বর্তমান সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকে নতুন একজন গভর্নর নিয়োগ দিয়েছে। পূর্ববর্তী গভর্নরকে কার্যত ‘জোরপূর্বক অব্যাহতি’ দিয়েছে, যা ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে একজন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের কী ধরনের জ্ঞান, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা থাকা দরকার, তা বোঝার চেষ্টা জরুরি। সে উদ্দেশ্যে কয়েকজন খ্যাতিমান গভর্নরের একাডেমিক পটভূমি, কর্মজীবন ও সাফল্য সংক্ষেপে পর্যালোচনা করা যেতে পারে।
মার্কিন অর্থনীতিবিদ অ্যালান গ্রিনস্প্যান আধুনিক ইতিহাসে অন্যতম দীর্ঘমেয়াদি ও প্রভাবশালী গভর্নর হিসেবে বিবেচিত। ১৯৯০-এর দশকের অর্থনৈতিক উত্থানের সময় তাঁর নেতৃত্বের জন্য তিনি ‘দ্য মায়েস্ত্রো’ নামে পরিচিত হন। তাঁর দায়িত্বকালে একাধিক অর্থনৈতিক সংকট, দ্রুত বিশ্বায়ন এবং আধুনিক আর্থিক বাজারের উত্থান ঘটেছে।
গ্রিনস্প্যান নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ১৯৮৭ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ফেডারেল রিজার্ভের ১৩তম চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৮৭ সালে প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগান তাঁকে নিয়োগ দেন। পরে তিনি চারজন ভিন্ন প্রেসিডেন্টের অধীনে নজিরবিহীনভাবে পাঁচ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন।
বাংলাদেশে গভর্নর নিয়োগে প্রায়ই পেশাগত উৎকর্ষের চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য বেশি গুরুত্ব পায়। সাম্প্রতিক নিয়োগ সে প্রশ্ন আবারও সামনে এনেছে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করে এবং অর্থনৈতিক শাসনব্যবস্থার প্রতি আস্থা দুর্বল করে।
ব্ল্যাক মানডে নামে পরিচিত ১৯৮৭ সালের ১৯ অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে নাটকীয় ধস নামে। ডাও জোনস ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ নামে পরিচিত নামেও পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ার বাজারের অন্যতম পুরনো ও গুরুত্বপূর্ণ সূচক সেদিন প্রায় ২২ শতাংশ কমে যায়। এটা ছিল ইতিহাসে এক দিনে সর্বোচ্চ পতন। এতে মহামন্দার আশঙ্কা দেখা দেয়।
গ্রিনস্প্যান সঙ্গে সঙ্গে ফেডারেল রিজার্ভকে বাজারে তারল্য সরবরাহের নির্দেশ দেন এবং ঘোষণা করেন যে, ব্যাংক ও ঋণবাজারকে সহায়তা দিতে ফেড প্রস্তুত। এতে ব্যাংকগুলো ঋণ প্রদান অব্যাহত রাখে। মানুষের আস্থা দ্রুত ফিরে আসে এবং সম্ভাব্য ব্যাংকিং সংকট এড়ানো সম্ভব হয়।
১৯৯০ থেকে ১৯৯২ সময়ে বেকারত্ব বৃদ্ধি, বিনিয়োগের দুর্বলতা ও ঋণ সংকোচনের মাধ্যমে মন্দার লক্ষণ দেখা দেয়। সুদের হার ধীরে কমানোর পর গ্রিনস্প্যান উপলব্ধি করেন যে নিম্ন সুদের হার বিনিয়োগ ও ভোগ ব্যয় বাড়াচ্ছে। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে সহনশীল মুদ্রানীতি বজায় রাখেন। এতে পুনরুদ্ধার টেকসই হয় এবং দীর্ঘমেয়াদি সম্প্রসারণের ভিত্তি গড়ে ওঠে।
১৯৯৪ সালে দীর্ঘ সম্প্রসারণের পর তিনি মূল্যস্ফীতির সম্ভাবনা অনুভব করেন। আগাম প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে সুদের হার বাড়ান। ফলে অর্থনীতি অতিরিক্ত উত্তপ্ত হওয়া থেকে রক্ষা পায়। এ ধরনের প্রাক্–প্রতিরোধমূলক নীতি গ্রহণ দূরদর্শী অর্থনীতিবিদের পরিচায়ক। রবার্ট লুকাস ১৯৯৬ সালে র্যাশনাল এক্সপেকটেশন তত্ত্বের জন্য নোবেল পান, কিন্তু গ্রিনস্প্যান এর নীতিগত প্রয়োগ আগেই করেছিলেন।
১৯৯০-এর দশকের শেষভাগে প্রযুক্তিগত বিপ্লব উৎপাদনশীলতা বাড়ায়। দ্রুত প্রবৃদ্ধি সাধারণত মূল্যস্ফীতি বাড়ায়, কিন্তু গ্রিনস্প্যান যুক্তি দেন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি মূল্যস্ফীতি ছাড়াই প্রবৃদ্ধি সম্ভব করেছে। তাই তিনি সুদের হার বাড়াতে অনীহা দেখান। পরে দেখা যায় তাঁর মূল্যায়ন সঠিক ছিল। শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি, নিম্ন মূল্যস্ফীতি ও হ্রাসমান বেকারত্ব অর্জিত হয়।
১৯৯৭ থেকে ১৯৯৮ সালের এশীয় আর্থিক সংকট ও লং টার্ম ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের বিপর্যয় বিশ্ব অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দেয়। গ্রিনস্প্যান মুদ্রানীতি শিথিল করে পরিস্থিতি সামাল দেন। এতে বৈশ্বিক আতঙ্ক কমে এবং যুক্তরাষ্ট্র সম্ভাব্য মন্দা এড়ায়।
২০০০ থেকে ২০০৩ সময়ে ডট–কম ধসের পর বিনিয়োগ কমে যায় এবং মন্দা শুরু হয়। গ্রিনস্প্যান সুদের হার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে নামিয়ে আনেন। শক্তিশালী প্রণোদনার মাধ্যমে গভীর মন্দা ও দরপতন ঠেকানো হয়। অর্থনীতি তুলনামূলক দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায়।
এই সময়ে মুদ্রানীতির স্থিতিশীলতা প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের আর্থিক শৃঙ্খলার সঙ্গে সমন্বিত ছিল। বাজেট উদ্বৃত্ত সামষ্টিক আস্থা বাড়ায়। নিম্ন মূল্যস্ফীতি, শক্তিশালী বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতার বৃদ্ধি ও বেকারত্ব হ্রাস একসঙ্গে অর্জিত হয়। এটি সফল মুদ্রা ও রাজস্ব সমন্বয়ের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত।
সংকট ব্যবস্থাপনা, মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশা নিয়ন্ত্রণ এবং তথ্যনির্ভর নমনীয় নীতির কারণে গ্রিনস্প্যানকে অনেকেই সফল চেয়ারম্যান মনে করেন। তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশ্বাসযোগ্যতা জোরদার করেন এবং দীর্ঘ অর্থনৈতিক সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখেন।
কেমব্রিজ ও অক্সফোর্ডে শিক্ষিত ড. মনমোহন সিং ১৯৮২ থেকে ১৯৮৫ পর্যন্ত ভারতের রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন। রাজস্বঘাটতি ও মূল্যস্ফীতির চাপে তিনি মুদ্রানীতির স্থিতিশীলতা ও আর্থিক শৃঙ্খলায় জোর দেন। পরে ১৯৯১ সালে অর্থমন্ত্রী হিসেবে উদারীকরণ সংস্কারের ভিত্তি গড়ে তোলেন। এ জন্য তিনি আধুনিক ভারতের স্থপতি হিসেবে স্বীকৃত।
আইএমএফের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রঘুরাম রাজন ২০১৩ সালে ভারতের রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নর হন। তিনি আগে প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ছিলেন। তাঁর একাডেমিক দক্ষতা ও নীতিগত দৃঢ়তা আন্তর্জাতিক পরিসরে স্বীকৃত।
হার্ভার্ডের অধ্যাপক জোসেফ শুম্পিটার সৃজনশীল ধ্বংস ধারণার জন্য পরিচিত। অস্ট্রিয়ার অর্থমন্ত্রী থাকাকালে তিনি দেখিয়েছিলেন, রাষ্ট্রের অর্থব্যবস্থা সমাজকাঠামোকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
এই উদাহরণগুলো দেখায়, একজন কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নরের ক্ষেত্রে উচ্চমানের একাডেমিক প্রস্তুতি, সামষ্টিক অর্থনীতিতে গভীর দখল, সংকট ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক চাপের ঊর্ধ্বে থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা অপরিহার্য।
বাংলাদেশে গভর্নর নিয়োগে প্রায়ই পেশাগত উৎকর্ষের চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য বেশি গুরুত্ব পায়। সাম্প্রতিক নিয়োগ সে প্রশ্ন আবারও সামনে এনেছে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করে এবং অর্থনৈতিক শাসনব্যবস্থার প্রতি আস্থা দুর্বল করে। যখন মুদ্রানীতির সর্বোচ্চ পদকে জাতীয় দায়িত্বের পরিবর্তে রাজনৈতিক পুরস্কার হিসেবে দেখা হয়, তখন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বার্তাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এন এন তরুণ অর্থনীতির অধ্যাপক, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ
ই–মেইল: [email protected]
*মতামত লেখকের নিজস্ব
