র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরেই এই বাহিনীর বিলুপ্তির সুপারিশ করে আসছে। অভ্যুত্থানের পর খোদ র্যাব বাহিনীর পক্ষ থেকে অতীতের কর্মকাণ্ডের জন্য দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছিল, এমনকি বিএনপিও বিলুপ্তি দাবি করেছিল।
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, র্যাবের জন্য নতুন আইন করা হবে। একই প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টাও বলেছেন, ‘র্যাব এক অর্থে সেভাবে থাকছে না, নামও সম্ভবত পাল্টাচ্ছে’ (প্রথম আলো, ১৯ মে ২০২৬)। তবে নতুন আইনে কী থাকবে, সেই রূপরেখা এখনো স্পষ্ট নয়। মনে রাখতে হবে, বাহিনী হিসেবে র্যাবের কর্মকাণ্ডকে বিএনপি কীভাবে পর্যালোচনা করছে, তার ওপর আসলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অনেক কিছু নির্ভর করছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী র্যাব অতীত ভূমিকা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে দাবি করেছেন, ‘ফ্যাসিবাদী শাসনামলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে এমন কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না, যা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, র্যাবও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে’ (প্রথম আলো, ১৮ মে ২০২৬)। একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে র্যাবকে ব্যবহার করা হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তবে বিপজ্জনক বিষয় হলো, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই বাহিনীর সামগ্রিক কর্মকাণ্ডকে ‘প্রাতিষ্ঠানিক ত্রুটি’ হিসেবে না দেখে মাত্র কয়েকজন ‘ব্যক্তি’র দোষ আকারে হাজির করেছেন। তাই তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘কয়েকজন কর্মকর্তার কর্মকাণ্ডের দায় পুরো প্রতিষ্ঠান নিতে পারে না।...যদি কিছুসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী বিপথগামী হয়, তারা ব্যক্তিগতভাবে দায়ী। প্রতিষ্ঠান দায়ী নয়।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যের মধ্যে গভীর বিপদ লুকিয়ে আছে।
রাষ্ট্রের নাগরিকেরা একটা রক্তাক্ত গণ–অভ্যুত্থান পার হয়ে এসেছে। দেড় দশকের ট্রমাটিক অভিজ্ঞতা রয়েছে। রাষ্ট্রীয় সহিংসতার চক্র ভাঙতে হলে নির্মোহভাবে গত কয়েক দশকের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতার পর্যালোচনা করা দরকার। মনে রাখা দরকার, চব্বিশের আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নিয়েছিল রাষ্ট্রীয় সহিংসতার প্রতিক্রিয়াতেই। ইনসাফ কায়েম ও রিকনসিলিয়েশনের দীর্ঘমেয়াদি যাত্রার পথে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে র্যাবের কর্মকাণ্ডে বিএনপির পক্ষ থেকে নিজেদের রাজনৈতিক দায় স্বীকার করা।
২.
বিষয়টি একটু অতীতে ফিরে গিয়ে ব্যাখ্যা করা যাক। সন্ত্রাস দমনের উদ্দেশ্যে ২০০৪ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে র্যাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর থেকে র্যাবের সঙ্গে ক্রসফায়ার তথা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। ২০০৬ সালেই হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) র্যাবকে একই সঙ্গে ‘বিচারক, জুরি ও জল্লাদ’ আখ্যায়িত করে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল (হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, ডিসেম্বর ২০০৬)। র্যাবের হাতে নিহতের একটা তালিকা নিয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্র তৎকালে বিশদ প্রতিবেদন করেছিল, নাম ছিল ‘র্যাব: সন্ত্রাস নির্মূল নাকি রাষ্ট্রের সন্ত্রাস?’।
সে আমলে র্যাবের এই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা কয়েকজন বিপথগামী কর্মকর্তার কাজ বলে দাবি করা যায় না। র্যাব যখন একের পর এক ক্রসফায়ার বা বিচারবহির্ভূতভাবে ‘সন্ত্রাসী’ দমন করে যাচ্ছিল, তখন তৎকালীন মন্ত্রী ও সরকারি দলের নেতা যেভাবে এর পক্ষে সাফাই ও সম্মতি উৎপাদন করে গিয়েছিলেন, সেটাকে ইয়াদ করলেই আমরা টের পাব, সরকারের প্রবল সম্মতি ও অনুমোদনের ভিত্তিতেই ‘ক্রসফায়ার’ করা হয়েছিল।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও সরকারি দলের নেতাদের বিভিন্ন বক্তব্য তুলে ধরে দেখানো হয়েছিল, তারা কীভাবে এর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের পক্ষে হরদম সাফাই গেয়েছিলেন। যেমন তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মন্তব্য করেছিলেন, ‘অপরাধীদের কোনো মানবাধিকার নেই।’ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচনা হলে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘আমি জানি না এমন দেশ পৃথিবীতে আছে কি না, যেখানে কিছু অপরাধীদের ক্রসফায়ারে মারা হয় না’ (হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, ডিসেম্বর ২০০৬)।
এটা প্রায় সর্বজনস্বীকৃত যে স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটলেও ২০০৪ সালে র্যাব প্রতিষ্ঠার আগপর্যন্ত এটি রাষ্ট্রীয় সাধারণ প্রবণতা আকারে হাজির হয়নি।
৩.
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরপরই র্যাব বিলুপ্ত করার পরামর্শ দিয়েছিল আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার এসে এই ‘হাতিয়ার’কে আরও ভয়ংকর ও নিখুঁত রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করে। ভাড়াটে বাহিনী হিসেবেও র্যাবকে ব্যবহারের নজির আমরা দেখেছি। এমনকি মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পক্ষে তৎকালীন বিএনপির কর্তাব্যক্তিরা যেভাবে সম্মতি উৎপাদন করতেন, ঠিক একইভাবে লীগের কর্তাব্যক্তিদেরও তা করতে দেখেছি।
এই নির্মম বাস্তবতাই প্রমাণ করে যে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের নিপীড়নমূলক হাতিয়ারগুলোর কেবল ‘হাতবদল’ হয়, চরিত্রের বদল হয় না। যে পক্ষ আগে বন্দুকের পেছনে ট্রিগারে আঙুল রেখে দাঁড়িয়ে ছিল, ক্ষমতার পরিবর্তনে তারাই এসে দাঁড়ায় নলের সামনে। ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, প্রতিটি শাসনামলই তার পূর্বতন আমলের ‘নিপীড়নমূলক’ হাতিয়ারকে কেবল বজায়ই রাখে না, বরং আরও প্রবলভাবে ব্যবহার করে।
সম্প্রতি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুরুতে ‘আলোচিত অপরাধী বা দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীরাই ছিল র্যাবের মূল লক্ষ্যবস্তু’; তবে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ব্যক্তিগত বিরোধ এবং প্রতিপক্ষ দমনে এটি ব্যবহার হতে শুরু করে। কিন্তু সন্ত্রাসী বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ—সবাই ‘ক্রসফায়ার’-এর মাধ্যমেই র্যাবের ‘লক্ষ্যবস্তু’-তে পরিণত হয়েছিলেন।
৪.
আমি বলার চেষ্টা করছি, বিগত আওয়ামী শাসনামলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের যে মহামারি এ দেশের নাগরিকেরা প্রত্যক্ষ করেছেন এবং সেখানে ‘প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে র্যাবের ভূমিকা কেবল গত শাসনামলের বিচ্ছিন্ন মামলা নয়। অন্তত এই একটা ক্ষেত্রে এটা ছিল আগের বিএনপি-জামায়াত জোটের শাসনামলেরই ধারাবাহিকতা।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর র্যাব বাহিনীর পক্ষ থেকে সরাসরি জনগণের কাছে দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা প্রার্থনা করা হয়েছে। বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারাও র্যাবের বিলুপ্তি চেয়েছেন। কিন্তু ক্ষমতাসীন হওয়ার পর বিএনপি র্যাবকে টিকিয়ে রাখার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। র্যাবের পদ্ধতিগত অপরাধকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেভাবে মাত্র ‘কয়েকজন কর্মকর্তার দোষ’ বলে হালকা করতে চাইছেন, তাতে স্পষ্ট যে ইস্যুটাকে এখনো গভীর দলীয় ও সংকীর্ণ দৃষ্টিকোণ থেকেই বিচার করা হচ্ছে।
বিএনপি যদি আসলেই মানবাধিকারের প্রশ্নে আন্তরিক হয়ে থাকে, তবে র্যাব বাহিনীর প্রতিষ্ঠা এবং ‘ক্রসফায়ার’কে পদ্ধতিগতভাবে চালু করার ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক দায় যেমন তাদের স্বীকার করতে হবে, তেমনি র্যাবের কর্মকাণ্ডকে কেবল ‘দলীয়’ দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা ত্যাগ করতে হবে।
সম্প্রতি সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার র্যাবকে টিকিয়ে রাখার পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সুরের পুনরাবৃত্তি করেছেন (প্রথম আলো, ২৬ মে ২০২৬)। তিনি বলেছেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ‘দায়ভার নিয়ে শুধু র্যাবকে বিলুপ্ত করা যৌক্তিক সমাধান নয় বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করছি না’। ‘বাহিনীটির সূচনা প্রশংসনীয় ছিল’ বলেও মনে করেন। তাঁর মতে, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ক্ষিপ্রতা, নজরদারি, পেশাদারির উৎকর্ষসম্পন্ন র্যাবের মতো একটি এলিট বাহিনীর আবশ্যকতা রয়েছে’, কিন্তু কেবল মানবাধিকারের দিকে নজর রাখতে হবে।
বিগত দুই দশকে র্যাবের রাষ্ট্রীয় ‘সন্ত্রাস’ ও এর ভয়াবহতাকে তিনিও পর্যালোচনা করতে পারছেন না বলেই আমার অনুমান। প্রথমত, বাহিনীটির সূচনার ‘প্রশংসনীয় কাজ’ও আদতে ছিল মানবাধিকার লঙ্ঘনের কাজ। ওপরে বলেছি, র্যাব যখন ‘চিহ্নিত’ সন্ত্রাসীদের ‘দমন’ও করেছিল, সেটা করেছিল মানবাধিকার লঙ্ঘন করে। দ্বিতীয়ত, যে বাহিনী জন্মের পর থেকে ‘পদ্ধতিগত মানবাধিকার লঙ্ঘন’ করে আসছে, তাদের ‘ক্ষিপ্রতা, নজরদারি, পেশাদারির উৎকর্ষ’ হিসেবে মূল্যায়ন করা নাগরিকের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারের সঙ্গে প্রতারণাপূর্ণ। অপরাধ দমন জন্য ‘অপরাধী’র মানবাধিকার লঙ্ঘন করতে হবে—এই পূর্বানুমানই র্যাবের পেশাদারির ‘উৎকর্ষ’ দাবির পূর্বানুমান হিসেবে কাজ করছে। এখন এলিট বাহিনীর কাজই যদি হয় এলিট কায়দায় ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ করা, তাহলে এই এলিট বাহিনী দিয়ে নাগরিকেরা কী করবে?
এই রাষ্ট্রের নাগরিকেরা একটা রক্তাক্ত গণ–অভ্যুত্থান পার হয়ে এসেছে। দেড় দশকের ট্রমাটিক অভিজ্ঞতা রয়েছে। রাষ্ট্রীয় সহিংসতার চক্র ভাঙতে হলে নির্মোহভাবে গত কয়েক দশকের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতার পর্যালোচনা করা দরকার। মনে রাখা দরকার, চব্বিশের আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নিয়েছিল রাষ্ট্রীয় সহিংসতার প্রতিক্রিয়াতেই। ইনসাফ কায়েম ও রিকনসিলিয়েশনের দীর্ঘমেয়াদি যাত্রার পথে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে র্যাবের কর্মকাণ্ডে বিএনপির পক্ষ থেকে নিজেদের রাজনৈতিক দায় স্বীকার করা।
দ্বিতীয়ত, ক্ষমতায় আসার আগে র্যাব বিলুপ্তির যে কথা বলা হয়েছিল, সেটাকে বাস্তবায়ন করা। ক্ষমতায় আসার আগে বিলুপ্তির কথা বলে এখন র্যাবের মতো পদ্ধতিগত ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’কারী একটা বাহিনীকে টিকিয়ে রাখার পক্ষে যুক্তি প্রদান সেই চিরচেনা সহিংসতার চক্রে আবারও জড়ানোর শঙ্কা তৈরি করছে। এই দীর্ঘ রাস্তা পার হয়ে এসেও যদি মানবাধিকারের পক্ষে অটল অবস্থান না নেওয়া যায়, তাহলে সেই অমোঘ বাণীই ইয়াদ করতে হয়, ইতিহাসের শিক্ষা হচ্ছে ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না।
সহুল আহমদ লেখক ও গবেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব