এ কথা জেনে রাখা ভালো যে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা রাজউকেরই বিধিমালা, যা গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত ইমারত নির্মাণ আইন ১৯৫২ বা বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন অ্যাক্ট ১৯৫২ (১৯৫৩ সাল থেকে কার্যকর বলে একে বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন অ্যাক্ট ১৯৫৩ ও বলা হয়ে থাকে)-এর অধীন বিধিমালা। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ বিধিমালা, যা বিএনবিসি বা বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড যথাযথভাবে পালন করেই প্রণীত হয়েছে।

ইমারত নির্মাণ বিধিমালা প্রণয়নের পর থেকে ধীরে ধীরে ঢাকায় স্থাপনার গঠনে পরিবর্তন আসতে থাকে। ইমারত নির্মাণ বিধিমালা করার একটা মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল নির্মিত দালান বা ভবনের সর্বোচ্চ আচ্ছাদিত স্থান কমানো, যা ৫ কাঠা বা ১০ কাঠার প্লটের পুরোটা জুড়ে তৈরি করা স্থাপনাগুলোর কারণে বেড়ে যাচ্ছিল। বিধিমালায় স্পষ্টত উল্লেখ আছে, আবশ্যিক উন্মুক্ত স্থানের ৫০ ভাগ মাটি রাখতে হবে। এর কারণ হলো ভূগর্ভে বৃষ্টির পানির প্রবেশ, যা ভূগর্ভস্থ পানির ভারসাম্য বজায় রাখবে। রাজউক কর্তৃক প্রণীত মহাপরিকল্পনায় কী কারণে বারবার সেই একই সংস্থার বিধিমালাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে, তা ঠিক বোধগম্য নয়।

ড্যাপের প্রস্তাবে পুরো মিরপুর ১০ ও ১১–তে ২.৩, বসুন্ধরায় ৪.১, ধানমন্ডিতে ৫.১, বাড্ডার ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডে ২.৪, ৩৮ নম্বরে ১.৯ এবং কড়াইল এলাকায় ১.৩ ফ্লোর এরিয়া রেশিও দেওয়া হয়েছে। তাহলে কোথায় অভিন্নতা দেখা যাচ্ছে? তবে অসাম্য সুস্পষ্ট। মিরপুর ১০ ও ১১ বর্ধনশীল এলাকা, বাড্ডা এলাকাও গুলশানের খুব কাছেই। জমির দামও সেখানে অনেক বেশি। তাহলে কোন যুক্তিতে গুলশান-বনানীতে ৫-এর ওপর ফ্লোর এরিয়া রেশিও নির্ধারণ করে বাড্ডার মতো জায়গায় ২.৩ দেওয়া হচ্ছে। এ অসাম্য জমিমালিকেরা মানবেন কেন?

বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা ২০২২-২০৩৫ প্রতিবেদনের প্রথম খণ্ডে পৃষ্ঠা ৪৪-এ যাওয়া যাক। অনুচ্ছেদ ২.৫.৬। ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০০৮-এর বিধি মোতাবেক রাস্তার দৈর্ঘ্য ন্যূনতম ৯ ফুট (২.৭৫ মিটার) না হলে কোনো স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হবে না।

প্রযোজ্য ক্ষেত্রে জমির মালিককে নির্দিষ্ট পরিমাণ জমি ছেড়ে রাস্তা প্রশস্ত করার জায়গা করে দিতে হবে। এ পদ্ধতিতে ঢাকা শহরের অনেকগুলো সরু সড়ক এলাকাবাসীর সহযোগিতায় প্রশস্ত করা হয়েছে। কিন্তু ড্যাপ রিপোর্ট বলছে, বিপুল পরিমাণ রাস্তাকে প্রশস্তকরণ সম্ভব নয়, সে ক্ষেত্রে রাস্তার ন্যূনতম প্রশস্তকরণের যে বিধি, তা পরিমার্জন করার সুপারিশ করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে ব্লকভিত্তিক উন্নয়ন প্রস্তাব দেওয়া যেতে পারত।

অনুচ্ছেদ ৩.৫. ৩.৩-এর খ; এখানে সিএস/আরএস মৌজায় চিহ্নিত প্রাকৃতিক খালসংলগ্ন প্লট বা দাগে ইমারত নির্মাণের বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে, যা ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০০৮-এর আইন কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়ে থাকে। যদিও উল্লেখ করা আছে, মালিকানা হস্তান্তরযোগ্য নয়, এমন খালের পাশেই হতে পারবে স্থাপনা। তবু মনে আশঙ্কা জাগে, এ দেশে নদীর মালিকানাও স্থানান্তরযোগ্য নয়। যে দেশে মানুষ জমি কেনে না, পানি কেনে, সে দেশে এমন প্রস্তাব শুধু কাল্পনিকই নয়, আত্মঘাতীও বটে।

এ পরিকল্পনার নির্ধারিত ভূমি ব্যবহার এলাকা বা ল্যান্ড ইউজ জোনের দিকে নজর দিলে আরও হতাশ হতে হয়। এখানে কোথাও প্লাবনভূমির উল্লেখ নেই। কারণ, প্লাবন ভূমির ব্যবহারকে হালের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় কৃষি হিসেবে দেখানো হয়েছে। এখানেই প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়, কেন এ সিদ্ধান্ত? কেন এত মিশ্র ব্যবহার এলাকা? কোন কোন তথ্য-উপাত্ত ও স্থিতিমাপক প্যারামিটারের ভিত্তিতে এ সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে?

বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা ২০২২-২০৩৫ প্রতিবেদনের প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭০, অধ্যায় ৩.৫. ৩.১ অধ্যায়ে জোনভিত্তিক স্থাপনা ব্যবহার নির্দেশনার অধীনে কৃষি এলাকা উপ-অধ্যায়ের সারণি ৩.৪-এ এবার নজর দেওয়া যাক। এখানে কৃষি জোনে অনুমোদিত ও শর্ত সাপেক্ষে অনুমোদিত স্থাপনার কথা বলা হয়েছে। এ অনুমোদিত স্থাপনার মধ্যে পড়েছে মুদিদোকান, ফার্মেসি ও প্রাথমিক বিদ্যালয়। এরপর আসছে শর্ত সাপেক্ষে স্থাপনা নির্মাণের প্রসঙ্গ। শুধু বহু পরিবারের ইউনিট একতলা, ইকো রিসোর্ট ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি স্থাপনাকেন্দ্র নির্মাণ করা যাবে।

এবার প্রশ্ন আপনাদের কাছে, প্রধানমন্ত্রী যেখানে নির্দেশ দিয়েছেন এক ইঞ্চি কৃষিজমিও যেন অনাবাদি না থাকে, যেখানে প্রতিটা বৈশ্বিক মন্দায় এ দেশ বেঁচে যায় শুধু কৃষিনির্ভরতার জন্য, সেখানে কোন বাস্তবতায় কৃষিজমিতে এহেন শর্তসাপেক্ষ উন্নয়ন প্রস্তাব দেওয়া হলো? জলাভূমির ও বনাঞ্চলের ক্ষেত্রেও একইভাবে শর্ত সাপেক্ষে উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে।

এ দেশে জমিজমা হলো অর্থ বিনিয়োগের সবচেয়ে নিরাপদ ক্ষেত্র। এর মুনাফা যেকোনো বিনিয়োগের চেয়ে বেশি। এ ক্ষেত্রে তাহলে ড্যাপের মূলনীতির প্রথম নীতিটির সার্থকতা মেলে ‘বিনিয়োগে সর্বজনীন স্বাধীনতা’! সব পর্যালোচনা শেষে এটাই প্রতীয়মান হয় যে এসব স্বপ্রণোদিত প্রস্তাব জলাভূমি, কৃষিজমি, বনাঞ্চল, পানিসম্পদ ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট বিদ্যমান পরিকল্পনা ও আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

আমরা শঙ্কিত কৃষিজমি ও জলাভূমিতে শর্ত সাপেক্ষে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রস্তাবের কারণে সৃষ্ট ভবিষ্যৎ বিশৃঙ্খলার কথা চিন্তা করে। প্লাবনভূমিকে ভূমি ব্যবহার শ্রেণিবিন্যাসে না রাখা নিয়ে শঙ্কিত, উন্নয়ন স্বত্ব বিনিময়ব্যবস্থাকে উন্নয়ন স্বত্ব বিক্রয়ব্যবস্থা হিসেবে প্রস্তাব করাতে আমরা শঙ্কিত। শঙ্কা আরও বেড়ে যায়, যখন দেখা যাচ্ছে রাজউক নিজেই এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের ভূমিকা পালন করবে। হ্যাঁ, আমরা আরও শঙ্কিত, কারণ দুই কোটি মানুষ নানাভাবে এ নির্মাণশিল্পের সঙ্গে সরাসরি জড়িত, যা পোশাকশিল্পের পরে লাভজনক শিল্প।

পরিশেষে এটাই বলব যে আমরা চাই ড্যাপ বাস্তবায়ন হোক আর তা যথার্থ পরিশীলন, পরিমার্জন ও সংশোধনের মাধ্যমে। ঢাকাকে বাঁচাতে একটি যথোপযুক্ত উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা প্রয়োজন, যা একটি গ্রহণযোগ্য ড্যাপের মাধ্যমেই সম্ভব।

ড্যাপ সংশোধন অত্যন্ত প্রয়োজন এই মর্মে যে এ বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনাটি বস্তুত ডিটেইলের দিকে না গিয়ে নীতি নিয়ে বেশি ভেবেছে ও লিখেছে। এটাকে অনায়াসে একটি নীতি পরিকল্পনা বলাই ভালো। যদিও সেসব পলিসির অনেকগুলোই ইউটোপিয়ান ভাবধারায় প্রস্তাবিত ও রচিত হয়েছে, এ দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতার সঙ্গে এর মিল অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত।

  • তাসলিহা মওলা স্থপতি