সাম্প্রতিক সময়ে এ প্রশ্ন ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা বিবেকবান মানুষকে ব্যাপকভাবে নাড়া দিয়েছে। শিক্ষক হত্যা, শিক্ষক লাঞ্ছনা, নানা অজুহাতে নিগ্রহের ঘটনা এ প্রশ্নকে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। তাহলে কি সামাজিক মূল্যবোধ ক্ষয়িষ্ণু হয়ে যাচ্ছে, পরিবর্তন হচ্ছে সামাজিক দায়বদ্ধতার সংজ্ঞা? পরিবর্তনের ইতিবাচক দিকটি যেমন আমরা সাদরে গ্রহণ করি, তেমনি নেতিবাচক বিষয়গুলো বিশদভাবে বিশ্লেষণের প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামাজিক পরিবর্তনের তাত্ত্বিক আলোচনায় প্রায় সব সমাজতত্ত্ববিদ একটি বিষয়কে গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন, তা হলো সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সামাজিক পরিবর্তন হয়। সামাজিক পরিবর্তনে সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তন এবং এ–সম্পর্কীয় সংশ্লিষ্ট কার্যাবলির পরিবর্তন, দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত আদর্শ পরিবর্তন, প্রচলিত মূল্যবোধের পরিবর্তন, সামাজিক বিধি ও আচার আচরণ পরিবর্তন ও প্রথার পরিবর্তন, ব্যক্তির ও গোষ্ঠীর পারস্পরিক সম্পর্কের পরিবর্তনসহ সামগ্রিক সমাজব্যবস্থায় রূপান্তর বা স্থানান্তর সমাজকাঠামোকে প্রভাবিত করে, তথা পরিবর্তন করে।

আর এই পরিবর্তনের অনেক কারণ রয়েছে, যেমন: মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে, মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও অবস্থার কারণে পরিবর্তন, সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়ায় পরিবর্তন, তথ্য ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের ও ব্যবহারের কারণে পরিবর্তন, শিল্প সম্প্রসারণের কারণে পরিবর্তন, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সহজ যোগাযোগের কারণে পরিবর্তন, জীবনধারণের বিভিন্ন অনুষঙ্গের সহজলভ্যতার জন্য, যেমন: বিদ্যুৎ, আবাসন, স্বাস্থ্যসুবিধা ইত্যাদির কারণে পরিবর্তনগুলোকে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। উল্লিখিত কারণগুলো সরাসরি প্রভাবিত করে সমাজে বসবাসকারী ব্যক্তি ও সমষ্টির মানুষের মনঃসামাজিক অবস্থার ওপর, যা সামাজিক মূল্যবোধকে সরাসরি প্রভাবিত করে। ফলে দীর্ঘদিনের সামাজিক মূল্যবোধ পরিবর্তিত তথা স্থানান্তরিত হতে থাকে। আর এ সময়ে সমাজের মানুষের মধ্যে একধরনের মনঃসামাজিক অসহিষ্ণুতা ও অস্থিরতার প্রবেশ ঘটে। ফলে দীর্ঘদিনের গঠিত সামাজিক মূল্যবোধের বিচ্যুতি ঘটে। আর এই বিচ্যুতির বহিঃপ্রকাশ হলো বিভিন্ন অপ্রত্যাশিত আচরণ। প্রাসঙ্গিকভাবে বলা প্রয়োজন, সামাজিক মূল্যবোধ হলো সমাজে মানুষের আচার-আচরণের মাপকাঠি। সমাজে মানুষ বসবাস করতে গিয়ে কতগুলো মাপকাঠির দ্বারা তাদের আচার-আচরণ নিয়ন্ত্রিত করে থাকে। মূলত, সেগুলোর সমন্বিত বহিঃপ্রকাশ সামাজিক মূল্যবোধ।

ইতিবাচক পরিবর্তনের সঙ্গে আর কিছু নেতিবাচক পরিবর্তনের সমন্বয়ে একধরনের স্থানান্তরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সমাজ পরিবর্তিত হচ্ছে, যার প্রভাব সমাজকাঠামো থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান। আগেই বলেছি, সমন্বিত এই স্থানান্তরের সময় একধরনের অনিশ্চয়তা, অস্থিরতা, সম্ভাবনা দেখা দেয় সব ক্ষেত্রেই। ফলে তার নেতিবাচক প্রভাব কিছুটা হলেও দেখা যায় সময়ের ব্যবধানে। যেটা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন ব্যাপক বিশ্লেষণ এবং উদ্বুদ্ধকরণের প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মসূচির যথাযথ বাস্তবায়ন।

সমাজবিজ্ঞানীরা সামাজিক মূল্যবোধের যে সংজ্ঞায়িত করেছেন, তার মোদ্দাকথা হলো, সমাজে বসবাসকারী মানুষের আচার-আচরণ যে মাপকাঠি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তার সমন্বিত রূপই হলো সামাজিক মূল্যবোধ; যদিও এই সামাজিক মূল্যবোধ পরিবর্তিত হয়। সামাজিক মূল্যবোধের মূল ভিত্তি হলো আদর্শ, নীতি–নৈতিকতা এবং মানুষের ধ্যানধারণা। তবে এটা প্রতিষ্ঠিত যে সামাজিক মূল্যবোধ সমাজের মানুষের মধ্যে ঐক্য তৈরি করে। ন্যায়-অন্যায় ও অবিচার প্রতিরোধে প্রতিবাদ–প্রতিরোধ করতে উদ্বুদ্ধ করে। আবার এর পাশাপাশি সামাজিক মূল্যবোধকে দুভাবে দেখা যায়—ইতিবাচক ও নেতিবাচক মূল্যবোধ। আর এই নেতিবাচক মূল্যবোধে সমাজের মানুষের কিছু অংশের অপ্রত্যাশিত, অনাকাঙ্ক্ষিত ও ধ্বংসাত্মক আচার–আচরণের বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়। সাম্প্রতিক সময়ের কিছু কিছু ঘটনা তারই বাহ্যিকরূপ।

বর্তমান বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থার সামগ্রিক পরিবর্তন তথা স্থানান্তর ঘটেছে। এ পরিবর্তন প্রতিটি ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান। এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তনগুলো পরিসংখ্যানগতভাবে প্রকাশ পাচ্ছে, যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীত হচ্ছে। পাশাপাশি সামাজিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নেতিবাচক কিছু বিষয় পরিলক্ষিত হচ্ছে, যেমন: শিক্ষক নিগ্রহ, ধর্ষণ, মাদকের ব্যাপকতা, নারী নির্যাতন ইত্যাদি সামাজিক অস্থিরতা। বাংলাদেশে বর্তমানে উল্লেখযোগ্য হারে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, যেমন: মাথাপিছু আয়, রিজার্ভ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, তথ্য ও প্রযুক্তি খাতের উন্নয়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, রপ্তানি বৃদ্ধিসহ নানা খাতের উন্নয়ন দৃশ্যমান। ঠিক তেমনিভাবে সামাজিক খাতেরও উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন, যেমন: শিক্ষার হার বৃদ্ধি, জনসংখ্যা ও মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাস, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, আধুনিক তথ্য ও প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার, আবাসন, সুপেয় পানির প্রাপ্যতা, পয়োনিষ্কাশন–সুবিধা, সর্বোপরি জীবনযাত্রার মানের উন্নয়ন আজ দৃশ্যমান। তবে ব্যতিক্রম তো কিছু আছেই।

সুতরাং ইতিবাচক পরিবর্তনের সঙ্গে আর কিছু নেতিবাচক পরিবর্তনের সমন্বয়ে একধরনের স্থানান্তরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সমাজ পরিবর্তিত হচ্ছে, যার প্রভাব সমাজকাঠামো থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান। আগেই বলেছি, সমন্বিত এই স্থানান্তরের সময় একধরনের অনিশ্চয়তা, অস্থিরতা, সম্ভাবনা দেখা দেয় সব ক্ষেত্রেই। ফলে তার নেতিবাচক প্রভাব কিছুটা হলেও দেখা যায় সময়ের ব্যবধানে। যেটা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন ব্যাপক বিশ্লেষণ এবং উদ্বুদ্ধকরণের প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মসূচির যথাযথ বাস্তবায়ন। কেননা, শুধু আইনের প্রয়োগে সমাজের নেতিবাচক বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, বিশেষভাবে প্রয়োজন উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচির ব্যাপক সম্প্রসারণ।

সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাগুলো সামাজিক মূল্যবোধে ক্ষত সৃষ্টি করছে। এই ক্ষতকে বড় করতে দেওয়ার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। যেটা সামগ্রিক সামাজিক উদ্যোগের মধ্য দিয়ে রোধ করা সম্ভব। তবে যদি আইনের প্রয়োগ প্রয়োজন হয়, সেটাও সমন্বিতভাবে করতে হবে। প্রাসঙ্গিকভাবে সামাজিক মূল্যবোধকে সামনে রেখে সামাজিক দায়বদ্ধতাকে আপামর জনসাধারণের মধ্যে তুলে ধরতে হবে। যেমন শিক্ষক নিগ্রহের ঘটনা প্রতিরোধে যদি স্থানীয় এলাকার রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নেতৃবৃন্দ, এমনকি মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিতসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের প্রধানেরা সমন্বিতভাবে এগিয়ে এসে প্রতিরোধ করত, তাহলে এ ধরনের ঘটনা রোধ করা সম্ভব হতো, যার প্রভাব ভবিষ্যতে ইতিবাচক হতো। সবশেষে এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে সামাজিক পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় পরিবর্তিত পরিস্থিতি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে সম্মিলিতভাবে স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক উদ্যোগ, স্থানীয় সব পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের (প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক) ভূমিকা সক্রিয়করণ, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগ এবং উদ্বুদ্ধকরণ কার্যক্রম গ্রহণে গুরুত্বারোপ করতে হবে। উল্লিখিত এ ক্ষেত্রগুলোর সমন্বিত উদ্যোগই পরিবর্তিত সমাজের পরিবর্তিত সামাজিক মূল্যবোধকে গঠনমূলক পর্যায়ে নিয়ে যাবে, যা ইতিবাচক সামাজিক মূল্যবোধ গঠনে সহায়ক ও কার্যকর হবে বলে আশা করা যায়।

অধ্যাপক ড. মো. ছাদেকুল আরেফিন উপাচার্য, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন