দেয়ালের লিখন বারবার খণ্ডন

ধর্মীয় সম্প্রীতির গ্রাফিতি আঁকা হয়েছে দেয়ালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়।ছবি: প্রথম আলো

দেশ পরিচালনায় যখন নীতি, অর্থনীতি কিংবা বাস্তব প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের চেয়ে প্রতীক, স্মৃতি ও ইতিহাসের ব্যাখ্যা বেশি গুরুত্ব পায়, তখন সেই অর্থবহ প্রতীক বা চিহ্নের জগৎ এক তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। এখানে কোনো শূন্যতা থাকতে পারে না, বিশেষত পরিবর্তনশীল নতুন পরিস্থিতিতে। গত দেড় দশকে সরকারি অর্থে নির্মিত প্রতিকৃতি, মূর্তি ও ইতিহাসের একমুখী বয়ান সর্বত্র একধরনের ‘সম্মতি উৎপাদন যন্ত্র’ হিসেবে কাজ করেছে।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় এই ব্যয়বহুল ম্যুরাল সংস্কৃতির বিপরীতে দাঁড়ায় দ্রুত স্প্রে-পেইন্টে করা গ্রাফিতি। এই গ্রাফিতির ভাষা ছিল ভিন্ন—যে ভাষা ভদ্র সমাজ সহজে বুঝতে পারে না। একই সময়ে র‍্যাপ সংগীতের ‘আওয়াজ উডা’ জোশে বহু সরকারি ভাষ্যযন্ত্র কার্যত কুপোকাত হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় মিম–সংস্কৃতি।

চার দশক আগে বাংলাদেশের আভাঁ-গার্দ লেখক, লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন, নতুন ঘরানার সিনেমা ও বিজ্ঞাপন সংস্থাগুলো নানাভাবে প্রমিত বাংলা ও কলকাতাকেন্দ্রিক ‘ভদ্রলোক’ ভাষার বিপক্ষে মুখের ভাষাকে জনপ্রিয় করে তোলে। একপর্যায়ে সামাজিক চাপের মুখে বিজ্ঞাপনের ‘বাংলিশ’ ভাষা বন্ধ করার চেষ্টাও হয়েছিল। সেই ভাষা-রাজনীতি বদলে বদলে আজ এসে পৌঁছেছে অন্য এক প্রজন্মের হাতে—দেয়ালের চিকা হিসেবে, যা কাউকে ‘কেয়ার’ করে না, চেনেও না।

আরও পড়ুন

এই সাংকেতিক ভাষার কারণেই ২০২৪ সালের রাস্তার আন্দোলনের তেজ ও গতি অনেকাংশে শাসন সংস্থার নজর এড়িয়ে যায়। নজরদারি সংস্থার কাছে এসব ভাষার অন্তর্নিহিত সংকেত ছিল একেবারেই ভিনগ্রহের সংকেত, যেগুলো ডিকোড করার মতো অভিধান তাদের ছিল না।

এই প্রেক্ষাপটে গতানুগতিক টেলিভিশন বিবৃতির অসারতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ব্যক্তির মন্তব্যটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, ‘এই প্রজন্ম বড় হয়েছে ক্রিস্টোফার নোলানের সিনেমা দেখে, আর আপনারা এখন খাওয়ানোর চেষ্টা করছেন দেলোয়ার জাহান ঝন্টুর বাসি সিনেমা।’

নতুন মূর্তি, মহাসড়ক কিংবা জাদুঘর তৈরির একটি দীর্ঘ সময়রেখা থাকে। সে অপেক্ষায় না থেকে পুরোনো শাসনের অবসানের পরের মাসগুলোতে শহরের রাস্তা নিজেই স্লোগান, আইকন ও চিত্র স্থাপনের নতুন ক্যানভাসে পরিণত হয়।

তবে অভ্যুত্থানের সময়ের দেয়াললিখন ও চিকা এক অর্থে সাংকেতিক বস্তু ছিল না। তখনকার গ্রাফিতি ছিল স্প্রে-পেইন্টে করা—দ্রুত, গোপন, সাদা-কালো বা লাল। সে তুলনায় বর্তমানের দেয়ালচিত্রগুলো অনেক ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক, ধীরগতির ও বহুরঙা। তবু এসব দেয়ালচিত্র পাঠ করে ভবিষ্যতের কিছু ইউটোপিয়ান আশা (যুক্তিবাদী ও ন্যায়সংগত সমাজের আশাবাদ) বিশ্লেষণ করা যায়।

বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতার ভাষা ৫৫ বছর ধরে মূলত প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে থেকেছে। পাঁচ দশক ধরে এটি প্রধানত বলেছে ‘কী চাই না’; কিন্তু স্পষ্টভাবে বলতে পারেনি ‘কী চাই’। ফলে জনমানসে সংযোগের ঘাটতি রয়ে গেছে। দেয়ালে উজ্জ্বল রঙে লেখা ধর্মনিরপেক্ষতার ঘোষণাগুলো চলমান ক্ষমতার বাস্তব সমীকরণে এসে দ্রুত বিবর্ণ হয়ে পড়ে।

নৃবিজ্ঞানী লোটে হুকের ২০০৯ সালের গবেষণা ঢাকার সিনেমা পোস্টারওয়ালাদের নিয়ে করা মাঠপর্যায়ের কাজের ওপর ভিত্তি করে লেখা। এই পোস্টারওয়ালা যুবকেরা ‘আসিতেছে’ সিনেমার ঘোষণা দিয়ে রাতে পোস্টার লাগাত।

হুক দেখান, ঢাকার দেয়ালগুলো ‘ঘনবসতিপূর্ণ’ এবং একধরনের ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক প্রতীকী ও বস্তুগত সাইট’, যেখানে সিনেমার পোস্টার রাজনৈতিক দলের পোস্টারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে। সে সময় শহরে একাধিক রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে একধরনের ভারসাম্য ছিল। গত এক দশকে সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর নেই; দেয়ালগুলো দখল করেছে সরকার অনুমোদিত ম্যুরাল ও পোস্টার।

অভ্যুত্থানের পর অনুমোদিত দেয়ালচিত্রের বিস্তার লক্ষণীয়। এগুলো প্রায়ই একাধিক দেয়ালজুড়ে থাকে, যা ইঙ্গিত দেয় যে এসব কাজের জন্য সময় ও অনুমতি অথবা অন্তত সমর্থন রয়েছে। এগুলো দিনের বেলায় ধীরে করা হয়; এগুলো নিশাচর, বেনামি, ‘অন দ্য গো’ পোস্টিং নয়।

প্রজন্মের স্লোগান, শহীদ স্মরণ কিংবা মিম মেমোরির পাশাপাশি এসব ম্যুরাল আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। হুমায়ুন আজাদের প্রশ্ন, ‘আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম?’ এর জবাবে যেন এগুলো একটি মেনিফেস্টো, ‘আমরা কেমন বাংলাদেশ চাই’।

আরও পড়ুন

চলমান সেমিনার সংস্কৃতিতেও এই প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার অডিটরিয়াম থেকে ইউটিউব চ্যানেলের আলোচনায় প্রায়ই দেখা যায়, পেছনের পিভিসি ব্যানারে লেখা ‘কেমন’ এবং ‘চাই’-এর মধ্যে বসানো হয় বিশ্ববিদ্যালয়, সংস্কৃতি, সাহিত্য ও সিনেমা ইত্যাদি। এই ভদ্রলোকি দাবিদাওয়ার তুলনায় দেয়ালের ভাষা অনেক বেশি সরাসরি দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগ করে।

তবে এই সরাসরি যোগাযোগের মধ্যেও দুর্বলতা আছে। ইউটোপিয়ান আশার বিপরীতে সমাজ ও রাষ্ট্রের ভেতরে এমন শক্তিশালী গোষ্ঠী রয়েছে, যারা এসব পরিবর্তনের কোনো অংশই চায় না।

কিছু ম্যুরাল অনেক বেশি সুনির্দিষ্ট। কোথাও দেখা যায় চা-বাগানের শ্রমিকদের, যাঁরা ২০২৪ সালের আগস্টের প্রথম দিকেই ধর্মঘটে গিয়েছিলেন। কোথাও আরও সরাসরি ভাষায় উঠে আসে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী সম্প্রদায়ের অধিকার। এসব দেয়ালচিত্রে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের ভেতরে ধর্মনিরপেক্ষতার সম্ভাব্য অবস্থান, দুর্বলতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রাথমিক রূপরেখা পাওয়া যায়।

আরও পড়ুন

একটি চিত্রে দেখা যায় রক্তাক্ত, বিচ্ছিন্ন একটি মুষ্টি, যা একটি পতাকা বহন করছে। পেছনে উদীয়মান সূর্য, জাপানি ‘মাঙ্গা’ ঘরানার স্টাইলে আঁকা। নিচে মসজিদ, গির্জা, গুরুদুয়ারা ও মন্দিরের প্রোফাইল। এর গঠন একাত্তরের বিখ্যাত ‘আমরা সবাই বাঙালি’ পোস্টারের স্মৃতি জাগালেও রক্তাক্ত পতাকা এখানে নতুন সংযোজন। অন্য এক সংস্করণে পতাকার বদলে আছে ‘হেলিকপ্টার গানশিপ’ প্রতিপক্ষের প্রতীক হিসেবে এবং বড় অক্ষরে লেখা ‘সংগ্রাম’। 

এই ম্যুরাল সোভিয়েত বাস্তববাদী পোস্টারের আদলে আঁকা। নিচে তিনটি মুখ, যা ধর্ম ও জাতিসত্তাকে একত্র করে; বিশেষ করে তৃতীয় মুখটি একই সঙ্গে আদিবাসী ও বৌদ্ধ পরিচয়ের ইঙ্গিত দেয়। অন্য ম্যুরালগুলোতে পোশাকের মাধ্যমে বিশ্বাসের প্রতিনিধিত্ব করা হয়েছে। স্লোগানটি পরিচিত, ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার।’

তবে ম্যুরালের মাধ্যমে আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের নিজস্ব সীমাবদ্ধতা আছে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী বছরে ধর্মীয় ও সামাজিক চাপ নারী সমাজের ওপর বেড়েছে; একই সঙ্গে হিন্দু ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণের ঘটনাও ঘটেছে।

আরও পড়ুন

এই প্রেক্ষাপটে কিছু ম্যুরালের ভাষা উদ্বেগ প্রকাশ করতে শুরু করে। ইউটোপিয়ান আশা থেকে আবেগ সরে গিয়ে জায়গা নেয় ডিস্টোপিয়ান (এমন একটি কাল্পনিক সমাজ, যেখানে সবকিছুই দুর্দশাপূর্ণ) আশঙ্কা।

দেয়ালে এখন দেখা যায় সতর্কবার্তা। আবারও বহু ধর্মের মানুষের অবয়ব আর ওপরে লেখা, ‘শুনো, ধর্ম আর দেশ মিলাতে যায়ো না, পরে ফুলের নাম কি দিবা ফাতেমা চূড়া?’ এখানে ‘ফাতেমা’ নামটিকে মুসলমান নারীর নাম হিসেবে ধরে নিয়ে তার সঙ্গে হিন্দু দেবতা কৃষ্ণের নামের প্রতিস্থাপনের আশঙ্কা তুলে ধরা হয়েছে; কিন্তু এই ভাষা কিছুটা সেকেলে ও স্থির মনে হয়।

ধর্মনিরপেক্ষতার অনুভূতি প্রশংসনীয়, ‘রাষ্ট্র সবার’ অবশ্যই আমাদের সমষ্টিগত লক্ষ্য। তবু এই আদর্শের ভাষায় এখানে এক ধরনের দুর্বল গতি ধরা পড়ে।

বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতার ভাষা ৫৫ বছর ধরে মূলত প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে থেকেছে। পাঁচ দশক ধরে এটি প্রধানত বলেছে ‘কী চাই না’; কিন্তু স্পষ্টভাবে বলতে পারেনি ‘কী চাই’। ফলে জনমানসে সংযোগের ঘাটতি রয়ে গেছে। দেয়ালে উজ্জ্বল রঙে লেখা ধর্মনিরপেক্ষতার ঘোষণাগুলো চলমান ক্ষমতার বাস্তব সমীকরণে এসে দ্রুত বিবর্ণ হয়ে পড়ে।

বাংলায় প্রবাদ আছে, ‘কপালের লিখন যায় না খণ্ডন।’ কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসের ধারাবাহিক দ্বন্দ্ব ও সংগ্রামের দিকে তাকালে বোঝা যায়, দেয়ালের লিখন প্রতিটি নতুন সন্ধিক্ষণে বারবার নতুন করে লেখা হয়, এবং মুছে যাওয়ার আশঙ্কাও সঙ্গে নিয়েই চলে।

  • নাঈম মোহায়মেন কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দৃশ্যকলা বিভাগের স্নাতক অধ্যয়ন পরিচালক

    *মতামত লেখকের নিজস্ব