রঙে নয়, সবুজে ফিরুক ডিসি হিল

এক সময়ে এই খোলা জায়গাটি নানারকম বৃক্ষশোভিত ছিল। ১৪ মার্চ শনিবার বিকেলে তোলা। ‌ছবি: ওমর কায়সার

চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র ডিসি হিলকে আরও নান্দনিক ও জনবান্ধব করে তুলতে উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসন। ডিসি হিল এলাকায় সৌন্দর্যবর্ধন ও পরিবেশ উন্নয়নমূলক সংস্কারকাজ হয়েছে। ইতিমধ্যে সেটি নগরবাসীর মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী উন্মুক্ত সবুজ পরিসর ডিসি পাহাড়ে গেলেই নান্দনিক উন্নয়নমূলক নানা কাজ এখন চোখে পড়ে। হাঁটার পথের সংস্কার, মাঠের বসার আসন মেরামত, গাছের গোড়ায় সাদা রং দেওয়া—এসব উদ্যোগ দর্শনার্থীদের কাছে জায়গাটিকে আরও পরিচ্ছন্ন ও সাজানো করে তুলেছে। পাশাপাশি বৌদ্ধমন্দিরের বিপরীতে ডিসি হিলের এক কোণে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রতিকৃতি স্থাপনও স্থানটিকে নতুন এক মাত্রা দিয়েছে।

সংস্কার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে হিলের চারপাশে নতুন করে ফুলের বাগান তৈরি এবং বিদ্যমান গাছপালার পরিচর্যায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও ঢেলে সাজানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ডিসি হিলকে শুধু একটি বিনোদনস্থল নয়; বরং একটি সাংস্কৃতিক ও পরিবেশবান্ধব উন্মুক্ত পরিসর হিসেবে গড়ে তোলাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য।

কয়েক বছর ধরে বন্ধ থাকলেও চট্টগ্রামের নাগরিকদের কাছে ডিসি হিল দীর্ঘদিন ধরেই নানা সাংস্কৃতিক আয়োজনের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। বিশেষ করে নববর্ষ, চৈত্রসংক্রান্তি, নজরুল–রবীন্দ্রজয়ন্তী, বসন্তবরণসহ বিভিন্ন উৎসবে হাজারো মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করেন। এ কারণে এই ঐতিহ্যবাহী স্থানটির সৌন্দর্য রক্ষা ও আধুনিক সুবিধা যুক্ত করার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন সংস্কৃতিকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা।

ডিসি হিলে কংক্রিটের চত্ত্বর
ছবি: ওমর কায়সার

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেছেন, নগরবাসীর জন্য একটি পরিচ্ছন্ন, সবুজ ও নিরাপদ উন্মুক্ত স্থান তৈরি করাই তাঁদের লক্ষ্য। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সংস্কারকাজ শেষ হলে ডিসি হিল আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে এবং পরিবারসহ মানুষের সময় কাটানোর একটি অন্যতম সুন্দর জায়গায় পরিণত হবে। তাঁর এই উদ্যোগকে অনেকেই স্বাগত জানিয়েছেন। নগর–পরিকল্পনাবিদদের মতে, এমন উদ্যোগ নগরীর পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি নাগরিক জীবনে স্বস্তির পরিসর তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তবে নগর পরিবেশবিদ ও সচেতন নাগরিকদের মতে, কেবল অবকাঠামোগত সাজসজ্জা দিয়ে ডিসি হিলের প্রকৃত সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। এ পাহাড়ের সবচেয়ে বড় সম্পদ এর প্রাকৃতিক উদ্ভিদ বৈচিত্র্য। কালে কালে সে বৈচিত্র্য আমরা হারিয়ে ফেলেছি। বসন্তের এই দিনে ডিসি হিলের এই কৃত্রিম চাকচিক্য দেখে পুরোনো দিনের প্রাকৃতিক জৌলুশের কথা মনে পড়ে গেছে। একসময় ডিসি পাহাড়ের গাছপালা জানিয়ে দিত, ‘বসন্ত এসে গেছে’। চারদিকে পলাশ, শিমুল, রাধাচূড়া, বকুলসহ নানা রঙের ফুল ফুটে আশ্চর্য নান্দনিক পরিবেশ তৈরি হতো। বসন্ত যেতে না যেতে ডিসি হিলে দেখেছি কৃষ্ণচূড়ায় আর সোনালু ফুলের বাহার। নানা প্রজাতির দেশি গাছ, লতাগুল্ম, ঝোপঝাড় এবং হাজার হাজার টিয়াসহ নানা পাখির উপস্থিতি এলাকার মুখর হয়ে থাকত। আমাদের ছোটবেলায় এখানে শিয়াল, শজারু, বেজি, কাঠবিড়ালি, সাপ, শামুকসহ নানা প্রাণী দেখেছি। নগরায়ণ ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের কারণে সেই প্রাকৃতিক বুনো বৈচিত্র্য আর খুঁজে পাওয়া যায় না।

পরিবেশবিশেষজ্ঞদের মতে, সৌন্দর্যবর্ধনের কাজের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত সেই হারিয়ে যাওয়া উদ্ভিদ বৈচিত্র্যকে ধীরে ধীরে ফিরিয়ে আনা। এর জন্য প্রথমেই নজর দেওয়া উচিত ডিসি পাহাড়ে কী কী গাছ ছিল, তার একটা জরিপ করা। সেই সব গাছের নতুন করে চারা লাগানোর কাজ প্রথমেই করতে হবে। মাটিকে রুক্ষ ও পানিশূন্য করে ফেলে এ রকম কিছু গাছ লাগানো বিদেশি গাছ লাগানো হয়েছে ডিসি পাহাড়ে। এগুলোর মধ্যে ইউক্যালিপটাস ও আকাশিয়া অন্যতম। এসব গাছ কেটে ফেলে এখানে দেশি ফলদ, যেমন আম, জাম, কাঁঠাল, বেল কিংবা ভেষজ, যেমন আমলকী, নিম, হরীতকী, অর্জুনসহ নানা প্রজাতির গাছের চারা লাগিয়ে সেগুলো বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করতে হবে।

দেশীয় প্রজাতির বৃক্ষরোপণ, ঝোপজাতীয় গাছ লাগানো এবং প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা উদ্ভিদের জন্য জায়গা রেখে পরিকল্পনা করা হলে ডিসি হিল আবারও একটি জীবন্ত সবুজ পাহাড়ে পরিণত হতে পারে। এতে শুধু পরিবেশই সমৃদ্ধ হবে না, পাখি ও ছোট প্রাণীর জন্যও একটি নিরাপদ আবাস তৈরি হবে। একটা শহরের প্রাণকেন্দ্রে এ রকম একটি পরিবেশ তৈরি করলে প্রশাসন প্রশংসিত হবে। ডিসি পাহাড়ে প্রতিদিন সকাল–বিকেলে হাঁটতে আসা মানুষগুলো শুদ্ধ বাতাসে শ্বাস নিতে পারবেন। শুধু তা–ই নয়, বৃক্ষ বাড়লে এখানকার জীববৈচিত্র্য ফিরে আসবে বলে আমাদের বিশ্বাস। পুরো নগরের পরিবেশের ওপরও এটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

ঠিক একই রকম কার্যক্রমের প্রস্তুতি নেওয়া যায় নগরের ফুসফুস বলে খ্যাত সিআরবি ঘিরে। এই এলাকা এখন খুবই সংকটাপন্ন। এখানে প্রতিদিন হাজারো দর্শনার্থীর ভিড় হয়। শত শত খাবারের দোকান পরিবেশকে ধ্বংস করছে। সিআরবির শত বছরের গাছগুলোর পাশাপাশি এখানে নতুন করে গাছ লাগানো খুবই দরকার। রেল কিংবা নগর কর্তৃপক্ষ এখনই পদক্ষেপ না নিলে সিআরবির সবুজ পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যাবে।

শুধু প্রাকৃতিক পরিবেশ নয়, নগরবাসীর বিশ্রাম ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে ডিসি হিল ও সিআরবির গুরুত্ব অনেক। তাই এর সৌন্দর্য রক্ষায় কেবল রংতুলির বাহারি সাজ নয়; বরং প্রকৃতির নিজস্ব রূপকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগই হতে পারে সবচেয়ে টেকসই পদক্ষেপ। সচেতন মহলের আশা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় এই দিকটি বিশেষ গুরুত্ব পাবে এবং ডিসি হিল আবারও তার প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যে ভরে উঠবে।

  • ওমর কায়সার প্রথম আলোর চট্টগ্রাম অফিসের বার্তা সম্পাদক

    মতামত লেখকের নিজস্ব