চরশাখাহাতী। নৌকা থেকে নামতেই দুইটা ছবি পাশাপাশি। একটিতে আব্বাসউদ্দীন। তাঁর ছবির ওপরের অংশে লেখা—‘ওকি গাড়িয়াল ভাই, হাঁকাও গাড়ি তুই চিলমারীর বন্দরে’ আর নিচে তাঁর জীবনী ও স্কুলের নাম। আরেকটি ছবি চারণ সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দীনের। এভাবে চরশাখাহাতী ১নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দরজা পর্যন্ত গাছে গাছে ঝোলানো সৈয়দ শামসুল হক, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, ভাওয়াইয়া শিল্পী সফিউল আলম রাজা, বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু, সত্যেন বসু, শহীদ জননী জাহানারা ইমাম থেকে শুরু করে অতীশ দীপঙ্কর পর্যন্ত মনীষীদের ছবি। এখানে এ ছাড়া আছে তিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। আর করোনাকালে হয়েছে তিনটি কওমি মাদ্রাসা।
বিদ্যালয়ে চার শিক্ষক। কিন্তু শিক্ষার্থীর সংখ্যা নগণ্য। তাদেরই নিয়ে চলছে পাঠদান। খ্রিষ্টীয় নববর্ষ উপলক্ষে এখানে চিলমারী উপজেলার কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নিয়ে হয়েছে সূর্য উৎসব। ‘আগে স্কুলে জায়গা দেওয়া যাই তো না। এলা খালি এই স্কুলই না, সবগুলা স্কুলেই ছাত্রছাত্রী কমে গেছে।’—কথাগুলো বলছিলেন চরশাখাহাতী ১ নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরি কাম প্রহরী মিলন মিয়া (৩২)। চরশাখাহাতী স্কুলের এক অভিভাবক মেহেদী হাসান জানান, পরীক্ষা বা মূল্যায়ন না হওয়ায় অনাগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে বিস্কুট বন্ধ হওয়া একটা কারণ। তিনি মনে করেন, এমনও বাচ্চা আছে, যাদের মা-বাবা মাঠে কাজ করেন। চাল-ডাল থাকলেও রান্না করার ঝামেলা আছে, এক প্যাকেট বিস্কুট তাদের কাছে একই সঙ্গে দুপুরের আহার ও আনন্দের উৎস।
করোনার মাঝামাঝিতে স্কুল ফিডিং বন্ধ হয়। আরেক দিকে স্কুলও বন্ধ। এ সময় শাখাহাতী চরে দুটি মাদ্রাসা তৈরি হয়। করোনা শেষে সেই বাচ্চারা অধিকাংশই আর ফেরেনি। একই অবস্থা পাশের চর বৈলমন্দিয়ারখাতাতেও। সেখানেও একটি মাদ্রাসা গড়ে ওঠে। চর কড়াইবরিশাল চরেও ঢুসমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্যাচমেন্ট এলাকায়ও তা-ই। কোথাও ছাত্ররা ফিরছে না।
রফিকুল হায়দার আরও জানান, পাঠদানের প্রক্রিয়াটি আনন্দদায়ক না হওয়ায় স্কুলে আসতে শিক্ষার্থীরা আগ্রহ পান না। স্কুলকে দৃষ্টিনন্দন করতে হবে। শিক্ষকদের পোশাকও হতে হবে বৈচিত্র্যময় এবং শিশুদের মনোযোগ আকর্ষণ করে এমন। আর শিক্ষকদের দ্বারা জরিপসহ আমলাতান্ত্রিক কোনো কাজ করা যাবে না। তাঁদের বেতনও প্রথম শ্রেণির হতে হবে। তাঁরা শুধু পড়বেন আর পড়াবেন।
করোনা মহামারির কারণে দীর্ঘ ১৮ মাস বন্ধ থাকার পর ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নতুন করে করোনার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছুটি ঘোষণা করা হয়। করোনাকালে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের শিখনক্ষতি নিয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠান এনসিটিবির এক গবেষণায় উঠে এসেছিল, করোনা মহামারির সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় প্রাথমিক পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা।
পঞ্চম শ্রেণির ইংরেজি, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এবং তৃতীয় শ্রেণির বাংলায় শেখার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ঘাটতি আরও বেড়েছে। ওই গবেষণার তথ্য বলছে, করোনা সংক্রমণের আগে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা গড়ে ইংরেজি বিষয়ে যতটা শিখত, করোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের কারণে তা সাড়ে ১২ শতাংশ কমে গেছে। একই শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ে শিখন অর্জনের হার কমেছে প্রায় সাড়ে ১৬ শতাংশ। আর তৃতীয় শ্রেণির বাংলায় কমেছে ১৫ শতাংশের মতো।
চরশাখাহাতী, বৈলমন্দিয়ারখাতা, কড়াইবরিশাল ও ঢুসমারা স্কুলের শিক্ষকেরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, স্কুলের খাতায় শিশুদের নাম থাকায় তাদের ঝরে পড়া কাগজে-কলমে বোঝার উপায় নেই। বিদ্যালয়ে ছাত্র ভর্তি গত বছরের তুলনায় বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু ক্লাসে উপস্থিত থাকছে না। তারা স্কুল থেকে উপবৃত্তি নিয়ে কওমি মাদ্রাসায় পড়ছে। অভিভাবকদের সঙ্গে বৈঠক ও হোম ভিজিটের পর কদিন স্কুলে আসে, তারপর আবার সাবেক।
এ প্রসঙ্গে এই ক্লাস্টারের উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা জাকির হোসেন বলেন, ‘এটা গুরুতর সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভর্তি প্রাইমারিতে, কিন্তু ক্লাস করছে কওমি মাদ্রাসায়। সমস্যাটি থেকে বের হওয়ার জন্য শিক্ষকদের সঙ্গে মতবিনিময় করছি।’
মনতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। চারণ সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দীন তাঁর লেখায় এই চরের ঘটনা কয়েকবার লিখেছেন। এই স্কুলের সহকারী শিক্ষক আতিকুর রহমান (৩০) জানান, কওমি মাদ্রাসাগুলো মূলত স্থানীয়। একজন মাওলানাই একটি মাদ্রাসা চালান।
চরশাখাহাতী ১ নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মিজানুর রহমান জানান, শিক্ষার্থীদের পঞ্চম শ্রেণি পাস করার পর লেখাপড়া সমাপ্ত হয়। উচ্চবিদ্যালয় না থাকায় মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায়। আর ছেলেরা গার্মেন্টসে চলে যায়। ফলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা তাদের তেমন কাজে না লাগায় মাদ্রাসাশিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। এ ছাড়া শিক্ষকদের সঙ্গে অভিভাবকদের সমন্বয়হীনতা ও বিদ্যালয়ের সময়সূচি একটা কারণ। মাদ্রাসার সঙ্গে সময়সূচির সমন্বয় করা গেলে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।
‘সমন্বিত প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প ১৯৯৭-২০০৩’-এর সহকারী প্রকল্প সমন্বয়কারী রফিকুল হায়দারের সঙ্গে এ প্রসঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, প্রকল্পের শুরুতে জেলার ৩টি সরকারি ও ২টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে প্রকল্পের আওতায় আনা হয়। এতে শিক্ষার মানোন্নয়ন নিয়ে কাজ করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের আগে এই স্কুলগুলোকে দেখাশোনা করতেন কমিউনিটির সদস্যরাই। কিন্তু ৭৩ সালে সরকারীকরণের পর ম্যানেজিং কমিটিগুলো হয়ে পড়ে নামসর্বস্ব।
রফিকুল হায়দার আরও জানান, পাঠদানের প্রক্রিয়াটি আনন্দদায়ক না হওয়ায় স্কুলে আসতে শিক্ষার্থীরা আগ্রহ পান না। স্কুলকে দৃষ্টিনন্দন করতে হবে। শিক্ষকদের পোশাকও হতে হবে বৈচিত্র্যময় এবং শিশুদের মনোযোগ আকর্ষণ করে এমন। আর শিক্ষকদের দ্বারা জরিপসহ আমলাতান্ত্রিক কোনো কাজ করা যাবে না। তাঁদের বেতনও প্রথম শ্রেণির হতে হবে। তাঁরা শুধু পড়বেন আর পড়াবেন।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, করোনার কারণে শিক্ষার্থীদের অনেকে বিদ্যালয় ছেড়েছে বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে গেছে। এখন কেন পরপর বিদ্যালয় কমছে, সেটার একটি সঠিক অনুসন্ধান করে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।
নাহিদ হাসান লেখক ও সংগঠক
[email protected]