সকালে ঘুম ভাঙতেই অঘোর মেঘ। পুরো ঢাকা শহর কালো চাদরে ঢেকে গেছে যেন। এমন দৃশ্যে যে কারও মনে পড়ে উঠবে ভূপেন হাজারিকার গাওয়া, ‘মেঘ থম থম করে’। আলমগীর কবিরের সীমানা পেরিয়ে সিনেমার মাস্টারপিস গান। সেই গানটি গুনগুন করতে না করতেই মেঘের হুংকার মানে বজ্রপাত, পরপর কয়েক দফা। কত দিন বৃষ্টি হয় না। চারদিকে অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণে মৃত্যুর হাহাকার। একপশলা বৃষ্টিই যেন এখানে প্রশান্তি এনে দিতে পারে। কিন্তু সেখানে যখন এমন বজ্রপাত হানা দেয়, তখন অন্য আশঙ্কাও চলে আসে মনে। 

যে বৃষ্টির জন্য এত প্রতীক্ষা, সে তো শুধু জলের আবাহনই নয়, আছে কালবৈশাখীর ছোবলও। বজ্রপাতের কথা তো বললামই। এ মৌসুমের আবহাওয়ার ভাবই এটা। সেই ভাবে সর্বনাশ হয়ে যায় অনেক কৃষক পরিবারের। গত বুধবার রাজধানীর সকালের সেই মেঘ নাগরিক মনে কিছুটা রোমান্টিক আবহ তৈরি করে উধাও হয়ে গেলেও দেশের অন্য জায়গায় ঠিকই নিজের ভাব প্রকাশ করে দিয়েছে। শরীয়তপুরে বজ্রপাতে মারা গেছেন তিনজন। মাছের খামারে আর কৃষিকাজে গিয়ে মারা গেলেন দুই তরুণ। বৃষ্টি শুরু হলে ফসলি জমি থেকে ত্বরা করে গরু নিয়ে বাড়িতে ফিরছিলেন এক কিষানি। তাঁর সঙ্গে মারা যায় গরুটিও। বাংলার কৃষিসমাজে গবাদিপশুর সঙ্গে কিষানির যে গভীর ও প্রেমময় সম্পর্ক, মৃত্যুতেও সেটি যেন অটুট থাকে।   

কালবৈশাখীর মৌসুমের শুরুতেই বজ্রপাতে মারা গেলেন তিনজন। এরপর গোটা বর্ষা মৌসুম পড়ে আছে। আষাঢ়–শ্রাবণের বারিধারার বন্দনা করে গেছেন বাংলার কবিরা আবহমান কাল থেকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই বন্দনায় বড় ধরনের বৈদ্যুতিক ক্ষতরেখা এঁকে যাচ্ছে প্রকৃতি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বে বজ্রপাতে যত মানুষ মারা যায়, তার এক-চতুর্থাংশই বাংলাদেশে। ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, প্রতিবছর গড়ে বজ্রপাতে ২৬৫ জনের মৃত্যু হচ্ছে। তবে কয়েক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও আবহাওয়াবিজ্ঞানী টমাস ডব্লিউ স্মিডলিন ‘রিস্কফ্যাক্টরস অ্যান্ড সোশ্যাল ভালনারেবিলিটি’ শীর্ষক এক গবেষণায় বলেছেন, ‘বাংলাদেশে বজ্রপাতে বছরে প্রায় দেড় শ মানুষের মৃত্যুর খবর সংবাদমাধ্যমে এলেও প্রকৃতপক্ষে তা পাঁচ শ থেকে এক হাজার।’ এসব হতভাগার বেশির ভাগ কিষান–কিষানি। 

গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বর সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় বীজতলা তৈরি করতে গিয়ে বজ্রপাতে মারা যান একসঙ্গে আটজন কৃষক। শ্যালো মেশিনের ঘরে আশ্রয় নিয়েও রক্ষা পাননি। ২০২১ সালের আগস্টের শুরুতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ট্র্যাজেডির কথা কি কখনো ভুলে যাওয়া সম্ভব? পদ্মাপারে প্রবল বজ্রপাতে টিনের ছাউনিতে আশ্রয় নিলেও একসঙ্গে ১৭ বরযাত্রী নিমেষেই শেষ। তাঁদেরও অনেকে ছিলেন কৃষক। এখন বজ্রপাতে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের লাশ নাকি কালোবাজারে ব্যাপক চাহিদা। কবরস্থান থেকে এমন লাশ চুরি হয়ে যায়। সে জন্য কংক্রিটের ঢালাই দিয়ে কবর দেওয়া হয়েছিল তাঁদের অনেককে। আর ঘরের ভেতরে কবর দেওয়ার ঘটনা তো আগেই হয়েছে। মৃত্যুর পরও রক্ষা নেই! 

শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘দেখা হলে বজ্রপাত!’ কবিতাটি অনেকেরই নিশ্চয় জানা আছে। অবশ্যই প্রেমের কবিতা এটি। কৃষকের মতো প্রেমিক আর কে আছে এ ধরায়। প্রকৃতি আর মাটির প্রেমিক। বীজ আর শস্য দিয়ে যে লিখে যায় বিরহী প্রেমপত্র। 

সেই প্রেমপত্রই যেন উঠে আসে শক্তির কবিতায়, 

‘আমি যেন বাজ-পড়া গাছ,

দাঁড়িয়ে রয়েছি স্থাণু, সর্বত্র জ্বলেছে।

খসে গেছে মাথা বুক সর্বত্র জ্বলেছে,

হাতে-পায়ে শক্তি নেই, চলচ্ছক্তিহীন

হয়েছি, দাঁড়িয়ে আছি তোমার সম্মুখে।’

ফসলের মাঠে চারাবীজ বুকে নিয়ে পড়ে থাকেন কৃষক। বাজ–পড়া গাছের মতো পুড়ে নিঃশেষ হয়ে যায় প্রকৃতির সন্তানেরা। বাস্তবতা হচ্ছে বজ্রপাতের আগাম সংকেত পাওয়া সম্ভব, কিন্তু অনেকেরই সেই ধারণা নেই। স্যাটেলাইট ও তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে আবহাওয়ার নানা দিক বিশ্লেষণ করে বজ্রপাতের পূর্বাভাস দিচ্ছেন বিজ্ঞানীরা এখন এবং সে পূর্বাভাস অনেকটা মিলেও যাচ্ছে। এর মাধ্যমে মানুষকে চাইলেই সতর্ক করা যায়। 

কৃষকের মৃত্যুতে কার কী এসে যায়! ঝড়–বাদলের দিনে কৃষকেরও কি ঘরে বসে থাকার সুযোগ আছে? তাঁর কথা কে ভাবে? আকাশ কালো হয়, অন্ধকার হয়ে আসে দুনিয়া। আর রবীন্দ্রনাথের ‘আষাঢ়’ কবিতার মতো কিষানির মন উছলে ওঠে, ‘দুয়ারে দাঁড়ায়ে ওগো দেখ্‌ দেখি/ মাঠে গেছে যারা তারা ফিরিছে কি...।’ সব কৃষকের নিরাপদে ঘরে ফেরা হোক।  

 ২০১৬ সালে বজ্রপাতে প্রায় ৩৫০ জন মারা যাওয়ার পর সরকার বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর বজ্রপাত রোধে নেওয়া হয় বিশেষ পরিকল্পনা এবং সতর্কীকরণ কর্মসূচি। জ্ঞান অর্জনের জন্য বেশ কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তাকেও পাঠানো হয় বিদেশে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা বজ্রপাতনিরোধক টাওয়ারের নকশা চূড়ান্ত করে তা স্থাপনের ব্যবস্থা নেবেন, এমনটাই কথা ছিল। আমরা জানি না, সে কাজ কত দূর হলো, সেই প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরাই–বা এখন কোথায়? গত বছর শুনেছিলাম আবারও কয়েক শ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। হয়তো আবারও কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশে পাঠানো হবে। বলা হয়েছিল, বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৩০ লাখ তালগাছ লাগানো হবে। কয়েক লাখ তালের আঁটি রোপণ করেই শেষ! বরং প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের লাগানো তালগাছের ওপর পড়ে শকুনের চোখ। সম্প্রতি রাজশাহীর বাগমারায় এমন অনেক তালগাছে কীটনাশক প্রয়োগ করে ৫০টি গাছ মেরে ফেলেন স্থানীয় ক্ষমতাসীন নেতা।

আমরা জেনেছি, একটি মার্কিন সংস্থার সহায়তায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বসানো যন্ত্র ৪৫ মিনিট আগেই বজ্রপাতের খবর দেয়। দেশটির অন্ধ্র প্রদেশের সরকারও আধুনিক সেন্সর বসিয়ে বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘটনা কমিয়ে এনেছে। তারা অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে সেটটপ বক্সের মাধ্যমে এসএমএস করে টেলিভিশনে সম্ভাব্য বজ্রপাতের খবর পাঠিয়ে থাকে। আমাদের আবহাওয়া অধিদপ্তরও বজ্রপাতের আগাম সংকেত জানতে ‘লাইটেনিং ডিটেকটিভ সেন্সর’ বসানোর প্রকল্প নিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র থেকে যন্ত্রপাতি কিনতে খরচ করা হয়েছে কোটি কোটি টাকাও। সেই যন্ত্র ১০ মিনিট থেকে আধা ঘণ্টা আগে বজ্রপাতের সংকেত দেবে। কিন্তু কৃষকেরা আদৌ কি সেই সংকেত পান? সেই যন্ত্রপাতিগুলোই–বা কেমন আছে, তা–ও আমরা জানি না।

কৃষকের মৃত্যুতে কার কী এসে যায়! ঝড়–বাদলের দিনে কৃষকেরও কি ঘরে বসে থাকার সুযোগ আছে? তাঁর কথা কে ভাবে? আকাশ কালো হয়, অন্ধকার হয়ে আসে দুনিয়া। আর রবীন্দ্রনাথের ‘আষাঢ়’ কবিতার মতো কিষানির মন উছলে ওঠে, ‘দুয়ারে দাঁড়ায়ে ওগো দেখ্‌ দেখি/ মাঠে গেছে যারা তারা ফিরিছে কি...।’ সব কৃষকের নিরাপদে ঘরে ফেরা হোক।  

রাফসান গালিবপ্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী