তাদের প্রশ্ন, হামলার ঘটনায় যদি প্রশাসনের প্রশ্রয় না থাকবে, তাহলে মামলার তদন্তকাজ গত ৯ মাসেও শেষ হলো না কেন? প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, গত বছরের মাঝামাঝি কুমিল্লা, চাঁদপুর ও নোয়াখালী জেলায় মন্দির, পূজামণ্ডপ ও সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়িতে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ৫১টি মামলা হয়। এর মধ্যে মাত্র তিনটি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। বাকিগুলোর তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। (প্রথম আলো, ১৮ জুলাই ২০২২)

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত অভিযোগ করেছেন, মামলাগুলো হচ্ছে দায়সারাভাবে। মামলা করে ভুক্তভোগীদের সান্ত্বনা দেওয়া হচ্ছে। আবার অপরাধীদের নিশ্চয়তা দেওয়া হচ্ছে, এসব মামলায় কিছুই হবে না। রানা দাশগুপ্তের এই বক্তব্য অসত্য হলে আমরা খুশি হতাম। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো ২০১১ সালে সংঘটিত রামুর ঘটনা, ২০১৬ সালে সংঘটিত নাসিরনগর কিংবা পরবর্তীকালে সাঁথিয়া ও গোবিন্দগঞ্জ, শাল্লার ঘটনায়ও কেউ শাস্তি পাননি। তাহলে কি এসব ঘটনা জিন-ভূতে এসে ঘটিয়ে গেছে? রামু ও নাসিরনগরে যে দুই তরুণের ফেসবুক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে লঙ্কাকাণ্ড ঘটল, সেই দুই তরুণের ফেসবুক অ্যাকাউন্টই ছিল না। আমরা প্রতিদিনই ইউটিউবে সংখ্যালঘুদের ধর্ম নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য দেখি; কিন্তু এর কোনোটির জন্য বিক্ষোভ হয় না। মামলা হয় না।

নির্বাচনের আগে কুমিল্লার সংখ্যালঘু নেতারা যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন, তার প্রতিফলন ভোটের বাক্সে পড়েছে বলে ধারণা করি। কুমিল্লা সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আরফানুল হক জয়ী হয়েছেন মাত্র সাড়ে তিন শ ভোটে। তা-ও শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তার পর। নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যায়, বিএনপির বহিষ্কৃত দুই নেতার প্রাপ্ত ভোটের চেয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ৩০ হাজার ভোট কম পেয়েছেন। এর মধ্যে একজন রাজনীতিতে প্রায় নবাগত এবং এই প্রথম নির্বাচন করেছেন। তাঁরা এত ভোট পেলেন কীভাবে? সিটি নির্বাচন ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন, এ রকম একাধিক ব্যক্তি ঘরোয়া আলাপে বলেছেন, অন্যান্য স্থানে সংখ্যালঘুরা যেভাবে দলে বেঁধে নৌকা প্রার্থীর পক্ষে ভোট দেন, এখানে তা হয়নি।

গত বছরের ঘটনায় ক্ষুব্ধ অনেক সংখ্যালঘু ভোট দিতেই যাননি। মাত্র ৫০ শতাংশ ভোট পড়েছে। আবার যাঁরা গিয়েছেন, তাঁদের একাংশ সাবেক মেয়র ও বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা মনিরুল হককে ভোট দিয়েছেন। সংখ্যালঘুর ভোট কেন নৌকার বিপক্ষে গেল? এই প্রশ্নের জবাবে একাধিক নেতা বলেছেন, স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা যেভাবে সংখ্যালঘুদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে মন্দির ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপ করেছেন, তা তাঁরা ভালোভাবে নেননি। এমনও হয়েছে, সেখানে মন্দির ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনেও অদৃশ্য শক্তি কলকাঠি নেড়েছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা যে তালিকা করেছেন, তা বাদ দিয়েও প্রভাবশালী নেতা পকেট থেকে তালিকা বের করে কমিটি ঘোষণা করেছেন। কেবল কুমিল্লা নয়, অন্যান্য জেলায় প্রভাবশালী নেতারা সব সময় গোলযোগ জিইয়ে রাখেন, যাতে সংখ্যালঘুরা ভাবেন আওয়ামী লীগ ছাড়া তাঁদের গতি নেই।

স্বপন কুমার বিশ্বাসের ওপর যা ঘটে গেছে, তা ভুলে যাওয়ার নয়। তিনি সাংবাদিকদের কাছে নিজের অনুভূতির কথা জানাতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘মনে হয়েছিল আত্মহত্যা করি। কিন্তু স্ত্রী ও ছেলেমেয়ের কথা ভেবে সেটি করতে পারিনি।’ তাঁর তিন মেয়ে কলেজ ও বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। তাদের মানসিক অবস্থাও চিন্তা করুন। স্বপন কুমার লাঞ্ছনার ঘটনায় ৯ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। বিচারে যদি তাঁদের শাস্তিও হয় (এ ধরনের সাম্প্রদায়িক ঘটনায় শাস্তির নজির খুব বেশি নেই), স্বপন কুমার কি তাঁর মর্যাদা ফিরে পাবেন?

অনেকের প্রশ্ন, আওয়ামী লীগ আমলে সংখ্যালঘুদের ওপর কেন একের পর এক হামলা হচ্ছে? বিএনপি-জামায়াত আমলে হামলার সময় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাই তো আক্রান্তদের পাশে ছিলেন। উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগের শাসনামলে (১৯৯৬-২০০১) বিএনপির যেসব নেতা-কর্মী ক্ষমতাসীনদের হাতে নিগৃহীত হয়েছিলেন, ক্ষমতার পালাবদলের পর তারা আওয়ামী লীগারদের কাছে না পেয়ে সংখ্যালঘুদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন।

উল্লেখ্য, ২০০১ সালের নির্বাচনের পর অনেক এলাকার প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা পালিয়ে বিদেশে চলে যান। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তাঁরা ফের দেশে ফিরে আসেন। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর গাজীপুরের কালিয়াকৈরে আক্রান্ত সংখ্যালঘুদের দেখতে গেলে এক নারী আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘অনুগ্রহ করে ভোটার তালিকা থেকে আমাদের নাম বাদ দিন। ভোটার তালিকায় নাম না থাকলে তো ভোটের পর কেউ আমাদের ওপর হামলা চালাবে না। আমাদের ভোট দেওয়ার দরকার নেই। আমরা এ দেশে থাকতে চাই।’

এই আকুতি কেবল ওই নারীর নয়, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অনেকের। গত ১৮ জুন নড়াইলের ইউনাইটেড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাস চরমভাবে লাঞ্ছিত হন। এ ঘটনার পর এক মাসের বেশি সময় পার হয়ে গেছে। কিন্তু তিনি কেমন আছেন, আমরা কজন তাঁর খোঁজ নিয়েছি? দেশে সরকার আছে, মন্ত্রী আছেন, এমপি আছেন, উপজেলা চেয়ারম্যান আছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বড় বড় কর্মকর্তা আছেন, গত এক মাসে তাঁরা কি কেউ জানতে চেষ্টা করেছেন, কেন একজন নিরপরাধ মানুষকে এভাবে শাস্তি পেতে হলো? আইনের চোখে অপরাধ করলে তাঁর বিচার হবে। কিন্তু তিনি তো অপরাধ করেননি।

প্রথম আলোর খবর থেকে জানা যায়, নড়াইলের মির্জাপুর ইউনাইটেড কলেজ ঈদের ছুটির পর আজ রোববার খুলেছে। কিন্তু ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাস কলেজে যাননি। শিক্ষার্থীরাও কলেজে যাননি। তবে প্রশাসনের কর্মকর্তারা এসে কলেজশিক্ষক ও কর্মচারীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এদিকে অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় করা মামলায় পুলিশ আরেক ছাত্রকে গ্রেপ্তার করেছে। কলেজশিক্ষক ও কর্মচারীরা বলেন, কলেজে প্রায় সাড়ে ৩০০ শিক্ষার্থী আছেন। চালু আছে এইচএসসি ও স্নাতক শ্রেণি। আজ কলেজ খুললেও কোনো শিক্ষার্থী কলেজে যাননি। যাননি ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসও। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) জুবায়ের হোসেন চৌধুরী, নড়াইল সদর থানার পরিদর্শক (অপারেশন) মো. সাজেদুল ইসলাম, মির্জাপুর পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) মো. সাইফুল ইসলাম আজ কলেজে এসে তাঁদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

নড়াইল সদর উপজেলা দুই নির্বাচনী আসনে বিভক্ত। সদর থানার যে এলাকায় ইউনাইটেড কলেজটি পড়েছে, সেই এলাকার এমপি বি এম কবিরুল হক। আর লোহাগড়া ও নড়াইল সদরের অপরাংশ নিয়ে যে নির্বাচনী এলাকা, তার এমপি হলেন মাশরাফি বিন মুর্তজা। লোহাগড়ার দিঘলিয়ায় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার পর আক্রান্তদের সমবেদনা জানাতে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। তাঁদের সাধ্যমতো সহায়তা করেছেন। কিন্তু অপর এমপি কি লাঞ্ছিত ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে একবার দেখতে গিয়েছিলেন? এমপি ছাড়াও সেখানকার উপজেলা চেয়ারম্যান আছেন, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আছেন। তাঁরাও কি লাঞ্ছিত মানুষটির খোঁজখবর নিয়েছেন?

সোমবার দুপুরে প্রথম আলোর নড়াইল প্রতিনিধি মারুফ সামদানির সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, প্রশাসন স্বপন কুমার বিশ্বাসের সঙ্গে যোগযোগ রাখছে। কিন্তু জনপ্রতিনিধিরা কী করছেন, তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারেননি। কেবল প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের কথাই বা বলি কেন? দেশে বহু শিক্ষক সংগঠন আছে। সংগঠনগুলো নিয়ে শিক্ষক ফেডারেশন আছে। কিন্তু এসব শিক্ষক সংগঠনের নেতারাও বিবৃতির বাইরে কিছু করেননি। অথচ উপজেলা চেয়ারম্যানের ওপর হামলার প্রতিবাদে উপজেলা চেয়ারম্যানদের সমিতি সরকারকে আলটিমেটাম দিয়েছে, তাঁর ওপর যে হামলা হয়েছে, তার বিচার না হলে তাঁরা সবাই একযোগে প্রতিবাদ করবেন?

স্বপন কুমার বিশ্বাসের ওপর যা ঘটে গেছে, তা ভুলে যাওয়ার নয়। তিনি সাংবাদিকদের কাছে নিজের অনুভূতির কথা জানাতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘মনে হয়েছিল আত্মহত্যা করি। কিন্তু স্ত্রী ও ছেলেমেয়ের কথা ভেবে সেটি করতে পারিনি।’ তাঁর তিন মেয়ে কলেজ ও বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। তাদের মানসিক অবস্থাও চিন্তা করুন। স্বপন কুমার লাঞ্ছনার ঘটনায় ৯ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। বিচারে যদি তাঁদের শাস্তিও হয় (এ ধরনের সাম্প্রদায়িক ঘটনায় শাস্তির নজির খুব বেশি নেই), স্বপন কুমার কি তাঁর মর্যাদা ফিরে পাবেন? তাঁর পরিবারের কষ্ট ও বেদনা কি কমবে? স্বপন কুমার যদি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ না হতেন, এভাবে কেউ অপমান করতে পারতেন?

  • সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্মসম্পাদক ও কবি

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন