বাংলাদেশের রাজনীতিতে শিষ্টাচারের অভাব গণতন্ত্রের জন্য একটি গুরুতর সংকট, যা রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থেকে উদ্ভূত। একাডেমিক গবেষণা দেখায় যে রাজনৈতিক সহনশীলতার অভাব, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও প্রতিষ্ঠানগত দুর্বলতা গণতান্ত্রিক চর্চাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
শিষ্টাচার লঙ্ঘন শুধু দেশীয় রাজনীতিতেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলোচিত হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান ও ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহুবার এমন ঘটনা ঘটেছে, যেখানে নেতাদের কথা, আচরণ বা কর্মকাণ্ড শালীনতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। কয়েকটি উদাহরণ দিই।
২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় দুই প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেনের মধ্যে টেলিভিশন বিতর্কে একে অপরকে বারবার বাধা দেওয়া, ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং অশালীন মন্তব্য ছিল শিষ্টাচারবহির্ভূত আচরণের স্পষ্ট উদাহরণ। বিভিন্ন সময়ে মার্কিন কংগ্রেসে সদস্যদের মধ্যে তর্কবিতর্ক এতটাই উত্তপ্ত হয়েছে যে শালীনতা হারিয়ে গেছে।
পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে সদস্যদের মধ্যে অনেকবার হাতাহাতি ও চিৎকার-চেঁচামেচি হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ইমরান খান ও বিরোধী নেতাদের মধ্যে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন মন্তব্য রাজনৈতিক পরিবেশকে উত্তপ্ত করেছে।
ভারতের লোকসভা ও রাজ্যসভায় সদস্যরা অনেকবার শালীনতা হারিয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি করেছেন, এমনকি কাগজ ছুড়ে ফেলার ঘটনাও ঘটেছে। বিভিন্ন নির্বাচনে নেতারা প্রতিপক্ষকে হেয় করে ব্যক্তিগত আক্রমণ করেছেন। পশ্চিমবঙ্গ, উত্তর প্রদেশসহ বিভিন্ন রাজ্যে নেতাদের বক্তব্যে অশালীনতা ও শিষ্টাচারবহির্ভূত আচরণ দেখা গেছে।
এই তিনটি দেশের উদাহরণ থেকে বোঝা যায় যে রাজনৈতিক শিষ্টাচারের অভাব একটি বৈশ্বিক সমস্যা। ক্ষমতার লড়াই, ব্যক্তিগত ঈর্ষা ও প্রতিহিংসা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের দুর্বলতা এর মূল কারণ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্বাধীনতাযুদ্ধ, সামরিক শাসন এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার লড়াই রাজনীতিকে বহুমাত্রিক করেছে। তবে রাজনৈতিক শিষ্টাচারের অভাব আজ একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংঘাতমুখী চরিত্র এবং প্রতিষ্ঠানগত দুর্বলতা গণতন্ত্রকে ক্রমেই দুর্বল ও ভঙ্গুর করে তুলেছে।
শিষ্টাচারের অভাবের প্রকাশ দেখা যায় নানাভাবে। যেমন রাজনীতিবিদদের বক্তৃতার ভাষা: নেতাদের বক্তব্যে অশালীন শব্দ ও ব্যক্তিগত আক্রমণ সাধারণ ঘটনা। এটি ঘটছে অহরহ। দ্বিতীয়ত, জাতীয় সংসদের পরিবেশ: সংসদে তথ্যভিত্তিক বিতর্কের পরিবর্তে আক্রমণাত্মক সমালোচনা ও বিষোদ্গার হয় বেশি। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক সহিংসতা: প্রতিপক্ষ দলের সমাবেশে হামলা, মিছিলে ভাঙচুর, এমনকি প্রাণঘাতী সংঘর্ষ ঘটে। এক দলের লোকের হাতে অন্য দলের লোকের খুন হওয়া যেন নৈমিত্তিক ব্যাপার। চতুর্থত, গণমাধ্যমের আচরণ: টক শোতে সৌজন্যপূর্ণ আলোচনার পরিবর্তে চিৎকার-চেঁচামেচি দেখা যায় নিয়মিত। মনে হয়, কয়েকটি টিভি চ্যানেলে ইচ্ছা করেই এমন লোকদের ডেকে আনা হয়, যাঁরা কথা বলতে গিয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে মারমুখী হয়ে ওঠেন। এতে নাকি চ্যানেলের ‘ভিউ’ বা ‘রিচ’ বাড়ে।
এবার দেখা যাক, শিষ্টাচারের অভাবের মূল কারণগুলো কী। আমরা তো সবাই কোনো না কোনোভাবে রাজনীতির পর্যবেক্ষক। আমরা গত কয়েক দশকে যা দেখেছি, তার কয়েকটি নমুনা তুলে ধরা যাক। গণতান্ত্রিক চর্চার দুর্বলতা: ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পরও নির্বাচনী অনিয়ম ও রাজনৈতিক মেরুকরণ গণতন্ত্রকে দুর্বল করেছে। সহনশীলতার অভাব: রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে শত্রু মনে করার প্রবণতা রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে সংঘাতমুখী করেছে। প্রশাসনিক দুর্বলতা: আমলাতন্ত্রের রাজনৈতিকীকরণ, দুর্নীতি ও জবাবদিহির অভাব শিষ্টাচারহীন আচরণকে উৎসাহিত করছে। ক্ষমতার লড়াই: ক্ষমতা দখল ও ধরে রাখার জন্য নেতারা কথায় ও আচরণে শালীনতা বিসর্জন দিচ্ছেন।
এসবের ফল হয়েছে মারাত্মক। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা অনেক কমে গেছে। তরুণ প্রজন্ম রাজনীতিকে ঘৃণা করতে শুরু করেছে। রাজনীতিবিদেরা নিজেরা নিজেদের মধ্যেই অশালীন শব্দের লড়াই জারি রাখছেন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় নিজ নিজ দলের ঠ্যাংগাড়ে বাহিনী পুষছেন। যা তাঁরা নিজেরা বলেন না বা বলতে পারেন না, তা তাঁরা বলান তাঁদের ছাত্রসংগঠনের লাঠিয়ালদের দিয়ে। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমাগত অকার্যকর হয়ে পড়ছে। সমাজে বিভাজন ও সংঘাত বাড়ছে। এ থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কী?
একটা ফুটবল মাঠের কথা ধরা যাক। মাঠে যাঁরা খেলেন, তাঁরা তাঁদের আশপাশের কয়েকজনকে ছাড়া পুরো মাঠকে দেখেন না। যে গতিতে তাঁরা বল নিয়ে বা বলের দখল পেতে দৌড়ান, তাতে পুরো মাঠের ছবিটি তাঁর পক্ষে দেখা সম্ভব নয়। অথচ যাঁরা গ্যালারিতে বসে খেলা দেখছেন, তাঁদের অনেকেই হয়তো জীবনে পা দিয়ে বল ছুঁয়ে দেখেননি। কিন্তু খেলাটা বোঝেন। তাঁরা দেখেন পুরো মাঠ—কে কোথায় কী ভুল করছেন বা কোন খেলোয়াড় কী করলে খেলাটি আরও উপভোগ্য হতে পারে। তাঁদের কাছে থাকে খেলার নানা রকমের কৌশল। কিন্তু গ্যালারিতে বসে তো মাঠের খেলোয়াড়কে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না! পত্রিকার প্রতিবেদনে খেলোয়াড়ের খেলা নিয়ে সমালোচনা করলে বা ভুল ধরলে খেলোয়াড় বলে বসেন, আমি দশ বছর ধরে খেলছি, এটাই আমার পেশা, আপনি কি আমার চেয়ে বেশি বোঝেন?
রাজনীতিবিদেরাও অনেক সময় এ রকম বলেন, বসে বসে সবক দেওয়া খুব সহজ। আসেন, মাঠে রাজনীতি করে দেখান।
সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষ, বিশেষ করে নাগরিক সংগঠনগুলো অনেক দিন ধরেই নানাভাবে বিভিন্ন সভা-সেমিনারে তাঁদের মতামত দিয়ে আসছেন। গণমাধ্যমে তাঁদের মতামত ছাপা কিংবা প্রচারিত হয়। তাঁরা মোটাদাগে অনেক কথা বলেন। তাঁদের উপলব্ধি, রাজনীতিবিদেরা তাঁদের মতামতকে থোড়াই পাত্তা দেন। রাজনীতিবিদেরা চলেন নিজস্ব নিয়মে, নিজস্ব গতিতে। তারপরও এসব মতামতের একটা সারসংক্ষেপ দিচ্ছি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ও পরে ‘জুলাই সনদ’ নিয়ে অনেক আলোচনা ও বিতর্ক হয়েছে। সেখানে এসব মতামতের প্রতিফলন দেখা গেছে।
আমরা দেখেছি এবং বুঝেছি, আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার দরকার। স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা ও আমলাতন্ত্রের পেশাদারত্ব নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। দ্বিতীয়ত, জনগণকে রাজনৈতিক শিষ্টাচার সম্পর্কে সচেতন করা দরকার। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তারা অশালীন বক্তব্য প্রচার না করে গঠনমূলক আলোচনাকে গুরুত্ব দিতে পারে। দুঃখের বিষয়, অনেক গণমাধ্যম রাজনীতিবিদের মতোই আচরণ করে। তৃতীয়ত, রাজনীতিবিদদের দলীয় সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া খুবই দরকার। তাদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও সৌজন্যপূর্ণ আচরণের চর্চা থাকতে হবে।
দেশের বয়স সাড়ে পাঁচ দশক। এখন পর্যন্ত গণতন্ত্র দাঁড়াতে পারল না। আমরা নেতাদের মুখে একটা কথা প্রায়ই শুনি—গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। কে দেবে? এ ব্যাপারে তো তাদেরই অনুঘটক হওয়া দরকার। মানুষ তাঁদের কাছে সে রকম ভূমিকাই আশা করে।
মুক্তিযুদ্ধের পর শুরুটা ভালো হলেও কয়েক মাস যেতে না যেতে আমরা নিজেদের মধ্যে এমন ঝগড়া-বিবাদে জড়িয়ে পড়েছি যে তা থেকে আর বেরিয়ে আসতে পারছি না। বিরোধী দলগুলোর প্রতি সহনশীলতার অভাব এবং যেনতেনভাবে ক্ষমতা ধরে রাখার প্রবণতা রাজনৈতিক সহিংসতা ও অশালীন আচরণকে উসকে দেয়।
১৯৯৪ সালে শুরু হয় আরেক প্রবণতা। বিরোধী দল সংসদে অংশগ্রহণ না করে দীর্ঘ সময় বয়কট করে। সংসদীয় গণতন্ত্রে আলোচনার পরিবর্তে একে অপরকে অশালীন ভাষায় আক্রমণ করতে থাকে। ২০০৬ সালের রাজনৈতিক সহিংসতা তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে দ্বন্দ্বের সময় বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক সহিংসতা ঘটে। রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যে শালীনতার অভাব ছিল স্পষ্ট, যা জনসমাজে বিভাজন বাড়ায়। ২০০০-এর দশক থেকে টেলিভিশন টক শোতে রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে সৌজন্যপূর্ণ আলোচনার পরিবর্তে চিৎকার-চেঁচামেচি ও ব্যক্তিগত আক্রমণ সাধারণ ঘটনা হয়ে ওঠে। ২০১৪ সালের নির্বাচনকালীন সহিংসতা, বিরোধী দলের আন্দোলন ও সরকারের কঠোর অবস্থান রাজনৈতিক পরিবেশকে অশান্ত করে তোলে। সমাবেশে হামলা, ভাঙচুর এবং নেতাদের অশালীন বক্তব্য গণতন্ত্রের শিষ্টাচারকে ক্ষুণ্ন করে।
এই উদাহরণগুলো দেখায় যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শিষ্টাচারের অভাব একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে দেখা, ক্ষমতার লড়াইকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের দুর্বলতা এই প্রবণতাকে আরও তীব্র করেছে। রাজনীতিবিদদের মধ্যে পরিমিতিবোধ ও পরিশীলিত আচরণের এই উপলব্ধি আসবে কবে?
মহিউদ্দিন আহমদ লেখক ও গবেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব
