সম্প্রতি প্রথম আলো আয়োজিত ‘জলবায়ুজনিত প্রভাবের অ-অর্থনৈতিক ক্ষতি’–বিষয়ক একটি গোলটেবিল আলোচনায় শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার আবদুল বারেক ও জাজিরা উপজেলার বিলকিস আক্তারের সঙ্গে পরিচয়ের সুযোগ হলো।
আবদুল বারেক তাঁর জীবদ্দশায় নদীভাঙনের কারণে আটবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। অন্য এলাকায় আশ্রয় নিতে গিয়ে তাঁকে ‘রোহিঙ্গা’ বলে বিদ্রূপের শিকার হতে হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এমন অনেক প্রভাব আছে, যা শুধু টাকা দিয়ে মাপা সম্ভব নয়। উন্নত দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণের ফলে আবদুল বারেক ও বিলকিস আক্তারের মতো মানুষেরা আজ নিজ দেশে পরবাসী ও নিঃস্ব।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা শীর্ষ দেশগুলোর একটি। এই অনাকাঙ্ক্ষিত অবস্থানে থেকেও আন্তর্জাতিক জলবায়ু কূটনীতিতে দেশটি নিয়মিতভাবে গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। বিশেষ করে প্যারিস চুক্তির অধীন ‘জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান’–এর (এনডিসি ৩.০) মাধ্যমে বাংলাদেশ ২০৩৫ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ প্রায় ২০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এর একটি অংশ নিজস্ব উদ্যোগে এবং বড় একটি অংশ আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি ‘বাংলাদেশ ক্লাইমেট প্রসপারিটি প্ল্যান’-এর মাধ্যমে জলবায়ুঝুঁকি মোকাবিলা করে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধির দিকে অগ্রসর হওয়ার একটি দীর্ঘমেয়াদি রূপকল্প আমাদের রয়েছে।
বাংলাদেশ কার্বন নিঃসরণকারী দেশ না হয়েও জলবায়ু পরিবর্তনের ফল ভোগ করছে সবচেয়ে বেশি। তাই অভিযোজনের কৌশলকে শক্তিশালী করতে বাংলাদেশ বরাবরই সচেষ্ট। জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (এনএপি), ডেলটা প্ল্যান ২১০০ এবং জলবায়ু কৌশলপত্রের মাধ্যমে একটি বিস্তারিত অভিযোজনের কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। তবে প্রশ্ন হলো, আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি ও জাতীয় পরিকল্পনার আলোকে আমাদের বাস্তব অগ্রাধিকারগুলো কি মাঠপর্যায়ে যথেষ্ট স্পষ্ট?
প্রথমত, বাংলাদেশের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় (এনএপি) ‘ক্ষতি ও ক্ষয়ক্ষতি’কে (লস অ্যান্ড ড্যামেজ) বিনিয়োগের একটি শক্তিশালী ‘যুক্তি’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অর্থাৎ আজ অভিযোজনে বিনিয়োগ করলে ভবিষ্যতে ক্ষয়ক্ষতির ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি এবং অপরিবর্তনীয় ক্ষতি—যেমন স্থায়ীভাবে ভূমি হারানো, বাস্তুচ্যুতি বা লবণাক্ততার কারণে জীবিকা ও সংস্কৃতির পরিবর্তন মোকাবিলায় আমাদের এখনো কোনো স্বতন্ত্র জাতীয় কাঠামো গড়ে ওঠেনি।
আন্তর্জাতিকভাবে এখন ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ তহবিল নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আগামী জুনে বাংলাদেশ এই তহবিলে আবেদন করতে পারবে। এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো—আমাদের আবেদন করার মতো কারিগরি দক্ষতা কতটা এবং আমরা কতটা পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত সেখানে উপস্থাপন করতে পারব।
জলবায়ু পরিবর্তন কেবল পরিবেশগত সংকট নয়; এটি আমাদের উন্নয়ন, অর্থনীতি ও অস্তিত্বের প্রশ্ন। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারে পিছিয়ে নেই—এখন মূল চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়ন। তাই প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব অগ্রাধিকারে রূপ দিতে হলে স্পষ্ট নীতি, কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ নিশ্চিত করা জরুরি। সময় আর আমাদের পক্ষে নেই, এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়।
দ্বিতীয়ত, জলবায়ু অর্থায়নের ক্ষেত্রে একটি বড় সুযোগ এখনো আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। এনডিসি ৩.০ বাস্তবায়নে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন পড়বে। এই অর্থ ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী ‘প্রকল্প পাইপলাইন’, সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং বেসরকারি খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণ। এখানে এখনো আমাদের কাঠামোগত ঘাটতি রয়েছে।
তৃতীয়ত, ‘স্থানীয় নেতৃত্বে অভিযোজন’ (লোকালি লেড অ্যাডাপশন-এলএলএ) এখন বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত। সম্প্রতি অনুমোদিত বাংলাদেশের ‘ন্যাশনাল ফ্রেমওয়ার্ক ফর এলএলএ’ জলবায়ু পরিকল্পনাকে তৃণমূল পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার একটি কার্যকর রূপরেখা। এটি স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সরাসরি সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলছে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে স্থানীয় সরকার কাঠামোকে (যেমন ইউনিয়ন পরিষদ) কতটা শক্তিশালী করা যায় এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে তহবিল সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের হাতে পৌঁছায় কি না, তার ওপর।
চতুর্থত, জলবায়ু ও উন্নয়ন পরিকল্পনার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এখনো দৃশ্যমান। ডেলটা প্ল্যান বা পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় জলবায়ুর উল্লেখ থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে খাতভিত্তিক বিচ্ছিন্নতা দেখা যায়। ফলে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সব সময় জলবায়ু-সহনশীল হয়ে ওঠে না।
পঞ্চমত, জলবায়ুজনিত অভিবাসন বা অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি এখন এক রূঢ় বাস্তবতা। শরীয়তপুরের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ৯৮ শতাংশ মানুষ অন্তত একবার নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। খুলনা শহরে কাজের সন্ধানে আসা মানুষের বিশাল একটি অংশই জলবায়ু উদ্বাস্তু। বস্তি এলাকায় তাদের মানবেতর জীবনযাপন আমাদের উন্নয়ন অগ্রযাত্রার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
বর্তমান সরকার জন–আকাঙ্ক্ষা ও পরিবেশ সুরক্ষায় আন্তরিক। সরকারের প্রাথমিক অঙ্গীকারগুলোয় বন সংরক্ষণ, নদী পুনরুদ্ধার ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো বিষয়গুলো স্থান পেয়েছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনকে কেবল পরিবেশের অংশ হিসেবে না দেখে একটি পৃথক ‘নীতিগত অগ্রাধিকার’ হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারগুলোকে নজরে এনে এগুলোর বাস্তবায়ন কাঠামো, নির্দিষ্ট সময়সীমা ও পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণ এখন সময়ের দাবি।
জলবায়ু ন্যায্যতার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত দৃঢ়। তবে এই বৈশ্বিক অবস্থানকে বাস্তব অগ্রাধিকারে রূপান্তর করতে তিনটি ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন:
১. অর্থনৈতিক ও অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি পরিমাপের জন্য একটি সুস্পষ্ট জাতীয় কাঠামো ও বাস্তবায়ন নীতিমালা প্রণয়ন করা। ২. আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল ব্যবহারের জন্য কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অর্থ ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। ৩. পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় স্থানীয় সরকারকে কেন্দ্রবিন্দুতে আনা, তাদের জ্ঞান ও দক্ষতা উন্নয়ন এবং তৃণমূল পর্যায়ে কার্যকারিতা নিশ্চিত করা। সব ক্ষেত্রে ‘কীভাবে’ কাজগুলো করতে হবে, তা নির্ধারণ করে দিতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তন কেবল পরিবেশগত সংকট নয়; এটি আমাদের উন্নয়ন, অর্থনীতি ও অস্তিত্বের প্রশ্ন। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারে পিছিয়ে নেই—এখন মূল চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়ন। তাই প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব অগ্রাধিকারে রূপ দিতে হলে স্পষ্ট নীতি, কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ নিশ্চিত করা জরুরি। সময় আর আমাদের পক্ষে নেই, এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়।
ফারহানা আফরোজ উন্নয়নকর্মী