বিগত প্রায় ষোলো বছরের অপশাসন আর দেড় বছরের দুর্বল শাসনে সন্দেহই নেই নতুন সরকারের কাছে দেশের মানুষের প্রত্যাশা হবে আকাশসম। কিন্তু এসব প্রত্যাশা পূরণ করতে নতুন সরকারের অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতাও অনেক। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক-আর্থিক খাতসহ প্রায় সব খাতেই ব্যাপক লুটপাট, দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের ফলে দেশের মূল অর্থনীতি ভঙ্গুর হয়ে পড়েছিল। সেই গর্ত থেকে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করে অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের তেমন গতি বাড়াতে পারেনি। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের মতে, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের গতি আরও শ্লথ হয়েছে। ফলে নতুন সরকার পূর্বসূরিদের কাছ থেকে একটি দুর্বল অর্থনীতি পেয়েছে, যা সচল করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যদিও সংস্থা দুটির আশা, নতুন সরকারের আমলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরলে বিনিয়োগ বাড়বে। শিল্প খাত চাঙা হবে। এতে কর্মসংস্থানও বাড়বে। ফলে অর্থনীতিতে গতি ফেরানো সম্ভব হবে।
অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতির যে মৌলিক সূচকগুলো দেখিয়েছে, তার মধ্যে কেবল প্রবাসীদের রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক অবস্থায় রয়েছে। অন্য খাতগুলো এখনো আছে অস্বস্তিতে। সেই সঙ্গে গোদের উপর বিষফোড়া হিসেবে যোগ হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের উপর চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ।
গত ১০ ফেব্রুয়ারি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার এবং নিট রিজার্ভ ছিল ২ হাজার ৯৫২ কোটি ডলার। আকুর (এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন) পেমেন্টের ফলে এটি কিছুটা কমে আবার অল্প বেড়েছে। এই রিজার্ভ দিয়ে ৪ দশমিক ৭ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী কমপক্ষে তিন মাসের আমদানি ব্যয়ের সমান রিজার্ভ থাকলে তাকে নিরাপদ মাত্রার ধরা হয়। সেই হিসাবে বাংলাদেশের রিজার্ভ এখন নিরাপদ মাত্রায় রয়েছে। তবে আগামী দিনে শিল্প খাত চাঙা হলে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাবে। তখন এ রিজার্ভ আরও বাড়াতে হবে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সপ্রবাহ বেড়েছে রেকর্ড পরিমাণে। কোনো কোনো মাসে ৩০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। গত জুলাই-জানুয়ারিতে রেমিট্যান্স এসেছে ১ হাজার ৯৪৩ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২১ দশমিক ৭৫ শতাংশ বেশি।
বিগত রাজনৈতিক সরকারের আমলে ডলারের দামে বড় ধরনের অস্থিরতা ছিল। বর্তমানে স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে। কিন্তু ডলারের দাম বেশ বেড়েছে। গত ১০ ফেব্রুয়ারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে প্রতি ডলারের দাম ছিল ১২২ টাকা ৭২ পয়সা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক পর্যায়ক্রমে ডলারের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইতিমধ্যে কিছুটা বেড়েছে। তবে আইএমএফ ডলারের দাম আরও বাড়ানোর পক্ষে। এ ক্ষেত্রে আইএমএফের চাপ মোকাবিলা করে নতুন সরকার ডলারের দাম কতটুকু ধরে রাখতে পারবে, সেটি এখনো দেখার বিষয়।
নতুন সরকার জনমনে অনেক আশা-আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করলেও বিভিন্ন জানা-অজানা সংকটে যাত্রাপথ যে মসৃণ হবে না, তা অনেকেরই ধারণা। তাই কান্ডারি সাবধান!
বিগত সরকারের শেষ দিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ছাপানো টাকায় ঋণ নেওয়ার মাত্রা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। বর্তমান সরকার বেশ কিছু ঋণ পরিশোধ করেছে। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ছাপানো টাকায় ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে গত জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নতুন সরকার ঋণ নিয়েছে ১৫ হাজার ৬৪ কোটি টাকা।
গত ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ব্যাংকঋণের স্থিতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বরের মধ্যে নিয়েছে ৫১ হাজার কোটি টাকা। নন–ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নেওয়া ঋণের স্থিতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ১ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জুলাই-ডিসেম্বরে ঋণ নিয়েছে ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। বাকি ঋণ বিভিন্ন সময় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বন্ডের মেয়াদ বাড়িয়ে নেওয়া হয়েছে।
গত ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারের বৈদেশিক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ২৪৩ কোটি ডলার। এর মধ্যে সরকারি খাতের ঋণ ৯ হাজার ৩০০ কোটি ডলার এবং বেসরকারি খাতের ঋণ ২ হাজার কোটি ডলার। স্থগিত ঋণের পরিমাণ একেবারেই নিম্নপর্যায়ে রয়েছে।
বিগত রাজনৈতিক সরকারের শেষ সময় থেকেই সরকারের রাজস্ব আয়ে ঘাটতি দেখা দেয়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এ ঘাটতি আরও বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বরে রাজস্ব আয় হয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪ দশমিক ১৯ শতাংশ বেশি। তবে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আয় এখনো কম। এদিকে সরকারের খরচ বেশি হচ্ছে। ফলে সরকারকে ঘাটতি অর্থায়নে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। নতুন সরকারের জন্য রাজস্ব আয় বাড়ানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, ব্যবসায় মন্দার কারণে রাজস্ব আয় আদায় কঠিন।
নতুন সরকারের জন্য আগামী দিনে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণও হবে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। গত জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতির হার আরও বেড়ে ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিসহ বিবিধ কারণে আগামী মাসগুলোয় মূল্যস্ফীতির হার আরও বাড়তে পারে। তবে অর্থবছর শেষে তা কিছুটা কমতে পারে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আইএমএফ পূর্বাভাস দিয়েছে।
রপ্তানি আয় কমছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারিতে রপ্তানি আয় হয়েছে ২ হাজার ৮৪১ কোটি ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৯৩ শতাংশ কম। রপ্তানি শিল্পে কাঁচামাল আমদানি ও এলসি খোলা কমছে। ফলে আগামী দিনেও রপ্তানি আয় কমতে পারে। বাজারে ডলারের প্রবাহ বাড়ায় আমদানিও বাড়ছে। প্রতি মাসে এখন ৫০০ কোটি ডলারের আমদানি হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বরে রপ্তানি ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে সামান্য বেশি।
গত অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে এ হার বাড়বে বলে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছে। খাদ্য মজুত রয়েছে প্রায় ১১ লাখ টন। বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে স্থবিরতা বিরাজ করছে। গত অর্থবছরে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ এসেছিল ২৬৮ কোটি ডলার। চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে এসেছে ৩২ কোটি ডলার।
ব্যাংক খাত এখনো নানামুখী সংকটে নিমজ্জিত। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক লুটপাট ও টাকা পাচারের কারণে ব্যাংকগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। তারল্য–সংকট রয়েছে। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণ বেড়ে ৬ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। তবে ডিসেম্বরে তা কিছুটা কমেছে। ঋণের সুদের হারও বেড়েছে অনেক। বর্তমান এ হার ৯ থেকে ১৭ শতাংশ। সুদের হার বেশি থাকার কারণে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে ঋণের প্রবাহ অনেক কমে গেছে। অধিকতর মন্দ ঋণের কারণে অনেক ব্যাংক তারল্য–সংকটে থাকায় নতুন করে ঋণ দিতে পারছে না। কেউ কেউ পারলেও টাকা চলে যাচ্ছে ভুল লোকের হাতে।
তাই নতুন সরকার জনমনে অনেক আশা-আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করলেও বিভিন্ন জানা-অজানা সংকটে যাত্রাপথ যে মসৃণ হবে না, তা অনেকেরই ধারণা। তাই কান্ডারি সাবধান!
মামুন রশীদ অর্থনীতি বিশ্লেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব
