ইরান যুদ্ধ: বৈশ্বিক শক্তির পুনর্বিন্যাসে বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে

কোনো সংঘাত দূরবর্তী স্থানে শুরু হলেও তা শেষ হতে পারে নিকটবর্তী বাস্তবতায়। ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা দেখাচ্ছে—বিশ্বরাজনীতিতে আবারও নতুন হিসাব-নিকাশ তৈরি হয়েছে। বৈশ্বিক শক্তির পুনর্বিন্যাসে বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে, তা নিয়ে লিখেছেন মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা যত বাড়ছে, ততই একটি পুরোনো প্রশ্ন সামনে আসছে—পশ্চিমা বিশ্ব কি সত্যিই একসঙ্গে চলছে? ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের সময় ইউরোপের কয়েকটি বড় দেশ দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু এবার দৃশ্যপট ভিন্ন। ইউরোপীয় দেশগুলো সরাসরি সামরিক অভিযানে অংশ নেয়নি। বিশ্লেষকেরা যদিও মনে করেন, পর্দার আড়ালে সীমিত সহায়তা, যেমন ঘাঁটি ব্যবহার, আকাশপথ বা গোয়েন্দা সমন্বয়—এগুলো হয়তো চলছে। তবে তারা মোটাদাগে যুদ্ধের দায় নিজেদের কাঁধে নিতে চাইছে না।

এ অবস্থান কেবল কৌশলগত সতর্কতা নয়; এটি পশ্চিমা বিশ্বের ভেতরে পরিবর্তনের ইঙ্গিত। ২ মার্চ প্রকাশিত দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট–এর প্রতিবেদনে দেখা যায়, ইউরোপীয় নেতারা সরাসরি সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে কথা বলেননি; বরং ‘দূরত্ব বজায় রাখা ভাষা’ ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ ন্যাটোর ভেতরে থেকেও এখন সরাসরি সমর্থনের বদলে শর্তসাপেক্ষ সহযোগিতার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

কেন এই সতর্কতা

প্রথমত, অতীত অভিজ্ঞতা। গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার যে অভিযোগে ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরাক যুদ্ধ শুরু করেছিল, সেই অভিযোগ পরে মিথ্যা প্রমাণিত হয়। তাই এখন ইউরোপীয় দেশগুলো যেকোনো সামরিক পদক্ষেপের আগে আইনি ভিত্তি, স্পষ্ট উদ্দেশ্য এবং বেরিয়ে আসার পথ জানতে চায়। ২ মার্চ রয়টার্সের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ইরান প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যাটোর অবস্থান পরিষ্কার না হলে ইউরোপীয় নেতারা প্রকাশ্যে এগোতে চান না; অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি এড়াতেই এ অবস্থান।

দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা নিয়ে অগ্রাধিকার। ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর ইউরোপের কৌশল বদলে গেছে; রাশিয়াকে তারা তাৎক্ষণিক হুমকি মনে করে। এই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে বড় সংঘাতে জড়ালে ইউক্রেন ইস্যুতে মনোযোগ ও সহায়তা সরে যেতে পারে। তাই তারা একসঙ্গে দুই সংকটে ঢুকতে চায় না। ৩ মার্চ অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসে (এপি) লর্ন কুক লিখেছেন, ইউরোপ সামরিক ঘাঁটি সুরক্ষা ও নাগরিক সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতিতে সক্রিয় থাকলেও সংঘাত বাড়ানোর পথে হাঁটছে না।

তৃতীয়ত, আস্থার টানাপোড়েন। ট্রাম্প আমলের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি, শুল্কবিরোধ, প্রতিরক্ষা ব্যয় ও ইউক্রেন প্রশ্নে মতভেদ—সব মিলিয়ে সম্পর্কের ভেতরে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। ফলে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ এখন জোরালো দাবি। ২ মার্চ দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট–এ এলেন ফ্রান্সিস জানান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থা কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ফ্রান্স পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং ইউরোপীয় অংশগ্রহণের পরিকল্পনা করছে। প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর ভাষায়, শক্তিশালী হতে হবে, এ বার্তাই ইউরোপের মানসিক পরিবর্তনকে ইঙ্গিত করে।

এ বিতর্ক রাজনীতির সীমানা ছাড়িয়ে অর্থনীতি ও কৌশলগত সম্পর্কেও বিস্তৃত। ফরেন অ্যাফেয়ার্সে (১২ ডিসেম্বর ২০২৫) প্রকাশিত ‘হাউ ইউরোপ লস্ট: ক্যান দ্য কন্টিনেন্ট এসকেপ ইটস ট্রাম্প ট্র্যাপ?’ প্রবন্ধে ম্যাথিয়াস ম্যাথাইস ও নাথালি তোচ্চি দেখিয়েছেন, শুল্কচাপ ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন ইউরোপকে এমন এক কাঠামোগত নির্ভরতার মধ্যে ফেলেছে, যা তাকে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়াতে বাধ্য করছে।

একইভাবে ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আইআইএসএস) ‘দ্য লুমিং ট্রান্সআটলান্টিক ট্রেড ওয়ার’ (মে ২০২৫) সম্ভাব্য শুল্কসংঘাতের ইঙ্গিত দেওয়া হয়। অর্থাৎ একদিকে বাণিজ্যিক চাপ, অন্যদিকে নিরাপত্তা-সমর্থনের প্রত্যাশা—এই অসম সম্পর্ক ইউরোপকে ন্যাটোর ভেতর থেকেও আরও শর্তসাপেক্ষ ও হিসেবি অবস্থান নিতে উদ্বুদ্ধ করছে।

সব মিলিয়ে ইউরোপের এ অবস্থানকে শুধু সতর্কতা বলা যথেষ্ট নয়; বরং এটি ‘ঝুঁকি বণ্টনের রাজনীতি’। আধুনিক সংঘাতে লাভ অনিশ্চিত, কিন্তু ক্ষতির ঢেউ, যেমন জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, শরণার্থীর প্রবাহ, বাজার অস্থিরতা—প্রায়ই ইউরোপকেই সামলাতে হয়। ৩ মার্চ অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসে লর্ন কুকের প্রতিবেদন ‘ইউরোপ ডিফেন্ডস মিলিটারি বেজেস, স্ট্রাগলস টু ইভাকুয়েট সিটিজেনস অ্যাজ ইট ইজ ড্রন ইনটু দ্য ওয়ার অন ইরান’-এ দেখা যায়, হরমুজ প্রণালি ঘিরে উদ্বেগ, সামরিক ঘাঁটির সুরক্ষা এবং নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার চাপ ইউরোপের ওপরই বেশি পড়ছে। অর্থাৎ সংঘাতে সরাসরি জড়িত না হয়েও ইউরোপ সেটার প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন একজন ইরানি নারী
ছবি : রয়টার্স

ইরান: রাষ্ট্র-সভ্যতার মনস্তত্ত্ব

পশ্চিমা দ্বিধা বোঝার পাশাপাশি ইরানের রাষ্ট্র-মনস্তত্ত্ব বোঝাও জরুরি। তেহরান নিজেকে প্রায়ই একটি ‘রাষ্ট্র-সভ্যতা’, অর্থাৎ হাজার বছরের পারস্য ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে তুলে ধরে। এই বয়ান কেবল আবেগ নয়, রাজনৈতিক কৌশলও। সংকটের সময় বাইরের হুমকিকে সামনে এনে জাতীয় ঐক্যকে শক্ত করা—এটাই ‘প্রতিরক্ষামূলক জাতীয়তাবাদ’-এর মূল চালিকা শক্তি।

জাতীয়তাবাদ নিয়ে আর্নেস্ট গেলনার তাঁর বই নেশনস অ্যান্ড ন্যাশনালিজম-এ বলেন, আধুনিক রাষ্ট্র নিজস্ব রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামো মিলিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ ‘জাতি’ নির্মাণ করে। অন্যদিকে বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ইমাজিনড কমিউনিটিজ-এ দেখান, ‘জাতি’ আসলে একটি কল্পিত রাজনৈতিক সম্প্রদায়, যেখানে মানুষ একে অপরকে না চিনলেও নিজেদের একই ঐতিহ্যের অংশ মনে করে। ইরানের ক্ষেত্রে এই তত্ত্বগুলো বাস্তব অর্থ পায়: বাইরের চাপ বাড়লে ‘আমরা এক’—এ বোধকে রাষ্ট্র আরও জোরালো করে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় দীর্ঘ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধ ইরানের নিরাপত্তা মানসিকতা বদলে দেয়। আট বছরের সেই রক্তক্ষয়ী সংঘাত তাদের সামরিক সংগঠন, বিপ্লবী গার্ডের ভূমিকা এবং ‘অবরুদ্ধ রাষ্ট্র’ ধারণাকে শক্তিশালী করেছে। যুদ্ধের পর ইরান সরাসরি বড় আকারের সংঘাতের বদলে আঞ্চলিক প্রভাব-কৌশল গড়ে তোলে—ইরাক, সিরিয়া, লেবানন ও ইয়েমেনে নেটওয়ার্ক তৈরি তারই অংশ।

বিশ্লেষকেরা এ রকম কৌশলকে কখনো কখনো ‘অ্যান্টিসিপেটরি সিকিউরিটি ডকট্রিন’, অর্থাৎ ‘সম্ভাব্য সংঘাত ধরে নিয়ে আগাম প্রস্তুতি’ হিসেবে দেখেন। ৩ অক্টোবর ২০২৫-এ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইনস্টিটিউট ফর সিকিউরিটি স্টাডিজের ব্রিফ ‘ইসরায়েল অ্যান্ড ইরান অন দ্য ব্রিংক: প্রিভেন্টিং দ্য নেক্সট ওয়ার’-এ সতর্ক করা হয়েছে যে ইসরায়েল-ইরান সম্পর্কের পুরোনো ট্যাবু ভেঙে গেছে এবং ভবিষ্যৎ সংঘাতের ঝুঁকি বাস্তব।

আরও পেছনে গেলে, পারস্য অঞ্চল বহু শতাব্দী ধরে শক্তির সংঘর্ষক্ষেত্র। অটোমান-সাফাভি প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রে ছিল আনাতোলিয়া-ইরাক-পারস্য করিডর; ১৫১৪ সালের চালদিরান যুদ্ধ—অটোমান সুলতান সেলিম প্রথম বনাম সাফাভি ইরান-মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেয়। তারও আগে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট পারস্য সাম্রাজ্য দখল করেছিলেন। এই স্মৃতিগুলো আজও রাষ্ট্রীয় বয়ানে জায়গা পায়—‘আমরা বারবার ঘেরাও হয়েছি’, এমন ধারণা জাতীয় নিরাপত্তার চিন্তাকে প্রভাবিত করে।

ধর্মীয় স্মৃতিও এখানে ভূমিকা রাখে। ইসলামের প্রাথমিক রাজনৈতিক বিভাজন থেকে যে শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বের সূত্রপাত, তা বহু শতাব্দী ধরে আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রতিফলিত হয়েছে। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, অভ্যন্তরীণ মতভেদ থাকলেও বাইরের চাপ দেখা দিলে ইরানে প্রায়ই জাতীয় ঐক্য জোরদার হয়। ইতিহাস, ধর্ম ও রাষ্ট্রীয় পরিচয় তখন একত্রে কাজ করে—এটিই ‘কল্পিত সম্প্রদায়’ তত্ত্বের বাস্তব প্রয়োগ।

বাংলাদেশ: ‘করিডর-সংলগ্ন’ বাস্তবতা

ইরান যুদ্ধের প্রশ্নটি যদি আমরা কেবল মধ্যপ্রাচ্যের একটি সংঘাত হিসেবে দেখি, তাহলে বাংলাদেশের প্রসঙ্গ আলাদা ও দূরের মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এটি বৃহত্তর শক্তির পুনর্বিন্যাসের অংশ। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা, ইউরোপের দ্বিধা এবং চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে একটি নতুন বৈশ্বিক শক্তির মানচিত্র তৈরি হচ্ছে, যেখানে দক্ষিণ এশিয়াও ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই বাংলাদেশকে বুঝতে হলে ‘অর্থনৈতিক নিরাপত্তা’ ও ‘সীমান্ত ভূরাজনীতি’কে একই ফ্রেমে দেখতে হবে।

ইরান যুদ্ধ যদি মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য বদলে দেয়, তার প্রভাব শুধু সামরিক থাকবে না; জ্বালানিবাজার, সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ এবং বৃহৎ শক্তির কৌশলগত পুনর্বিন্যাসে তা প্রতিফলিত হবে। ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর বৃহত্তর প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশ এমন এক ভৌগোলিক অবস্থানে আছে, যেখানে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতা ও মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতা একসঙ্গে প্রভাব ফেলছে। ফলে আমাদের নিরাপত্তা এখন বন্দর ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি সরবরাহ, ট্রেড রুট, সীমান্ত স্থিতিশীলতা এবং রোহিঙ্গা সংকট—সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রশ্ন।

এ প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২২ সালের ‘বার্মা অ্যাক্ট’-এ বাংলাদেশকে সরাসরি আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রেক্ষাপটে উল্লেখ করা হয়েছে, যা দেখায়, বিষয়টি শুধু মিয়ানমারকেন্দ্রিক নয়; বরং বৃহত্তর ‘রিজিওনাল সিকিউরিটি আর্কিটেকচার’-এর অংশ। যদি ইরান যুদ্ধ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত উপস্থিতি জোরদার করে, তাহলে এ ধরনের কাঠামো আরও সক্রিয় হতে পারে। এতে সীমান্তবর্তী দেশগুলোর ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়বে এবং রোহিঙ্গা সংকটে ইতিমধ্যেই চাপে থাকা বাংলাদেশ তার বাইরে থাকবে না।

বাংলাদেশ হয়তো ‘ক্রিটিক্যাল বটলফিল্ড’ নয়, কিন্তু ‘করিডর-আদ্যাসেন্ট’ (করিডর–সংলগ্ন) বাস্তবতায় আছে। বঙ্গোপসাগর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের অংশ; ভারতের উত্তর-পূর্বের সঙ্গে সংযোগ এবং মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতা আমাদের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা নির্ধারণ করে। ফলে বড় শক্তির সংঘাত যদি এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে, সমুদ্রপথ, জ্বালানি রুট ও অবকাঠামো বিনিয়োগ—এগুলো নতুন কৌশলগত ভারসাম্যের অংশ হয়ে উঠবে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তত্ত্ব এখানে তাৎপর্যপূর্ণ। কেনেথ ওয়াল্টজ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে ‘অরাজক’ বলে ব্যাখ্যা করেছেন, যেখানে ছোট রাষ্ট্রগুলো বড় শক্তির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে টিকে থাকে। ব্যারি বুজানের ‘সিকিউরিটি কমপ্লেক্স’ ধারণা দেখায়, একটি অঞ্চলের নিরাপত্তা–সংকট পারস্পরিকভাবে জড়িত। দক্ষিণ এশিয়া ও বঙ্গোপসাগর অঞ্চলকে এককভাবে দেখলে বোঝা যায়, বাংলাদেশ একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা জটিলতার অংশ। তাই আমাদের কৌশল হতে পারে—কোনো এক শক্তির সঙ্গে প্রকাশ্য বৈরিতা না বাড়িয়ে বহুপক্ষীয় সম্পর্ক বজায় রাখা।

অভ্যন্তরীণ সংহতি ও অর্থনৈতিক প্রস্তুতি

বর্তমান পরিস্থিতিতে কেবল বাহ্যিক ভারসাম্য নীতি যথেষ্ট নয়, অভ্যন্তরীণ সংহতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রীয়-সামাজিক সংহতি যত শক্তিশালী থাকে, বহিরাগত প্রভাব তত কম কার্যকর হয়। শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন এবং কার্যকর প্রশাসন রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করে। বিপরীতে দুর্বল প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক বিভাজন এবং সামাজিক অস্থিরতা বিদেশি প্রভাবকে সহজ করে তোলে। তাই জাতীয় ঐক্য ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় নয়; এটি কৌশলগত নিরাপত্তার প্রশ্ন।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের শ্রমবাজারের প্রশ্নও একই নিরাপত্তাকাঠামোর অংশ। আধুনিক বিশ্বে নিরাপত্তা শুধু সামরিক শক্তির প্রশ্ন নয়; এটি সরবরাহশৃঙ্খল, খাদ্য, জ্বালানি ও শ্রমের প্রশ্ন। একে বলা যেতে পারে ‘স্কিল-সিকিউরিটি’, অর্থাৎ দক্ষতা নিজেই একটি নিরাপত্তাসম্পদ। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বাড়লে নির্মাণ খাতে শ্রমের চাহিদা কমতে পারে; আবার খাদ্যনিরাপত্তার চাপে কৃষি খাতে চাহিদা বাড়তে পারে। দক্ষতার ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য না থাকলে, এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে বাংলাদেশের রেমিট্যান্সনির্ভর অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়বে।

কোনো সংঘাত দূরবর্তী স্থানে শুরু হলেও তা শেষ হতে পারে নিকটবর্তী বাস্তবতায়। ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা দেখাচ্ছে—বিশ্বরাজনীতিতে আবারও নতুন হিসাব-নিকাশ তৈরি হয়েছে। পশ্চিমা ঐক্যের ভেতরের টানাপোড়েন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে জটিলতা প্রমাণ করছে, ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য নিরপেক্ষ থাকাই যথেষ্ট নয়; একই সঙ্গে প্রস্তুত থাকাও জরুরি। বাংলাদেশ যুদ্ধের কেন্দ্র নয়, কিন্তু ঝুঁকির প্রান্তে আছে। তাই কৌশলগত সতর্কতা, নীতিগত স্পষ্টতা এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাই হতে পারে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষাব্যবস্থা।

  • মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার শিক্ষক ও গবেষক, রাষ্ট্র ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

  • মতামত লেখকের নিজস্ব