বরং সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর ভূমিকার প্রশংসা করেছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারাও। জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলায় সবাইকে একত্রে মাঠে নামতে হয়। সব ক্ষেত্রে দলীয় বিভাজন কাঙ্ক্ষিত নয়।

জাতিসংঘ প্রতিনিধির সঙ্গে মির্জা ফখরুলের বৈঠক সম্পর্কে তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেছেন, ‘আমরা দেখি বিএনপি সব সময় বিদেশিদের কাছে ছুটে যায়। বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের কাছে, বিদেশি সংস্থার কাছে তাদের দৌড়ঝাঁপ।’ এখানেই তিনি থেমে থাকেননি। বলেছেন, কিন্তু এ দেশের মালিক হচ্ছেন এ দেশের জনগণ। তাঁরাই প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন। (প্রথম আলো, ১৪ জুলাই ২০২২)

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, সভাপতিমণ্ডলীর সভাপতি আব্দুর রাজ্জাকও একই পরামর্শ দিয়েছেন।

আমরা অতীতের রেকর্ড ঘাঁটলে দেখতে পাই, যাঁরা ক্ষমতায় থাকেন, তাঁরা বিরোধী দলের ন্যায্য দাবিও আমলে নেন না। ফলে বিরোধী দলের কাছে দুটি বিকল্প থাকে। প্রথমত গণমাধ্যমের মাধ্যমে তাদের দাবিদাওয়ার কথা দেশবাসীকে জানানো; দ্বিতীয়ত বিদেশিদের কাছে প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরে দাবি মানতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। আওয়ামী লীগ নেতারা জানিয়ে দিয়েছেন, চাপ দিয়ে তাঁদের কাছ থেকে কিছু আদায় করা যাবে না। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হবে।

সংবিধান অনুযায়ী ২০১৪ ও ২০১৮ সালেও নির্বাচন হয়েছিল। সংবিধান অনুযায়ী ১৯৮৬, ১৯৮৮, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারিতেও নির্বাচন হয়েছিল। প্রতিটি নির্বাচনের পর সংসদও গঠিত হয়েছিল। কিন্তু তাতে নির্বাচন সমস্যার সমাধান হয়নি। দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হয় না বলে আমরা নির্দলীয় ব্যবস্থা কায়েম করলাম। আবার সেটি বাতিলও করলাম। কিন্তু নির্বাচনী সমস্যার সমাধান করতে পারলাম না। এর পুরো দায় ১৫ বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির ওপর চাপালে হবে না। দায় আওয়ামী লীগকেও নিতে হবে।

গেল দুই পরীক্ষায় আওয়ামী লীগ ফেল করেছে। ২০২৩ সালের শেষের পরীক্ষাটি কেমন হবে, সে সম্পর্কে চূড়ান্ত কথা বলার সময় আসেনি। তবে সরকারের নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশে বলতে চাই, দেশের নির্বাচন বা গণতন্ত্র নিয়ে বিদেশিদের কাছে ধরনা দেওয়া যতটা অমর্যাদার, তার চেয়ে বেশি লজ্জার সুষ্ঠু নির্বাচন না করার ক্ষেত্র তৈরি করা এবং জনগণের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করা। জনগণের প্রতি আস্থা থাকলে কোনো দল জনগণের ভোটাধিকার হরণ করতে পারে না।

আওয়ামী লীগের নেতারা প্রায়ই বিএনপির আন্দোলন করার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন করেন। কিন্তু যদি দেশে সত্যিকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু থাকে, তাহলে আন্দোলন করতে হয় না। বিএনপির আন্দোলন করতে না পারায় আওয়ামী লীগের জবরদস্তির নির্বাচন সুষ্ঠু হয়ে যায় না।

নির্বাচন নিয়ে সমস্যা তখনই বেশি দেখা দেয়, যখন প্রতিযোগীদের কেউ মসনদে থাকে, কেউ বাইরে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে প্রতিযোগীদের সবাই ক্ষমতার বাইরে ছিল। ফলে সমস্যা তেমন হয়নি। ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি যে নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল, তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ছিলেন বিএনপির মনোনীত রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। তাঁর ভূমিকা এতটাই পক্ষপাতমূলক ছিল যে চারজন উপদেষ্টা পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ফলে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগেই এক–এগারোর পটপরিবর্তন ঘটে। আওয়ামী লীগের নেতারা এখন এক–এগারোকে যেভাবেই চিহ্নিত করুন না কেন, সেদিন সোল্লাসে স্বাগত জানিয়েছিলেন। শীর্ষ নেতারা বঙ্গভবনে গিয়েছিলেন নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে।

ইইউর রাষ্ট্রদূত ও জাতিসংঘের সমন্বয়কারীর সঙ্গে বিএনপির মহাসচিবের বৈঠককে হৃষ্ট চিত্তে নিতে পারেননি। এর মধ্যে ষড়যন্ত্রের আভাস দেখতে পেয়েছেন কেউ কেউ। কিন্তু তাঁদের মনে থাকার কথা, ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ দিকে আওয়ামী লীগ কতবার বৈঠক করেছে বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে।

প্রথম আলোর খবর থেকে সে সময়ের কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরছি:

উন্নয়ন সহযোগী পাঁচটি দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনাররা গতকাল শনিবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিলের সঙ্গে তাঁর গুলশানের বাসভবনে বৈঠক করেছেন।

বৈঠকে অংশ নেওয়া রাষ্ট্রদূতেরা হলেন: যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত প্যাট্রিসিয়া এ বিউটেনিস, যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী, কানাডার হাইকমিশনার বারবারা রিচার্ডসন, অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনার ডগলাস ফসকেট ও জাপানের রাষ্ট্রদূত। (৩ ডিসেম্বর ২০০৬)

আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে ছয়টি মুসলিম দেশের বৈঠক। এই দেশগুলো হলো তুরস্ক, পাকিস্তান, ইরান, মিসর, ফিলিস্তিন ও আফগানিস্তান। (২৩ নভেম্বর ২০০৬)

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪–দলীয় জোট ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে। অসুস্থতার কারণে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ওই বৈঠকে উপস্থিত থাকতে পারেননি। তবে তাঁর লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন দলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল। (২ নভেম্বর ২০০৬)

বিরোধী দলের আন্দোলন, কূটনীতিকদের সুপরামর্শ উপেক্ষা করে বিএনপি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে দিয়ে একটি জবরদস্তির নির্বাচন করতে গিয়ে যে ঐতিহাসিক ভুল করেছিল, নেতারা এখন তা স্বীকার করেন। আওয়ামী লীগ যদি তৃতীয়বারের মতো আরেকটি জবরদস্তির নির্বাচন চাপিয়ে দিতে চায় দেশবাসীর ওপর, তাতে গণতন্ত্রের যে ছিটেফোঁটা অবশেষ আছে, তা–ও থাকবে না।

২০০৮ সালে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। নির্বাচনী অঙ্গীকার তারা কতটা পালন করেছে, জনগণের দিন বদল হয়েছে না আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের দিন বদল হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু ২০০৮–এর নির্বাচন যে সুষ্ঠু ও অবাধ হয়েছিল, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করল। এরপর তাদেরই দায়িত্ব ছিল দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনকে সুষ্ঠু করার উপায় খুঁজে বের করা।

কিন্তু তারা সেই পথে না নিয়ে বিএনপির আন্দোলন করার মুরাদ নেই—এ অহংবোধে দেশবাসীর ওপর পরপর দুটি জবরদস্তির নির্বাচন চাপিয়ে দিল। যে আওয়ামী লীগ রাজপথে আন্দোলন করে জনগণের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিল, সেই আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধেই ভোটাধিকার হরণের অকাট্য প্রমাণ হাজির করছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। এটি জনগণের মধ্য থেকে উঠে আসা আওয়ামী লীগের নৈতিক পরাজয় বলে মনে করি।

গেল দুই পরীক্ষায় আওয়ামী লীগ ফেল করেছে। ২০২৩ সালের শেষের পরীক্ষাটি কেমন হবে, সে সম্পর্কে চূড়ান্ত কথা বলার সময় আসেনি। তবে সরকারের নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশে বলতে চাই, দেশের নির্বাচন বা গণতন্ত্র নিয়ে বিদেশিদের কাছে ধরনা দেওয়া যতটা অমর্যাদার, তার চেয়ে বেশি লজ্জার সুষ্ঠু নির্বাচন না করার ক্ষেত্র তৈরি করা এবং জনগণের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করা। জনগণের প্রতি আস্থা থাকলে কোনো দল জনগণের ভোটাধিকার হরণ করতে পারে না।

  • সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি [email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন