তাঁর ভাই এবং সাবেক অর্থমন্ত্রী বাসিল রাজাপক্ষেও দেশ ত্যাগ করেছেন বলে কোনো কোনো গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপক্ষে একটি নৌঘাঁটিতে আছেন বলে রোববার ব্রিটিশ গণমাধ্যমে বলা হয়েছে।

সব মিলে এটাই দাঁড়িয়েছে যে একসময়কার পরাক্রমশালী একটি পরিবারের সদস্যরা—যাঁদের সাতজন মন্ত্রিসভার সদস্য এবং প্রেসিডেন্ট ছিলেন, এখন পলাতক। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, সোমবার একপর্যায়ে প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা নৌপথে পালিয়ে যাওয়ার কথাও বিবেচনা করেছিলেন। জানুয়ারি মাস থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন, যা ৩১ মার্চ থেকে গণ–অভ্যুত্থানে রূপ নিয়েছে, তা ক্ষমতা থেকে কর্তৃত্ববাদী শাসকদের হটাতে পেরেছে।

কার্যত স্বতঃস্ফূর্ত এবং প্রচলিত অর্থে নেতৃত্বহীন একটি আন্দোলনের একটি বড় ধরনের সাফল্য ঘটল। এ পর্যায়ের সূচনা হয়েছে ১১ মে, যখন মাহিন্দা রাজাপক্ষে প্রধানমন্ত্রীর পদ ত্যাগ করতে বাধ্য হন। সে সময় প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া সম্ভবত ধরে নিয়েছিলেন, ভাইকে আপাতত ক্ষমতার বাইরে রাখার মধ্য দিয়ে ক্ষোভ প্রশমিত হবে এবং আন্দোলনে ভাটা পড়বে। কিন্তু সাংবিধানিকভাবে যেহেতু প্রেসিডেন্টই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, তাই তিনি ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবেন। রাজপথের বিক্ষোভকারীরা তাঁর এ চেষ্টাকে নস্যাৎ করে দিতে পেরেছে।

সংবিধানে প্রেসিডেন্টের যে অভাবনীয় ক্ষমতা দেওয়া আছে, তা সংকোচন না করে কর্তৃত্ববাদী শাসনের আশঙ্কাকে তিরোহিত করার উপায় নেই। যে কারণে বিক্ষোভকারীরা যে ছয় দফা দাবি তুলেছে, তাতে সর্বোচ্চ এক বছরের জন্য একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন, এই এক বছরের মধ্যে জনগণের অধিকার সংরক্ষিত হয় এমন একটি সংবিধান গণভোটের মাধ্যমে প্রণয়ন এবং প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা কমিয়ে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করার কথা বলা হয়েছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, সামনে কী হবে। প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষের পালিয়ে যাওয়া বা পদত্যাগের পর প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহেকে শ্রীলঙ্কার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দেশটির স্পিকার মাহিন্দা ইয়াপা আবেবর্ধনে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষে তাঁকে প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহেকে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট নিয়োগ দিতে বলেছেন। সংবিধানের ৩৭ ধারার ১ অনুচ্ছেদের আওতায় এ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, রনিল বিক্রমাসিংহে নিজেও বিক্ষোভকারীদের রোষের মুখে আছেন। দেখা যাচ্ছে, একদিকে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন তিনি, অন্যদিকে কাছাকাছি সময়ে বিক্ষোভকারীরা তাঁর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় দখল করে ফেলেছে। এর আগে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগেরও ঘোষণা দিয়েছিলেন। রনিল বিক্রমাসিংহে পদত্যাগ করবেন, এ ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে পার্লামেন্ট একজন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের চেষ্টা শুরু করেছিল। কিন্তু বিরোধী দলগুলো এ ব্যাপারে একমত হতে পারেনি। একজন নতুন প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের কাজটি খুব সহজ হবে বলে মনে হচ্ছে না।

এর বাইরেও তিনটি সমস্যা আছে। প্রথমত, বর্তমান পার্লামেন্টে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা হচ্ছে রাজাপক্ষের দল শ্রীলঙ্কা পদুজানা পেরামুনার (এসএলপিপি)। যদিও এই দলের একটি অংশ রাজাপক্ষের বিরোধী বলে ঘোষণা দিয়েছে এবং বিরোধী দলের সঙ্গে একত্রে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে, কিন্তু বিক্ষোভকারীরা এদের ওপর আস্থা রাখছে না। ফলে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শ্রীলঙ্কা পদুজানা পেরামুনা (এসএলপিপি), বিরোধী দলগুলো এবং বিক্ষোভকারীদের পছন্দ এক জায়গায় মিলবে, এমন আশা করা কঠিন।

দ্বিতীয় সমস্যা হচ্ছে, বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের পার্থক্য। এ আন্দোলনে প্রচলিত বিরোধী দলগুলোর কর্মীরা যোগ দিলেও আন্দোলনের নেতৃত্ব বা সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ তাঁদের হাতে নেই। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে একধরনের স্বতঃস্ফূর্ত নেতৃত্ব গড়ে উঠেছে। ১১ মের পর বিরোধী দলগুলো মাহিন্দা রাজাপক্ষের পদত্যাগেই সন্তুষ্ট ছিল এবং প্রেসিডেন্টের পদত্যাগের বিষয়ে খুব বেশি জোর দেয়নি। রাজপথের বিক্ষোভকারীরাই সেটা বহাল রেখেছে এবং শেষ পর্যন্ত গোতাবায়াকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছে। রাজপথ এবং বিরোধী দলের নেতৃত্বের এ দূরত্ব ঘোচানোর কী ব্যবস্থা হবে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ।

তৃতীয়ত, কোন ধরনের সরকার গঠন করা হবে। বিরোধী দলগুলো একটি সর্বদলীয় সরকার গঠনের জন্য চেষ্টা করছে। গত রোববার সর্বদলীয় সরকার গঠনের বিষয়ে একমত হয় রাজনৈতিক দলগুলো। কিন্তু বিক্ষোভকারীরা কোনো অবস্থায়ই সর্বদলীয় সরকার চায় না। তারা চায় একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হোক।

এ ধরনের ব্যবস্থা বর্তমান সংবিধানে নেই। ফলে সংবিধানের প্রচলিত কাঠামোর বাইরে গিয়েই সমাধান খোঁজার দরকার হবে, যেটা রাজনৈতিক দলগুলো এখনো ভাবছে না।

এই তিনটি সমস্যাই হচ্ছে শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক সংকটের নতুন অধ্যায়ের বিষয়। এগুলোর কীভাবে সমাধান হচ্ছে এবং তাতে করে ক্ষমতার ভারসাম্য কোন দিকে ঝুঁকছে, তার ওপরই শ্রীলঙ্কার রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে। রোববার সর্বদলীয় সরকার গঠনের বিষয়ে ঐকমত্যের কথা জানিয়ে দেশের প্রধান বিরোধী দল সামাজি জানা বালাওয়েগায়ার (এসজেবি) মহাসচিব রণজিৎ মাদ্দুমা বানদারা বলেছিলেন, ‘আমরা সব দলকে নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে একমত হয়েছি। এরপরই পার্লামেন্ট নির্বাচন হবে।’ কিন্তু আরেকটি পার্লামেন্ট নির্বাচন হলেই শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হবে না।

সংবিধানে প্রেসিডেন্টের যে অভাবনীয় ক্ষমতা দেওয়া আছে, তা সংকোচন না করে কর্তৃত্ববাদী শাসনের আশঙ্কাকে তিরোহিত করার উপায় নেই। যে কারণে বিক্ষোভকারীরা যে ছয় দফা দাবি তুলেছে, তাতে সর্বোচ্চ এক বছরের জন্য একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন, এই এক বছরের মধ্যে জনগণের অধিকার সংরক্ষিত হয় এমন একটি সংবিধান গণভোটের মাধ্যমে প্রণয়ন এবং প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা কমিয়ে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করার কথা বলা হয়েছে। শ্রীলঙ্কা সেই পথে অগ্রসর হবে, নাকি বর্তমান সংবিধানের মধ্যে সমাধান খোঁজার নামে প্রচলিত রাজনীতি এবং শাসনব্যবস্থাই বহাল রাখবে, সেটা আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে যাবে।

আলী রীয়াজ যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, আটলান্টিক কাউন্সিলের অনাবাসিক সিনিয়র ফেলো এবং আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন