কিশোরীদের স্বপ্ন কেড়ে নিচ্ছে বাল্যবিবাহ

গাইবান্ধা শহর থেকে প্রায় এক ঘণ্টা গাড়িতে গিয়ে ব্রহ্মপুত্রের ঘাট। সেখান থেকে আরও ৪০-৪৫ মিনিট নৌকায় গেলে কুন্দেরপাড়া গণ–উন্নয়ন একাডেমি। নদীভাঙন, পারিবারিক দারিদ্র্য, বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রমের ঝুঁকির মধ্যে বেড়ে উঠছে চরের এই মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

সেখানে বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। একজন জানালেন, নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় পরিবার তাঁকে বিয়ে দিতে চেয়েছিল। তিনি নিজেই সেই বিয়ে ঠেকিয়েছিলেন। মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালো ফল করে বৃত্তি নিয়ে গাইবান্ধা কলেজে পড়েছেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় টিউশনি করে নিজের খরচ চালিয়েছেন। এখন তিনি এই চরেরই একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা।

প্রাক্তন শিক্ষার্থীর গল্প অনুপ্রেরণার। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের অসংখ্য মেয়ের জীবন তাঁর মতো নয়। যেমন গত দুই বছরের মধ্যে সাতক্ষীরার তালা উপজেলার ইসলামকাটি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ৯ম ও ১০ম শ্রেণির ১৩ ছাত্রীর বাল্যবিবাহ হয়েছে (প্রথম আলো, ১০ সেপ্টেম্বর)।

পরিস্থিতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়

ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর যৌথভাবে প্রকাশিত ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫’-এর প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ৪৭ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই; ১৩ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছরের আগে। ২০১৯ সালের তুলনায় এই হার কিছুটা কমেছে। কিন্তু প্রায় প্রতি দুই নারীর একজনের ১৮ বছর হওয়ার আগেই বিয়ে হয়েছে, এই বাস্তবতায় সামান্য অগ্রগতি নিয়ে আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই; বরং এই পরিসংখ্যান আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতা তুলে ধরে।

বাল্যবিবাহের সঙ্গে দারিদ্র্য ও শিক্ষার সম্পর্ক অত্যন্ত স্পষ্ট। যেসব নারী কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পাননি, তাঁদের মধ্যে বাল্যবিবাহের হার ৬৯ শতাংশ। সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের নারীদের মধ্যে এই হার ৬৫ শতাংশ। বিপরীতে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাসম্পন্ন নারীদের মধ্যে বাল্যবিবাহের হার ২৮ এবং সবচেয়ে ধনী পরিবারের নারীদের মধ্যে ৪১ শতাংশ।

বাংলাদেশের নানা প্রান্তে কিশোরীদের সঙ্গে কথা বলেছি। কেউ উদ্যোক্তা হতে চায়, কেউ ফ্রিল্যান্সার। কেউ পুলিশ বা সেনা কর্মকর্তা হতে চায়, কেউ আইনজীবী, ব্যবসায়ী, চিকিৎসক কিংবা প্রকৌশলী। তাদের স্বপ্নগুলো বাল্যবিবাহের কারণে মাঝপথে থেমে যাচ্ছে। আমরা কি তাদের যন্ত্রণা অনুভব করতে পারি?

বাল্যবিবাহ মানে একটি মেয়ের জীবন থামিয়ে দেওয়া

বাল্যবিবাহ শুধু একটি ক্ষতিকর সামাজিক প্রথা নয়। এটি শিশু অধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন এবং একধরনের যৌন নির্যাতন। একটি শিশুকে বিয়ের নামে এমন একটি সম্পর্কে ঠেলে দেওয়া হয়, যার জন্য সে শারীরিক বা মানসিকভাবে প্রস্তুত নয় এবং যেখানে নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তার থাকে না।

বিয়ের পর অধিকাংশ মেয়ের পক্ষে বিদ্যালয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে তাদের সম্ভাবনা বিকাশের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। বাল্যবিবাহের শিকার কিশোরীদের গার্হস্থ্য সহিংসতার শিকার হওয়ার ঝুঁকিও বেশি।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোরীদের মধ্যে সন্তান জন্মদানের হার বাড়ছে। ২০২৪-এ প্রকাশিত বাংলাদেশ জনমিতি এবং স্বাস্থ্য জরিপ অনুযায়ী, এই বয়সী ২৩ দশমিক ২ শতাংশ কিশোরী ইতিমধ্যে সন্তান ধারণ শুরু করেছে; ১ দশমিক ২ শতাংশ ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই মা হয়েছে। অল্প বয়সে গর্ভধারণের পরিণতি গুরুতর। এতে মৃত সন্তান প্রসব, অপরিণত শিশুর জন্ম এবং মা ও নবজাতকের মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়।

কেন এখনো মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হচ্ছে?

আইনের দুর্বল প্রয়োগ বাল্যবিবাহকে টিকিয়ে রেখেছে। মেয়েরা যৌন নিপীড়নের শিকার হতে পারেন কিংবা কোনো সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লে পরিবারের ‘সম্মান’ ক্ষুণ্ন হবে, এমন আশঙ্কা থেকেও অনেক মা-বাবা মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেন।

পরিবার ও সমাজের একটি বড় অংশ এখনো মনে করে, বিয়ে, সন্তানধারণ ও তাদের বড় করাই মেয়েদের জীবনের প্রধান লক্ষ্য। মেয়েদের পড়াশোনা, নিজের পায়ে দাঁড়ানো কিংবা পেশাগত সাফল্যকে মূল্য দেওয়া হয় না।

সম্প্রতি গাইবান্ধা ও সিরাজগঞ্জের কয়েকজন কিশোরীর সঙ্গে কথা বলার সময় তারা এই বৈষম্যের কথা খুব স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। একজন বলেছিল, ‘ছেলেরা পরীক্ষায় খারাপ করলে মা-বাবা তাদের আবার সুযোগ দেন। কিন্তু মেয়েদের পরীক্ষার আগেই ভয় দেখানো হয়, পাস করতে না পারলে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হবে।’

আরেকজন বলেছিল, ‘মাধ্যমিক পাস করলে মেয়েরা অনেক কিছু বুঝতে শিখবে, তখন তাদের বিয়ে দেওয়া কঠিন হবে, এই কথা ভেবে অনেক পরিবার স্কুলে পড়ার সময়ই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেয়।’

আরেক কিশোরীর কথা, ‘আমি হয়তো মা-বাবাকে বুঝিয়ে আমার বিয়ে বন্ধ করতে পারব। কিন্তু সমাজের মানুষ এসে বলবে, এত ভালো পাত্র পাওয়া গেছে, এখনই মেয়ের বিয়ে দাও। তখন মা-বাবার পক্ষে না বলা কঠিন হয়ে যাবে।’ অল্প বয়সে বিয়ে দিলে যৌতুক কম লাগে, এ কথাও কিশোরীরা বলেছে।

এসব মন্তব্য মেয়ে এবং নারীদের বিষয়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। কোভিড-১৯ মহামারির কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। আয় ও জীবিকার অনিশ্চয়তায় পড়া অনেক পরিবার কিশোরী মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দিয়েছে।

আইনত নিষিদ্ধ হওয়ার পরও সম্প্রতি বাল্যবিবাহের পক্ষে প্রকাশ্যে কথা বলা ও প্রচার চালানোর ঘটনা দেখা যাচ্ছে। মাঠপর্যায়ে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং মেয়েদের শিক্ষা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থাও বাধার মুখে পড়ছে বলে খবর এসেছে। বাল্যবিবাহ কোনো ‘মূল্যবোধ’ বা ‘পারিবারিক পছন্দের’ বিষয় নয়। একটি শিশুর অধিকার লঙ্ঘনের পক্ষে কোনো সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় ব্যাখ্যাকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করানো গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

আইনের প্রয়োগ ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন

সরকারের প্রথম দায়িত্ব বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭-এর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা। জন্ম ও বিয়ে নিবন্ধনব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। শিশু আইন, ২০১৩-এর আলোকে সমাজভিত্তিক শিশু সুরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন, যাতে মেয়েদের নিরাপত্তাহীনতার কারণে পরিবার বিয়েকে ‘সমাধান’ হিসেবে না দেখে। স্থানীয় প্রশাসন ও ইউনিয়নভিত্তিক বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটিগুলোকে কার্যকরভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে।

একই সঙ্গে মেয়েদের শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে দরিদ্র, চর, উপকূলীয় ও অন্যান্য পিছিয়ে থাকা এলাকার মেয়েরা যেন মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করতে পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা দরকার।

মা-বাবাকে বুঝতে হবে, তাঁদের মেয়ে কোনো ‘দায়’ নয়। তারও স্বপ্ন আছে, সক্ষমতা আছে, নিজের ভবিষ্যৎ বেছে নেওয়ার অধিকার আছে। একটি মেয়ের ‘সাফল্য’ শুধু ভালো পাত্রের সঙ্গে তার বিয়ে হওয়া নয়; তার শিক্ষা, কর্মজীবন, নেতৃত্ব, স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সমাজে অবদান রাখা গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যম, শিক্ষক, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতা, লেখক, শিল্পীসহ সবাই বাল্যবিয়ে নিয়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে হবে।

বাংলাদেশের নানা প্রান্তে কিশোরীদের সঙ্গে কথা বলেছি। কেউ উদ্যোক্তা হতে চায়, কেউ ফ্রিল্যান্সার। কেউ পুলিশ বা সেনা কর্মকর্তা হতে চায়, কেউ আইনজীবী, ব্যবসায়ী, চিকিৎসক কিংবা প্রকৌশলী। তাদের স্বপ্নগুলো বাল্যবিবাহের কারণে মাঝপথে থেমে যাচ্ছে। আমরা কি তাদের যন্ত্রণা অনুভব করতে পারি?

প্রত্যেক মেয়ের শিক্ষা, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও নিজের ভবিষ্যৎ বেছে নেওয়ার অধিকার আছে। তাই বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে আরও দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানো উচিত। সরকার, রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্ব, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—সবাইকে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে হবে: শিশুর বিয়ে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে উদ্যোগ নেওয়া আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব। আমরা সেই দায়িত্ব পালন করছি কি?

  • লায়লা খন্দকার উন্নয়নকর্মী

    মতামত লেখকের নিজস্ব