শীতে পোষা প্রাণীর যত্নে করণীয়

দেশের সর্ব–উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে জেঁকে বসেছে শীত। তীব্র শীতে মানুষের পাশাপাশি কাবু হয়ে পড়েছে গৃহপালিত প্রাণী। ঠান্ডা থেকে রক্ষায় গরুকে ঢেকে দেওয়া হয়েছে কাঁথা ও পাটের চটে। বানপাড়া, মাগুরা, পঞ্চগড়ছবি: রাজিউর রহমান

শীতকাল শুধু মানুষের জন্য নয়, পোষা প্রাণীর জন্যও একটি সংবেদনশীল সময়। বিশেষ করে বাংলাদেশের বর্তমান তীব্র শীতে কুকুর ও বিড়ালের শরীর সহজেই ঠান্ডাজনিত সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারে। তাপমাত্রা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। এ সময় সঠিক পরিবেশ, নিরাপদ আশ্রয়, পরিমিত চলাফেরা এবং ত্বক-শরীরের যত্ন নিশ্চিত না করলে পোষা প্রাণীরা দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে।

শীতে কেন বিড়াল বেশি ঝুঁকিতে থাকে

শীতকালে ঠান্ডা ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে বিভিন্ন ভাইরাস দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকে। এ সময় বিড়াল সাধারণত কম চলাফেরা করে, রোদ কম পায় এবং শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধ শক্তিও কিছুটা কমে যায়। এর ফলে হাঁচি-কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, জ্বর, খাওয়ার রুচি কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে, যা অনেক ক্ষেত্রে নিউমোনিয়ার মতো গুরুতর শ্বাসতন্ত্রের রোগে রূপ নিতে পারে। এসব রোগের একটি বড় অংশ সময়মতো টিকা দেওয়ার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব।

ঘরের ভেতরে রাখাই সবচেয়ে নিরাপদ

ঠান্ডা থেকে পোষা প্রাণীকে নিরাপদ রাখার সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর উপায় হলো দিনের বেশির ভাগ সময় এবং সারা রাত ঘরের ভেতরে রাখা। বিশেষ করে রাতে কুকুর ও বিড়ালের বাইরে বের হওয়ার প্রবণতা থাকে। এ সময় তারা রাস্তার বেওয়ারিশ পশুর সংস্পর্শে এসে বিভিন্ন জীবাণুবাহিত রোগে আক্রান্ত হতে পারে। তীব্র শীতে সংবেদনশীল কুকুর ও বিড়ালের ক্ষেত্রে হাইপোথার্মিয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়, যা জীবননাশের কারণ হতে পারে।

তবে শীতের সময় পুরোপুরি চলাফেরা বন্ধ করাও ঠিক নয়। দিনের আলো ও তুলনামূলক উষ্ণ সময়ে মালিকের সঙ্গে অল্প সময় হাঁটা, খেলাধুলা বা হালকা দৌড়ঝাঁপ তাদের শরীর উষ্ণ রাখতে সাহায্য করে এবং মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী।

থাকার জায়গা উষ্ণ ও শুকনা রাখা জরুরি

পোষা প্রাণীর থাকার জায়গা পর্যাপ্ত উষ্ণ না থাকলে তারা অস্বস্তি বোধ করে এবং নানা শারীরিক সমস্যায় পড়তে পারে। যেসব পশুপাখি বাড়ির বাইরে থাকে, তাদের আশ্রয়স্থল অবশ্যই শুষ্ক, বাতাস প্রতিরোধী এবং মজবুত ঘেরযুক্ত হতে হবে। এমনভাবে জায়গাটি তৈরি করতে হবে, যাতে তারা আরাম করে বসতে ও শুতে পারে এবং সরাসরি ঠান্ডা মেঝে বা স্যাঁতসেঁতে পরিবেশের সংস্পর্শে না আসে।

শীতের পোশাক: কখন দরকার, কখন নয়

অনেকেই মনে করেন পশুপাখির লোমই শীতের জন্য যথেষ্ট, কিন্তু এটি সব সময় সত্য নয়। পাতলা লোমযুক্ত পূর্ণবয়স্ক পশু কিংবা বেশি সংবেদনশীল কুকুর ও বিড়াল দীর্ঘ সময় ঠান্ডায় থাকলে হাইপোথার্মিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে শরীরের বেশির ভাগ অংশ ঢেকে রাখা একটি উপযুক্ত সোয়েটার বা জ্যাকেট কার্যকর সুরক্ষা দিতে পারে।

তবে ছোট আকারের বা ঘন লোমশ অনেক পশুর ক্ষেত্রে আলাদা পোশাকের প্রয়োজন হয় না। তাদের স্বাভাবিক লোমই যথেষ্ট উষ্ণতা প্রদান করে—এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে পোশাক ব্যবহার করা উচিত।

ঠান্ডা মেঝে, কাদা বা রাস্তার ক্ষতিকর রাসায়নিক থেকে থাবা রক্ষার জন্য একজোড়া বুটি ব্যবহার করা যেতে পারে, যা পায়ের ত্বক ফেটে যাওয়া ও সংক্রমণের ঝুঁকি কমায়।

শীতে ত্বক ও পশমের বিশেষ যত্ন

শীতকালে পোষা প্রাণীর ত্বক শুষ্ক হয়ে যায়, তাই ঘন ঘন গোসল করানো উচিত নয়। অতিরিক্ত গোসল শরীরের প্রাকৃতিক তেল নষ্ট করে ত্বকের সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে। ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখতে খাবারে অল্প পরিমাণ নারকেল তেল ব্যবহার করা যেতে পারে।

এ ছাড়া পোষা প্রাণীর জন্য বিশেষভাবে তৈরি নিরাময় মলম বা পেট্রোলিয়াম জেলি নাক ও পায়ের আঙুলের চারপাশে লাল বা ফাটা জায়গায় ব্যবহার করা যেতে পারে।

শীতের সময় পশম কিছুটা বড় হতে দেওয়া প্রাকৃতিকভাবেই শরীরকে উষ্ণ রাখে। তবে মৃত বা নষ্ট পশম ঝরাতে নিয়মিত ব্রাশ করা জরুরি—এতে ত্বকের রক্তসঞ্চালন ভালো হয় এবং পশম সুস্থ থাকে।

তীব্র শীতে বিড়ালের যত্নে বিশেষ করণীয়

শীতে বিড়ালদের জন্য কিছু অতিরিক্ত বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি—
• উষ্ণ ও আরামদায়ক জায়গা দিন: ঠান্ডা বাতাস লাগে এমন জায়গা এড়িয়ে চলুন, নরম কম্বল বা বিছানার ব্যবস্থা করুন এবং রাতে দরজা-জানালা বন্ধ রাখুন।
• পুষ্টিকর খাবার দিন: শীতে শক্তির চাহিদা বাড়ে, তাই ভালো মানের প্রোটিনযুক্ত খাবার দিন। খুব ঠান্ডা খাবার সরাসরি দেবেন না।
• পানির দিকে খেয়াল রাখুন: শীতে অনেক বিড়াল কম পানি খায়, যা বিপজ্জনক। পরিষ্কার ও হালকা কুসুম গরম পানি দিন।
• লোম ও ত্বকের যত্ন নিন: নিয়মিত ব্রাশ করুন, গোসল কম করান এবং ভেজা হলে সঙ্গে সঙ্গে শুকিয়ে দিন।
• অসুস্থতার লক্ষণ নজরে রাখুন: হাঁচি, কাশি, চোখ দিয়ে পানি পড়া, খাবারে অনীহা বা অলসতা দেখা দিলে দ্রুত ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ নিন।
• ঘরের ভেতরে রাখুন: শীতে বাইরে সংক্রমণ ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি, তাই ঘরের ভেতরেই খেলাধুলার ব্যবস্থা করুন।
• টিকা ও কৃমিনাশক দিন: নিয়মিত টিকা আপডেট রাখুন এবং শীতেও কৃমিনাশক দেওয়ায় অবহেলা করবেন না।

কখন প্রাণী চিকিৎসকের কাছে যাবেন

হাঁচি, কাশি, শ্বাস নিতে কষ্ট, খাবার না খাওয়া, অতিরিক্ত অলসতা, কাঁপুনি বা অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব দেখা দিলে দেরি না করে প্রাণী চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
শীতকাল পোষা প্রাণীর জন্য পরীক্ষার সময়। উষ্ণ আশ্রয়, নিরাপদ পরিবেশ, পরিমিত চলাফেরা, সময়মতো টিকা এবং ত্বক-শরীরের যত্ন—এই কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করতে পারলেই শীতের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়। আপনার সামান্য সচেতনতা ও যত্নই আপনার আদরের সঙ্গীটিকে রাখতে পারে সুস্থ, নিরাপদ ও স্বস্তিতে।


ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির অধ্যাপক ও গবেষক, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম। [email protected]