দেশজুড়ে এখন আলোচিত খবর। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় তার বিগত বছরগুলোর ‘ঐতিহ্যের’ ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে। পেছন ফিরে তাকালে দেখা যাবে, নিয়োগবাণিজ্যে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ‘সোনার অক্ষরে’ জ্বলজ্বল করছে।
বিতর্কিত নিয়োগের অভিযোগের মধ্য দিয়ে সেই ইতিহাস আরও বেশি সমৃদ্ধ করার পথেই হাঁটছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির বর্তমান হর্তাকর্তারা। যাঁদের মধ্যে একজন অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলে ইতিমধ্যে দেশজুড়ে চরম সমালোচিত হয়েছেন। বিতর্কিত নিয়োগে আছে তাঁর মেয়ের নামও। এবার কত দ্রুত কত বেশি নিয়োগ দেওয়া যায়, সেই প্রতিযোগিতায় নেমেছে বিশ্ববিদ্যালয়টি।
একদা এ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম অন্য সবার মতো চোখে নতুন আশা, স্বপ্ন ও উদ্দীপনা নিয়ে। তারুণ্যে ভরপুর দিন তখন। পাহাড়ের পর পাহাড়ঘেরা সবুজের সমারোহে উচ্চশিক্ষার উন্মুক্ত এক পাঠশালা।
একেক দিন ক্লাসরুমে যেতে থাকি, একেকজন শিক্ষকের সঙ্গে পরিচিত হতে থাকি। কোনো কোনো শিক্ষক তাঁদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও পাণ্ডিত্যে আমাদের মুগ্ধ করেন। কোনো কোনো শিক্ষক চরমভাবে হতাশ করতে থাকেন। এমন শিক্ষকের দেখা মিলতে থাকল, যাঁরা ক্লাসরুমে কিছুই পড়াতে পারেন না। নবীন শিক্ষার্থীদের সামনে দাঁড়িয়ে গড়গড় করে কী কী সব বলে যান বা নোটখাতা নিয়ে এসে সেখান থেকে দেখে দেখে বোর্ডে লিখতে থাকেন আর আমাদের সেগুলোর কপি করতে বলেন। এটা দেখে তো সবাই অবাক, এ কোন কিন্ডারগার্টেনের ক্লাসরুমে চলে এলাম!
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের সহপাঠীদের সঙ্গে পরিচিতি হয়, বন্ধুত্ব হয়। আগের বন্ধুদের খুঁজেপেতে নিই। আড্ডা জমে যায়। জানতে পারি, সবার বিভাগেই কোনো কোনো শিক্ষক নিয়ে একই করুণ অভিজ্ঞতা। সিনিয়র ব্যাচের ভাইবেরাদর থেকে নানা গল্প ভেসে আসে। বুঝতে পারি, সেই গল্পও তাঁরা শুনেছেন তাঁদের ওপরের ব্যাচ থেকে।
এক বর্ষ থেকে আরেক বর্ষে যেতে যেতে এমনও পরিস্থিতি হলো, ক্লাসে পড়াতে না পারার কারণে কোনো কোনো শিক্ষকের ক্লাসই করা হতো না। ক্লাসে পাঠদান একটা দক্ষতার বিষয়। ভালো রেজাল্টধারী মানেই পাঠদানে দক্ষ হবেন, তা নয়। এরপরও ক্লাসে এসে তালগোল পাকিয়ে ফেলা এবং আচার-আচরণে বোঝা যেত, কারও কারও নিয়োগে ঘাপলা আছে। ধীরে ধীরে আমাদের জানা হয়ে যায়, কোন শিক্ষক কীভাবে নিয়োগ পেয়েছিলেন?
কে ভালো রেজাল্টের মাধ্যমে মূল্যায়িত হয়েছিলেন, কে তাঁর চেয়েও কয়েকজন ভালো রেজাল্টধারীকে ডিঙিয়ে এসেছেন, কে কোন শিক্ষকের বাজারের ব্যাগ বহন করেছেন, কে কোন শিক্ষকের সন্তান বা আত্মীয় ছিলেন ইত্যাদি গল্প। পরবর্তী সময়ে আরও জানতে পারছি, কীভাবে টাকার খেলা চলে শিক্ষক নিয়োগে। ভালো ছাত্র ছিলাম না বলে এসব মুখরোচক গল্পে মজে যেতে ভালোই লাগত।
দেশজুড়ে উচ্চশিক্ষা খাতে এত বড় নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে তখনও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এখনোও না। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর নানা ধরনের কমিশন গঠন হয়েছিল, শ্বেতপত্র প্রকাশও হয়েছে, উচ্চশিক্ষার ভয়াবহ নিয়োগ বাণিজ্য, দুর্নীতি ও অনিয়মের জন্য সেরকম কিছুই হয়নি।
দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়েই কতিপয় শিক্ষককে নিয়ে এমন গল্প প্রজন্মের পর প্রজন্ম চালু আছে। আর বিগত বছরগুলোতে জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘দোকান’ খোলার নামে টেন্ডার ও নিয়োগবাণিজ্যের একটা ‘মচ্ছব’ তো আমরা দেখলামই।
সেই কাজ সুচারুরূপে সম্পন্ন করার জন্য নিয়োগ পেয়েছিলেন একেকজন দলদাস উপাচার্য। আমরা দেখলাম, নানা অপকর্মের কারণে একেকজন উপাচার্য কীভাবে ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’ হয়ে উঠতেন। দেশজুড়ে উচ্চশিক্ষা খাতে এত বড় নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে তখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, এখনো না।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর নানা ধরনের কমিশন গঠিত হয়েছিল, শ্বেতপত্র প্রকাশও হয়েছে; উচ্চশিক্ষার ভয়াবহ নিয়োগবাণিজ্য, দুর্নীতি ও অনিয়মের জন্য সে রকম কিছুই হয়নি।
গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন বন্দোবস্তের আওয়াজ উঠেছিল। সেটি যে দিন দিন কতটা ফিকে হয়ে উঠেছে, গত দেড় বছরে আমরা দেখলামই। এরই মধ্যে বিতর্কিত নিয়োগের মাধ্যমে লাজহীনভাবে পুরোনো বন্দোবস্তের ছক্কা মেরে দেওয়ার উদাহরণ তৈরি করল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
এ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগের আলাপ উঠলে অবধারিতভাবেই চলে আসে বহুল আলোচিত উপাচার্য শিরীণ আখতারের কথা। বিশ্ববিদ্যালয়টির ইতিহাসে তিনি স্বেচ্ছাচারিতা, কর্তৃত্ববাদ ও শিক্ষক নিয়োগের ‘টেক্সটবুক’ দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন বলে অত্যুক্তি হবে না।
কোনো বিভাগ তাদের নতুন কোনো শিক্ষক প্রয়োজন নেই জানিয়ে দিলেও সেখানে জোর করেই শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছিলেন তিনি। তোপের মুখে নিজের বাসভবনে নিয়োগ বোর্ড বসিয়েছিলেন। নিয়োগবাণিজ্যের কল রেকর্ড ফাঁসের পর তো বড় কেলেঙ্কারিই ফাঁস হয়ে গেল। তাঁর মেয়াদকালের শেষ দিনও নিয়োগবাণিজ্য নিয়ে ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছিল।
শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী নিয়মে বিশ্ববিদ্যালয় চালাতেন বলে তাঁর মেয়াদকাল ‘আম্মুর শাসনকাল’ হিসেবে পরিচিত হয়ে যায়। ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণ ও নিয়োগবাণিজ্যে তাঁর মেয়ের ক্ষমতাচর্চার কারণেও শিক্ষার্থীরা তাঁকে ‘আম্মু’ বলেও বিদ্রূপ করতেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামী দাপট চব্বিশের হাওয়া বদলে এখন জামায়াতি দাপটে রূপ নিয়েছে। নিয়োগের ক্ষেত্রে জামায়াত-শিবিরের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিবর্গই প্রাধান্য পাওয়ার অভিযোগও উঠল।
বিষয়টা শুধু দলীয়ই থাকেনি, স্বজনপ্রীতির মোড়কে একটি পারিবারিক ড্রামা সিরিয়াল হয়ে ওঠে। যেখানে দেখা যাচ্ছে, ক্যাম্পাসের একসময়কার জামায়াতের নেতা হিসেবে পরিচিত সহ-উপাচার্য মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খানের মেয়েসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের কারও সন্তান, কারও স্ত্রী, কারও স্বামী, কারও হবু মেয়েজামাই নিয়োগ পেয়েছেন। যদিও তাঁদের দাবি, যোগ্যতার ভিত্তিতেই এ নিয়োগ হয়েছে। বরং এ নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে তা অপপ্রচার।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পোষ্য কোটার মাধ্যমে শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়োগের একটা ইকোসিস্টেম তৈরি হয়ে গেছে। এ কোটার সুবিধা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া, তারপর শিক্ষক-কর্মকর্তা অভিভাবকের প্রভাবে চাকরিও জুটিয়ে নেওয়া—সেটির প্রয়োগ আবারও দেখা গেল এখানে।
বর্তমান উপাচার্য মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার একজন সজ্জন, একাডেমিক ও শিক্ষার্থীবান্ধব ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। তিনিই শিক্ষক নিয়োগ বোর্ডে প্রধান থাকেন। এ বিতর্কিত নিয়োগের দায় তো কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না তিনি। তাঁর ইতিবাচক ভাবমূর্তির আর কী বাকি থাকল!
দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে একের পর এক বিতর্কিত ঘটনার মধ্য দিয়ে এটিই প্রমাণিত হয়, ইয়াহ্ইয়া আখতার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চালাতে চরমভাবে ব্যর্থই হয়েছেন। অনেকে বলে থাকেন, জামায়াত প্রভাবিত প্রশাসনে তিনি একা কী করবেন? তাহলে তিনি কেন এই বিতর্কের বোঝা টানছেন।
এ বিতর্কিত নিয়োগের প্রতিবাদে চাকসু নির্বাচনে জিএস পদে লড়েছিলেন এক ছাত্রসংগঠনের নেতা সাকিব মাহমুদ রুমি। প্রশাসন ভবনের সামনে হাতে লেখা একটি পোস্টার নিয়ে তিনি দাঁড়িয়েছেন, যেখানে লেখা, ‘বাবা, আমায় নিয়োগ দেবে? চেটে চেটে খাবো!’
এ পোস্টারই বলে দেয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘আম্মু’র দিন শেষ, এখন ‘আব্বু’র দিন চলে এসেছে। অন্যদিকে বিতর্কিত শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে চাকসুর ‘নরম সুর’ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। আর চাকসু মানে তো দু–একজন বাদে জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ছাত্রশিবিরের নির্বাচিত নেতারাই।
গত ১৫ মাসে বিভিন্ন পদে ৫৫১ জনকে নিয়োগ দিতে অন্তত ২৫টি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। এ থেকে প্রতীয়মান হয়, শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কতটা বেপরোয়া। ইতিমধ্যে তিন শতাধিক নিয়োগ সম্পন্নও হয়ে গেছে। যদিও আগের অনেক নিয়োগ এখানে স্থায়ী করা হয়েছে।
শিরীণ আখতারের আগে বিতর্কিত নিয়োগে কলঙ্কজনক অধ্যায় রচনা করে গিয়েছিলেন সাবেক দুই উপাচার্য—মো. আনোয়ারুল আজিম ও ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী। ইউজিসি বা দুদকে অভিযোগের পাহাড় জমলেও মেয়াদকাল শেষে সবাই যে যাঁর মতো স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন যাপন করে যাচ্ছেন। ‘দায়মুক্তির’ এমন ‘সুবর্ণ সুযোগ’ শামীম উদ্দিন খানরাও কেন হারাতে চাইবেন?
রাফসান গালিব প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী। ই–মেইল: [email protected]
*মতামত লেখকের নিজস্ব