাঁরা কি তবে বর্তমানের সীমিত উপস্থিতির চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থানে যেতে পারতেন, কিংবা সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পারতেন? রাজনৈতিক সমীকরণ ও জল্পনাকল্পনার চুলচেরা বিশ্লেষণে যাঁরা পারদর্শী, তাঁরা হয়তো এর উত্তর ভালো দিতে পারবেন।
কিন্তু এটা স্পষ্ট, অন্তর্বর্তী সরকারের অধীন নানা কমিশন তৈরি করে সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক সমাজের মধ্যবর্তীরা জান বাজি রাখা বিপ্লবী জনতাকে বাইরে রেখে যে প্রক্রিয়া শুরু করেছিল, তাকে প্রত্যক্ষ বিপ্লব তো নয়ই, বড়জোর ‘লিবারেল ডেমোক্রেটিক প্রসিডিউরালিজম’ বলা যায়। গ্রামসির কাছ থেকে ধার করে বলা যায়, এভাবেই সংঘটিত হয় পরোক্ষ বিপ্লব। এর মূল লক্ষ্যই থাকে প্রত্যক্ষ বিপ্লবকে ঠেকিয়ে রাখা। এই আলাপকে এমনভাবে বন্দী করা হলো, মনে হবে যেন বৈপ্লবিক কোনো আকাঙ্ক্ষাই ছিল না। অভিজাতদের মধ্যস্থতায় সংস্কারই যেন ছিল জুলাইয়ের মূল আকাঙ্ক্ষা।
তারপর যা ঘটল, তা আসলে এই পরোক্ষকরণ প্রক্রিয়ারই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। অন্তর্বর্তী সরকার নিজেই যখন জুলাই ঘোষণাপত্র প্রকাশ করল, সেখানে ২০২৪-এর ঘটনাবলিকে ‘অভ্যুত্থান’ বলেই অভিহিত করল। আমি মনে করি, এটা নেহাত ভাষাগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং এই নামকরণই সেই কাঠামো নির্ধারণ করে দিল, যার ভেতর দিয়ে গোটা ঘটনাপ্রবাহকে পরবর্তীকালে ব্যাখ্যা ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা হবে।
প্রশ্নটা আসলে সংস্কার হলো কি না তা নয়, প্রশ্নটা হলো, সম্পদ, ক্ষমতা আর বণ্টনের সম্পর্কে সেই সংস্কার কতটা বাস্তবিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম? এই মানদণ্ডে বিচার করলে বলা যায়, এই পুরো প্রক্রিয়া প্রাতিষ্ঠানিক মেরামতের প্রক্রিয়া, মোটেও পুঁজিবাদী উৎপাদন-সম্পর্কের রূপান্তর নয়।
গ্রামসি অবশ্য পরোক্ষ বিপ্লবকে ‘র্যাডিক্যাল-জ্যাকোবিন’ ধারার রূপান্তর কিংবা অভিজাতচালিত তথাকথিত ‘রাজকীয় বিজয়’—উভয় সংকট থেকেই স্পষ্টভাবে আলাদা করেছেন। এটি মূলত এমন এক প্রক্রিয়া, যেখানে শাসকশ্রেণি সংকটে পড়ে নিজেদের কিছুটা মানিয়ে নেয়, কিন্তু ক্ষমতাকাঠামো থেকে তাদের প্রকৃত বিচ্যুতি বা স্থানচ্যুতি ঘটে না। ঠিক যেমনটা ঘটেছিল ইতালীয় ‘রিসোর্জিমেন্তো’র ক্ষেত্রে, যা শেষ পর্যন্ত একটি মধ্যস্থতানির্ভর বুর্জোয়া উত্তরণে গিয়ে ঠেকেছিল।
এই উত্তরণের প্রক্রিয়া হিসেবেই যেন অনেকগুলো সংস্কার কমিশন আর একটি জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হলো। কাগজে-কলমে যতই চিত্তাকর্ষক শোনাক না কেন, বাস্তবে এগুলোর প্রধান কাজ দাঁড়াল শ্রমজীবী ও নিম্নবিত্ত মানুষের ভেতর থেকে উঠে আসা আমূল পরিবর্তনের দাবিগুলোকে কোনো ধরনের মৌলিক পুনর্বণ্টনমূলক পদক্ষেপ ছাড়াই শুষে নেওয়া। তদুপরি অধিকাংশ সুপারিশ আজও বাস্তবায়িত হয়নি।
বিএনপি সরকারের বাস্তবায়নের ইচ্ছা আদৌ আছে কি না, তা-ও সন্দেহের ঊর্ধ্বে নয়। ফলে এই উদ্যোগকে বড়জোর একটা উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরকার সংস্কার বলা যেতে পারে, কোনোভাবেই এটিকে বৈপ্লবিক কাঠামোগত রূপান্তর বলা যায় না।
সম্ভবত সেটা হওয়ার কথা ছিল না। কেননা অন্তর্বর্তী সরকার কোনো দিনই নিজেকে প্রকৃত অর্থে একটি বৈপ্লবিক কর্তৃপক্ষ হিসেবে দাঁড় করায়নি। সংবিধান স্থগিত হয়নি, আগের শাসনামল থেকে চলে আসা রাষ্ট্রপতি পদের প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতাও ভাঙা হয়নি। শিক্ষার্থীদের তিনজন প্রতিনিধিকে উপদেষ্টা করা হলেও বিপ্লবী শক্তির বৃহত্তর অংশগ্রহণ সীমিতই থেকে গেল। আন্দোলনের একাংশ পরে জাতীয় নাগরিক পার্টি গঠন করলেও দিন শেষে তারা ঐকমত্য কমিশনের আলোচনার অংশীদার প্রায় ৩০টি রাজনৈতিক দলের একটি মাত্র হয়ে থেকে গেল।
সংস্কারের প্রক্রিয়াকে বৈধতা দিতে একটি গণভোটের আয়োজনও করা হলো, যদিও অনেকগুলো সংস্কার প্রস্তাবকে একসঙ্গে একটি প্যাকেজে বেঁধে দেওয়ার সমালোচনা হয়েছে ব্যাপকভাবে। এত সমালোচনার পরও গণভোটে সংস্কারের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ রায় এল।
কিন্তু প্রশ্নটা আসলে সংস্কার হলো কি না তা নয়, প্রশ্নটা হলো, সম্পদ, ক্ষমতা আর বণ্টনের সম্পর্কে সেই সংস্কার কতটা বাস্তবিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম? এই মানদণ্ডে বিচার করলে বলা যায়, এই পুরো প্রক্রিয়া প্রাতিষ্ঠানিক মেরামতের প্রক্রিয়া, মোটেও পুঁজিবাদী উৎপাদন-সম্পর্কের রূপান্তর নয়।
এই গোটা প্রক্রিয়াকে ফরাসি দার্শনিক ক্রিস্টিন বুচি-গ্লুকসমানের বর্ণিত ‘উত্তরণের রাষ্ট্রায়ন’ ধারণার আলোকেও দেখা যায়। রাষ্ট্রযন্ত্র নিজেই সামাজিক সম্পর্কগুলোকে এমনভাবে পুনর্বিন্যস্ত করে, যাতে পুঁজির পুনরুৎপাদন ব্যাহত না হয়। মার্ক্স ও অ্যাঙ্গেলস যাকে বলেছিলেন বুর্জোয়া স্বার্থ পরিচালনার নির্বাহী কমিটি, অন্তর্বর্তী সরকারকে অনেকাংশে সেই ধাঁচেই দেখা যায়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী পার্থ চট্টোপাধ্যায় যেভাবে উত্তর-ঔপনিবেশিক পরোক্ষ বিপ্লবকে ব্যাখ্যা করেছিলেন, অর্থাৎ এটা অভিজাত শ্রেণির নিয়ন্ত্রিত সমঝোতার মধ্য দিয়ে একটা ব্যবস্থাপিত রাজনৈতিক উত্তরণ, সেটাও বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক।
আরেক রাজনৈতিক তাত্ত্বিক অ্যাডাম ডেভিড মর্টনের ভাষায় বললে, এটি আসলে স্থিতাবস্থা বা ধারাবাহিকতা বজায় রাখার শর্তে সামাজিক সম্পর্কের পুনর্বিন্যাসের মধ্য দিয়ে পুরোনো রাষ্ট্রীয় রূপের পুনরুৎপাদন। ফলে যে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কথা আমরা শুনেছিলাম, সেই চিন্তার পুরোধারাই হয়তো স্বীকার করবেন যে সেটি কখনোই ফলপ্রসূ হয়নি।
তাহলে শেষ পর্যন্ত জুলাই আমাদের কোথায় নিয়ে দাঁড় করাল? অন্তর্নিহিত রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সম্পর্কের কোনো বড় পুনর্গঠন ছাড়াই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতৃত্বাধীন একটি উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক বুর্জোয়া কাঠামোর দিকে নির্বাচনী উত্তরণ ঘটিয়েছে।
আমার ডক্টরাল গবেষণার সুপারভাইজার মাইকেলকে তাই এখন আমি বলি, আমরা অভ্যুত্থান বলি, কারণ যা ঘটেছিল, তা প্রত্যক্ষ বিপ্লবের একটা সম্ভাবনামাত্র ছিল, যাকে ধাপে ধাপে পরোক্ষকরণের মধ্য দিয়ে একটা স্থিতিশীল সংস্কারবাদী মীমাংসায় রূপান্তর করা হয়েছে।
জুলাই তাই কোনো সমাপ্ত বিপ্লব নয়; বরং একটা অবরুদ্ধ বৈপ্লবিক সম্ভাবনা, যে সম্ভাবনাকে অনেকে শেষ বলে ধরে নেন। তবে মনে রাখা দরকার, ইতিহাসের দীর্ঘ বাঁকে দুই বছর বড় অল্প সময়। জুলাই মানুষের মনে যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা জ্বালিয়েছে, তা আজও দেদীপ্যমান।
অনুপম দেবাশীষ রায় অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞানের ডক্টরাল ক্যান্ডিডেট এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও দর্শন বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক।
মতামত লেখকের নিজস্ব