অর্থাৎ অনুভূতিতে আঘাত, কটাক্ষ ও ভাবমূর্তি বিনষ্ট বা অবমাননার ব্যাপারগুলো ভীষণভাবে ব্যক্তি ও স্থানকেন্দ্রিক এবং আপেক্ষিক। কোনো বাক্য শুনে এক ব্যক্তি তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠতে পারেন। কিন্তু অন্য কোনো ব্যক্তি সেই একই বাক্য হয়তো আমলেই নেবেন না, অনুভূতিতে আঘাত লাগা তো অনেক দূরের ব্যাপার।

এর চেয়ে বড় কথা হলো অনুভূতিতে আঘাত, কটাক্ষ ও ভাবমূর্তি বিনষ্ট বা অবমাননা নামক ক্ষতিগুলো পরিমাপ করার কোনো নিরপেক্ষ মানদণ্ড নেই এবং সেটা সম্ভবও নয়। ফৌজদারি আইনের সম্পত্তিহানি-সংক্রান্ত অপরাধের বিভিন্ন ধরন আছে। যেমন ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যের সম্পত্তি বিনষ্ট করা, চুরি, ডাকাতি, দস্যুতা, বলপূর্বক অর্থ আদায়, চাঁদাবাজি ইত্যাদির কোনটা কী, সেটা নির্দিষ্ট মাপকাঠির ভিত্তিতে আলাদা করা যায়। এ বিভিন্ন ধরনের সম্পত্তিহানির জন্য বিভিন্ন ধরনের কারাদণ্ড বা শাস্তির বিধান আছে। চুরি হয়েছে না ডাকাতি হয়েছে, সেটা সহজেই সাক্ষ্যপ্রমাণ দ্বারা নির্ধারণ করা সম্ভব।

কিন্তু অবমাননা, ভাবমূর্তি বিনষ্ট কার কীভাবে হয়েছে, সেটা নির্ধারণের কোনো মাপকাঠি নেই। অবমাননা, কটাক্ষ, ভাবমূর্তি বিনষ্ট ইত্যাদিতে ভুক্তভোগীর অবশ্যই ক্ষতি হয়। ভুক্তভোগীর মন ক্ষুণ্ন হতে পারে, সে ব্যথিত অথবা মানসিকভাবে আহতও হতে পারে, কিন্তু কোন কাজে কে কতটুকু মনের ব্যথা পেয়েছে, সেটা বুঝবেন বা মাপবেন কীভাবে? ক্ষতির পরিমাণটা নির্ধারণ করতে না পারলে তাকে শাস্তি দেবেন কিসের ভিত্তিতে?

দুনিয়ার বহু আইন ও বিচারব্যবস্থায় মধ্যযুগ থেকে এই অনুভূতিতে আঘাত, কটাক্ষ ও ভাবমূর্তি বিনষ্ট বা অবমাননার জন্য শাস্তির বিধান ছিল। উনিশ শতকের প্রথমদিকে আইনবিদেরা অনুধাবন করলেন যে এসব ক্ষতির জন্য শাস্তির বিধান, ফৌজদারি বিচারব্যবস্থাকে হয়রানি ও অপদস্থ করার একটা বহুল প্রচলিত এবং অপব্যবহৃত হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। কাউকে হয়রানি করতে চাইলে তার বিরুদ্ধে ভাবমূর্তি নষ্ট করা ইত্যাদি অভিযোগ এনে খুব সহজেই বিচারব্যবস্থার দ্বারস্থ হওয়া যেত। ফলে তথাকথিত অভিযুক্তকে পাকড়াও করা, আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো এবং জামিন নামঞ্জুর করে বারোটা বাজানোর মোক্ষম তরিকায় পরিণত হয়েছিল। সেই হয়রানির হাতিয়ার বা অস্ত্র আমাদের বর্তমান আইনে আবার ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

এসব গোছের হয়রানি ও অপব্যবহার বন্ধের জন্য ১৮৫০ সাল নাগাদ সব উন্নত আইন ও বিচারব্যবস্থায় সিদ্ধান্ত হয় যে এই গোছের ক্ষতি হবে দেওয়ানি ব্যাপার। মনোবেদনা, মনঃকষ্ট, ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন ইত্যাদির প্রতিকারের জন্য ভুক্তভোগী যাবেন দেওয়ানি বিচারকের কাছে এবং দাবি করবেন আর্থিক ক্ষতিপূরণ।

সেই ১৮৬০ সালে প্রণীত আমাদের প্রধান ফৌজদারি আইন, অর্থাৎ পেনাল কোডেও (যার ভুল বাংলা অনুবাদ ‘দণ্ডবিধি’) ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতজনিত কোনো অপরাধের উল্লেখ ছিল না, অন্য কোনো মনোবেদনা তো দূরের ব্যাপার। পরে ১৯২৭ সালে একটা বিশেষ ঘটনার প্রেক্ষাপটে পেনাল কোডে ২৯৫ক ধারা যোগ করে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতজনিত একটা অপরাধ যোগ করা হয়, যার সর্বোচ্চ শাস্তি দুই বছর কারাদণ্ড (অর্থাৎ একটা বই নিয়ে লাহোরে প্রচুর হুলুস্থুল হয়েছিল এবং সেই হুলুস্থুল দমাতে ব্রিটিশরা এই ধারা যোগ করেছিল। যেহেতু বইটি বাংলাদেশে নিষিদ্ধ, সেহেতু আর কিছু বলছি না।)।

এরপরে তো ২০১৮ সাল। আবির্ভূত হলো ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’। অর্থাৎ, আমরা সদর্পে ফিরে গেলাম মধ্যযুগে। যখন রাজা-বাদশাহদের নিয়ে অলংকৃত ও প্রশংসাসূচক কথাবার্তা বা বক্তব্যের বাইরে সব ধরনের বাক্স্বাধীনতার চর্চা ছিল জঘন্যতম অপরাধ। ব্যবস্থা ছিল চরম শাস্তির। ফৌজদারি আইনের মাপকাঠিতে আমরা এখন বাস করছি মধ্যযুগীয় রাজা-বাদশাহদের আমলে।

আর শুনছি সব উদ্ভটতম ব্যাখ্যা। যেমন এসব অপরাধের জন্য সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার করা হবে না বা জামিন মঞ্জুর করা হবে। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জন্য ফৌজদারি আইনে বিশেষ ব্যবস্থা বা ছাড় নিষিদ্ধ করা আছে অন্য একটা আইনে। ৫০ বছর বয়সী সেই অন্য আইনটি হলো আমাদের সংবিধান। কিন্তু আমরা বোধ হয় ভুলেই গেছি যে সংবিধান নামক একটা আইন আছে। অন্তত সরকারের নেতা গোছের লোকজন আইনটিতে কী লেখা আছে, তা বোধ হয় বহু বছর পড়েও দেখেননি।

২.

একদা যে বাক্স্বাধীনতা ছিল। অবশ্য এখনো নিশ্চয়ই আছে। তবে সেটা শুধু সরকারপন্থীদের জন্য। আর কষ্টেসৃষ্টে হলেও এখনো আছে প্রথম আলোর। নানা কথা শুনি, কয়েক বছর আগে নাকি সেই প্রথম আলোর ওপর দিয়েও নানা ঝড়-ঝাপটা গেছে। সমস্যা হচ্ছে, আমরা আগের মতো খোলামেলা অনেক কিছুই বলি না, বললেও তা বলি ইনিয়ে-বিনিয়ে, হাত কাঁচুমাচু করে এবং খুব সরল বদনে।

তবু প্রথম আলো মাঝেমধ্যেই সরকারের ভুলত্রুটি দেখিয়ে দেওয়ার ও সত্য প্রকাশের সাহস করে। দুই সচিবের জন্য তাঁদের বাড়িতে সুইমিংপুল নির্মাণের খবর ছাপা হয়েছিল কয়েক দিন আগে। ৩১ অক্টোবর মন্ত্রিপরিষদ সচিব টেলিভিশনে সংবাদ সম্মেলনে তা বাতিল করলেন। হঠাৎ হঠাৎ সরকারের এ রকম দু-একটা ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার কারণে আশা-ভরসা এখনো সম্পূর্ণ তিরোহিত হয়ে যায়নি।

নিজে এখন যেটা বলার সাহস পাই না, সেই কথাগুলো চালাকি করে অন্যকে উদ্ধৃত করে বলি। যেমন অধ্যাপক রেহমান সোবহান কয়েক মাস আগে এক সেমিনারে বলেছিলেন যে পাকিস্তান আমলে যেসব কথা বলতে দ্বিধাবোধ করতেন না, সে ধরনের কথা এখন তো আর বলা যায় না। বেফাঁস কথাগুলো বলেছিলেন অধ্যাপক রেহমান সোবহান, অধমের কোনো দোষ নেই।

আমরা ভাতও চাই, ভোটও চাই। এর শুধু একটায় আমাদের পেট কখনো ভরে না এবং ভরবেও না। গণতন্ত্র ছাড়া ভাত অর্থহীন। গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে যখন পড়তাম, তখন বিভিন্ন কায়দায় আমাদের বারবার বোঝানো হতো যে ভাত ছাড়া গণতন্ত্র অর্থহীন।

সোভিয়েতরা নিঃসন্দেহে তাদের নাগরিকদের জন্য ভাত ও আনুষঙ্গিক মৌলিক চাহিদা পূরণ করেছে। কিন্তু গণতন্ত্রের চাহিদাটা রয়ে গিয়েছিল অপূর্ণ। তাই শেষতক এত চাহিদা পূরণ করা সত্ত্বেও দেশটা টিকল না। নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেল, তখন তেমন কোনো হানাহানি বা রক্তপাত হয়নি। আশপাশের পূর্ব ইউরোপের বেশ কিছু দেশে হানাহানি হয়েছিল প্রচুর।

প্রথম আলো আছে, থাকুক। শুধু প্রথম আলোই না, অন্য সব পত্রিকা ও টেলিভিশনকে টিকে থাকতে হবে শত কষ্ট, ভয়ভীতি ও বাধাবিপত্তির মধ্যে। অন্য সব ক্ষেত্রের মতো সংবাদমাধ্যমের জগতেও ভালো আছে, খারাপ আছে, আছে সজ্জন ও দুষ্ট লোক। খারাপ বা দুষ্টরা বেশি দিন টেকে না।

প্রথম আলো ভালো থাকুক। আর প্রথম আলোর সঙ্গে সঙ্গে আমরাও ইনিয়ে-বিনিয়ে বলেই যাব। সম্পূর্ণ বাক্স্বাধীনতা ও অর্থবহ গণতন্ত্র এ দেশে একদিন আসবে, আসতেই হবে।

ড. শাহদীন মালিক বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের শিক্ষক