বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে প্রধানমন্ত্রী হবেন, সে বিষয়ে কারও সংশয় ছিল না। মঙ্গলবার সকালেই বিএনপির সংসদীয় দল সর্বসম্মতিক্রমে তাঁকে সংসদ নেতা হিসেবে নির্বাচন করে। আর সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাকেই রাষ্ট্রপতি সরকার গঠনের আহ্বান জানাবেন, সেটাই স্বাভাবিক।
বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল নতুন মন্ত্রিসভায় নবীন ও প্রবীণের সমন্বয় থাকবে এবং এর আকার খুব বড় হবে না। মন্ত্রিসভায় তরুণেরা প্রাধান্য পেয়েছেন, এটা সত্য। কিন্তু যাঁরা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন, তাঁরা এর জন্য কতটা প্রস্তুত আছেন কিংবা নিজেদের তৈরি করেছেন, সে বিষয়েও প্রশ্ন আছে।
তবে মন্ত্রিসভার সদস্য বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ভারসাম্য যে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। প্রথম আলোর খবর থেকে জানা যায়, ২৫ জেলা থেকে কোনো মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী নেওয়া হয়নি। অনুসন্ধানে জানা গেছে, যেসব জেলায় বিএনপি খারাপ ফল করেছে, সেসব জেলা মন্ত্রী থেকেও বঞ্চিত হয়েছে। এতে ওই এলাকার মানুষ নিজেদের অপমানিত বোধ করতে পারেন।
উল্লিখিত ২৫ জেলার মধ্যে দারিদ্র্যপীড়িত কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, রংপুর, নীলফামারী যেমন আছে; তেমনি আছে মেহেরপুর, সাতক্ষীরা ও চুয়াডাঙ্গাও। মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও গোপালগঞ্জের সব আসনে বিএনপি জয় পেলেও সেখান থেকেও কোনো মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী নেওয়া হয়নি। উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলকে জামায়াত-অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে শাস্তি দেওয়া হয়েছে বলেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। কিন্তু শেষোক্ত তিন জেলার জনপ্রতিনিধিরা কী দোষ করলেন? বৃহত্তর ফরিদপুর থেকে একজন প্রতিমন্ত্রী নেওয়া হয়েছে মাত্র।
দপ্তর বণ্টনেও একধরনের অসমতা লক্ষ করা গেছে। যেমন তথ্য ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একজন পূর্ণমন্ত্রীর পাশাপাশি প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ করা হয়েছে। দুটি মন্ত্রণালয়ই ছোট। পার্বত্য চট্টগ্রামে বরাবর স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের থেকে মন্ত্রী নেওয়া হয়। এবারও হয়েছে। কিন্তু একজন প্রতিমন্ত্রী জুড়ে দেওয়া হয়েছে সমতল থেকে। এটা ওই অঞ্চলের অধিবাসীদের মধ্যে সন্দেহ বাড়াতে পারে। তাহলে কি মন্ত্রীর ওপর খবরদারি করার জন্যই একজন প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে? শেখ হাসিনা সরকারের আমলে তথ্য মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীর পাশাপাশি প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের পরিণতি কী হয়েছিল, তা-ও আমাদের জানা।
নব্বইয়ের দশকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পালাক্রমে আনুষ্ঠানিক ছায়া মন্ত্রিসভা না করলেও দুই দলই বিকল্প নেতৃত্ব তৈরি করেছিল, যাঁরা নিজ নিজ বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত ও প্রস্তাবের বিশ্লেষণ করতেন এবং ক্ষেত্রবিশেষে বিকল্প প্রস্তাবও পেশ করতেন। একবার বিরোধী দলে থাকতে বিএনপি বিকল্প বাজেটও উপস্থাপন করেছিল। এরপর আর আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্র কাজ করেনি। ক্ষমতাসীন দল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সবকিছু দখল করেছে এবং বিরোধী দল সব অন্যায়ের প্রতিকার হিসেবে রাজপথকেই ভরসা করেছে।
মন্ত্রিসভা গঠনের ক্ষেত্রে তৃতীয় যে বিষয়টি খেয়াল রাখা দরকার, সেটি হলো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থের সঙ্গে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে যেন স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি না হয়। যেমন একজন ব্যবসায়ী যদি বাণিজ্য বা অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকেন, তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। অতীতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সরকার গঠনের ক্ষেত্রে স্বার্থের দ্বন্দ্বের বিষয়টিতে গুরুত্ব দেয়নি। এবার আশা করা গিয়েছিল পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিএনপির সরকার সেটি মনে রাখবে। কিন্তু সব ক্ষেত্রে মনে রেখেছে, এমনটি বলা যাবে না।
নতুন মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের দায়িত্ব রাখা হয়েছে। এটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু জ্যেষ্ঠ ও কনিষ্ঠ মন্ত্রীদের মধ্যে এমন মন্ত্রণালয়ও দেওয়া হয়েছে, যার সঙ্গে তাঁদের অভিজ্ঞতা ও কাজের সংগতি নেই। যিনি যে বিষয়ে অধিক অভিজ্ঞ, তাঁকে সেই মন্ত্রণালয় না দিয়ে অন্য মন্ত্রণালয় দেওয়ার উদাহরণও আছে।
এহছানুল হক মিলনকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় দেওয়ায় শিক্ষাঙ্গনের মানুষ খুশি হবেন আশা করি। আগেরবার তিনি প্রতিমন্ত্রী হিসেবে পাবলিক পরীক্ষায় নকল বন্ধে শক্ত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছেন।
অন্যদিকে কৃষির সঙ্গে খাদ্য মেলানো গেলেও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদকে যুক্ত করা কিংবা বাণিজ্যের সঙ্গে শিল্প ও বস্ত্র-পাটকে মেলানোও যথার্থ হয়েছে বলে মনে করি না।
অনেক ছোট মন্ত্রণালয়ে একাধিক মন্ত্রী নেওয়া হয়েছে। আবার এক ব্যক্তিকে দুই বা ততোধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টিও অসামঞ্জস্যপূর্ণ। সড়ক পরিবহনের সঙ্গে রেল মন্ত্রণালয়কে সংযুক্ত করা গেলেও নৌপরিবহনকে কোনোভাবে মেলানো যায় না। চিকিৎসক ও ড্যাব নেতা জাহিদ হোসেনকে মন্ত্রিসভায় আনা হলেও তাঁকে দেওয়া হয়েছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে সরদার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেনকে দেওয়া হয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এ সিদ্ধান্তের যথার্থতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সংসদে মনোনয়নের মতো মন্ত্রিসভাতেও নারীর অংশীদারত্ব খুবই কম। একজন পূর্ণমন্ত্রী ও দুজন প্রতিমন্ত্রী। বিএনপির নারী নেতৃত্বের মধ্যে আর কোনো যোগ্য নেত্রী ছিলেন না, যাঁরা মন্ত্রী হতে পারেন? নারীর ক্ষমতায়নের পক্ষে জোরালো আওয়াজ তোলা দলটি নারীর প্রতি সুবিচার করেছে বলে মনে হয় না। একই কথা প্রযোজ্য সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্বের বিষয়েও।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের পর বিএনপির পক্ষ থেকে এই ধারণা দেওয়া হয়েছিল যে এবারের ছোট বা মাঝারি মন্ত্রিসভা গঠিত হবে। কিন্তু গত মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজার উন্মুক্ত অঙ্গনে সাড়ম্বরে যে মন্ত্রিসভা শপথ নিল, তাকে কোনোভাবে ছোট বলার উপায় নেই। প্রধানমন্ত্রীসহ ৫০ জনের মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণের রাতেই মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী মর্যাদায় ১০ জন উপদেষ্টাকেও সরকার দেশবাসীকে উপহার দিয়েছে।
উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোয় মন্ত্রিসভায় কাউকে নেওয়ার আগে দীর্ঘ প্রস্তুতি নেওয়া হয়। সম্ভাব্য মন্ত্রীকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে কাজের জন্য প্রস্তুত করা হয়। বিরোধী দলের ছায়া মন্ত্রিসভা এর অন্যতম উদাহরণ। যাঁরা ভবিষ্যতে ক্ষমতায় যাবেন, তাঁরা এভাবে প্রস্তুতি নেন। কিন্তু আমাদের এখানে সেই রেওয়াজ এখনো গড়ে ওঠেনি। বিএনপি বহু বছর সংসদের বাইরে থাকায় সেই সুযোগও হয়তো কম ছিল।
মন্ত্রিসভায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে খলিলুর রহমানের অন্তর্ভুক্তির ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক পরিসরে বেশ কৌতূহল ও আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। তিনি ছিলেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা। বিএনপির নেতারা একসময় যাঁকে কঠোর সমালোচনা করেছেন, তাঁকেই কেন মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হলো। এর কারণ হতে পারে বিএনপিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার মতো কোনো ব্যক্তি নেই। কিংবা তিনি এতটাই প্রভাবশালী যে তাঁকে সরকারে না নিয়ে বিএনপির কোনো উপায় ছিল না। তাঁর নিয়োগ নিয়ে সামনের দিনগুলোতে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারকে বিরোধীদের সমালোচনার মুখে পড়তে হবে বলে মনে হয়।
সব মিলিয়ে বিএনপির নতুন সরকারকে কিছুটা এলোমেলো ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর স্বার্থের কাছে নমনীয় বলে মনে হয়েছে। নতুনত্ব আনার কথা বলা হলেও মন্ত্রিসভায় সেই ছাপ খুব বেশি দেখা গেল না। গতিশীল নেতৃত্ব এবং জবাবদিহিমূলক সরকারই জনগণের প্রত্যাশা।
● সোহরাব হাসান কবি ও সাংবাদিক।
ই–মেইল: [email protected]
*মতামত লেখকের নিজস্ব
