ধর্মনিরপেক্ষতা আর সাম্প্রদায়িকতার দ্বন্দ্বে বাঙালি ভোটার

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাংলা সংস্কৃতি ও রাজনীতি নানা ধরনের দ্বন্দ্বে বা বাইনারিতে আবদ্ধ। এখানে ‘হয় তুমি এই পক্ষের, নয় তুমি ওই পক্ষের’। বাঙালির নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে গর্ব থাকলেও ‘মধ্যবর্তী’ বা বিকল্প অবস্থানের জায়গা তাদের কাছে বরাবরই সীমিত।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ফুটবলের কথাই ধরুন। এখানে হয় ইস্টবেঙ্গল, না হয় মোহনবাগান। এই দুইয়ের বাইরে অন্য ক্লাব সাধারণ আলোচনায় খুব কমই আসে। মাছ নিয়ে বিতর্ক উঠলে এক পক্ষ থাকে ইলিশে, আরেক পক্ষ থেকে চিংড়িতে। পরিচয়ের প্রশ্নেও তারা দুই ভাগে বিভক্ত। এক ভাগে ‘বাঙাল’, আরেক ভাগে ‘ঘটি’। এই বাইনারি দ্বন্দ্বের তালিকা দীর্ঘ।

তবে এর মানে এই নয় যে এখানে একেবারেই কোনো মধ্যবর্তী জায়গা নেই। কিন্তু সেই জায়গার পরিসর খুবই সংকুচিত। পশ্চিম বাংলার রাজনীতিও এই প্রবণতার প্রতিফলন। বিকল্প রাজনীতির জন্য সেখানে প্রায় কোনো জায়গাই রাখা হয় না।

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক পরামর্শদাতা সংস্থা আই-প্যাক-এ এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের অভিযান চলার সময় তাঁর হস্তক্ষেপে একটি বিতর্ক শুরু হয়েছে। এক পক্ষ বলছেন, এটি কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে ন্যায্য প্রতিরোধ। আরেক পক্ষ বলছে, এটি দুর্নীতিগ্রস্তদের রক্ষা করার প্রশাসনিক চেষ্টা। এই বিভ্রান্তি আসলে বাংলার রাজনীতির গভীরতর একটি দ্বন্দ্বকে প্রকাশ করে। এই দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে সেই রাজনৈতিক বাইনারিগুলোর মধ্য থেকে, যা দীর্ঘদিন ধরে বাংলার রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় এসে বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটানোর পর থেকেই দলটি একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগে জড়িয়েছে। সারদা, নারদা থেকে শুরু করে শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারি—তৃণমূলের শাসনকালকে কলঙ্কিত করেছে।

তবু ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে আবার তৃণমূলের ক্ষমতায় ফেরা এবং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তাদের আসনসংখ্যা বাড়ানোর ক্ষেত্রে যে একমাত্র শক্তিশালী রাজনৈতিক কৌশলটি কাজ করেছে, সেটি হলো ‘বাঙালি পরিচয়’-এর প্রশ্ন।

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর তৃণমূলের রাজনৈতিক প্রচারে ‘ভেতরের লোক বনাম বাইরের লোক’, ‘বাঙালি বনাম অবাঙালি’—এই দ্বন্দ্বকে সচেতনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে একটি সমজাতীয় বাঙালি সমাজের কল্পনা তৈরি করা হয়েছে, যাকে উত্তর ভারতের দলগুলোর সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিপরীতে দাঁড় করানো হয়েছে।

এই রাজনৈতিক বয়ানগুলো মূলত তিনটি ঐতিহাসিক উদ্বেগ বা আশঙ্কার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

প্রথমত, পশ্চিম বাংলার স্কুলশিক্ষায় ইতিহাসের একটি খুব সরল ও একমাত্রিক পাঠ দেওয়া হয়। সেখানে শেখানো হয়—মুর্শিদাবাদের নবাব সিরাজউদ্দৌলা পলাশীর যুদ্ধে মিরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে পরাজিত হন, আর এর মধ্য দিয়েই বাংলা স্বাধীনতা হারিয়ে ব্রিটিশ শাসনের পথে ঢুকে পড়ে। এই সরল ব্যাখ্যায় বাদ পড়ে যায় সিরাজের শাসনামলের অনিশ্চয়তা, স্বজনপোষণ ও অহংকার, যা অবিভক্ত বাংলার মানুষের ওপর প্রভাব ফেলেছিল। উপনিবেশবিরোধী ইতিহাসবিদদের চোখে তিনি যেমন বীর, আবার ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের লেখায় তিনি একনায়ক ও স্বৈরাচার—এই দুই চরমের বাইরে বাস্তব রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মিরজাফর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে ব্যবহার করে ক্ষমতায় আসার পথ বেছে নিয়েছিলেন।

এই ‘বিশ্বাসঘাতকের কারণে বাইরের শক্তির আগ্রাসন’—ধারণাটি আজও বাঙালি মানসে গভীরভাবে কাজ করে। বিজেপি নেতাদের ‘বাইরের লোক’ বলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বারবার উল্লেখ করা এই ঐতিহাসিক বাইনারিকেই নতুনভাবে রাজনৈতিক অস্ত্র বানায়।

বাংলার রাজনীতি একধরনের বিভ্রান্তিতে আটকে আছে। যদি বাঙালি ভোটার এই পুরোনো দ্বন্দ্বের বাইরে ভাবতে না শেখে, তাহলে রাজ্যের রাজনৈতিক চক্র চলতেই থাকবে—একই পুরোনো রীতিতে, কিন্তু নতুন দিশা বা উন্নতির কোনো পথ দেখা যাবে না।

দ্বিতীয়ত, ‘বাঙালি বনাম অবাঙালি’ দ্বন্দ্বের পেছনে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক একটি ইতিহাস আছে, যা প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়। ব্রিটিশ আমলের শুরুতে কলকাতা রাজধানী হওয়ার ফলে সেখানে ইংরেজি শিক্ষার বিস্তার ঘটে।

ইউরোপীয় যুক্তিবাদ ও তথাকথিত আধুনিক শিক্ষা থেকে জন্ম নেয় ‘বঙ্গীয় নবজাগরণ’। এতে একদিকে তৈরি হয় উচ্চবর্ণের ইংরেজিশিক্ষিত ভদ্রলোক শ্রেণি, অন্যদিকে গড়ে ওঠে একধরনের ‘কেরানি শ্রেণি’; বা আরও নির্দিষ্ট করে বললে, ‘কেরানি মানসিকতা’। এই শ্রেণি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সকাল-সন্ধ্যা চাকরিতেই স্বস্তি খুঁজে পায়।

বিজ্ঞানী প্রফুল্লচন্দ্র রায় এই মানসিকতার কড়া সমালোচনা করেছিলেন এবং বাঙালিদের ব্যবসায় নামার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এটি ছিল উদ্যোক্তা হওয়ার একেবারে প্রাথমিক ডাক। তিনিই বেঙ্গল কেমিক্যালস অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যালস প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু সাংস্কৃতিক গৌরবে মগ্ন বাঙালি ভদ্রলোকেরা এই আহ্বানে তেমন সাড়া দেননি। স্বাধীনতার পরও তাঁরা মূলত ‘অবাঙালি’ (বিশেষ করে মাড়োয়ারি) মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেই সন্তুষ্ট থেকেছেন।

একদিকে শিল্পায়ন কার্যত পাটকল-যুগের পর থমকে গেছে। অন্যদিকে উত্তর প্রদেশ ও বিহার থেকে শ্রমিকদের আগমন সীমিত সম্পদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।

বিজেপি যেখানে এই দ্বন্দ্বকে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে স্থাপন করে, তৃণমূল সেখানে বাঙালি ও অবাঙালি অভিবাসীদের মধ্যকার শ্রেণিগত উদ্বেগকে সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব হিসেবে তুলে ধরে।

তৃতীয়ত, দেশভাগ ও বাংলাদেশ যুদ্ধের স্মৃতি। বিজেপি এই স্মৃতিকে কাজে লাগিয়ে ‘বাঙালি মুসলমান মানেই বাংলাদেশি’—এই বয়ানকে জাতীয় রাজনীতিতে ব্যবহার করছে। এটি বাংলার হিন্দুদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক অনুভূতি উসকে দেয়। অথচ বাস্তবে, যশোর রোডের শরণার্থীশিবিরগুলোতে যেমন ভিটেমাটি হারানোর যন্ত্রণা বাঙালি হিন্দুদের একত্র করেছিল, তেমনি অসংখ্য উদাহরণ আছে যেখানে মুসলমান প্রতিবেশীরা হিন্দু পরিবারকে দাঙ্গার হাত থেকে বাঁচাতে সাহায্য করেছিলেন।

এর পাশাপাশি কমিউনিস্ট রাজনীতি ও তার মাধ্যমে গড়ে ওঠা ‘রাজনৈতিক সমাজ’ (যেমনটি রাজনৈতিক তাত্ত্বিক পার্থ চট্টোপাধ্যায় ব্যাখ্যা করেছেন) নগর এলাকায় ধর্মনিরপেক্ষ সহাবস্থানের ভিত্তি তৈরি করেছিল। এই ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির উত্তরাধিকারই বিজেপির স্মৃতি ও দেশভাগভিত্তিক রাজনীতির তুলনায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাড়তি সুবিধা দেয়।

বাংলার ভোটার এখন একটা পুরোনো ধাঁচের দ্বন্দ্বের মধ্যে আটকে আছে: একদিকে ধর্মনিরপেক্ষ তৃণমূল, অন্যদিকে ধর্মীয় রাজনীতিতে বিশ্বাসী বিজেপি। আঞ্চলিক স্বার্থ বনাম ধর্মীয় রাজনৈতিক প্রভাব—এই দুইয়ের মধ্যে ফাঁদ। বামপন্থী দল আর কংগ্রেস এই বাইনারির বাইরে কোনো বিকল্প দিতে পারছে না।

ফলাফল? বাংলার রাজনীতি একধরনের বিভ্রান্তিতে আটকে আছে। যদি বাঙালি ভোটার এই পুরোনো দ্বন্দ্বের বাইরে ভাবতে না শেখে, তাহলে রাজ্যের রাজনৈতিক চক্র চলতেই থাকবে—একই পুরোনো রীতিতে, কিন্তু নতুন দিশা বা উন্নতির কোনো পথ দেখা যাবে না।

  • অভিক ভট্টাচার্য দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর জ্যেষ্ঠ সহকারী সম্পাদক

  • দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত