২.

অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন, রেডিও-টেলিভিশনসহ সব রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যমকে স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় পরিণত করা, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী সব রাজনৈতিক দলের প্রচার-প্রচারণায় অবাধ সুযোগ নিশ্চিত করা, জনগণের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা এবং মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী সব আইন বাতিল করা—এগুলো ছিল স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের ৮ দল, বিএনপির ৭ দল ও বামপন্থীদের ৫–দলীয় মোট তিন জোটের রূপরেখার দাবি। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সেই কথা রাখেনি। কেন এ রূপরেখা বাস্তবায়নে তাদের বাধ্য করা গেল না?

তত্ত্বাবধায়ক সরকার তো রক্তের বিনিময়ে ও সংসদে আইন পাস করেই করা হয়েছিল। এরশাদ উচ্চ আদালত ও নিম্ন আদালতগুলোকে যথাক্রমে বিভাগে ও উপজেলায় নিয়েছিলেন সংবিধান সংশোধন করেই। কিন্তু সেটা আদালতের রায়ে বাতিল হয়েছে। সামরিক সরকারগুলোর করা সব সংশোধনীও আদালত বাতিলের রায় দিয়েছেন।

গত ৫০ বছরেও যখন শান্তিপূর্ণভাবে সরকার গঠন বা বদলের নির্বাচনী ব্যবস্থা নেই, স্বাধীন বিচার বিভাগ নেই, গণতান্ত্রিক প্রশাসন নেই, স্থানীয় সরকার নেই, স্বাধীন দেশের উপযোগী জবাবদিহিমূলক সরকার নেই, তখন এর সুবিধাভোগীরা ভোটে জিতে এই ব্যবস্থার সুবিধা নিতে চাইবে। কে নিজের কবর খোঁড়ে? তিন জোটের রূপরেখা একই কারণে বাস্তবায়িত হয়নি। এবারও বিএনপি গণতন্ত্র মঞ্চ ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে সুর মিলিয়ে ‘রাষ্ট্র রূপান্তর কর্মসূচি’ দিয়েছে। একানব্বইয়ের মতো ক্ষমতায় গিয়ে যে লাউ সেই কদু যে হবে না, তার গ্যারান্টি কী?

সংস্কার না করলে বারবার রক্তের মাধ্যমে অর্জিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মতো অন্য কোনো ব্যবস্থাও বাতিলের মতো সুযোগ থেকেই যাবে। আর বারবার নির্বাচনের আগে জাতি রক্তাক্ত সংকটের মুখে পড়বে। তাতে, বারবার ঘুঘু শুধু ধানই খাবে না, বর্গীও আসবে। এটা শুধু বিরোধী দলগুলোরই দরকার নয়, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগেরও দরকার। এখন কথা হচ্ছে, সামনের নির্বাচনটিকে ৭০ সালের মতো সংবিধান সংস্কারের জন্য কীভাবে আইনি বাধ্যবাধকতায় করানো যায়, সেই রাস্তা বের করা।

অতীতে আমাদের পূর্বপুরুষেরা সংবিধান তৈরির নির্বাচন করেছেন। একবার পাকিস্তান রাষ্ট্র বানানোর জন্য ১৯৪৬ সালে, আরেকবার মুক্তিযুদ্ধের আগে ১৯৭০ সালে। ১৯৪৬ সালের আগে চলতাম ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনে, ১৯৭০ সালের আগে আইয়ুব খানের ১৯৬২ সালের সংবিধান অনুযায়ী। দুটি নির্বাচনেই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দুই ধরনের দায়িত্ব ছিল। একদিকে তাঁরা ছিলেন গণপরিষদ সদস্য, অন্যদিকে সরকার গঠনেরও দায়িত্ব ছিল।

আশার ব্যাপার, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের প্রয়োজনীয় প্রায় সব প্রতিষ্ঠানই আছে। সর্বজনীন ভোটাধিকার আছে, আছে নির্বাচন কমিশনও। কিন্তু সবই ১২৩ (৩) অনুচ্ছেদ অনুসারে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার কাছে বন্দী। সংসদের অনুমোদনে আইন প্রণয়ন হওয়ার কথা, কিন্তু ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে এখানেও প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার কাছে বন্দী।

আমাদের পূর্বপুরুষেরা বিচার বিভাগ, প্রশাসন, অর্থ বিভাগ, স্থানীয় সরকার—সব করেছেন। কিন্তু সবই আইনের মারপ্যাঁচে একটি পদের কাছে বন্দী। প্রধানমন্ত্রী কারও কাছে জবাবদিহিতে বাধ্য নন, কিন্তু সবাই তাঁর কাছে জবাব দিতে বাধ্য। এ প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাতন্ত্রটা বাতিল ও ক্ষমতাকাঠামোটি সংস্কার করা প্রয়োজন।

৩.

সংবিধান সংস্কার তা নয়। এর সীমা আদালতের আওতায় নয়, জনগণের দ্বারা নির্ধারিত। জনগণই ঠিক করেন সংবিধানের কোন অংশের কী বদল হবে। প্রথমে সংবিধান সংস্কারের জন্য প্রতিনিধি নির্বাচন করবে। এই নির্বাচিতরা হবেন একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার সভার সদস্য ও জাতীয় সংসদের সদস্য। তাঁরা প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে তা পরিবর্তন করবেন। পরিবর্তিত সংবিধান জনগণের সামনে উপস্থাপন করা হবে এবং জনগণ গণভোটে তা অনুমোদন করবেন। অনুমোদনের পরই নির্বাচিত প্রতিনিধিরা হবেন সংসদ সদস্য। যতক্ষণ সংবিধান সংস্কার ও তা গণভোটে অনুমোদিত হবে না, ততক্ষণ তাঁরা সংসদ সদস্যের মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা পাবেন না। এই বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে।

আর এই অনুমোদিত সংবিধানই হবে আদালতের বিচার ও রাষ্ট্র-সংসদ পরিচালনার ভিত্তি। এরপর আর আদালতে গিয়ে এই সংস্কারকৃত ধারাগুলো বাতিল করার সুযোগ থাকবে না। ফলে সংস্কার না করলে বারবার রক্তের মাধ্যমে অর্জিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মতো অন্য কোনো ব্যবস্থাও বাতিলের মতো সুযোগ থেকেই যাবে। আর বারবার নির্বাচনের আগে জাতি রক্তাক্ত সংকটের মুখে পড়বে। তাতে, বারবার ঘুঘু শুধু ধানই খাবে না, বর্গীও আসবে। এটা শুধু বিরোধী দলগুলোরই দরকার নয়, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগেরও দরকার। এখন কথা হচ্ছে, সামনের নির্বাচনটিকে ৭০ সালের মতো সংবিধান সংস্কারের জন্য কীভাবে আইনি বাধ্যবাধকতায় করানো যায়, সেই রাস্তা বের করা।