শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনামলে যেসব গুম, খুন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর একটা বড় অংশের সঙ্গে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় এই ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগও করেছেন। এরই মধ্যে র্যাবের নাম ও পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
র্যাবের নতুন নাম হচ্ছে স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স (এসআইএফ)। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইনশৃঙ্খলা–সংক্রান্ত কোর কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। নাম পরিবর্তনের বিষয়টি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টাও অনুমোদন করেছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, বহুল আলোচিত-সমালোচিত একটি বাহিনীকে বিলুপ্ত না করে এই নাম পরিবর্তন আসলে কী ইঙ্গিত দেয়?
২.
২০০৪ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ‘এলিট ফোর্স’ র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) গঠন করা হয়েছিল। সেই আমলে তৎকালীন সরকারের নীতিনির্ধারকেরা এ বাহিনী গঠনকে তাঁদের একটি ‘সাফল্য’ হিসেবে অভিহিত করতেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও সন্ত্রাস দমনে র্যাবের ভূমিকা নিয়ে তাঁরা ছিলেন প্রশংসামুখর।
২০০৬ সালে চারদলীয় জোট সরকার তার মেয়াদ পূর্ণ করে এবং ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয়। এ সরকারের আমলেও র্যাবের তৎপরতা ছিল প্রায় একই রকম। এরপর ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ; র্যাবের ভূমিকা হতে থাকে আরও বেপরোয়া ও আক্রমণাত্মক; ‘ক্রসফায়ারের’ পাশাপাশি শুরু হয় গুম।
২০২১ সাল পর্যন্ত র্যাবের এসব কর্মকাণ্ড ‘বেপরোয়াভাবেই’ চলেছে। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগে র্যাব এবং এর কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ। এরপর লক্ষণীয়ভাবে র্যাবের ‘ক্রসফায়ার’ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু এরই মধ্যে এ বাহিনীর হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হন প্রায় তিন হাজার মানুষ। (র্যাব প্রতিষ্ঠার ২০ বছর: অন্তত ২,৯৫৪ বিচারবহির্ভূত হত্যা, ডয়চে ভেলে বাংলা, ৪ নভেম্বর ২০২৪)
শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনামলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে বারবার এমন অভিযোগ উঠেছে, র্যাব একটি ‘খুনে বাহিনী’ বা ‘দানবে’ পরিণত হয়েছে; একই সঙ্গে এ বাহিনী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। পরিহাসের বিষয় হলো, ১৮ বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির নেতা-কর্মীরা ছিলেন এর অন্যতম ভুক্তভোগী।
দুই দশক পরে এসে তাই বিএনপির ‘ভিন্ন’ উপলব্ধি হয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ তুলে পুলিশ সংস্কার কমিশনের কাছে নিজেদের গড়া র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করার সুপারিশ করেছিল বিএনপি। (‘নিজেদের গড়া র্যাবের বিলুপ্তি চায় বিএনপি’, দেশ রূপান্তর, ১১ ডিসেম্বর ২০২৪)
৩.
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনের পতনের কয়েক মাস পর গুমবিষয়ক তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছিল। গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন তাদের প্রতিবেদনে র্যাবকে বিলুপ্তির সুপারিশ করেছে। গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, গুমের ঘটনায় সংস্থা হিসেবে সবচেয়ে বেশি (প্রায় ২৫ শতাংশ) জড়িত ছিল র্যাব।
এ ছাড়া গুম হওয়া ব্যক্তিদের আটক বা নির্যাতনের জন্য ব্যবহৃত ‘ডিটেনশন’ সেন্টার তৈরিতেও এগিয়ে ছিল র্যাব। আওয়ামী লীগ শাসনামলে ৪০টির মতো ডিটেনশন সেন্টার তৈরি করা হয়েছিল বলে উল্লেখ করেছে গুম কমিশন। ওই ৪০টি ডিটেনশন সেন্টারের মধ্যে ২২-২৩টিই ছিল র্যাবের। (‘ডিটেনশন সেন্টারগুলোর অর্ধেকই র্যাবের—গুম কমিশন’, বণিক বার্তা অনলাইন, ৬ জানুয়ারি ২০২৬)
নাম পরিবর্তন করে কোনো বাহিনীর বৈশিষ্ট্য বা কর্মকাণ্ডে যে পরিবর্তন আনা যায় না, সেটা খুবই সহজবোধ্য বিষয়; সরকারের নীতিনির্ধারকদেরও এটা না বোঝার কোনো কারণ নেই। র্যাবের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তকে তাই অন্তর্বর্তী সরকারের একধরনের ‘চালাকি’ বা ‘তামাশা’ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
গত ২৮ জানুয়ারি ‘আফটার দ্য মুনসুন রেভোল্যুশন: আ রোডম্যাপ টু লাস্টিং সিকিউরিটি সেক্টর রিফর্ম ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, র্যাবপ্রধান এ কে এম শহীদুর রহমান ইউনিটের গোপন আটক কেন্দ্রের কথা স্বীকার করেন এবং বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার ইউনিটটি বিলুপ্তি করে দিতে চাইলে র্যাব তা মেনে নেবে। (‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদন: র্যাবের বিলুপ্তি ও গণতন্ত্র ফেরাতে সংস্কারের তাগিদ’, প্রথম আলো অনলাইন, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬)
লক্ষণীয় বিষয় হলো, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের জ্যেষ্ঠ গবেষক জুলিয়া ব্লেকনারের কাছে র্যাবের কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়ে জানতে চেয়েছিলেন সাংবাদিকেরা। কিন্তু তাঁর মতে, যে দলই ক্ষমতায় এসেছে, র্যাবকে নির্যাতনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। র্যাবকে সংস্কার করা সম্ভব নয়।
৪.
র্যাবকে সংস্কার করা সম্ভব নয় বলেই বিভিন্ন সময়ে ভুক্তভোগী ব্যক্তি বা পরিবার, রাজনৈতিক দল, গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে র্যাব বিলুপ্তির দাবি উঠেছে; অন্তর্বর্তী সরকার এমনটা চাইলে, র্যাবপ্রধান তা মেনে নেওয়ার কথাও বলেছেন; এরপরও র্যাব বিলুপ্ত না করে এর নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
গণ–অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম ম্যান্ডেট ছিল রাষ্ট্রসংস্কার। কিন্তু গত দেড় বছরের শাসনামলে এ সরকার আমলাতন্ত্র, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা গোয়েন্দা সংস্থার সংস্কারের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি; বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারের কর্মকাণ্ডে মনে হয়েছে, তাঁরা সংস্কারের উল্টো দিকে যাত্রা করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের র্যাব বিলুপ্ত না করার সিদ্ধান্তটি সে রকম একটি উল্টো যাত্রার দৃষ্টান্ত হয়েই থাকবে।
নাম পরিবর্তন করে কোনো বাহিনীর বৈশিষ্ট্য বা কর্মকাণ্ডে যে পরিবর্তন আনা যায় না, সেটা খুবই সহজবোধ্য বিষয়; সরকারের নীতিনির্ধারকদেরও এটা না বোঝার কোনো কারণ নেই। র্যাবের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তকে তাই অন্তর্বর্তী সরকারের একধরনের ‘চালাকি’ বা ‘তামাশা’ হিসেবে দেখা যেতে পারে। নাম পরিবর্তন করে র্যাবকে কোনোভাবে ‘দায়মুক্তি’ দেওয়া হচ্ছে কি না, এমন প্রশ্ন ওঠাটাও এখন অমূলক নয়। র্যাব বিলুপ্ত না করে এর নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তটি যেমন হতাশাজনক, তেমনি তা ভবিষ্যতের জন্য আশঙ্কাজনকও বটে।
মনজুরুল ইসলাম প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক
* মতামত লেখকের নিজস্ব