মতামত
ব্যালটের ভাষায় যেভাবে রাষ্ট্রসংস্কারের রায় দেওয়া হলাে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি রাজনৈতিক ঘটনার চেয়ে বেশি কিছু। লিখেছেন কাজী মারুফুল ইসলাম
১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ এক নতুন ইতিহাসের সাক্ষী হলো। কিছু নির্বাচনী এলাকায় প্রার্থীদের বিচ্ছিন্ন অভিযোগ থাকলেও বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট (রেফারেন্ডাম) সম্পন্ন হয়েছে।
দীর্ঘ দেড় দশকের রুদ্ধশ্বাস রাজনৈতিক পরিবেশ, ভোটাধিকার হরণ ও সংকোচন এবং কার্যত একদলীয় আধিপত্যের অভিজ্ঞতার পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন নিঃসন্দেহে এক ঐতিহাসিক বাঁকবদল। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রক্তক্ষয়ী গণ–অভ্যুত্থানের পর এটিই ছিল প্রথম জাতীয় নির্বাচন—যা কেবল সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নয়, রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে জনগণের এক সরাসরি রায়।
২.
নির্বাচনের তথ্যভিত্তিক চিত্রও একরকম ঐতিহাসিকতার সাক্ষ্য দেয়। ১১ ডিসেম্বর তফসিল ঘোষণার পর নিবন্ধিত ৬০টি দলের মধ্যে ৫১টি দল নির্বাচনে অংশ নেয়। ২৯৯ আসনে (একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে একটি আসনে ভোট গ্রহণ স্থগিত রয়েছে) মোট প্রার্থী ছিলেন ২ হাজার ২৮ জন।
এবারের নির্বাচনে নারী প্রার্থী ছিলেন ৮৩ জন; এটা মোট প্রার্থীর মাত্র ৪ শতাংশ; যা আমাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের কাঠামোগত বৈষম্যের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ৭৯ জন প্রার্থী অংশগ্রহণ করেছেন। প্রায় ১২ কোটি ১০ লাখ ভোটারের দেশে প্রাথমিক হিসাবে গড়ে ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ ভোট পড়েছে। এই অংশগ্রহণ কেবল পরিসংখ্যান নয়, এটি আস্থার প্রত্যাবর্তনের ভাষা।
► বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাস প্রায়ই সংঘাত ও সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত ছিল। সেই বাস্তবতার মধ্যে এবারের শান্তিপূর্ণ নির্বাচন এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে। ► অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সম্মিলিতভাবে প্রমাণ করেছে, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে আন্তর্জাতিক মানের স্বচ্ছ নির্বাচন বাংলাদেশেও সম্ভব।
৩.
গণতন্ত্র কেবল একটি শাসনব্যবস্থা নয়; এটি নাগরিকের মর্যাদা ও সমান রাজনৈতিক অধিকারের স্বীকৃতি। রাজনৈতিক তাত্ত্বিক রবার্ট ডাল ‘পলিআর্কি’ ধারণায় দেখিয়েছেন, প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন, অংশগ্রহণের বিস্তার ও নাগরিক স্বাধীনতা—এই তিনের সমন্বয়েই কার্যকর গণতন্ত্র গড়ে ওঠে। আবার জোসেফ শুম্পিটার নির্বাচনের মধ্য দিয়েই শাসক নির্বাচনের প্রতিযোগিতাকে গণতন্ত্রের মূল বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখেছেন। এই তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণের আলোকে এবারের নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল বাস্তব, অংশগ্রহণ ছিল বিস্তৃত এবং প্রশাসনিক প্রভাব ছিল ন্যূনতম।
নির্বাচনী অনিয়ম, যেমন কারচুপি, জাল ভোট বা ব্যালট দখল অত্যন্ত নগণ্য পরিমাণে ছিল এবং তা ফলাফলের সামগ্রিক চিত্রে কোনো তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারেনি। বাংলাদেশে নির্বাচন ঘিরে যে ঐতিহাসিক অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল, এই নির্বাচন তার বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী ‘প্রতিস্বর’।
৪.
এই নির্বাচনকে বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ২০২৪ সালের উত্তাল জুলাইয়ে। প্রায় ১ হাজার ৪০০ প্রাণের মৃত্যু এবং হাজারো মানুষের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে যে গণ–অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল, তার কেন্দ্রীয় দাবি ছিল রাষ্ট্রসংস্কার ও কার্যকর গণতন্ত্র।
প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের মূল দর্শন হলো জনগণ সার্বভৌম; তারা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা অর্পণ করে এবং সেই ক্ষমতার জবাবদিহি দাবি করে। জন লকের সামাজিক চুক্তি তত্ত্বে যেমন বলা হয়েছে, জনগণের সম্মতি ছাড়া শাসনের বৈধতা নেই।
১২ ফেব্রুয়ারির ভোট সেই সম্মতির পুনঃপ্রতিষ্ঠা। একই সঙ্গে গণভোট রেফারেন্ডামে সাংবিধানিক সংস্কারের পক্ষে সমর্থন জানানো ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামোর জন্য এক স্পষ্ট নির্দেশনা।
বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের গুরুত্ব বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। আমাদের সমাজ বৈচিত্র্যময়—বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা, শ্রেণি ও অঞ্চলের পার্থক্য নিয়ে গঠিত। এমন সমাজে নির্বাচনই হলো ভিন্নমতকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতায় রূপান্তর করার পদ্ধতি।
নির্বাচন না থাকলে বা নির্বাচন অবিশ্বস্ত হলে রাজনৈতিক বিরোধ সড়কে, সহিংসতায় বা রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নে রূপ নেয়। এবারের নির্বাচনে আমরা দেখেছি—শহর থেকে গ্রামের কেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, কিন্তু নেই ভয়ভীতি বা পেশিশক্তির প্রদর্শন।
তরুণ ভোটারদের উচ্ছ্বাস এবং নারী ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক অধিকার এখন আর কাগুজে ধারণা নয়; এটি নাগরিক চেতনার অংশ হয়ে উঠছে।
৫.
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাস প্রায়ই সংঘাত ও সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত ছিল। সেই বাস্তবতার মধ্যে এবারের শান্তিপূর্ণ নির্বাচন এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সম্মিলিতভাবে প্রমাণ করেছে, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে আন্তর্জাতিক মানের স্বচ্ছ নির্বাচন বাংলাদেশেও সম্ভব। গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ঠিক এভাবেই ঘটে—নিয়ম, আস্থা ও চর্চার পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে।
নির্বাচনের প্রচার–প্রচারণাকালেও লক্ষ করা গেছে এক ভিন্ন রাজনৈতিক সংস্কৃতি। ব্যক্তিগত আক্রমণ বা উসকানিমূলক ভাষার বদলে নীতিগত বিতর্ক তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। গণতান্ত্রিক তত্ত্বে ‘ডেলিবারেটিভ পলিটিকস’ বা পরামর্শমূলক রাজনীতির যে ধারণা—যেখানে যুক্তি ও মতবিনিময়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়—তার আভাস আমরা এই নির্বাচনে দেখেছি। যদি এই সংস্কৃতি সংসদের ভেতরেও বজায় থাকে, তবে নীতিনির্ধারণের প্রক্রিয়া আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক হবে।
৬.
প্রযুক্তির ব্যবহারও এবারের নির্বাচনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এবারের নির্বাচনে সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা ছিল আগের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত। প্রার্থীরা ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে একে ব্যবহার করেছেন, ভোটাররাও সরাসরি প্রশ্ন করার সুযোগ পেয়েছেন।
অপপ্রচার এবং ‘ডিজইনফরমেশন’ (অপতথ্য) বা ভুল তথ্যের বিস্তার যদিও ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ, তবু স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
মোটাদাগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রার্থীদের জবাবদিহি বাড়িয়েছে এবং তথ্যপ্রবাহকে আরও উন্মুক্ত করেছে। ডিজিটাল স্বচ্ছতা গণতন্ত্রের আধুনিক রূপকে শক্তিশালী করেছে।
৭.
বাংলাদেশে আগে পোস্টাল ব্যালটের সুযোগ সীমিত ছিল—মূলত সরকারি ও জরুরি সেবায় নিয়োজিত নাগরিকদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার জন্যই এটি ব্যবহৃত হতো। কিন্তু এবারের নির্বাচনে সেই পরিসর অর্থবহভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিরাও পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক সংস্কার নয়; বরং নাগরিকত্বের ধারণাকে ভৌগোলিক সীমানার বাইরে বিস্তৃত করার এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রবাসীদের সম্পর্ক এত দিন প্রধানত অর্থনৈতিক অবদানের মাধ্যমে স্বীকৃত ছিল; এবার তাদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেল। ফলে বাংলাদেশের গণতন্ত্র এখন আর কেবল ভূখণ্ডের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়, এটি বৈশ্বিক পরিসরে ছড়িয়ে থাকা নাগরিকদের অংশগ্রহণে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রতিনিধিত্বমূলক রূপ লাভ করেছে।
৮.
এই নির্বাচনের একটি আলোচিত বা বিতর্কিত অধ্যায় ছিল আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারা। অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাহী আদেশে দলটির কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। পরবর্তী সময়ে নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করেছে।
নিষেধাজ্ঞার কারণে আওয়ামী লীগ সরাসরি ভোটে না থাকলেও অনলাইনে তাদের নেতা–কর্মী–সমর্থকেরা সক্রিয় ছিলেন। তাঁরা সাধারণ ভোটারদের ভোট না দেওয়ার জন্য প্রচারণা চালিয়েছেন। তবে নির্বাচনে ভোটারদের উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অংশগ্রহণের হার এবং মানুষের স্বতঃস্ফূর্ততা এটাই প্রমাণ করে যে ভোটাররা সেই নেতিবাচক প্রচারণাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পক্ষেই রায় দিয়েছেন।
এই নির্বাচনের একটি দুর্বল দিক ছিল নারী প্রার্থীদের তুলনামূলকভাবে কম অংশগ্রহণ। বিএনপি মাত্র ১০ জন নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে, জামায়াতে ইসলামী থেকে কোনো নারী প্রার্থী ছিলেন না। এমনকি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং বাম দলগুলোও নারী নেতৃত্বকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারেনি।
নির্বাচনের প্রচারের সময় নারী অধিকার ইস্যুতে, বিশেষ করে জামায়াতের রক্ষণশীল অবস্থান নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা নির্দেশ করে যে বাংলাদেশে নারী অধিকারের এজেন্ডাটি এখনো রাজনীতির কেন্দ্রে থাকা জরুরি। ভবিষ্যৎ সংসদে বিষয়টি নিয়ে গভীর বিতর্কের প্রয়োজন রয়েছে।
৯.
সবশেষে বলা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি রাজনৈতিক ঘটনার চেয়ে বেশি কিছু। এটি গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণের সূচনা।
প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র কেবল সরকার পরিবর্তনের উপায় নয়—এটি রাষ্ট্রের বৈধতা, সামাজিক আস্থা এবং ন্যায়বিচারের ভিত্তি। এবারের নির্বাচন সেই ভিত্তিকে পুনর্নির্মাণের সুযোগ এনে দিয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা হবে এই অর্জনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া, সংসদকে কার্যকর করা এবং বিরোধিতাকে শত্রুতা নয়; বরং গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া।
বাংলাদেশ এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। যদি রাজনৈতিক দলগুলো এই মুহূর্তের তাৎপর্য উপলব্ধি করে পারস্পরিক সহিষ্ণুতা, জবাবদিহি ও সংস্কারের পথে অগ্রসর হয়, তবে এই নির্বাচন সত্যিই নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূর্যোদয় হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত হবে।
গণতন্ত্রের পথ দীর্ঘ ও কঠিন, কিন্তু এবারের নির্বাচনে প্রমাণিত হয়েছে, এই পথেই হাঁটার জন্য বাংলাদেশ প্রস্তুত।
● কাজী মারুফুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক।
*মতামত লেখকের নিজস্ব