গত সপ্তাহে পাকিস্তান ঘোষণা করেছে, ইরানের ওপর আমেরিকার জারি করা সর্বশেষ নিষেধাজ্ঞা তারা মেনে চলবে না; বরং প্রতিবেশীদের সঙ্গে বাণিজ্য আগের মতোই চালিয়ে যাবে। চীনের পক্ষ থেকে একই ধরনের ঘোষণা দেওয়ার মাত্র কয়েক দিন পরই পাকিস্তানের এই বার্তা সামনে এল।
গত ২৪ আগস্ট মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’-এর আওতায় এই নতুন বিধিনিষেধ ঘোষণা করেন। একে বলা হচ্ছিল ‘ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা’, যার উদ্দেশ্য ছিল ‘বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সমন্বিত অর্থনৈতিক অবরুদ্ধতা’ গড়ে তোলা।
এর আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে এটিকে ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। ইরানকে যেকোনো ধরনের ‘সহযোগিতার হাত’ বাড়িয়ে দেওয়া দেশের জন্য ‘ভয়ংকর অর্থনৈতিক পরিণতির’ হুঁশিয়ারিও দিয়েছিলেন তিনি।
ইরানে ছয় মাসের টানা মার্কিন বোমাবর্ষণ এবং নৌ-অবরোধ আমেরিকার জন্য কোনো সাফল্য এনে দিতে পারেনি। তাই এবার ইরানকে অনাহারে রেখে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার পথ বেছে নেওয়া হয়েছে। তবে এই নতুন কৌশলটি সম্পূর্ণ বেআইনি, নির্মম এবং কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণে এটি ব্যর্থ হতে বাধ্য।
প্রথমত, ইতিহাসের অভিজ্ঞতা কী বলে? যেসব সরকার বা রাষ্ট্র টিকে থাকার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, কেবল অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করে তাদের পতন ঘটানো যায় না। হ্যাঁ, নিষেধাজ্ঞা সাধারণ মানুষকে দরিদ্র করে তুলতে পারে, চোরাচালান নিয়ন্ত্রণকারী নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে পারে এবং মার্কিন আগ্রাসনের মুখে একটি জাতিকে একতাবদ্ধ হওয়ার রসদ জোগাতে পারে। কিন্তু এর মাধ্যমে কোনো সরকারের পতন ঘটানো যায় না।
দ্বিতীয়ত, বিশ্ব তেল বাজারের প্রাথমিক হিসাব-নিকাশটুকুও এখানে বিবেচনা করা হয়নি। প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে বিশ্ববাজার ইতিমধ্যে তার মোট তেল সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ হারিয়েছে। ঠিক এই সময়ে বেসেন্ট চাচ্ছেন বাজার থেকে ইরানি তেল রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে। অর্থাৎ ইউরোপ, জাপান এবং অন্যান্য সহযোগী দেশগুলো বর্তমানে যে স্থবিরতা ও মূল্যস্ফীতি সহ্য করছে, আমেরিকা সেটাকে আরও গভীর করতে চায়। একই সঙ্গে মিত্রদের ওপর আদেশ জারি করছে এমন এক নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে, যা তাদের নিজেদের অর্থনীতিকেই ধ্বংস করে দেবে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই অভিযানটি প্রত্যক্ষভাবে চীনের বিরুদ্ধে নিশানা করা হয়েছে। কারণ, ইরান যত তেল রপ্তানি করে তার ৮০ শতাংশেরও বেশি কেনে চীন। আমেরিকা যদি এখন ‘ব্যাংক অব চায়না’ কিংবা ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড কমার্শিয়াল ব্যাংক অব চায়না’র ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে, তবে বেইজিং কিন্তু সাধারণ কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানিয়ে বসে থাকবে না। তারা সরাসরি ‘রেয়ার আর্থ’ রপ্তানি বন্ধ করে দেবে। কারণ, এই কৌশল প্রয়োগ করে তারা আগেই একবার জয়ী হয়েছে।
২০২৫ সালের এপ্রিলে ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের জবাবে চীন ‘রেয়ার আর্থ’ ধাতু রপ্তানিতে লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু করেছিল। তার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে রেয়ার আর্থ চুম্বকের অভাবে আমেরিকা ও ইউরোপের গাড়ি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর অ্যাসেম্বলি লাইন বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ২০২৫ সালের অক্টোবরে চীন আরও কঠোর প্যাকেজের ঘোষণা দিলে ওয়াশিংটন পিছু হটতে বাধ্য হয়। তারা চীনের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর থেকে নতুন বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার বিনিময়ে বেইজিংয়ের সেই পদক্ষেপ এক বছরের জন্য স্থগিত রাখতে সম্মত হয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্বের প্রতিটি সরকারের তিনটি স্পষ্ট সিদ্ধান্তে আসা উচিত। প্রথমত, আমেরিকা জাতিসংঘের সনদকে প্রত্যাখ্যান করেছে। দ্বিতীয়ত, মার্কিন নিরাপত্তা আশ্বাস আর নির্ভরযোগ্য নয়। এবং তৃতীয়ত, ডলারভিত্তিক বাণিজ্যের ওপর ভরসা রাখা যেকোনো রাষ্ট্রকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সামনে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।
এপ্রিলের সেই নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থাগুলো চীন কিন্তু কখনোই পুরোপুরি প্রত্যাহার করেনি। আর অক্টোবরের পদক্ষেপগুলোর যে স্থগিতাদেশ ছিল, তার মেয়াদও আগামী নভেম্বরে শেষ হতে যাচ্ছে। অর্থাৎ চীনের সেই বর্ধিত নীতি পুনরায় কার্যকর হতে যখন মাত্র দুই মাসের মতো বাকি এবং চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের ওয়াশিংটন সফরের আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি, ঠিক তখনই বেসেন্ট বেইজিংকে বার্তা দিলেন—হয় তারা আমেরিকার পক্ষে থাকবে, না হয় বিপক্ষে। এটি আসলে আমেরিকার নিজের তৈরি করা নিজেরই এক ফাঁদ।
বেইজিং অবশ্য তাদের অবস্থান একদম পরিষ্কার করে দিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আন্তর্জাতিক আইন বা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া আরোপ করা বেআইনি একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে চীন বারবার তার দৃঢ় বিরোধিতা ব্যক্ত করেছে। অর্থনৈতিক যুদ্ধ এবং চরম চাপ প্রয়োগের কৌশল কোনো সমাধান এনে দিতে পারে না।’
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা যে বেআইনি, এটি কেবল চীন সরকারের একার মতামত নয়। জাতিসংঘের সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, যেকোনো রাষ্ট্রের আঞ্চলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ বা বলপ্রয়োগের হুমকি দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে আমেরিকা এখন সেই দেশ, যারা জাতিসংঘভিত্তিক বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সঙ্গে সবচেয়ে কম মানিয়ে চলছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ওয়াশিংটন ৬০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয়। এমনকি ২০২৫ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যতগুলো প্রস্তাব নিয়ে ভোটাভুটি হয়েছে, তার মাত্র ৫ শতাংশ ক্ষেত্রে আমেরিকা আন্তর্জাতিক সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের পক্ষে ভোট দিয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্বের প্রতিটি সরকারের তিনটি স্পষ্ট সিদ্ধান্তে আসা উচিত। প্রথমত, আমেরিকা জাতিসংঘের সনদকে প্রত্যাখ্যান করেছে। দ্বিতীয়ত, মার্কিন নিরাপত্তা আশ্বাস আর নির্ভরযোগ্য নয়। এবং তৃতীয়ত, ডলারভিত্তিক বাণিজ্যের ওপর ভরসা রাখা যেকোনো রাষ্ট্রকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সামনে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।
সারা বিশ্বেই এখন দেশগুলো নতুন ধরনের প্রতিরক্ষা সমঝোতার দিকে ঝুঁকছে; যেমন সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের ‘মক্কা চুক্তি’। সেই সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই তারা মার্কিন ডলারের মাধ্যমে লেনদেন থেকে সরে আসছে এবং তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের পরিমাণ কমিয়ে আনছে। একই সঙ্গে আমেরিকার নিজস্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মডেলের পেছনে টাকা না ঢেলে অনেকেই এখন চীনের ‘ওপেন-ওয়েট’ এআই মডেলগুলোর দিকে তাকাচ্ছে।
পেলোপনেসীয় যুদ্ধ নিয়ে থুসিডাইডিসের সেই প্রাচীন বিবরণকে আজকের মার্কিন-চীন দ্বন্দ্বের এক প্রতিচ্ছবি হিসেবে পড়া হচ্ছে। খ্রিষ্টপূর্ব ৪১৬ অব্দে মেলোসের অধিবাসীদের উদ্দেশে এথেনীয় জেনারেলদের সেই বিখ্যাত তাচ্ছিল্যসূচক উক্তিটি এখানে স্মরণ করা যেতে পারে—‘শক্তিশালীরা যা করার ক্ষমতা রাখে তা-ই করে, আর দুর্বলরা যা পাওয়ার কথা তা-ই সহ্য করে।’ অথচ সেই অহংকারী এথেনীয় জেনারেলদের উক্তির মাত্র এক দশক পরই স্পার্টার হাতে এথেন্স চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়েছিল।
আমেরিকা আজ ইরানসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে ঠিক একই অহংকারী সুরে কথা বলছে। কথায় আছে, পতনের আগেই আসে অহংকার। বিশ্বের অন্যান্য সরকারগুলো নিশ্চয়ই অন্ধের মতো আমেরিকাকে অনুসরণ করে নিজেদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে না।
জেফ্রি ডি স্যাক্স কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক
সিবিল ফারেস জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন সমাধান নেটওয়ার্কের মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকাবিষয়ক উপদেষ্টা
আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত