জঁ–পল সার্ত্রের অন্তহীন নরক নিয়ে অস্তিত্ববাদী নাটক ‘নো এক্সিট’ ১৯৪৪ সালের মে মাসে প্যারিসে প্রথম মঞ্চস্থ হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন পঞ্চম বছরে পা দিতে যাচ্ছে। নাটকে দেখা যায়, সদ্য মৃত তিন লোক নরকের এক কক্ষে বন্দী হয়ে আছেন, নিজেদের জীবনের ভুল সিদ্ধান্তগুলোর মুখোমুখি হচ্ছেন। সেখান থেকে পালানোর কোনো পথ নেই।
২০২৬ সালের এই সময়ে এসে রুশ কর্তৃপক্ষ যদি মস্কোতে সার্ত্রের এই নাটক মঞ্চস্থ করার অনুমতি দিত, তাহলে যে কেউ জিজ্ঞেস করতে পারেন, ইউক্রেনে চার বছরের বেশি সময় ধরে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ চালানোর পর প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও সাধারণ রুশরা নাটকটি দেখে কী ভাবতেন।
প্রায় সিকি শতাব্দী ধরে পুতিন রাশিয়াতে যে চরম ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা জারি রেখেছেন, সেটা ২০২২ সালে ইউক্রেনে আগ্রাসনের পর যেন অদ্ভুত স্থিতিশীলতায় পৌঁছে গেছে। গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, এটা যে সবার জন্যই ফাঁদ। পুতিন রাষ্ট্র ও সমাজকে এমন এক যুদ্ধের ময়দানে এনে দাঁড় করিয়েছেন, যা ধীরে ধীরে রাশিয়ার শক্তি, সম্পদ ও তরুণদের জীবন ক্ষয় করছে।
রাশিয়ায় একটি দক্ষ ও যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে তোলার জন্য এখন ‘পুতিনবাদে’র সম্পূর্ণ অবসান প্রয়োজন। বর্তমান ব্যবস্থাটি যতই তার বৈধতা ও কার্যকারিতা হারাবে, পুতিন-পরবর্তী ক্ষমতার দখল নেওয়ার লড়াই ততই তীব্র রূপ ধারণ করবে। যখন সেই সময় আসবে, তখন সেই বছর বিশেক আগে যে স্থিতিশীলতাকে পুতিন চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, সেটাও পুরোপুরি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যেতে পারে।
আপাতদৃষ্টিতে সব শান্ত বলে মনে হবে। পুতিন এই ব্যয়বহুল যুদ্ধের অর্থ জোগানোর পথ খুঁজে পেয়েছেন, অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঠেকিয়েছেন, এবং নগদ বোনাসের লোভ দেখিয়ে সেনাবাহিনীতে নতুন নিয়োগ দিচ্ছেন। রাশিয়াও সবার সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলছে। যদিও সম্প্রতি কিছু অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ দেখা যাচ্ছে, তবু পুতিন আত্মবিশ্বাসী যে এসব এখনো তাঁর নিয়ন্ত্রণে।
সেনাবাহিনীতে নতুন নিয়োগ রাশিয়াকে কিছুটা সুবিধা দিলেও, এটা রুশদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করেছে। যেকোনো ধরনের পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার তো ভয়াবহ সিদ্ধান্ত হবে। এ ধরনের কিছু বিজয় নিশ্চিত তো করবেই না, বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের পক্ষ থেকে তীব্র সামরিক জবাবের ঝুঁকি থাকবে। এমনকি রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ মিত্র চীনের সঙ্গেও সম্পর্ক ভেঙে যেতে পারে।
পুতিন ইউক্রেন থেকে চাইলেই সেনা প্রত্যাহার করতে পারছেন না। রাশিয়া যদি বর্তমান যুদ্ধরেখা অনুযায়ী কোনো সমঝোতা মেনে নেয়, তবে কেবল দক্ষিণ ইউক্রেনের সংকীর্ণ এক ফালি ভূখণ্ড ছাড়া পুতিনের ঝুলিতে দেখানোর মতো তেমন কিছুই থাকবে না। কেবল তাঁর আত্মম্ভরিতায় আঘাতই নয়, এত স্বজন হারানোর পর এই ছোট অর্জন রুশ নাগরিকদের সামনে উল্টো এই যুদ্ধের অর্থহীনতাকেই প্রমাণ করবে। তখন তাঁর দুর্বল কৌশলগত চিন্তাভাবনা এবং আত্মম্ভরিতা রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক বড় সংকট হয়ে দাঁড়াতে পারে।
পুতিন নিজেকেই কৌশলের ফাঁদে ফেলে দিয়েছেন। কেবল নিজেকেই নয়, পুতিনবাদের পুরো প্রকল্প যদি তাঁর মেয়াদের পরও টিকে থাকে, সেখানেও অন্তহীন যুদ্ধের বোঝা রয়ে যাবে। পুতিনের আদর্শের যেকোনো ভবিষ্যৎ নেতাই যখন দেখবেন একটি ভারী অস্ত্রে সজ্জিত ইউক্রেন পশ্চিমা নিরাপত্তাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে এবং পুরো ইউরোপ সামরিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠছে, তখন হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারবেন না।
যদি পুতিনের যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ না থাকে, তাহলে রাশিয়ার সাধারণ জনগণের পুতিনবাদের বাইরেও যাওয়ার উপায় নেই আর। রাশিয়ার সাম্প্রতিক গণ-অসন্তোষকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। এই অসন্তোষ বাস্তব, কিন্তু এর মূল নির্যাস হলো এই হতাশা যে পুতিনবাদ তার সব ব্যর্থতা সত্ত্বেও যেন এক অন্তহীন সত্য বলে মনে হচ্ছে।
আজ প্রেসিডেন্টকে কোনো যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন সামলাতে হচ্ছে না, কোনো বিরোধী দলও নেই। ইচ্ছামতো রুশ নাগরিকদের দমন করতে পারেন। এমনকি দৈনন্দিন কাজকারবারও এই শাসনব্যবস্থাকে যুদ্ধ এগিয়ে নিতে ও নিপীড়নকে প্রশ্রয় দিতে সহায়তা করে। অধিকাংশ রুশকে কোনো না কোনোভাবে রাষ্ট্রের কাজ করতে হয়। বেসরকারি খাতও সরকারের অধীন। তবু রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যাপারে তাদের কোনো মতামত নেই।
সামগ্রিকভাবে এই ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিকভাবে অসম্ভব। প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে এমন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নেই। তাঁর শাসনের অবসান বা প্রতিস্থাপন করার কোনো দৃশ্যমান পথ নেই। এই পরিস্থিতিতে মৌখিক প্রতিবাদের ঝলক দেখা দিলেও সেগুলোকে সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
১৮ এবং ১৯ শতকের বিপ্লবের তাত্ত্বিকেরা ‘ক্রমবর্ধমান প্রত্যাশা’র গুরুত্বকে অনুঘটক হিসেবে দেখতেন। মানুষ যখন বুঝতে পারে যে একটি উন্নত ভবিষ্যৎ সম্ভব, তখন তারা সেই প্রক্রিয়াটিকে ত্বরান্বিত করার জন্য পদক্ষেপ নেয়। উদাহরণস্বরূপ ১৯৮৯ সালের পূর্ব ইউরোপীয় বিপ্লবগুলোর কথা বলা যায়। মিখাইল গর্বাচেভের গ্লাসনস্ত এবং পেরেস্ত্রোইকার প্রতিশ্রুতির পরপরই এটা সংগঠিত হয়েছিল।
রুশ জনগণের প্রত্যাশা যেন সীমিত থাকে, সে ব্যাপারে পুতিন তৎপর। আধুনিক, সমৃদ্ধ ও উন্মুক্ত রাশিয়ার যে ওয়াদা ছিল, সেটা স্বৈরতন্ত্র ও অন্তহীন যুদ্ধের চাপে তলিয়ে গিয়েছে। এই অস্বস্তিকর ভারসাম্য চিরকাল চলতে পারে না। সোভিয়েত পতনের পর পুতিন ও পুতিনবাদের প্রাথমিক ওয়াদা ছিল—প্রকৃত স্বাধীনতা না মিললেও, একটি আরামদায়ক পরিবেশ ও উন্নত জীবনযাত্রা এবং দক্ষ শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করা। কিন্তু পুতিন নিজেকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একদিকে চরম কর্তৃত্ববাদী হিসেবে গড়ে তুলেছেন, মাঝারি মানের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন।
অন্যদিকে, দুর্বল অর্থনীতি ও আঞ্চলিক বিশৃঙ্খলার মাধ্যমে এমন পরিস্থিতিতে ফেলেছেন, যা বুমেরাং হয়ে খোদ রাশিয়ার দিকেই আঘাত হানছে। রুশ ভূখণ্ডে ইউক্রেনের একেকটি আঘাত যেন রুশ নাগরিকদের ভালো থাকাটাকেও ক্রমশ ক্ষয় করে দিচ্ছে।
রাশিয়ায় একটি দক্ষ ও যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে তোলার জন্য এখন ‘পুতিনবাদে’র সম্পূর্ণ অবসান প্রয়োজন। বর্তমান ব্যবস্থাটি যতই তার বৈধতা ও কার্যকারিতা হারাবে, পুতিন-পরবর্তী ক্ষমতার দখল নেওয়ার লড়াই ততই তীব্র রূপ ধারণ করবে। যখন সেই সময় আসবে, তখন সেই বছর বিশেক আগে যে স্থিতিশীলতাকে পুতিন চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, সেটাও পুরোপুরি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যেতে পারে।
মাইকেল কিমেজ কেনান ইনস্টিটিউটের পরিচালক।
নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত