উত্তাল ইরানে খামেনি শাসন কি টিকবে

তেহরানের বাজারে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়েনছবি: এএফপি

ইরানে ঘুরেফিরে যে বিক্ষোভ দেখা দেয়, তা মূলত দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, শাসনব্যবস্থা, পররাষ্ট্রনীতি ও নিষেধাজ্ঞার প্রভাবের পারস্পরিক সম্পর্কের ফল। এসব উপাদান একদিকে যেমন অসন্তোষের জন্ম দেয়, তেমনি রাষ্ট্র কীভাবে সেই অসন্তোষের জবাব দেবে, তা–ও নির্ধারণ করে। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা ও ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার পরিপ্রেক্ষিতে এই বিষয়গুলো আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

গত বছরের শেষ দিকে যে বিক্ষোভ হয়, তার সূচনা হয়েছিল ব্যবসায়ী ও বাজারের দোকানিদের ধর্মঘট থেকে। ইরানের জনসাধারণের ক্রয়ক্ষমতা হঠাৎ অনেক কমে যাওয়ায় তারা প্রতিবাদে নেমেছিলেন। বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় ইরানের মুদ্রা রিয়ালের মূল্য প্রায় ৫০ শতাংশ কমে যায়।

একই সঙ্গে বেকারত্বের হার বেড়ে দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশে। অর্থনৈতিক কারণে ইরানে অস্থিরতা এবারই প্রথম নয়, ২০০৮ সালে মূল্য সংযোজন কর বাড়ানোর সিদ্ধান্তের পর তেহরানের বাজার এলাকাগুলোতে বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়। এর ফলে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের সরকার সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়।

এরপর ২০১০ সালে সরকার যখন আয়করের হার ৭০ শতাংশে উন্নীত করার আইন করতে চেয়েছিল, তখনো সীমিত পরিসরে প্রতিবাদ হয়। সেবারও জনরোষের মুখে সরকার পিছু হটে।

ইরানের বিভিন্ন সময়ের আন্দোলনে নানান অর্থনৈতিক দাবির পাশাপাশি সামাজিক স্বাধীনতার প্রশ্নও বারবার উঠে এসেছে। এর মধ্যে বাধ্যতামূলক হিজাব আইনের বিরোধিতা ছিল একটি বড় বিষয়।

ইরানের অর্থনীতি বহুদিন ধরেই কিছু কাঠামোগত সমস্যায় ভুগছে, যেগুলো ১৯৮০ সালের পর থেকে আর সমাধান করা হয়নি। বিপ্লবী আদর্শ এবং তার সঙ্গে যুক্ত ব্যয়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় একটি শক্ত রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি গড়ে তোলার বিষয়টি উপেক্ষিত থেকেছে।

২০২২ সালে এই ইস্যুতেই দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। হিজাব আইন ভঙ্গের অভিযোগে আটক ২২ বছর বয়সী মাসা আমিনির হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা থেকে জন্ম নিয়েছিল দেশব্যাপী বিক্ষোভ। কর্তৃপক্ষ যখন ঘটনার দায় মাসার ওপরই চাপানোর চেষ্টা করে, তখন জনরোষ আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

অনেক আন্দোলনের পরেও কোনো সরকারই দেশটিতে মৌলিক সংস্কার করতে পারেনি। ১৯৯৭ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ইরানের ক্ষমতায় ছিলেন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামি। তিনি তেলের আয়ের ওপর থেকে নির্ভরতা কমিয়ে তেলবহির্ভূত খাত গড়ে তোলার একটি বিকল্প অর্থনৈতিক কৌশল প্রস্তাব করেছিলেন। এর উদ্দেশ্য ছিল নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কমানো।

কারণ, এসব নিষেধাজ্ঞা সাধারণত ইরানের তেল খাতকে লক্ষ্য করে দেওয়া হয়; কিন্তু ওই উদ্যোগ সফল হয়নি। ২০০২ সালের আগস্টে নাতানজ পারমাণবিক স্থাপনার প্রথম ছবি প্রকাশের পর পারমাণবিক–সংকট তীব্র হয়ে ওঠে এবং বিদেশি চাপ আরও বেড়ে যায়, যা অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।

পরে ২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট আহমাদিনেজাদ একটি জনতাবাদী নীতি অনুসরণ করেন। যার লক্ষ্য ছিল তেল থেকে নগদ কর্মসূচির মাধ্যমে তেলের আয় জনগণের মধ্যে পুনর্বণ্টন করা। কিন্তু এই কৌশল ব্যর্থ হয়। দেশের ভেতরের প্রভাবশালী অর্থনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর বাধা এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের আরোপ করা কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে এই উদ্যোগ টেকেনি।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ১৬৯৬, ১৭৩৭, ১৭৪৭, ১৮০৩ ও ১৯২৯ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে এসব নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এর ফলে তেলবাণিজ্য সীমিত হয়, আর্থিক সম্পদ জব্দ করা হয় এবং আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থায় ঢোকার পথ সংকুচিত হয়ে যায়। এসবের সঙ্গে যোগ হয় ১৯৮০ সাল থেকে চলতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নিষেধাজ্ঞা।

ইরানের অন্তত ৪০টি শহরে বিভিন্ন মাত্রায় চলমান বিক্ষোভের প্রভাব পড়েছে
ছবি: এএফপি

খারাপ শাসন নাকি নিষেধাজ্ঞা

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বিক্ষোভের পরিধি বাড়তে থাকায় একটি পুরোনো প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে। ইরানের অর্থনৈতিক সংকটের জন্য কতটা দায় নিষেধাজ্ঞার, আর কতটা দায় সরকারের শাসনব্যবস্থার। ইরানের অর্থনীতি বহুদিন ধরেই কিছু কাঠামোগত সমস্যায় ভুগছে, যেগুলো ১৯৮০ সালের পর থেকে আর সমাধান করা হয়নি। বিপ্লবী আদর্শ এবং তার সঙ্গে যুক্ত ব্যয়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় একটি শক্ত রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি গড়ে তোলার বিষয়টি উপেক্ষিত থেকেছে।

অর্থনৈতিক ও আর্থিক আইনকানুনও বাকি দুনিয়ার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। এর ফলে ইরান ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আরও বেশি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এতে দেশের ভেতরের সংকটগুলো আরও জটিল হয় এবং প্রায় সব খাতে নিষেধাজ্ঞার প্রভাব তীব্র হয়ে ওঠে।

এতে ইরানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেতৃত্বের সামনে একটি প্রশ্ন স্থায়ীভাবে দাঁড়িয়ে গেছে—কেন এতগুলো সরকার এমন কোনো অর্থনৈতিক নীতি ও কর্মসূচি নিতে পারেনি, যা নিষেধাজ্ঞার প্রভাব মোকাবিলা করতে পারত। এই প্রেক্ষাপটে চীনের সঙ্গে ইরানের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব, বিশেষ করে ২৫ বছরের কৌশলগত সহযোগিতা চুক্তি তেমন কোনো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এনে দিতে পারেনি।

আরও পড়ুন

জ্বালানি, টেলিযোগাযোগ, পরিবহন ও অবকাঠামো খাতকে অন্তর্ভুক্ত করা ওই চুক্তির মূল্য ছিল ৪০০ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালের শুরুতে রাশিয়ার সঙ্গে যে কৌশলগত অংশীদারি চুক্তি সই হয়। যেখানে দুই দশক ধরে সহযোগিতা জোরদার করার কথা ছিল; কিন্তু সেটিও ইরানের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি করতে পারেনি। এই দুই অংশীদার মিলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের আরোপ করা কঠোর নিষেধাজ্ঞার ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে ব্যর্থ হয়েছে।

ইরানের মানুষ অনেক দিন ধরেই বিক্ষোভের স্লোগানে বলে আসছে, দেশের পররাষ্ট্রনীতি, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের স্বার্থে জড়িত থাকার কারণেই দেশের আয় কমে যাচ্ছে।

তবে ২০২৫ সালের শুরু থেকে এই ব্যাখ্যা আগের মতো বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। লেবানন, সিরিয়া, গাজা ও ইয়েমেনে ইরানের প্রভাব উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। এতে এই যুক্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে যে শুধু আঞ্চলিক কর্মকাণ্ডই রাষ্ট্রীয় সম্পদের প্রধান অপচয়ের কারণ।

প্রথমবারের মতো ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি এবং প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন যে ইরানের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থার জন্য শুধু নিষেধাজ্ঞাকেই দায়ী করা যায় না। এই স্বীকারোক্তি দেখিয়ে দেয় যে, শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা এখনো সংকটের মূল কেন্দ্রে রয়েছে।

সামনে যে ঝুঁকি

এখন ইরানের নেতৃত্ব বিক্ষোভ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দুই ধরনের আলাপ সামনে আনছে। প্রথম ব্যাখ্যাটি দিচ্ছেন সর্বোচ্চ নেতা ও প্রেসিডেন্ট। তাঁরা বলছেন, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতা আছে এবং শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে এই গভীর সংকটের ব্যাখ্যা দেওয়া যায় না। দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি দিচ্ছে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলো। তারা এখনো জোর দিয়ে বলছে, বাইরের শক্তিগুলোই অস্থিরতা উসকে দিচ্ছে এবং সরকারব্যবস্থাকে নিশানা করছে।

এই দুই ধরনের ব্যাখ্যার কারণে রাষ্ট্রের ভেতরেই বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। কারণ, নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাখ্যায় বিক্ষোভকে কার্যত সরকারের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর ফলে সমাজের ভেতরে উত্তেজনা আরও বাড়ছে এবং সরকার ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব আরও গভীর হচ্ছে।

ইতিহাস বলছে, সরকার টিকে থাকা নিয়ে উদ্বেগ বাড়লে বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান আরও শক্ত হয়। এদিকে ইরানি নেতারা আছেন আরেক আশঙ্কায়। তাঁদের ধারণা, ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অটল সমর্থন দেশটিকে ইরানের বিরুদ্ধে আবার যুদ্ধে প্ররোচিত করছে। এই আশঙ্কা ইরানের ভেতরে সরকার ও সমাজের মধ্যে সংঘাতকে আরও তীব্র করেছে। এমনকি দীর্ঘদিন ধরে যদি এই সংঘাত চলতে থাকে, তাহলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা সরকার পরিবর্তনের দিকেও যেতে পারে। এই আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

  • মাহজুব জুয়েইরি মধ্যপ্রাচ্য–বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত