বাজেট: প্রতিশ্রুতি কতটা, বাস্তবতা কতটা

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের প্রতিপাদ্য গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ—সাম্প্রতিক সময়ের বাজেট ভাষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। সাধারণত বাজেটের আলোচনায় প্রবৃদ্ধি, রাজস্ব, ঘাটতি বা অবকাঠামো বিনিয়োগের মতো বিষয়গুলো প্রাধান্য পায়। সেখানে এবারের প্রতিপাদ্য অর্থনীতিকে মানুষের অংশগ্রহণ, মর্যাদা এবং অন্তর্ভুক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার আহ্বান জানায়।

এবারের বাজেট কি সত্যিই বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে নাকি এটি মূলত বিদ্যমান উন্নয়ন কাঠামোকেই বজায় রাখছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রতিপাদ্যের তিনটি উপাদান—গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।

গণতান্ত্রিক অর্থনীতি: কর, অংশগ্রহণ ও ন্যায্যতার প্রশ্ন

গণতান্ত্রিক অর্থনীতি বলতে শুধু নির্বাচনী গণতন্ত্র বোঝায় না; এর অর্থ হলো অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সম্পদ বণ্টন এবং রাষ্ট্রের আর্থিক কাঠামো কতটা ন্যায্য ও অংশগ্রহণমূলক। এর একটি দিক হলো বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নাগরিক অংশগ্রহণ। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের আর্থিক ভিত্তি—করব্যবস্থা এবং সরকারি ব্যয়ের কাঠামো।

একটি গণতান্ত্রিক অর্থনীতিতে করব্যবস্থা সাধারণত প্রগতিশীল (প্রোগ্রেসিভ) হয়। অর্থাৎ যাদের আয় ও সম্পদ বেশি, তাদের করদায়িত্বও বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশের রাজস্বকাঠামো এখনো মূলত পরোক্ষ করনির্ভর। মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় ৭০ শতাংশ আসে ভ্যাট, আমদানি শুল্ক ও অন্যান্য পরোক্ষ কর থেকে। শুধু ভ্যাট ও শুল্ক মিলিয়েই রাজস্ব আয়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সংগৃহীত হয়। এ ধরনের করব্যবস্থার একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। একজন নিম্ন আয়ের মানুষ ও একজন উচ্চ আয়ের মানুষ বাজার থেকে পণ্য কিনলে একই হারে ভ্যাট দেন। ফলে করের আপেক্ষিক বোঝা দরিদ্র ও মধ্যবিত্তের ওপর বেশি পড়ে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, পরোক্ষ কর বৃদ্ধির প্রভাব নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি এবং তা দারিদ্র্য বৃদ্ধির ঝুঁকিও সৃষ্টি করতে পারে।

অন্যদিকে আয় ও সম্পদের বৈষম্য ক্রমাগত বাড়ছে। সাম্প্রতিক গিনি সহগের প্রবণতা দেখায় যে প্রবৃদ্ধির সুফল সমানভাবে বণ্টিত হচ্ছে না। অর্থাৎ বাজেটের ভাষায় গণতন্ত্রের কথা বলা হলেও এর আর্থিক কাঠামো এখনো বৈষম্য কমানোর জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আর্থিক বিকেন্দ্রীকরণ। বাংলাদেশের অধিকাংশ সরকারি ব্যয় এখনো কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত। স্থানীয় সরকারগুলো সীমিত আর্থিক ক্ষমতা নিয়ে কাজ করে। ফলে অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান—স্থানীয় পর্যায়ে সম্পদ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এখনো দুর্বল রয়ে গেছে।

মানবিক অর্থনীতি: সুরক্ষা নাকি সক্ষমতা

মানবিক অর্থনীতির মূল ধারণা হলো মানুষকে অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা। অর্থনীতির সাফল্য শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধি দিয়ে নয়, মানুষের জীবনমান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং মর্যাদার উন্নতির মাধ্যমে বিচার করা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাজেটে কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে। শিক্ষা খাতে প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা, স্বাস্থ্য খাতে ৬৯ হাজার কোটি টাকা এবং সামাজিক সুরক্ষা খাতে ১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বরাদ্দ কি মানবিক সক্ষমতা গঠনের জন্য যথেষ্ট?

শিক্ষা খাতে ব্যয় এখনো জিডিপির প্রায় ২ শতাংশের কাছাকাছি, যেখানে ইউনেসকো ৪-৬ শতাংশ ব্যয়ের সুপারিশ করে। স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় জিডিপির মাত্র ১ শতাংশের মতো, যা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায়ও কম। এর ফলে স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৭০ শতাংশের বেশি এখনো জনগণকে নিজ পকেট থেকে বহন করতে হয়। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য সামনে আসে—রাষ্ট্রের সুরক্ষাদান ক্ষমতা (প্রটেক্টিভ ক্যাপাসিটি) এবং রূপান্তরমূলক ক্ষমতা (ট্রান্সফরমেটিভ ক্যাপাসিটি)। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, ভাতা ও ভর্তুকি মানুষের তাৎক্ষণিক কষ্ট কমায়। এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান। এই বিচারে বাজেট মানুষের দুর্ভোগ কমানোর ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী, কিন্তু মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সামাজিক গতিশীলতা সৃষ্টির ক্ষেত্রে এখনো সীমিত। অর্থাৎ রাষ্ট্র মানুষকে রক্ষা করছে, কিন্তু পর্যাপ্ত মাত্রায় রূপান্তর করছে না।

অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি: কে লাভবান হচ্ছে

অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির মূল প্রশ্ন হলো—উন্নয়নের সুফল কারা ভোগ করছে? এখানে দুটি স্তর রয়েছে। প্রথমটি পুনর্বণ্টনমূলক অন্তর্ভুক্তি (রিডিস্ট্রিভিউটিভ ইনক্লুশন), যা সামাজিক সুরক্ষা, ভর্তুকি ও নগদ সহায়তার মাধ্যমে বৈষম্যের প্রভাব কিছুটা কমায়। দ্বিতীয়টি কাঠামোগত অন্তর্ভুক্তি (স্ট্রাকচারাল ইনক্লুশন), যা মানুষের জন্য সমান সুযোগ, মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, অর্থায়ন এবং কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করে। এবারের বাজেট প্রথম ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী, কিন্তু দ্বিতীয় ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত দুর্বল। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির কেন্দ্রে থাকার কথা কর্মসংস্থান সৃষ্টির। কারণ, মানুষের জন্য সবচেয়ে কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি হলো একটি মর্যাদাপূর্ণ চাকরি। কিন্তু বাজেটে কর্মসংস্থানকে উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রীয় স্তম্ভ হিসেবে খুব স্পষ্টভাবে দেখা যায় না। যুব বেকারত্ব, দক্ষতা ও শ্রমবাজারের অসামঞ্জস্য এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরির প্রশ্ন তুলনামূলকভাবে প্রান্তিক অবস্থানে রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থনৈতিক ক্ষমতার ক্রমবর্ধমান কেন্দ্রীভবন।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং, জ্বালানি, আমদানি বাণিজ্য, রিয়েল এস্টেট এবং বৃহৎ শিল্প খাতের দিকে তাকালে দেখা যায়, অর্থনৈতিক সম্পদ, ঋণ এবং বাজার সুযোগের একটি বড় অংশ সীমিত সংখ্যক গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত। ব্যাংকের শতকরা ৭০ ভাগের বেশি ঋণ মুষ্টিমেয় কিছু শিল্প ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর মধ্যে পুঞ্জীভূত। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা, যাঁরা কর্মসংস্থানের প্রধান উৎস, তাঁরা প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে। ফলে একটি বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে: যারা সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, তারা সবচেয়ে কম আর্থিক সহায়তা পায়।

জ্বালানি, আমদানি বাণিজ্য এবং ভোগ্যপণ্যের বাজারেও সীমিত সংখ্যক বড় প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য নিয়ে বহুবার প্রশ্ন উঠেছে। বাজারে প্রতিযোগিতা কমলে নতুন উদ্যোক্তাদের প্রবেশ কঠিন হয় এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি দুর্বল হয়ে পড়ে। বাজারে প্রতিযোগিতা কমলে সিন্ডিকেট তৈরির প্রবণতা বাড়ে, যা বাজারে নতুন উদ্যোক্তাদের প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল হয়ে পড়ে।

এখানেই বাজেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়। সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব থাকলেও প্রতিযোগিতা নীতি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন, নতুন ব্যবসা সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের প্রশ্ন তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পেয়েছে।

তাহলে এই বাজেট কেমন উন্নয়ন রাষ্ট্র নির্মাণ করছে

এই বাজেট সামাজিক সুরক্ষা বাড়িয়েছে এবং দুর্বল জনগোষ্ঠীর জন্য কিছু নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। তবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে মানুষের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি এখনো দুর্বল। ফলে রাষ্ট্র বৈষম্যের প্রভাব মোকাবিলায় সক্রিয় হলেও বৈষম্য তৈরি করে এমন কাঠামো পরিবর্তনে দ্বিধায় আছে। তাই ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি’ এখনো অর্জিত বাস্তবতা নয়—এটি একটি আকাঙ্ক্ষা ও অসমাপ্ত যাত্রা। বাজেটের প্রকৃত পরীক্ষা হবে ভাতা বা ভর্তুকির পরিমাণে নয়, বরং এটি কতটা মানুষের সক্ষমতা বাড়ায়, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং অর্থনৈতিক সুযোগকে আরও বিস্তৃত ও ন্যায়সংগতভাবে বণ্টন করতে পারে তার ওপর।

 প্রশ্নটি তাই বাজেটের আকার নয়, প্রশ্ন হলো উন্নয়নের চরিত্র। আগামী দশকে বাংলাদেশ কি এমন একটি উন্নয়ন রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারবে, যা শুধু প্রবৃদ্ধি সৃষ্টি করবে না; বরং সেই প্রবৃদ্ধির সুযোগ, সম্পদ ও ক্ষমতাকেও সমাজের বৃহত্তর অংশের কাছে পৌঁছে দেবে?

  • গোলাম রসূল অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস, অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি, ঢাকা

    [email protected]

    মতামত লেখকের নিজস্ব