লোকায়ত কৃষিকে উপেক্ষা করে খাদ্যনিরাপত্তা সম্ভব?

কৃষি এখনও বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠীর জীবিকার প্রধান উপায়ফাইল ছবি: প্রথম আলো

খাদ্য সংরক্ষণের প্রাচীন নিদর্শন মৃৎপাত্রহীন যুগে পাওয়া গেছে। যিশুখ্রিষ্টের জন্মের ১১ হাজার বছর আগের খাদ্যাগারের সন্ধান মিলেছে। জর্ডানে পাওয়া ওই খাদ্যাগারগুলো কৃষির সূচনার অন্তত দেড় হাজার বছর আগের। এ তথ্য আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে। কৃষি ও খাদ্যাগারের সম্পর্ক এতটা সরল নয়। কৃষি শুরুর আগেই মানুষকে খাবার সংরক্ষণ করতে হয়েছে। অর্থাৎ শস্যাগারের ধারণা শিকার-সংগ্রহ যুগেরই অংশ।

গোত্রভিত্তিক সমাজের হাজার মানুষের শস্যভান্ডার আর একক পরিবারের ভান্ডারের ধরন এক নয়। গোত্রভিত্তিক সমাজ থেকে পরিবারভিত্তিক সমাজে রূপান্তরের চিহ্নও এখানে স্পষ্ট। আবার যে দেশে যে ধরনের ফসল উৎপাদিত হয়, শস্যাগারের গঠনও সেই অনুযায়ী বদলায়। শিকার করে সংগৃহীত হোক কিংবা কৃষিকাজে উৎপাদিত হোক, খাদ্য সারা বছর পাওয়া যায় না। তাই সংরক্ষণের প্রয়োজন পড়ে। কৃষি মূলত বনের উদ্ভিদকে গৃহপালিত করারই একটি প্রক্রিয়া।

শস্য সংরক্ষণের প্রয়োজনে মানুষ স্থায়ী আবাস গড়ে তোলে। এভাবেই প্রথম গড়ে ওঠে গ্রাম। গ্রামের জনসংখ্যা বাড়লে মানুষ ধীরে ধীরে নাগরিক জীবনের দিকে এগোয়। এরপর আসে রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের ভেতরে গড়ে ওঠে নানা শ্রেণি ও পেশা। তারপর দুর্গ। দুর্গের ভেতরে সারা বছরের খাদ্য মজুত থাকে। উদ্বৃত্ত উৎপাদন ও সমাজের স্তরবিন্যাসের সঙ্গে শস্যাগারের সম্পর্ক গভীর।

দুই.

অঞ্চলভেদে উৎপাদনের পরিমাণ ও প্রয়োজনের ভিন্নতায় বাংলায় নানা ধরনের ধানের গোলা দেখা যায়। এসব গোলা আসলে আর্থসামাজিক পরিবর্তনের চিহ্ন। ধানের গোলা বানানোর ক্ষেত্রে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, স্যাঁতসেঁতে বাতাস ও মাটির সংস্পর্শ। দ্বিতীয়ত, ইঁদুর ও পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে প্রতিরোধ।

ধানের পরিমাণ কম হলে তা ঘরের ভেতর রাখা হয়। পরিমাণ বেশি হলে আলাদা ঘর বানানো হয়। অর্থাৎ ধানের পরিমাণই গোলার ধরন নির্ধারণ করে। গঠনের ভিন্নতার কারণে গোলার নামও আলাদা হয়।

ছয় শ থেকে হাজার মণ ধারণক্ষম গোলাগুলো দেখতে পাকা ঘরের মতো। ভেতরে এক বা একাধিক কুঠুরি থাকে। ওপরে জানালা থাকে। মই দিয়ে উঠে সেই জানালা দিয়ে ধান ঢোকানো হয়। দেয়াল মাটি দিয়ে নিকানো হয়। ছাদে থাকে চাল। নিচে ছোট জানালা থাকে। সেখান থেকে ধান বের করা হয়। গৃহস্থবাড়িতে এখন এসব গোলা খুব কম দেখা যায়। কৃষিজমির মালিকানার সর্বোচ্চ সিলিং নির্ধারণ ও বড় পরিবারের ভেঙে যাওয়াই এর প্রধান কারণ বলে ধারণা করা হয়।

ত্রিশ থেকে আড়াই শ মণ ধান রাখার পাত্রকে বলা হয় কড়ুই। বাঁশের বাখারি দিয়ে কাঠামো তৈরি করা হয়। এটি সিমেন্ট বা মাটির মেঝের ওপর বসানো হয়। মাঝের বা ওপরের অংশ নিচের তুলনায় চওড়া হয়। ওপরে দরজা থাকে। নিচে জানালা। দরজা দিয়ে ধান ঢালা হয়।

জানালা দিয়ে বের করা হয়। ভেতরে মাটি, খড় ও গোবর মিশিয়ে প্রলেপ দেওয়া হয়। এতে বাতাস ঢুকতে পারে না। ওপরের অংশে চাল থাকে। উচ্চতা ১০ ফুট পর্যন্ত হয়। অল্প ধান রাখার জন্য খড় দিয়ে রেশমগুটির মতো পাত্র বানানো হয়। একে বলা হয় বাঁদি। কোড়া, সাঁওতালসহ বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠী এটি ব্যবহার করেন।

আড়াই থেকে তিন ফুট উচ্চতার এই পাত্রে দুই থেকে তিন মণ ধান রাখা যায়। বর্তমানে বস্তা বাঁদির জায়গা দখল করেছে। তবে কোড়া জনগোষ্ঠীর ব্যবহৃত বাঁদিতে ৯ থেকে ১২ মণ ধান রাখা যায়। আদিবাসীদের ধানের পাত্র ছোট হওয়ার পেছনে তাদের খাদ্যাভ্যাস ও দীর্ঘদিনের শোষণের ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

ধান কেটে নিয়ে যাচ্ছেন কৃষক
ফাইল ছবি

ধান রাখার একটি আশ্চর্য দেশীয় প্রযুক্তি হলো ধান্যগলি। মাটির ঘরের দেয়াল তৈরির সময় ভেতরে কলাগাছের কাণ্ডের মতো পচনশীল বস্তু রাখা হয়। দেয়াল তৈরি হলে ভেতরে ফাঁকা গলি তৈরি হয়। দোতলা বাড়িতে এই গলি আরও বড় হয়। ওপরে ধান ঢালা হয়। নিচে ঢাকনা দিয়ে বন্ধ রাখা হয়।

উৎপাদিত শস্য সংরক্ষণে লোকজ প্রযুক্তির ব্যবহার অত্যন্ত কার্যকর। খড় তাপের কুপরিবাহী। এটি ভেতরের শুষ্কতা ধরে রাখতে পারে। গোলা মেঝে থেকে কিছুটা উঁচুতে রাখলে স্যাঁতসেঁতে ভাব কমে। বাখারি ও মাটির দেয়াল ইঁদুর কাটতে পারে না। খোলা জায়গায় গোলা থাকায় নজরদারিও সহজ হয়।

ধানের গোলায় লক্ষ্মীর অধিষ্ঠান বলে বিশ্বাস করা হয়। তাই গোলার গায়ে মাটি ও গোবর লেপে সিঁদুর ও আতপচাল দিয়ে আলপনা আঁকা হয়। সকাল ও সন্ধ্যায় ধূপ ও গঙ্গাজল দেওয়া হয়। গোলা স্থাপনের আগে হলুদ, এক টাকা ও কড়ি উৎসর্গ করা হয়। ভাদ্র ও পৌষ মাসে ধান বিক্রি নিষিদ্ধ থাকে। কোথাও কোথাও সোম ও বৃহস্পতিবারে বিক্রি করা হয় না। এই দিনগুলো লক্ষ্মীবার নামে পরিচিত। দুর্ভিক্ষ ও আকালের আশঙ্কা থেকেই এই রীতি গড়ে উঠেছে। এই বিশ্বাস ধানের গোলাকে একটি আর্থসামাজিক প্রতিষ্ঠানে রূপ দিয়েছে।

তিন.

ফসলকে খেতে পোষ মানাতে গিয়ে মানুষ নিজেই খেতে আটকে পড়ে। জুমচাষের মতো স্থানান্তরিত কৃষি থেকে মানুষ স্থায়ী কৃষিতে আবদ্ধ হয়ে যায়। জন্ম নেয় শস্যদেবতা ও কৃষিকেন্দ্রিক মিথ। শিবের কৃষিদেবতা হয়ে ওঠা কিংবা মনসার কাহিনি ধান ও উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত।

রংপুর, কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, চিলমারীর ওপারের গোয়ালপাড়া একসময় মিলিতভাবে পরিচিত ছিল প্রাগজ্যোতিষপুর নামে। এর রাজার নাম ছিল মহীরাঙ্গ। ‘মহীরাঙ্গ’ শব্দের অর্থ চাল। সিকিমের প্রাচীন নাম দেমাজং। এর অর্থ ধানিজমি। রংপুর অঞ্চলে প্রচলিত প্রবাদে বলা হয়, ধান পান গাই, তিন থাকতে কাহারো বাড়ি না যাই। সম্ভবত এই কারণেই অংপুরিয়ারা প্রবাসে যেতে অনাগ্রহী।

অংপুরিয়া সংস্কৃতিতে ধান উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বীজবপন অবিচ্ছেদ্য অংশ। চাষ শুরুর আগে পুঁজা বা গচিবোনা করা হয়। ধান খড় দিয়ে বা মাচায় সংরক্ষণ করা হয়। বীজ বপনের আগে পানিতে ভিজিয়ে বিচন তৈরি করা হয়। জমিতে তৈরি হয় বিচনবাড়ি। বিচনের নানা নাম আছে। যেমন পোতা বিচন, জালা বিচন, নেকনেকা বিচন, কাইনা বিচন, গাইটা বিচন। বিচন তুলে জমিতে লাগানোর প্রক্রিয়াকে বলা হয় রোয়াগাড়া।

কার্তিক মাসের শেষে ধান কাটার আগে শুভ দিনে ধানের আগা আনা হয়। গৃহিণী সাদা কাপড় পরে মাথার চুল ছড়িয়ে কুলা বা কাঁসার থালায় আতপচাল, কলার ছড়া ও মাটির প্রদীপ নিয়ে খেতে যান। একটি ধানের শিষ কেটে আনেন। সেটি গোলাঘর বা রান্নাঘরের বাঁশের খুঁটিতে বেঁধে রাখা হয়। গৃহিণী ঘরে ঢোকার সময় অন্য নারীরা দরজার চালে পানি ছিটিয়ে দেন।

অনুষ্ঠান শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি উপবাস করেন। পরে জলখাবার খেয়ে উপবাস ভাঙেন। ধান কাটার পর অগ্রহায়ণের শুরুতে নবান্ন উৎসব হয়। রংপুরে একে বলা হয় ‘নবান্ন খাওয়া’।

চার.

আরও পড়ুন

অগ্রহায়ণ শব্দের অর্থ ‘অগ্র অয়ন’, অর্থাৎ বর্ষের সূচনা। একসময় নববর্ষ শুরু হতো নব অন্নের ঘ্রাণে। পূর্বপুরুষদের নিবেদন করে অন্ন গ্রহণ করা হতো। নবান্নের অন্ন কাক, শালিখ বা শঙ্খচিল খেলে গৃহস্থরা তা শুভ মনে করতেন।

নবান্নের দিন গৃহিণীরা স্নান করে পাকসাফ হয়ে ঘরে আলপনা আঁকেন। নতুন আতপচালের গুঁড়ার সঙ্গে বাতাসা, সুপারি ও পান কুলায় সাজানো হয়। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা গৃহদেবতার পূজা করেন। মুসলমানেরা মিলাদ পড়ান। এরপর সবাইকে খেতে দেওয়া হয়।

গ্রামে একটি নির্দিষ্ট দিনে নবান্ন উদ্‌যাপন করা হয়। হিন্দু–মুসলিম সবাই নতুন ধানের চালে পায়েস ও শাকসবজি রান্না করেন। গৃহিণীরা সেদিন নিজেরা ঠিকমতো খেতে পারেন না। পরদিন প্রতিবেশীদের সঙ্গে গল্প করতে করতে সেই খাবার খান। একে বলা হয় বাসি নবান্ন।

সাঁওতাল ও অংপুরিয়ারা নবান্নকে ‘নবাইপরব’ও বলে। সাঁওতালেরা দুই সপ্তাহ ধরে নৃত্য, গান ও ভোজে মেতে থাকে। বাঙালি, অংপুরিয়া ও সাঁওতাল—সবাই নবান্নে থালা–বাটির বদলে কলাপাতা ব্যবহার করে।

ধানের বীজ বপন থেকে অন্ন গ্রহণ পর্যন্ত নানা পর্বে উৎসব রয়েছে। শুভ দিন দেখে জমিতে হাল দেওয়া হয়। ভাদ্র মাসে কুমারী মেয়েরা ‘ভাঁজো’ উৎসব পালন করে। এতে বীজের গুণাগুণ ও বর্ষার গতিপ্রকৃতি বিচার করা হয়। আশ্বিনসংক্রান্তিকে গর্ভসংক্রান্তি বলা হয়। সেদিন ফলনের সম্ভাবনা অনুমান করা হয়। কার্তিকসংক্রান্তিতে হয় মুঠিসংক্রান্তি। একমুঠো ধান তুলে ফলন নির্ণয় করা হয়। এরপর অগ্রহায়ণে ধান ঘরে তোলা হয়।

নবান্নের পর পৌষ মাসে আসে মকরসংক্রান্তি। নদীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। নদীতীরে নাচ, গান ও মেলা বসে।

পাঁচ.

হাওর, চর, পাহাড়, উপকূল কিংবা বরেন্দ্র—প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব কৃষিপদ্ধতি, দেশীয় বীজ ও খাদ্যাভ্যাস রয়েছে। অথচ রাষ্ট্রীয় নীতিতে এই বৈচিত্র্যের কোনো প্রতিফলন নেই।

উন্নয়নের নামে একরকম চাষপদ্ধতি ও বাজারনির্ভর কৃষি চাপিয়ে দেওয়ায় শত শত দেশীয় বীজ হারিয়ে গেছে। কৃষক হারাচ্ছেন নিজস্ব জ্ঞান ও নিয়ন্ত্রণ। কৃষি এখনো সংস্কৃতি হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়নি।

দেশের সব অঞ্চলের লোকায়ত কৃষিপদ্ধতি, ঐতিহ্য, উৎসব ও মেলা রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণ করা জাতীয় দায়িত্ব। অঞ্চলভিত্তিক কৃষি ও খাদ্য সংগ্রহশালা গড়ে তুলতে হবে। সেখানে দেশীয় বীজ, কৃষি সরঞ্জাম, স্থানীয় খাদ্য ও কৃষকের অভিজ্ঞতা সংরক্ষিত থাকবে।

কৃষি ও খাদ্য সংগ্রহশালা কেবল প্রদর্শনীর স্থান নয়। এটি হবে গবেষণা, শিক্ষা ও প্রজন্মান্তরের সংযোগস্থল। এসব উদ্যোগে কৃষক ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নেতৃত্ব নিশ্চিত না হলে তা অর্থহীন হবে।

কৃষিকে উপেক্ষা করে খাদ্যনিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা কিংবা টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। বাংলাদেশের কৃষি আজ গভীর সংকটে। এই সংকট কেবল উৎপাদনের নয়। এটি লোকায়ত জ্ঞান, ঐতিহ্য ও খাদ্যসংস্কৃতির অস্তিত্বের সংকট। প্রশ্ন একটাই। রাষ্ট্র কি এই দাবি এখনো উপেক্ষা করবে।

  • নাহিদ হাসান লেখক ও সংগঠক।

    [email protected]

    *মতামত লেখকের নিজস্ব