নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশ: দরকার জনমুখী ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র

শপথ নিচ্ছেন নতুন মন্ত্রিসভার মন্ত্রীরা। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা, ঢাকা; ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বাংলাদেশ একটি তাৎপর্যপূর্ণ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে, যা হয়ে থাকতে পারে দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়।

দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ নাগরিক তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। নানান শঙ্কা পাশ কাটিয়ে, দেশের নাগরিকদের জন্য ভোটের দিনটি কেটেছে উৎসব, উদ্দীপনা আর দেশ নিয়ে নতুন স্বপ্নে।

অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের অধীনে নির্বাচন কমিশন একটি সুশৃঙ্খল ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া পরিচালনা করতে সক্ষম হয়েছে। এমন একটি দেশে যেখানে নির্বাচন মানেই মানুষের মনে আতঙ্ক তৈরি হওয়া, সেখানে এটি কোনো সাধারণ অর্জন নয়।

তবে আমাদের বাস্তববাদী হতে হবে। নির্বাচন অনুষ্ঠান ছিল এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে সহজ অংশটুকু।

ভোট দেওয়া একটি পদ্ধতিগত বিষয়মাত্র। কিন্তু ন্যায়ভিত্তিক শাসন প্রতিষ্ঠা করা একটি রূপান্তরমূলক কাজ। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠন করতে যাচ্ছে এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও তাদের মিত্ররা বিরোধী দলে বসছে। এর মধ্য দিয়ে ক্ষমতাপ্রাপ্তির প্রতিযোগিতামূলক লড়াই হয়তো শেষ হয়েছে এবারের মতো, কিন্তু সুশাসনের মূল লড়াইটি কেবল শুরু।

দেশের ৪০ শতাংশ যোগ্য ভোটার এই নির্বাচনে অংশ নেননি। কেউ স্বেচ্ছায় ভোটদানে বিরত থেকেছেন, কেউ নিরুৎসাহিত হয়েছেন। আবার অনেকেই হয়তো মনে করেছেন, ভোট দিলেও মৌলিক কোনো পরিবর্তন আসবে না। এই সংশয় দূর করাই হবে নতুন সরকারের প্রথম বড় চ্যালেঞ্জ। যে গণতন্ত্রে একটি বড় অংশের মানুষ নিজেদের রাজনৈতিকভাবে ঠিকানাহীন মনে করে, সেই গণতন্ত্র কেবল কাগজ-কলমেই স্থিতিশীল।

বাংলাদেশে কোনোকালে নীতি বা কৌশলের অভাব ছিল না। আমাদের সমস্যা হলো পুরোনো বাজে অভ্যাসের আধিক্য। দলীয় পৃষ্ঠপোষকতা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, ক্ষমতার চরম কেন্দ্রীকরণ এবং প্রভাবশালীদের প্রতি অন্ধ আনুগত্য। এসব অভ্যাস আগেও সরকার পরিবর্তনের পরও টিকে ছিল। সচেতনভাবে এসবের মূলোৎপাটন করা না হলে এবারও এগুলো বহাল তবিয়তে টিকে থাকবে হয়তো।

দেশের সংবিধানে আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং জীবন ও স্বাধীনতার সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়া আছে। এখানে আইনি কাঠামোর কোনো ঘাটতি নেই, ঘাটতি রয়েছে রাজনৈতিক সদিচ্ছার। থানাসহ অন্যান্য জরুরি সেবাপ্রাপ্তির স্থানগুলো যদি আগের মতোই দলীয় প্রভাবমুক্ত হতে না পারে, আদালতের মামলাগুলো যদি বছরের পর বছর ঝুলে থাকে এবং ক্ষমতাসীন দলের নৈকট্যই যদি বিচার পাওয়ার মাপকাঠি হয়, তবে এই নির্বাচনী গণতন্ত্র নিয়মরক্ষা ছাড়া আর কিছুই নয়।

নতুন প্রশাসন অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের কথা বলছে। ব্যাংক খাত স্থিতিশীল করা, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো এবং প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার মতো বিষয়গুলো উঠে এসেছে। এসব অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কিন্তু কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া কেবল প্রবৃদ্ধির হিসাব কষলে তা ক্ষমতাশালীদের পকেটই ভারী করে। বাংলাদেশে বৈষম্য দূর না করেই অর্থনীতির আকার বড় হওয়ার অতীত ইতিহাস রয়েছে। তাই এখন মূল প্রশ্ন হলো, অর্থনীতির এই পুনরুদ্ধার কি জনমুখী হবে, নাকি ক্ষমতামুখী?

শুরুটা করতে হবে নারীদের দিয়ে। তাঁরা মোট জনসংখ্যার ৫১ শতাংশ হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্র গঠনের অংশীদার হিসেবে মর্যাদা পান না। তাঁদের শুধু ভোটব্যাংক হিসেবেই দেখা হয়। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় নারী ও কন্যারা জনপরিসরে নিরাপত্তাহীনতা, সহিংসতা এবং প্রকাশ্য বিদ্বেষের শিকার হয়েছেন। এ ধরনের সহিংসতাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা অনিবার্য হিসেবে দেখার যে সহজাত প্রবৃত্তি, তা এবার বন্ধ করতে হবে।

আরও পড়ুন

ধর্ষণের শিকার একজন নারীর বিচার পাওয়া কোনোভাবেই তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর করতে পারে না। সালিসের মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়ার বিকল্প তৈরি করা যাবে না। সংস্কৃতি রক্ষার নামে নীতি পুলিশিং বা মরাল পুলিশিংয়ের কোনো সুযোগ নেই। নারী সংবেদনশীল শাসনব্যবস্থা বলতে এমন একটি বাজেট বোঝায়, যেখানে মজুরিবিহীন সেবামূলক কাজের স্বীকৃতি থাকে। এমন শ্রমনীতি থাকতে হবে, যা গৃহকর্মী ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নারীদের সম্মানহানির ঝুঁকির পরিবর্তে অধিকারধারী নাগরিক হিসেবে দেখতে হবে।

এরপর আসে যুবসমাজের কথা। সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে না পারলে বাংলাদেশের জনমিতিক লভ্যাংশের সুবিধা দ্রুতই শেষ হয়ে যাবে। কর্মসংস্থানহীন শিক্ষা শুধু ক্ষোভের জন্ম দেয়। যে শিশুশ্রম আইন আজও ঝুঁকিপূর্ণ খাতে কিশোরদের কাজ করাকে প্রশ্রয় দেয়, তার জরুরি পর্যালোচনা প্রয়োজন। যাঁরা প্রকৃত অর্থনীতি সচল রেখেছেন, সেই লাখ লাখ অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকের ন্যূনতম সুরক্ষা, ন্যূনতম মজুরি এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একটি আধুনিক রাষ্ট্র তার বিবেকের দায়ভার কোনোভাবেই বাজারের ওপর ছেড়ে দিতে পারে না।

বাস্তবতার দোহাই দিয়ে দুর্নীতিকে মেনে নেওয়া, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতাকে ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য বলে স্বাভাবিকীকরণ করা, সুযোগ পেতে দলীয় পৃষ্ঠপোষকতা মেনে নেওয়া এবং মিত্রদের রক্ষা করে সমালোচকদের শাস্তি দেওয়ার যে সংস্কৃতি, তা থেকে আমাদের বের হতে হবে।

এই সবকিছুর ভিত্তি হলো প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর মানুষের আস্থা তলানিতে ঠেকেছে। বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা মানুষের বিশ্বাস কেড়ে নিয়েছে। দলীয় আনুগত্যকে রাষ্ট্রের ক্ষমতার সমার্থক হিসেবে দেখার প্রবণতা প্রশাসনের ভেতরটাকে ধ্বংস করে দেয়। বড় বড় মেগা প্রকল্প ঘোষণার চেয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন করে গড়ে তোলা অনেক বেশি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান ছাড়া যেকোনো উন্নয়নই আসলে একটি ভ্রান্তিবিলাস।

এই সবকিছু ঘটছে ক্রমাগত বাড়তে থাকা বাহ্যিক চাপের মধ্যে। বাংলাদেশ এখন একটি জটিল ভূরাজনৈতিক বলয়ের কেন্দ্রে অবস্থান করছে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে কৌশলগত প্রতিযোগিতা এখন আর কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়। এটি আমাদের বাণিজ্য পথ, জ্বালানি সরবরাহ, অবকাঠামো অর্থায়ন এবং কূটনৈতিক পছন্দকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে। নতুন সরকারকে নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে শক্তিশালী প্রতিবেশী এবং বিশ্বশক্তির সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হবে। পররাষ্ট্রনীতি কোনোভাবেই তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের বিষয় হতে পারে না। একে স্বচ্ছ জাতীয় স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে দাঁড় করাতে হবে।

এর পাশাপাশি জলবায়ু সংকট দ্রুত ঘনীভূত হচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড় এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধির ঝুঁকিতে বাংলাদেশের মতো খুব কম দেশই রয়েছে। জলবায়ুর এই ঝুঁকি কোনো সুদূরপ্রসারী পূর্বাভাস নয়, এটি উপকূলীয় জেলা এবং শহরের বস্তিগুলোতে বসবাসকারী মানুষের প্রতিদিনের বাস্তব অভিজ্ঞতা। জলবায়ু অভিযোজনের জন্য প্রয়োজন বিনিয়োগ, সঠিক পরিকল্পনা ও সততা। এখানে আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেই অর্থ যেন পরিচিত দুর্নীতিবাজ চক্রের পকেটে না গিয়ে প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছায়, তার জন্য দেশের ভেতরে জবাবদিহি নিশ্চিত করা আরও বেশি জরুরি।

যেকোনো কৌশলের চেয়ে চর্চা বা সংস্কৃতি অনেক বেশি শক্তিশালী। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপরেখা, জলবায়ু কর্মপরিকল্পনা বা নারী নীতিসহ নানা কৌশল রয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো আমাদের চর্চায়। বাস্তবতার দোহাই দিয়ে দুর্নীতিকে মেনে নেওয়া, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতাকে ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য বলে স্বাভাবিকীকরণ করা, সুযোগ পেতে দলীয় পৃষ্ঠপোষকতা মেনে নেওয়া এবং মিত্রদের রক্ষা করে সমালোচকদের শাস্তি দেওয়ার যে সংস্কৃতি, তা থেকে আমাদের বের হতে হবে।

নতুন সরকার এখন একটি কঠিন পছন্দের মুখোমুখি। তিনি কি অনুগতদের একটি সুরক্ষিত বলয় থেকে দেশ শাসন করবেন, নাকি নীতিগত উন্মুক্ততার জায়গা থেকে দেশ পরিচালনা করবেন? চাটুকার পরিবেষ্টিত থাকাটা নিরাপদ মনে হতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে তা অত্যন্ত ঠুনকো। টেকসই নেতৃত্বের জন্য ভিন্নমতের কাছাকাছি থাকা প্রয়োজন। ক্ষমতাকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক না করে জবাবদিহিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া জরুরি।

তবে এই হিসাব-নিকাশ শুধু সরকারের একার নয়। নাগরিকদেরও সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তাঁরা সত্যিই কাঠামোগত পরিবর্তন চান কি না। ব্যবসায়ী নেতারা কি অবৈধভাবে লেনদেনের সংক্ষিপ্ত পথ এড়িয়ে চলবেন? দলীয় সমর্থকেরা কি সুবিধা আদায়ের জন্য কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা বন্ধ করবেন? অপরাধী নিজেদের লোক হলেই সমাজ কি তার সহিংসতাকে প্রশ্রয় দেওয়া বন্ধ করবে? সমাজ যদি প্রকাশ্যে যে বিষয়গুলোর নিন্দা করে, গোপনে আবার সেগুলোর সঙ্গেই আপস করে, তবে কোনো কাঠামোগত সংস্কারই টিকবে না।

২০২৬ সালের নির্বাচন প্রমাণ করেছে, বাংলাদেশ একটি শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক ভোটের আয়োজন করতে সক্ষম। এ জন্য সংশ্লিষ্টরা সাধুবাদ পেতেই পারেন। কিন্তু কেবল ব্যালট পেপার অন্যায়ের মূলোৎপাটন করতে পারে না। এটি কেবল একটি সম্ভাবনা তৈরি করে মাত্র। এখন আসল প্রশ্ন হলো, শান্তিপূর্ণ ভোটের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক পন্থায় ফেরার মুহূর্তটি কি কেবল ক্ষমতা হস্তান্তরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? নাকি এটি অন্তর্ভুক্তি, প্রাতিষ্ঠানিক সততা এবং জেন্ডার সমতাভিত্তিক ন্যায়নিষ্ঠ শাসনের দিকে একটি সত্যিকারের বাঁকবদল হবে?

সবচেয়ে সহজ কাজটুকু শেষ হয়েছে। আসল হিসাব-নিকাশ শুরু এখন।

  • ফারাহ্ কবির কান্ট্রি ডিরেক্টর, একশনএইড বাংলাদেশ

    *মতামত লেখকের নিজস্ব