প্রতিবছরের এ সময়ে আমার প্রচুর মিষ্টি খাওয়া হয়। কারণ, এ সময়টাতেই শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বেশি দেশের বাইরে যাওয়া হয় নতুন সেশন শুরু হওয়ার কারণে। অনেকেই দেশে থাকতে চান, দেশের জন্য কিছু করতে চান। নিজের পরিবারের সঙ্গে থাকতে চান। কিন্তু বাস্তবতা তাঁকে বাধ্য করে দেশের বাইরে চলে যেতে। আমাদের এক ছাত্রী খুব মন খারাপ করে কয়েক দিন আগে বিদায় নিতে এসে বলল, ‘অনেক থাকতে চেয়েছিলাম দেশে। কিন্তু আমাদের তো কোথাও কোনো জায়গা নেই। চাকরির ক্ষেত্রে আমাদের অচ্ছুত করে রাখা হয়েছে। এই দেশ আমাকে জোর করেই বিদেশ পাঠিয়ে দিচ্ছে।’ কথাগুলো খুব অভিমানের মনে হলেও এটাই বাস্তবতা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকারী অনেক শিক্ষার্থীই জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিষয়ে ভর্তি হন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও শীর্ষ ১০০ জনের মধ্যে যাঁরা থাকেন, তাঁরাই মূলত সুযোগ পান এ বিষয়ে। অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থীরা এ বিষয়ে পড়তে এলেও পাঁচ বছরের পড়াশোনা শেষে তাঁদের সামনে থাকে কেবল হতাশা, বঞ্চনা আর অবমূল্যায়ন। তাঁদের যেসব জায়গায় কাজ করার ক্ষেত্র আছে, সেখানে তাঁদের আবেদনই করতে দেওয়া হয় না।
২০২৩ সালে সারা বছর মিলিয়ে যেখানে দেশে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিষয়ের নাম উল্লেখ করে মাত্র ৩টি প্রতিষ্ঠানে ৫টি পদের বিজ্ঞাপন হয়, সেখানে কেন ২৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োটেকনোলজি বা জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়টি পড়ানোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে? প্রতিবছর পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় মিলে ১ হাজার ৭০০ ছাত্রছাত্রী স্নাতক সম্পন্ন করছেন। কোথায় যাবেন তাঁরা? চাকরিদাতারা কেউ কেউ এ বিষয়ে অজ্ঞ। তাই কিছু ক্ষেত্রে চাকরির বিজ্ঞাপনে নাম বাদ যাচ্ছে, কেউ কেউ বায়োটেকনোলজিতে আসলে কী বিষয়ে পড়ানো হয়, তা জানে না দেখে চাকরিটা সংশ্লিষ্ট হওয়া সত্ত্বেও আবেদনের সুযোগ দিচ্ছে না।
নিজের যোগ্য শিক্ষার্থীদের এ দেশের মাটিতে বসেই কাজ করতে দেখার যে অন্য রকম একটা আনন্দ, তা থেকে আমরা কি আজীবনই বঞ্চিত হয়ে যাব? পথের কাঁটা সরিয়ে দিন, জীবপ্রযুক্তিবিদদের এগোতে দিন।
আসলেই কি জীবপ্রযুক্তিবিদদের কোনো চাকরির জায়গা নেই? উত্তরটা হবে, অবশ্যই আছে। অন্তত ৫০টি প্রতিষ্ঠানে এই সংশ্লিষ্ট কাজের ক্ষেত্র আছে, কিন্তু কোথাও তাঁদের আবেদনের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। প্রশ্ন হলো, তাঁরা কি এসব সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করেন না? উত্তর, অবশ্যই তাঁরা সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে চার বছরের অনার্সে পড়েন।
স্কুলগুলোতে শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় এ বিষয়ের স্নাতকদের আবেদনের কোনো অপশন বা সুযোগই রাখা হয়নি আবেদনপত্রে। সহকারী শিক্ষক নিয়োগেও নেই তাঁদের সুযোগ। অথচ উদ্ভিদবিজ্ঞান, প্রাণিবিজ্ঞানসহ এ সংশ্লিষ্ট ছয়–সাতটি বিষয় পড়ানো হয় ছাত্রছাত্রীদের চার বছরের অনার্সে। একইভাবে জৈব রসায়ন, অজৈব রসায়ন, ভৌত রসায়ন, প্রাণরসায়নের মতো সব কটি বিষয়ই এই কোর্সে পড়ানো হয়। কিন্তু তা–ও জীববিজ্ঞান বা রসায়নের শিক্ষক হিসেবে আবেদনের যোগ্য হিসেবে গণ্য করা হয় না এই বিষয়ের স্নাতকদের।
বিসিএস পরীক্ষায় শিক্ষা ক্যাডারে ও অন্যান্য আবেদনেও রয়েছে অদ্ভুত সব বৈষম্য। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং একটি জীববিজ্ঞান–সংশ্লিষ্ট বিষয় হলেও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে প্রকৌশলের সঙ্গে। যেটি একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। অন্যদিকে বায়োটেকনোলজিকে যুক্ত করা হয়েছে কৃষির সঙ্গে। যেখানে কেবলই কৃষি বিষয়ে ডিগ্রিপ্রাপ্তরাই (বিএসসি ইন অ্যাগ্রিকালচার) আবেদন করতে পারেন। তাই এখানেও খুব দুঃখজনকভাবে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও আবেদন করতে দেওয়া হচ্ছে না হাজার হাজার জীবপ্রযুক্তিবিদকে, যাঁরা প্রকৌশলী না কিংবা কৃষিবিদ নন। দেশে এ মুহূর্তে ২৫ হাজারের বেশি বায়োটেকনোলজি বিষয়ে স্নাতক বেকার আছেন। কোথায় যাবেন তাঁরা? কার কাছে যাবেন? কেউ কথা শুনছে না, শুনতে চাইছে না। কোথাও কেউ নেই!
প্রাণিবিজ্ঞান, অ্যানিমেল বায়োটেকনোলজি, অ্যানিমেল ব্রিডিংসহ বেশ কিছু ভেটেরিনারি–সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পড়াশোনা করলেও বায়োটেকনোলজি স্নাতকদের আবেদন করতে দেওয়া হচ্ছে না বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটে। অথচ সেখানে জীবপ্রযুক্তির বিশেষ শাখা ও গবেষণা থাকা সত্ত্বেও জীবপ্রযুক্তি নিয়ে পড়াশোনা করা ব্যক্তিদেরই আবেদন করতে দেওয়া হয় না। যুগ যুগ ধরে উদ্ভট উটের পিঠে চলছে এ দেশের সব গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আর তার নিয়োগের যত নিয়ম।
খাদ্যনিরাপত্তা, খাদ্যপ্রযুক্তি, পুষ্টিবিজ্ঞান, খাদ্য জৈব রসায়নের মতো বিষয়গুলো চট্টগ্রাম, ঢাকা, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়ানো হচ্ছে। কিন্তু অজানা কারণে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তর ও বিএসটিআইয়ে জীববিজ্ঞানের অন্য সব ক্ষেত্রের ছাত্রছাত্রীদের আবেদন করতে দেওয়া হলেও বায়োটেকনোলজি স্নাতকদের আবেদন করতে দেওয়া হয় না।
জীবপ্রযুক্তিবিদদের অন্যতম বিশাল কাজের ক্ষেত্র কৃষি। চার বছরের অনার্স আর এক বছরের মাস্টার্স মিলিয়ে তাঁরা উদ্ভিদবিজ্ঞান, কৃষিবিজ্ঞান, টিস্যু কালচার, প্ল্যান্ট ব্রিডিং, প্ল্যান্ট ফিজিওলজি, ক্রপ সায়েন্স, ক্রায়োপ্রিজারভেশনসহ অনেক বিষয় পড়ে দক্ষতা অর্জন করেন। কয়েক হাজার গ্র্যাজুয়েট এ মুহূর্তে দেশের বাইরে স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের কৃষি অনুষদগুলোতে গবেষণা করছেন, বিদেশে কৃষি গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। কিন্তু বাংলাদেশে কৃষিক্ষেত্রেও বায়োটেকনোলজি স্নাতকদের জন্য তুলে রাখা হয়েছে অদৃশ্য এক দেয়াল। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের অন্তর্ভুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠানে আবেদনের সুযোগ দেওয়া হয় না এ বিষয়ের শিক্ষার্থীদের। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই), বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা), বাংলাদেশ ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএসআরআই), মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই), বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (এফআরআই), বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই), বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই), বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই), বাংলাদেশ রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (বিএসআরটিআই), বাংলাদেশ তুলা উন্নয়ন বোর্ডের (সিডিবি) কোথাও চাকরির বিজ্ঞাপনে বায়োটেকনোলজি বিষয়ের স্নাতকদের কথা উল্লেখ থাকে না। অথচ এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে জীবপ্রযুক্তি–সংশ্লিষ্ট প্রচুর গবেষণা হয়। প্রকল্প ও বায়োটেকনোলজিস্টের পদও রয়েছে। এমনকি বিএসসি অনার্স বা এমএসসি ডিগ্রি থাকলেও আবেদন করা যায় না। এ এক অদ্ভুত স্বদেশ!
এই বিষয়ের স্নাতকদের আরও পড়ানো হয় ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্স, ফার্মাসিউটিক্যাল বায়োটেকনোলজি, মাইক্রোবায়োলজি, ড্রাগ ডিসকভারির মতো বিষয়গুলো। কিন্তু ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট চাকরির বিজ্ঞাপনগুলোতে জীববিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার স্নাতকদের আবেদনের সুযোগ রাখা হলেও অন্তর্ভুক্ত করা হয় না বায়োটেকনোলজি কিংবা জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংকে। কেন এই বৈষম্য?
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকতার ক্ষেত্রেও রয়েছে মজার এক নিয়ম। বায়োটেকনোলজি একটি বহুমাত্রিক বিষয়। জীববিজ্ঞানের সব শাখার লোকজনকে এখানে আবেদনের সুযোগ দেওয়া হয় এবং অনেকের পিএইচডি বা উচ্চতর গবেষণা এ বিষয়ে থাকার কারণে প্রাসঙ্গিকভাবেই এই বিভাগে শিক্ষকতার সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু অদ্ভুতভাবে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা এই একটি বিষয় ছাড়াও অন্য কোনো বিভাগেই আবেদনের সুযোগ বা ডাক পান না ৯৯ ভাগ ক্ষেত্রেই? এখনকার জীববিজ্ঞান বহুমাত্রিক জ্ঞানকে ধারণ করে, তখন কেন এই ধারণা অন্য বিভাগগুলোর নিয়োগের ক্ষেত্রে মানা হয় না—এ প্রশ্ন জীবপ্রযুক্তিবিদদের।
বৈষম্যহীনতার এ সময়ে এ রকম নির্মম বৈষম্যের দেয়াল তুলে একটা দেশ কীভাবে এগোবে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গবেষণায়? আমরা প্রায়ই ভাবি, আমাদের কি হার্ভার্ড, অক্সফোর্ড কিংবা কেমব্রিজ থেকে তোলা আমাদের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সেলফি দেখেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে? নিজের যোগ্য শিক্ষার্থীদের এ দেশের মাটিতে বসেই কাজ করতে দেখার যে অন্য রকম একটা আনন্দ, তা থেকে আমরা কি আজীবনই বঞ্চিত হয়ে যাব? পথের কাঁটা সরিয়ে দিন, জীবপ্রযুক্তিবিদদের এগোতে দিন।
ড. আদনান মান্নান অধ্যাপক ও গবেষক, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়