ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির পাকিস্তান সফর নিয়ে অনেক আশা ছিল। ভাবা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি আলোচনা আবার শুরু হবে। কিন্তু তা হয়নি। হোয়াইট হাউস জানিয়েছিল, তারা তাদের দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারকে ইসলামাবাদে পাঠাবে। শান্তি আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইরান জানিয়ে দেয়, তারা কোনো মার্কিন প্রতিনিধির সঙ্গে দেখা করবে না।
এরপর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রতিনিধিদের পাকিস্তান সফর বাতিল করেন। তবে তিনি কূটনীতির দরজা পুরোপুরি বন্ধ করেননি। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখলেন, ইরান চাইলে ফোনে কথা হতে পারে।
দুই সপ্তাহ ধরে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছিল। কঠোর অবস্থান নিয়েছিল দুই পক্ষই। এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তান মধ্যস্থতার চেষ্টা করে। দ্বিতীয় দফার আলোচনা না হওয়ায় হতাশা তৈরি হয়। তবে কূটনীতির পথ পুরো বন্ধ হয়নি। দুই পক্ষই আসলে সংঘাত থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছে। কিন্তু সমস্যা একটাই। কে আগে নরম হবে? কেউই আগে ছাড় দিতে চায় না। কারণ, তাতে অন্য পক্ষ ‘জয়’ দাবি করতে পারে। এটি একধরনের মনস্তাত্ত্বিক অচলাবস্থা।
এপ্রিলের ১১ তারিখ ইসলামাবাদে প্রথম দফার মুখোমুখি আলোচনা হয়েছিল। তা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি। তবে একটি সম্ভাবনাময় প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয় দফার আলোচনা আটকে যায়। এর পেছনে কয়েকটি কারণ ছিল।
সবচেয়ে বড় কারণ ছিল হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল ওই অঞ্চলে মার্কিন সেনা উপস্থিতি বাড়ানো। এরপর মার্কিন বাহিনী একটি ইরানি পতাকাবাহী জাহাজ আটক করে। এটি উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। ইরান একে যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন বলে। তারা এটিকে জলদস্যুতার সঙ্গে তুলনা করে। প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকিও দেয়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানায়, তারা আলোচনায় যাবে না। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত দাবি করছে। তাদের অবস্থান বারবার বদলাচ্ছে। একই সঙ্গে চলছে নৌ অবরোধ। এর জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালি আবার বন্ধ করে দেয়। তারা জানায়, যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ না তুললে এই পথ খোলা হবে না।
ট্রাম্প বলছেন, অবরোধ চলবে। ইরানকে চুক্তিতে রাজি হতে হবে। এই পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপে পরিস্থিতি অনিশ্চিত হয়ে ওঠে।
ইরান আত্মবিশ্বাসী। কারণ, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চাপের মুখেও টিকে আছে। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে। অন্যদিকে ট্রাম্পের বারবার
অবস্থান বদলানো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এখানে ইসরায়েলও একটি বড় বাধা। তারা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির পক্ষে নয়।
দুই পক্ষই একে অন্যকে যুদ্ধবিরতি ভঙ্গের অভিযোগ তুলছে। ১৪ দিনের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে পাকিস্তান সক্রিয় হয়ে ওঠে। শেষ মুহূর্তে তারা ট্রাম্পকে রাজি করায়। তিনি যুদ্ধবিরতি অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ান। কিন্তু অবরোধ তুলে নেওয়ার বিষয়ে রাজি হননি। ভাবা হয়েছিল, যুদ্ধবিরতি বাড়লে আলোচনা আবার শুরু হবে। কিন্তু ইরান তাতে সাড়া দেয়নি। তাদের বক্তব্য পরিষ্কার। চাপ ও হুমকির মধ্যে তারা আলোচনা করবে না।
এখন প্রশ্ন, কী হলে আলোচনা আবার শুরু হতে পারে? প্রথমত, যুদ্ধ কোনো সমাধান নয়। এটি এমন এক সংঘাত, যেখানে কেউ জিতবে না। ইরান বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রও রক্ষা পাবে না। যদি দীর্ঘ যুদ্ধ শুরু হয়, পুরো অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস হতে পারে। এর প্রভাব পড়বে বিশ্ব অর্থনীতিতে। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও এর প্রভাব পড়বে। মূল্যস্ফীতি বাড়ছে ইতিমধ্যে। এই অবস্থায় নতুন চাপ তৈরি হবে।
রাজনৈতিক দিক থেকেও ট্রাম্প চাপে পড়বেন। মধ্যবর্তী কংগ্রেস নির্বাচন সামনে। এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রে জনপ্রিয় নয়। তার জনপ্রিয়তাও কমে গেছে।
ইরান আত্মবিশ্বাসী। কারণ, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চাপের মুখেও টিকে আছে। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে। অন্যদিকে ট্রাম্পের বারবার
অবস্থান বদলানো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এখানে ইসরায়েলও একটি বড় বাধা। তারা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির পক্ষে নয়।
তাহলে সমাধান কোথায়? মূল চাবিকাঠি হলো পারমাণবিক ইস্যু। এই জায়গায় সমঝোতা হলে পথ খুলতে পারে। ইরান যদি নিশ্চয়তা দেয়, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র একটি চুক্তি দেখাতে পারবে। ইরান ইতিমধ্যে প্রস্তাব দিয়েছে, তারা এটির মাত্রা কমাবে এবং আন্তর্জাতিক তদারকির আওতায় রাখবে। সবচেয়ে বড় কথা, যুক্তরাষ্ট্রকে বুঝতে হবে একটি বাস্তবতা। তা হলো, যুদ্ধক্ষেত্রে যা অর্জন করা যায়নি, তা আলোচনার টেবিলে জোর করে আদায় করা যায় না।
মালিহা লোধি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জাতিসংঘে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত
ডন থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত