ফুটবল উন্মাদনা কেন মারামারি, খুনোখুনিতে গড়ায়

আগের মতো এবারও বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে বাংলাদেশে উন্মাদনা তৈরি হয়েছে।ছবি: প্রথম আলো

চলতি বছর (২০২৬) ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল সামনে রেখে দলীয় পতাকা টাঙাতে গিয়ে মৌমাছির আক্রমণের ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে বেশ আলোচনায় এসেছে। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলায় এক আর্জেন্টাইন সমর্থক বাড়ির ছাদে পতাকা লাগাতে গিয়ে মৌমাছির কামড়ে গুরুতর আহত হন।

মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার ভাটবাউর এলাকায় ব্রাজিলের পতাকা টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ফয়সাল হোসেন নামে ১৮ থেকে ২০ বছর বয়সী এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। ঘটনাটি ৯ জুন বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে ঘটে। তিনি একটি আমগাছে পতাকা লাগানোর সময় পতাকার খুঁটি বা তার বিদ্যুতের লাইনের সংস্পর্শে এলে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন।

বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় হলেই এ রকম মৃত্যু আর আহত হওয়ার খবর আসতে থাকে। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শুধু খেলার এক মাসের মধ্যেই পতাকা টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে এবং ছাদ থেকে পড়ে কমপক্ষে সাতজন সমর্থক মারা যান। (অন্যান্য কারণসহ মোট ১২ জনের মৃত্যু হয়েছিল)। এর আগে ২০১৮ সালের বিশ্বকাপেও হবিগঞ্জে রিয়াদ আহমেদ নামের এক কিশোর ঘরের ওপরে আর্জেন্টিনার পতাকা টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। এভাবে বিগত প্রতিটি বিশ্বকাপেই গড়ে ৫ থেকে ১০ জন মানুষ কেবল পতাকা টাঙাতে গিয়েই প্রাণ হারিয়েছেন।

আরও পড়ুন
খুনের ঘটনাও ঘটেছে। গত বিশ্বকাপের সময় দেশের তিন জেলায় খুন হন তিনজন, খেলাকে কেন্দ্র করে লালমনিরহাট, ভোলাসহ ছয়টি জেলায় ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধ্যে প্রাণঘাতী সংঘর্ষ হয়। তর্কবিতর্কের জেরে দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে—একটি হয় ঢাকার অদূরে সাভারে, অন্যটি হবিগঞ্জের বাহুবলে।

পঙ্গুত্ব ও আহতের সংখ্যা

সারা জীবনের জন্য পঙ্গু বা বিকলাঙ্গ হওয়া মানুষের সুনির্দিষ্ট তালিকা পাওয়া কঠিন।

সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছিল আবদুল মতিনের দুর্ঘটনাটি। আবদুল মতিন ২০১৪ বিশ্বকাপের আগে নিজের দোকানে আর্জেন্টিনার পতাকা টাঙাতে যান। এ সময় তাঁর পতাকার দণ্ড ৩৩ হাজার ভোল্টের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুতের তারে স্পর্শ করলে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। পরে তার দুই হাত ও দুই পা কেটে ফেলতে হয়। ঘটনাটি আলোচিত হয়েছিল আন্তর্জাতিকভাবেও।

পরবর্তী সময়ে বিশ্বকাপ ২০২২-এর সময় আর্জেন্টিনার কয়েকটি সংবাদমাধ্যম ও টেলিভিশন চ্যানেল তাঁর গল্প প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, দুর্ঘটনার পরও তিনি আর্জেন্টিনা ও মেসির একজন নিবেদিত সমর্থক। আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সান্তিয়াগো কাফিয়েরো ২০২৩ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশ সফরে এসে আবদুল মতিনের জন্য আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের একটি জার্সি পাঠান।

উন্মাদনা ও গণ–আবেগের শুরু

১৯৫৭ সালে ঢাকায় মোহামেডানের টেন্ট উদ্বোধন করেছিলেন চুরাশি বছরের এক ‘তরুণ’। সেই ‘তরুণ’ হলেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। পরদিন দৈনিক আজাদের প্রথম পাতায় বেশ করে ছাপা হয়েছিল শেরেবাংলার বলে লাথি মারার ছবি। তিনি তখন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হয়েছেন।

শেরেবাংলা যখন কলকাতার মেয়র বা বাংলার শিক্ষামন্ত্রী অথবা অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী তখনো ফুটবলের মাঠে তিনি একজন সোচ্চার দর্শক। মোহামেডানের কোনো গুরুত্বপূর্ণ খেলা তিনি বাদ দিতেন না। নামাজের ওয়াক্ত হলে তিনি খেলার মাঠেই নামাজ পড়ে নিতেন। ফুটবলের উন্মাদনা তত দিনে খেলার মাঠের বাইরে এক সামাজিক পরিচয়ে পরিণত হয়।

মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব শুধু আর ফুটবল ক্লাব থাকে না; ক্রমশ এটি শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত মুসলিম সমাজের আত্মপরিচয় এবং আত্মমর্যাদারও একটি প্রতীক হয়ে ওঠে। শেরেবাংলার মতো জনপ্রিয় মুসলিম নেতাদের সঙ্গে ক্লাবটির ঘনিষ্ঠতায় ফুটবল উন্মাদনা ক্রমশ একটা মতাদর্শে রূপ ধারণ করে। স্লোগান ব্যানার প্রচারে সেই মতাদর্শের প্রতিফলন ঘটতে থাকে। শুধু মোহামেডান নয়, মোহনবাগান ও ইস্ট বেঙ্গলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা সমগ্র বাংলায় ফুটবলকে গণ–আবেগে পরিণত করে।

১৯১১: এক ফুটবল ম্যাচের রাজনৈতিক অর্থ

১৯১১ সালের আইএফএ কাপে ফাইনালে মোহনবাগান ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্ট দলকে ২-১ গোলে হারিয়ে দিলে ফুটবল ক্রমশ প্রতিরোধ প্রতিশোধের একটা হাতিয়ার হয়ে ওঠে। সেদিনের সেই খেলায় অধিকাংশ ভারতীয় খেলোয়াড় খালি পায়ে খেলেছিলেন, আর ব্রিটিশরা খেলেছিলেন বুট পায়ে। এই জয়কে অনেক সমকালীন মানুষ শুধু ক্রীড়া বিজয় হিসেবে নয়, বরং ‘সাহেবদেরও হারানো যায়’—এমন বিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে দেখেছিল।

পরবর্তীকালে ১৯১১ সালের এই জয়কে অনেকে ‘পলাশীর প্রতিশোধ’ বলেও আখ্যা দেন।

আরও পড়ুন

সহিংসতা আর মৃত্যু বাড়ছে

দেশ ভাগ করে ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পরও ফুটবল উন্মাদনা থেকে যায়। ফুটবল লাইনে রাজনৈতিক বিভাজন অন্য এক রূপ ধারণ করে। ব্রিটিশ আমলে যেমন কলকাতার মোহনবাগান-মোহামেডান প্রতিদ্বন্দ্বিতা সমাজের পরিচয় ও আবেগের বাহক ছিল, স্বাধীন বাংলাদেশে আবাহনী-মোহামেডান দ্বৈরথও তেমনি একটি প্রজন্মের সাংস্কৃতিক স্মৃতি হয়ে আছে। অনেক প্রবীণ সমর্থক এখনো বলেন, ‘একসময় ঢাকা শহর দুই ভাগে ভাগ হয়ে যেত—আবাহনী আর মোহামেডান।’

একটি পরিবারেও একজন আবাহনী, অন্যজন মোহামেডান সমর্থক হওয়া অস্বাভাবিক ছিল না।

অফিসে বাজি ধরা হতো। ম্যাচের আগে পতাকা লাগানো হতো। জয়ের পর মিছিল বের হতো।

পরাজয়ের পর কয়েক দিন খোঁচাখুঁচি চলত। মারামারি ঢিল ছোড়াছুড়ি চলত। তবে আজকের আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল বিভাজনের মতো প্রাণঘাতী কিছু ছিল না।

বাংলাদেশে বিশ্বকাপ ফুটবলের পতাকা টাঙাতে গিয়ে এ পর্যন্ত কতজন মারা গেছেন বা আজীবনের জন্য পঙ্গু হয়েছেন, তার নির্দিষ্ট কোনো সরকারি বা কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান নেই। তবে গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতি বিশ্বকাপেই অসাবধানতার কারণে বহু মানুষ হতাহত হন। সব মিলিয়ে বলা যায়, গত কয়েকটি বিশ্বকাপ মিলিয়ে অসাবধানতাবশত পতাকা টাঙাতে গিয়ে বাংলাদেশে ৩০ থেকে ৪০ জন মানুষ মারা গেছেন এবং এর চেয়ে বেশি মানুষ স্থায়ীভাবে শারীরিক সক্ষমতা হারিয়েছেন।

খুনের ঘটনাও ঘটেছে। গত বিশ্বকাপের সময় দেশের তিন জেলায় খুন হন তিনজন, খেলাকে কেন্দ্র করে লালমনিরহাট, ভোলাসহ ছয়টি জেলায় ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধ্যে প্রাণঘাতী সংঘর্ষ হয়। তর্কবিতর্কের জেরে দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে—একটি হয় ঢাকার অদূরে সাভারে, অন্যটি হবিগঞ্জের বাহুবলে।

সতর্কতা

দুর্ঘটনাগুলো এড়াতে কিছু সতর্কতা মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি:

• বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া রোধ করুন: ধাতব বা বাঁশের খুঁটিতে পতাকা লাগানোর সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন তা বৈদ্যুতিক তারের সংস্পর্শে না আসে

• ভেজা হাতে বৈদ্যুতিক খুঁটি বা তারে হাত দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।

• উঁচু স্থান থেকে পড়া: ছাদ, বারান্দা বা ভবনের কার্নিশে ওঠার সময় পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা রাখুন। পিচ্ছিল জুতা পরে উঁচু স্থানে না ওঠাই ভালো।

• শিশুদের নিরাপত্তা: শিশুরা যেন ছাদের রেলিং বা অরক্ষিত বারান্দায় ঝুঁকে পতাকা লাগাতে না যায়, সেদিকে কঠোর নজর রাখুন।

• রাস্তায় সতর্কতা: বড় পতাকা নিয়ে রাস্তায় দৌড়াদৌড়ি বা গাড়ি/বাইকে ঝালিয়ে চলাচলের সময় ট্রাফিক দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

গওহার নঈম ওয়ারা লেখক ও গবেষক

[email protected]

মতামত লেখকের নিজস্ব