‘এবার রাম, পরে বাম’: বাম ভোটাররা যেভাবে নীরবে বিজেপিকে জেতালেন

পশ্চিমবঙ্গজুড়ে এখনো বামপন্থীদের শক্ত রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক রয়েছে। যদিও ২০১১ থেকে তাদের ভোটসংখ্যা ক্রমশ কমেছে। ছবি: রয়টার্সছবি: রয়টার্স

‘আমাদের দল আগের মতো শক্তিশালী নেই। তাই আমাদের অনেক সমর্থক তৃণমূলকে হারাতে বিজেপিকে ভোট দিয়েছে’—পশ্চিমবঙ্গের নিউ ব্যারাকপুরের সিপিআই (এম) কর্মী সঞ্জিত রায়ের এই কথাতেই যেন ধরা পড়ে সাম্প্রতিক নির্বাচনের এক অদ্ভুত বাস্তবতা।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান মূলত তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষতির বিনিময়ে হলেও এই উত্থানের পেছনে নীরবে বড় ভূমিকা নিয়েছে বাম ভোটারদের একাংশ। শুনতে অস্বাভাবিক লাগলেও এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যে লুকিয়ে আছে ‘লালের’ ছাপ।

এই বিষয়টির ইঙ্গিত দেন পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজেই। ৪ মে ভবানীপুরে জয়ের পর ভাষণে তিনি বলেন, ‘ভবানীপুরে সিপিএমের প্রায় ১৩ হাজার ভোট ছিল, তার মধ্যে অন্তত ১০ হাজার ভোট আমার দিকে এসেছে। এ জন্য আমি সিপিএম ভোটারদের ধন্যবাদ জানাই।’

এই আসনে তিনি তৃণমূল নেত্রী ও সদ্য সাবেক হওয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করেন।

আরও পড়ুন

এই ভোট স্থানান্তরের ঘটনা শুধু ভবানীপুরেই সীমাবদ্ধ ছিল না। রাজ্যের একাধিক আসনে একই চিত্র দেখা গেছে। এর মধ্যে উত্তর দমদম এলাকাও রয়েছে। এই কেন্দ্রের অন্তর্গত নিউ ব্যারাকপুরে দীর্ঘদিন ধরে সিপিএমের ভালো ভোটব্যাংক ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সেখানে জয় পায় বিজেপি। অথচ বামপন্থীরা সেখানে প্রার্থী করেছিল নতুন প্রজন্মের নেতা দীপ্সিতা ধরকে। তিনি পুরোনো নেতৃত্বের জায়গা নিতে উঠে আসছিলেন।

ভোটারদের দলবদল নতুন কিছু নয়। কিন্তু বাম ভোটারদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা। কারণ, সিপিএমের মতো দলগুলো মূলত সংগঠনভিত্তিক, যেখানে কর্মীরা আদর্শে বিশ্বাসী এবং অনেকেই ছাত্রজীবন থেকেই বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। একসময় পশ্চিমবঙ্গে টানা ৩৪ বছর ক্ষমতায় থাকা এই দলগুলোর বিস্তৃত সংগঠনও ছিল।

তবু বিশেষজ্ঞ, ভোটার এবং বাম কর্মীদের মতে, বাম থেকে ডানপন্থায় ঝোঁকার এই প্রবণতা নতুন নয়। ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের পর তৃণমূলের হাতে বাম কর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। সেই সময় থেকেই অনেক বাম সমর্থক বিজেপির দিকে ঝুঁকতে শুরু করেন; কারণ তখন বিজেপি রাজ্যে শক্তি বাড়াচ্ছিল।

এর প্রভাব স্পষ্ট হয় ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে। এই সময় বিজেপি মাত্র দুটি আসন থেকে বেড়ে ১৮টি আসন জেতে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও বিজেপির আসনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭৭–এ।

এই পরিবর্তনের পেছনে বামদের একধরনের কৌশলও কাজ করেছে বলে অনেকে মনে করেন। কৌশলটা অনেকটা মার্শাল আর্টের লড়াইয়ের মতো, যেখানে লড়াই থেকে সাময়িক সরে গিয়ে পরে আবার শক্তি সঞ্চয় করে ফিরে আসা হয়। অর্থাৎ আপাতত পিছিয়ে গিয়ে ভবিষ্যতে আবার লড়াইয়ের প্রস্তুতি নেওয়া।

মাঠে-ঘাটে তার প্রভাবও দেখা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিওতে দেখা গেছে, তৃণমূলের দখলে থাকা বাম দলের পুরোনো পার্টি অফিসগুলো ধীরে ধীরে তারা ফেরত নিচ্ছে।

অনেকে মনে করেন, এই নির্বাচনে কেন্দ্রীয় বাহিনীর বড় উপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর উপস্থিতি ভোটারদের মধ্যে নিরাপত্তার অনুভূতি বাড়িয়েছে এবং তারা নির্ভয়ে ভোট দিতে পেরেছেন।

সঞ্জিত রায়ের কথায়, ‘প্রতিটি নির্বাচনে তৃণমূলের পক্ষ থেকে ভয় ও হিংসার পরিবেশ তৈরি হতো বলে বাম ভোটাররা হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু এবার সিআরপিএফ জওয়ানদের ব্যাপক উপস্থিতির কারণে অনেক বেশি মানুষ স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পেরেছেন।’

সব মিলিয়ে, পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচনে এক অদ্ভুত রাজনৈতিক সমীকরণ সামনে এসেছে, যেখানে আদর্শগতভাবে বিপরীত দুই শিবিরের মধ্যে নীরব সমঝোতা তৈরি হয়ে গেছে। আর সেই সমীকরণই রাজ্যের রাজনীতির চেহারা বদলে দিয়েছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শনিবার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে।
ছবি: ভিডিও থেকে থেকে সংগৃহীত

বাংলার বাম ভোটাররা কবে বিজেপির দিকে ঝুঁকেছিল?

দীর্ঘ ৩৩ বছর ১০ মাস ক্ষমতায় থাকার পর ২০১১ সালে সিপিআই (এম)-নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট ক্ষমতা হারায়। কিন্তু তাতেই বাম রাজনীতি বাংলার মাটি থেকে মুছে যায়নি। বরং বাম দলগুলো পরবর্তী সময়েও জোরালোভাবে নির্বাচনে লড়াই চালিয়ে গেছে। কলকাতার ময়দান ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে সিপিএমের বার্ষিক সমাবেশে এখনো লাখ লাখ কর্মী-সমর্থক জড়ো হন।

তবু বাস্তবতা বলছে, বামদের রাজনৈতিক শক্তি ক্রমে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। বিশেষ করে সিপিএমের ক্ষেত্রে এই পতন সবচেয়ে স্পষ্ট। ২০১১ সালে যেখানে তাদের ভোট শতাংশ ছিল ৪১ দশমিক ০৯, ২০২৬ সালে তা নেমে দাঁড়ায় মাত্র ৪ দশমিক ৪ শতাংশে। প্রথমে তাদের ভোটব্যাংকের বড় অংশ সরে যায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের দিকে, পরে সেই সমর্থনের একাংশ আবার ডানপন্থী বিজেপির দিকে ঝুঁকে পড়ে।

এই পরিবর্তনের সূচনা ঘটে মূলত ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের পর। সেই নির্বাচন ছিল বামদের কাছে এক বড় মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। রাজ্যজুড়ে হিংসা, ভয় দেখানো এবং বিরোধী প্রার্থীদের মনোনয়ন জমা দিতে না দেওয়ার অভিযোগে ঘেরা ছিল সেই ভোট। সেবার বহু বাম কর্মী আক্রান্ত হন, অনেকে প্রাণও হারান।

এই পরিস্থিতি বাম শিবিরের মধ্যে একটি ধারণা জোরদার করে। তা হলো—তৃণমূলই তাদের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। ক্রমাগত চাপ এবং রাজনৈতিক হিংসার মধ্যে বামদের সংগঠন দুর্বল হতে থাকে। ফলে তাদের ঐতিহ্যগত তৃণমূলবিরোধী ভোটব্যাংকের একটি অংশ বিজেপির দিকে সরে যায়। এর কারণ, অনেকেই মনে করতে শুরু করেন, তৃণমূলকে মোকাবিলা করার মতো শক্তি বিজেপির মধ্যেই রয়েছে।

এই প্রবণতাটা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায় ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে। সেই নির্বাচনে বাম দলগুলো একটি আসনও জিততে পারেনি। তাদের ভোটও অনেক কমে যায়—২০১৪ সালে যেখানে প্রায় ৩০ শতাংশ ছিল, তা নেমে ৮ শতাংশেরও নিচে চলে আসে।

কলকাতার লেখক স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য এ প্রসঙ্গে বলেন, বামদের অর্ধেকেরও বেশি ভোটব্যাংক বিজেপির দিকে সরে গেছে। তাঁর কথায়, ‘বামরা এখনো সেই ভোটের ২২ শতাংশও ফেরাতে পারেনি।’

একই সময়ে দেখা যায়, বামদের ক্ষতির জায়গা থেকেই বিজেপি লাভবান হয়েছে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ৪২টির মধ্যে ১৮টি আসন জেতে, যেখানে ২০১৪ সালে তাদের আসন ছিল মাত্র দুটি। ভোট শতাংশও ১৭ থেকে বেড়ে প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছে যায়।

কলকাতার ময়দান ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে সিপিএমের বার্ষিক সমাবেশে এখনো লাখ লাখ কর্মী-সমর্থক জড়ো হন। কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেসকে হারাতে বাম ভোটারদের বড় একটি অংশ এবার বিজেপিকেই ভোট দেয়
ছবি: ইনস্টাগ্রাম

এই পরিবর্তন বাম নেতৃত্বের কাছেও অজানা ছিল না। ২০১৯ সালে সিপিএমের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি স্বীকার করেন, বাম ভোটারদের একটি অংশ বিজেপির দিকে ঝুঁকেছে। তিনি বলেন, সিপিএমের কোনো সদস্য সরাসরি বিজেপিকে ভোট দেননি, কিন্তু তৃণমূলের শাসনের আট বছরে যে তীব্র সন্ত্রাস ও দমননীতি চলেছে, তার শিকার হয়ে বাম সমর্থকদের একাংশ এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই প্রবণতা আরও জোরালো হয়ে ওঠে। অনেক বাম সমর্থকই তখন বলেন, আদর্শগতভাবে তারা বামপন্থী হলেও ভোট দেবেন বিজেপিকে। তাঁদের যুক্তি ছিল, আগে তৃণমূলকে সরাতে হবে, তারপর আবার বামে ফেরা যাবে।

একজন বাম সমর্থক বলেন, ‘এটা অদ্ভুত শোনালেও সত্যি—বাম আর ডান একসঙ্গে চলে না। কিন্তু বিজেপি জিতলে আমরা আবার বামে ফিরে আসব। ক্ষমতা আমাদের কাছে মুখ্য নয়। তৃণমূল সরে গেলে আমি শতভাগ সিপিএমে ফিরে যাব।’

এই মানসিকতার প্রতিফলন দেখা যায় ২০২১ সালের নির্বাচনের ফলাফলেও। সেই নির্বাচনে তৃণমূল বিপুল ব্যবধানে জিতলেও, বিজেপি তাদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৭৭টি আসন পায়, যা ২০২৬-এর আগ পর্যন্ত তাদের সর্বোচ্চ সাফল্য ছিল।

সব মিলিয়ে, বাংলার রাজনীতিতে বাম ভোটের এই সরে যাওয়া শুধু একটি দলের পতনের গল্প নয়, বরং এক বৃহত্তর রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত দেয়, যা এখনো রাজ্যের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করে চলেছে।

পশ্চিমবঙ্গে বাম ভোটাররা কেন বিজেপিকে সমর্থন করেছিল?

এখন প্রশ্নটা আর ‘কবে’ নয়, বরং ‘কেন’। পশ্চিমবঙ্গের বামঘেঁষা ভোটারদের একাংশ কেন বিজেপির দিকে সরে গেলেন? কাগজে-কলমে বাম আর বিজেপি তো পরস্পরের সম্পূর্ণ বিপরীত মেরু—যেন চুম্বকের উত্তর ও দক্ষিণ মেরু। তবু বাস্তব রাজনীতিতে দেখা গেল এক ভিন্ন সমীকরণ।

প্রথম কারণটি খুবই সরল। সেটি হলো—বেঁচে থাকা। ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস ধারাবাহিকভাবে বিরোধী দলগুলোকে চাপে রেখেছে বলে অভিযোগ। বাম নেতৃত্ব ও কর্মীদের ওপর হামলা, পার্টি অফিস দখল, অনেককে গা ঢাকা দিতে বাধ্য করা—এই পরিস্থিতিতে অনেকেই বিকল্প খুঁজতে শুরু করেন। সেই বিকল্প হিসেবে কেউ তৃণমূলে যোগ দেন, আবার অনেকে বিজেপির দিকে ঝুঁকে যান।

তৃণমূলের রাজ্যসভা এমপি জহর সরকার এই প্রসঙ্গে বলেন, ক্ষমতায় আসার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী দলগুলোকে দুর্বল করার দিকে নজর দেন। তাঁর কথায়, কংগ্রেস ও বাম দলগুলোর বহু নেতা হয় তৃণমূলে যোগ দেন, নয়তো রাজনৈতিক আশ্রয় ও নিরাপত্তার খোঁজে বিজেপির দিকে যান। ধীরে ধীরে বিজেপিকে অনেকেই একধরনের ‘লাইফ ইনস্যুরেন্স’ হিসেবে দেখতে শুরু করেন।

দীর্ঘ ৩৩ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ২০১১ সালে বামফ্রন্ট ক্ষমতা হারায় তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। এরপর বামফ্রন্টের উপর চরম দমন–নিপীড়নের অভিযোগ উঠে মমতার বিরুদ্ধে।
ফাইল ছবি

দ্বিতীয় কারণ, শক্তিশালী বিকল্পের অভাব। রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মহম্মদ রিয়াজ মনে করেন, ২০১১ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে বিরোধী শক্তিকে প্রায় শেষ করে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। ২০১৬ সালের নির্বাচনে তৃণমূল ২৯৪টির মধ্যে ২১১টি আসন জেতে। সেই সময় বাম কর্মীরা বুঝতে পারেন, দল হিসেবে বামফ্রন্ট তেমন জোরালো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারছে না। বিশেষ করে বহু হিন্দু বাম সমর্থক তখন বিজেপিকে তৃণমূলের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখতে শুরু করেন।

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও একই মানসিকতা কাজ করেছে বলে জানিয়েছেন বাম কর্মীরা। নিউ ব্যারাকপুরের সিপিএম কর্মী সঞ্জিত রায়ের কথায়, স্থানীয় স্তরে সমর্থন থাকলেও দল সেই সময় এতটা শক্তিশালী ছিল না যে নিজেকে বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প হিসেবে তুলে ধরতে পারে। ফলে বহু সমর্থক বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন।

এখানেই তৈরি হয় এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব। আদর্শগতভাবে বিজেপি যে অবস্থানের প্রতিনিধিত্ব করে, তা একজন বাম ভোটারের ভাবনার সম্পূর্ণ বিপরীত। তবু অনেকের কাছে তৃণমূল হয়ে ওঠে আরও বড় হুমকি—একটি শক্তি, যা বাংলায় বামদের শেষ চিহ্নটুকুও মুছে ফেলতে চায় বলে তাঁদের ধারণা। ফলে কৌশলগতভাবে অনেকেই মেনে নেন এক অস্থায়ী সমঝোতা। তা হলো—‘এবার রাম, পরে বাম।’

নিউ ব্যারাকপুরের এক সিপিএম কর্মী এই প্রসঙ্গে বলেন, বিজেপির জয়ের অর্থ এই নয় যে বাম সমর্থকেরা হঠাৎ করে হিন্দুত্ববাদকে গ্রহণ করেছেন বা নিজেদের আদর্শ ত্যাগ করেছেন। বরং এটি সেই সময়ের সংগঠনগত দুর্বলতার প্রতিফলন। কারণ, এই নির্বাচনের সময় অনেক ভোটার মনে করেছিলেন তৃণমূলের বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াই করার মতো শক্তি বামদের হাতে নেই।

সব মিলিয়ে, এই রাজনৈতিক সরে আসা কোনো আদর্শগত পরিবর্তনের সরল গল্প নয়। বরং তা সময়ের চাপে নেওয়া এক কৌশলগত সিদ্ধান্ত, যেখানে ভোটাররা আপাতত একদিকে ঝুঁকে থেকেও ভবিষ্যতের জন্য অন্য সম্ভাবনার দরজা খোলা রাখছেন।

২০১৮ সালের পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে সহিংসতা ঘটেছিল, তা অনেক বাম সমর্থককে বিজেপির দিকে ঝুঁকতে বাধ্য করেছিল।
ফাইল ছবি

কীভাবে বাম ভোটাররা ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিজেপির পক্ষে ফল ঘুরিয়ে দিল

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের পেছনে বাম ভোটারদের ভূমিকা ছিল—এ কথা অনেকটাই সত্যি। কিন্তু পুরো কৃতিত্ব শুধু বাম সমর্থকদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হলে ছবিটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বাস্তবে আরও নানা কারণ মিলেই তৈরি হয়েছে এই ফলাফল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো নারী ভোটারদের একাংশের বিজেপির দিকে ঝোঁক এবং দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা শাসক দলের বিরুদ্ধে জমে ওঠা প্রবল ক্ষোভ।

তবু বিজেপির জয়ের ব্যাপ্তি অনেক কিছু স্পষ্ট করে দেয়। শুধু সাবেক তৃণমূল সমর্থকেরাই নয়, বামফ্রন্টের একাংশ ভোটারও যে বিজেপির দিকে ঝুঁকেছেন, তা ফলাফলেই পরিষ্কার।

২৯৪টির মধ্যে ২০৭টি আসনে জয় এবং প্রায় ৪৫ শতাংশ ভোট—এই পরিসংখ্যান বলছে, বিজেপির সমর্থন ঐতিহ্যগত দলীয় সীমারেখা পেরিয়ে গেছে। বিশেষ করে যেসব আসনে অল্প ব্যবধানে জয় এসেছে, সেখানে এই বাম ভোটের সরে আসা বড় ভূমিকা নিয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে।

এই পরিবর্তনের মূল কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল বামদের নিজেদের দুর্বলতা। বিজেপির তুলনায় তারা নিজেদের শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে তুলে ধরতে পারেনি। পাশাপাশি তৃণমূলকে ক্ষমতা থেকে সরানোর ইচ্ছাও ভোটারদের মধ্যে প্রবল হয়ে উঠেছিল।

নিউ ব্যারাকপুরের সিপিএম কর্মী কৃষ্ণেন্দু মিত্র বলেন, ‘বাংলার মানুষ তৃণমূলকে সরাতে চেয়েছিলেন। তাই অনেকেই চোখ বন্ধ করে বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন।’ তাঁর মতে, তৃণমূলকে হারানোর তাগিদ এতটাই প্রবল ছিল যে বহু ভোটার বিজেপির প্রতিশ্রুতিগুলোকেও গুরুত্ব দেননি। তাঁদের কাছে মূল লক্ষ্য ছিল তৃণমূলকে সরানো, আর সেই মুহূর্তে বিজেপিকেই সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য শক্তি বলে মনে হয়েছে।

এই প্রবণতা বোঝা যায় বিভিন্ন কেন্দ্রের ফলাফল দেখলেও। যাদবপুর, উত্তরপাড়া, দমদম, দমদম উত্তর, আসানসোল—এমন একাধিক আসন বিজেপির দখলে যায়। একই সঙ্গে বামদের একাধিক পরিচিত মুখ, যেমন মীনাক্ষী মুখার্জি ও দীপ্সিতা ধর বিজেপি প্রার্থীদের কাছে পরাজিত হন।

নিরাপত্তার বিষয়টিও এই নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। কেন্দ্রীয় সশস্ত্র বাহিনীর ব্যাপক মোতায়েনের ফলে অনেকেই এই ভোটকে সাম্প্রতিক কালের সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন বলে মনে করেছেন। এতে বাম সমর্থক থেকে শুরু করে নিরপেক্ষ ভোটার—সবাই অনেকটাই নিশ্চিন্তে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছেন।

বাম প্রভাবিত এলাকায় দীপ্সিতা ধরদের মতো পরিচিত বামপন্থী প্রার্থীও বিজেপি প্রার্থীদের কাছে পরাজিত হন।
ছবি: সংগৃহীত

নিউ ব্যারাকপুরের সিপিএম কর্মী সঞ্জিত রায়ের কথায়, ‘২০২১ সালের পর থেকেই আমাদের অনেক সমর্থক হতাশ হয়ে পড়েছিলেন, কারণ তাঁরা ঠিকমতো ভোট দিতে পারছিলেন না। ২০২৬ সালে কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতিতে নিরাপদ পরিবেশ তৈরি হয়। আর সেই সময় আমাদের দল যথেষ্ট শক্তিশালী না থাকায়, তৃণমূলকে হারানোর জন্য অনেকেই বিজেপিকে ভোট দেন।’

তবে এই চিত্রের মধ্যেও বামদের জন্য কিছু ইতিবাচক দিক ছিল। লেখক স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য মনে করেন, ২০২১ সালের তুলনায় বাম জোট তাদের ভোটের একটা বড় অংশ ধরে রাখতে পেরেছে।

প্রসঙ্গত, কংগ্রেসকে বাদ দিলে ২০২১ সালে বামফ্রন্টের ভোট শতাংশ ছিল প্রায় ৫ দশমিক ৭, যা ২০২৬ সালে বেড়ে প্রায় ৬ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ বামদের মূল সমর্থক–শ্রেণির একটা অংশ এখনো অটুট রয়েছে। কিছু কেন্দ্রে, যেমন উত্তরপাড়ায়, বামরা ভোট বাড়াতেও পেরেছে, যদিও তা জয়ের জন্য যথেষ্ট হয়নি।

অন্যদিকে মুসলিম ভোটের বিভাজনও বামদের কিছু জায়গায় সুবিধা করে দিয়েছে। বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ জেলায় এই প্রভাব স্পষ্ট। সেখানে সিপিএম ডোমকল আসন জেতে, আর নওশাদ সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন আইএসএফ ভাঙড় আসনটি তৃণমূলের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়।

সব মিলিয়ে, পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচনের ফলাফল একাধিক স্তরে বিশ্লেষণ দাবি করে। বাম ভোটের সরে যাওয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণ। এই সবকিছু মিলিয়েই তৈরি হয়েছে এক জটিল, বহুস্তরীয় রাজনৈতিক বাস্তবতা, যা আগামী দিনের রাজনীতির দিশা নির্ধারণ করতে পারে।

বাংলায় বামদের সামনে এগোনোর পথ কী?

২০১৯ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গের একাংশ বাম সমর্থক স্পষ্ট একটি লক্ষ্য সামনে রেখে বিজেপিকে সমর্থন করে এসেছেন। সেটি হলো—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর তৃণমূল সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানো। সেই লক্ষ্য এখন পূরণ হয়েছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই নতুন প্রশ্ন উঠছে—এবার কী?

প্রথম দিকের ইঙ্গিত বলছে, বাম শিবিরে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিও ও পোস্টে দেখা যাচ্ছে, সিপিএমসহ বামফ্রন্টের কর্মীরা তাঁদের পুরোনো পার্টি অফিস ফেরত নিচ্ছেন। ২০১১ সালের পর যেসব অফিস তৃণমূল কর্মীদের দখলে চলে গিয়েছিল বা দীর্ঘদিন অবহেলায় পড়ে ছিল, সেগুলোই আবার সক্রিয় করার চেষ্টা চলছে।

কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, স্থানীয় বিজেপি নেতাদের উপস্থিতিতেই এই অফিসগুলো বাম কর্মীদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। তবে এই প্রক্রিয়া এখনো প্রাথমিক স্তরে রয়েছে।

বিজেপির জয়ের পর বাম কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে যেমন কিছুটা আশাবাদ দেখা যাচ্ছে, তেমনই রয়েছে সংশয়ও। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এক বাম সমর্থক বলেন, তিনি নিশ্চিত নন আদৌ শক্তিশালীভাবে বামরা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি না। তাঁর আশঙ্কা, বিজেপি হয়তো বড় কোনো বিরোধী শক্তিকে সহজে গড়ে উঠতে দেবে না।

অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, কোচবিহারের দিনহাটায় ফরওয়ার্ড ব্লকের কর্মীরা তাঁদের পার্টি অফিস পুনর্দখল করছেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিজেপি নেত্রী পিয়ালি গুপ্ত। আবেগঘন মুহূর্তে তিনি অভিযোগ করেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনকালে তৃণমূলের নেতারা তাঁকে তাঁর বাবার শেষকৃত্য সম্পন্ন করতেও বাধা দিয়েছিলেন।

তাই এখন প্রশ্ন—কলকাতার আকাশে কি আবার লাল সূর্যোদয় দেখা যাবে? এর উত্তর অনেকটাই নির্ভর করছে বিজেপির ওপর। বাংলার ভোটারদের একটা ধৈর্যের ইতিহাস রয়েছে। তাঁরা টানা ৩৪ বছর বামদের পাশে থেকেছেন, আবার ১৫ বছর তৃণমূলকেও ক্ষমতায় রেখেছেন।

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—বামরা লড়াই চালিয়ে যেতে জানে। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে তৃণমূলের চাপে সংগঠন দুর্বল হলেও তারা পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। প্রতিটি নির্বাচনে তারা অংশ নিয়েছে। অনেক সমর্থক হতাশ হয়ে বিজেপির দিকে গেলেও বামদের একটি শক্তিশালী এবং অনুগত কর্মী ভিত্তি এখনো রয়েছে।

একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, ভোটের দ্বিতীয় দফা শেষ হওয়ার পর সিপিএম কর্মীরা ধীরে ধীরে দলীয় পতাকা নামিয়ে যত্ন করে সংরক্ষণ করছেন—যেন সামনে আরও বড় লড়াইয়ের প্রস্তুতি চলছে।

এখন যখন ‘জোড়া ফুল’ শাসনের অধ্যায় অতীত, তখন বামদের সামনে পথ স্পষ্ট। তাদের সামনে দুটি সম্ভাবনা—একদিকে তৃণমূলের ফাঁকা হয়ে যাওয়া বিরোধী জায়গা দখল করে বিজেপির বিরুদ্ধে প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠা এবং সেই সঙ্গে বিজেপির দিকে সরে যাওয়া হতাশ বাম সমর্থকদের ফের টেনে আনা। অন্যদিকে, যদি তা না পারে, তাহলে ২০১১-এর পর যেভাবে প্রান্তিকতায় চলে গিয়েছিল, সেই চক্রেই আটকে পড়ার ঝুঁকি থেকে যাবে।

সবশেষে বলা যায়, বাম সমর্থকেরা তাঁদের মতো করেই কাজটা করেছেন। ‘এবার রাম, পরে বাম’—এই কৌশলেই তাঁরা তৃণমূলকে পরাজিত করতে সাহায্য করেছেন। এখন দেখার, সেই কৌশলের পরবর্তী অধ্যায় কীভাবে লেখা হয়।

  • শৌনক সান্যাল ইতিহাস ও ভূরাজনীতি নিয়ে আগ্রহী এক তরুণ লেখক।

ইন্ডিয়া টুডে থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে নেওয়া।