গত সপ্তাহে ইরানি সভ্যতাকে ধুলায় মিশিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়ার পর থেকেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মানসিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এখন নিজেকে যিশুর সঙ্গে তুলনা করে সেই বিতর্ক তিনি আরও চড়িয়ে দিয়েছেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মস্তিষ্কের সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন নতুন নয়। ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর আমেরিকার সেরা ২৭ জন মানসিক রোগ–বিশেষজ্ঞ বই লিখে ঘোষণা করেছিলেন, ট্রাম্প মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন ও বিপজ্জনক। সেসময় এই বিশেষজ্ঞরা উত্তর কোরিয়ার নেতা কিংম জং-উনের ব্যাপারে ট্রাম্পের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।
ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, কিম যদি আমেরিকার বিরুদ্ধে কোনো হুমকি দেয় তাহলে এমন আগুনের তাণ্ডব চালানো হবে, যা পৃথিবীর মানুষ আগে কখনোই দেখেনি।
সেই ঘোষণার কথা উল্লেখ করে ডা. জেমস জিলিয়ান লিখেছিলেন, ট্রাম্পের যে অসুখ তার নাম ‘ম্যালিগন্যান্ট নার্সিসিজম’ বা বিকৃত আত্মমুগ্ধতা। ১০ বছরে ট্রাম্পের এই বিকৃত আত্মমুগ্ধতা আরও কয়েক গুণ বেড়েছে। ইরানি সভ্যতা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মাটির সঙ্গে গুঁড়িয়ে দেবেন বলে যে হুমকি ট্রাম্প দিয়েছিলেন, তাতে কেবল আত্মমুগ্ধতা নয়, মানসিক বৈকল্যের লক্ষণও ধরা পড়েছে। আইনের চোখে এমন হুমকি দেওয়াও যুদ্ধাপরাধ।
ডেমোক্রেটিক সিনেটর চাক শুমার ট্রাম্পকে ‘একজন অত্যন্ত অসুস্থ মানুষ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ট্রাম্পের সাবেক ব্যক্তিগত আইনজীবী টাই কব সিএনএনকে বলেছেন, লোকটা যে ‘পাগল’ তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তা না হলে সভ্যতা গুঁড়িয়ে দেওয়ার কথা কেউ বলে?
ট্রাম্পের মিত্র ও রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের কথা উদ্ধৃত করে নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে, তাঁদের কেউ কেউ এখন খোলামেলাভাবেই তাঁর মানসিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন করা শুরু করেছেন। হোয়াইট হাউসে টাইমসের প্রধান প্রতিবেদক পিটার বেকারের এক দীর্ঘ নিবন্ধে ট্রাম্পকে ‘লুনাটিক’ ও ‘ইনসেইন’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। উভয় শব্দের অর্থ একই—উন্মাদ।
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক আচরণ ও কথাবার্তা নিয়ে উদ্বেগ এতটাই বেড়েছে যে কংগ্রেস সদস্যদের অনেকে মনে করছেন শাসনতন্ত্রের ২৫তম সংশোধনী ব্যবহার করে তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরানোর ব্যবস্থা করা উচিত। প্রায় ১০০ জন ডেমোক্রেটিক কংগ্রেস সদস্য সে দাবি তুলে একটি খসড়া প্রস্তাবও উত্থাপন করেছেন।
সর্বশেষ ট্রাম্পের মানসিক সুস্থতা নিয়ে নতুন করে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছে যিশুখ্রিষ্টের আদলে নিজের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে প্রচার করায়। কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে নির্মিত ওই ছবিতে সবকিছুই যিশুর প্রচলিত ছবির মতো, কেবল ঈশ্বরপুত্রের জায়গায় ট্রাম্পের মুখটি বসানো। চোখে পবিত্র দ্যুতি, মাথার চারধারে জ্যোতির্বলয়, এক হাত অসুস্থ ব্যক্তির মাথার ওপর—যিশুর স্পর্শ পাওয়ামাত্রই যে সুস্থ হয়ে উঠবে।
অধিকাংশ মার্কিন নাগরিকের চোখে ৭৯ বছর বয়ষ্ক ট্রাম্প বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ‘অপ্রকৃতস্থ’ হয়ে উঠছেন। সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা তাঁর কমে আসছে। তাঁর শারীরিক সুস্থতা নিয়ে নানা মহলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এ বছরের গোড়ার দিকে ট্রাম্পের হাতে অদ্ভুত এক ক্ষতের চিহ্ন দেখা গেলে অনেকেই ধরে নেন এটা নিশ্চয় অজ্ঞাত কোনো রোগের প্রকাশ।
ট্রাম্প এর আগে নিজেকে সুপারম্যান, সম্রাট, এমনকি সেরা সংগীতজ্ঞ হিসেবে চিত্রিত করে সেসব ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিলি করেছেন। নিজেকে ‘ঈশ্বর কর্তৃক নির্বাচিত’ হিসেবেও বর্ণনা করেছেন। এগুলো নিয়ে কথা উঠলেও অধিকাংশ সময়ই ব্যাপারটা হেসে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নিজেকে যিশুখ্রিষ্টের সঙ্গে তুলনা করে এবার যে কাণ্ডটা করেছেন, তা সম্ভবত আগের সব বাড়াবাড়ি ছাড়িয়ে গেছে।
এ কথা খোদ তাঁর সমর্থকেরাই বলা শুরু করেছেন। তাঁদের একজন হলেন ট্রাম্পের মাগা-সমর্থক হিসেবে পরিচিত ভাষ্যকার মেগান কেলি। নিউইয়র্ক পোস্টকে তিনি বলেছেন, ট্রাম্প যে কাজটা করেছেন তা কেবল অশোভনই নয়, তা রীতিমতো ধর্ম অবমাননার শামিল। একই কথা বলেছেন আরেক মাগা-সমর্থক মারজারি টেইলার গ্রিন।
প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকান স্পিকার জনসন বলেছেন, ছবিটা দেখার পরপরই তিনি ট্রাম্পকে ফোন করে তা সরিয়ে ফেলতে অনুরোধ করেন। ট্রাম্প সেই অনুরোধ রাখেন বটে, তবে এই ছবি প্রচারের পক্ষে যে যুক্তি দেখান তাতে সমস্যা আরও বেড়েছে। তিনি বলেন, ‘যিশুখ্রিষ্ট নয়, আমি নিজেকে একজন ডাক্তার হিসেবে দেখিয়েছি।’ ‘আমি তো ডাক্তারই, মানুষের নিরাময় করাই তো আমার কাজ।’ সে কথা উদ্ধৃত করে সিএনএন একজন প্রকৃত ডাক্তারের ছবি দিয়ে প্রশ্ন রেখেছে, ট্রাম্প কি কখনো সত্যিকারের ডাক্তার দেখেননি?
জটিলতা আরও বেড়েছে ইরান যুদ্ধ প্রসঙ্গে ট্রাম্প পোপ লিওকে সমালোচনা করায়। লিও চলতি যুদ্ধের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন, ট্রাম্প প্রশাসন যে এই যুদ্ধকে ঈশ্বরের নির্দেশ বলে প্রচারের চেষ্টা করেছেন তারও বিরোধিতা করেছেন। ট্রাম্পের দাবি, পোপ লিও আইনের ব্যাপারে দুর্বল, বৈদেশিক নীতির কিছুই তিনি বোঝেন না।
পোপ ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র রাখার ব্যাপারে সমর্থন করেছেন, ট্রাম্প এমন দাবিও করেছেন, যা মোটেই সত্য নয়। তিনি এমন দাবিও করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক পোপ লিও ভ্যাটিকানের প্রধান হয়েছেন শুধু ট্রাম্পের মার্কিন প্রেসিডেন্ট হওয়ার সুবাদে। রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্স বলেছেন, ট্রাম্প কাজটা মোটেই ভালো করেননি। পোপ লিও কোনো রাজনীতিক নন, তিনি ট্রাম্পের প্রতিদ্বন্দ্বীও নন।
কোনো সন্দেহ নেই, রাজনৈতিকভাবে ট্রাম্পের এই অদ্ভুত ব্যবহার বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টির জন্য সুখবর। আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন। মার্কিন ভোটারদের ২২ শতাংশ ক্যাথলিক, তাঁদের ৫৫ শতাংশ গত নির্বাচনে ট্রাম্পের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। নভেম্বরের নির্বাচনে তাঁরা সবাই বা অধিকাংশ—রিপাবলিকান পার্টির বিপক্ষে ভোট দেবে সে কথা ভাবার কারণ নেই, তবে ট্রাম্পের ব্যবহারে অসন্তুষ্ট ক্যাথলিকদের একটা বড় অংশ হয়তো ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকবে। ডেমোক্র্যাটরা এই মুহূর্তে তেমন সম্ভাবনাই হিসাবের খাতায় রাখছে।
ট্রাম্পের মানসিক সুস্থতার প্রশ্নটিও ভোটারদের বিবেচনায় থাকতে পারে। ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে গৃহীত এক জনমত জরিপ অনুসারে, অধিকাংশ মার্কিন নাগরিকের চোখে ৭৯ বছর বয়ষ্ক ট্রাম্প বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ‘অপ্রকৃতস্থ’ হয়ে উঠছেন। সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা তাঁর কমে আসছে। তাঁর শারীরিক সুস্থতা নিয়ে নানা মহলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এ বছরের গোড়ার দিকে ট্রাম্পের হাতে অদ্ভুত এক ক্ষতের চিহ্ন দেখা গেলে অনেকেই ধরে নেন এটা নিশ্চয় অজ্ঞাত কোনো রোগের প্রকাশ।
ইতিহাসে এমন মানুষের অভাব নেই, যাঁরা উন্মাদ বা অপ্রকৃতস্থ হয়েও ক্ষমতা আঁকড়ে থেকেছেন। তাঁদের একজন হলেন রোমান সম্রাট ক্যালিগুলা, যিনি নিজেকে ‘জীবন্ত ঈশ্বর’ বলে ঘোষণা করেছিলেন।
হাসান ফেরদৌস প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক
*মতামত লেখকের নিজস্ব
