সারা দেশে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী অঙ্গীকার। তবে এই অঙ্গীকার সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে প্রতিটি পদক্ষেপেই বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। কিন্তু কাজটি অসম্ভবও নয়।
২৮ মার্চ দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের জন্য বন বিভাগ ইতিমধ্যেই ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, দেশের প্রতিটি অঞ্চলের স্বতন্ত্র ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, পরিবেশগত প্রয়োজনীয়তা ও আর্থসামাজিক পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় নিয়ে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণকে ৬টি খাতে ভাগ করা হয়েছে।
আগামী ৫ বছরে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি—এই তিন ধাপে ভাগ করে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। প্রস্তাবিত প্রকল্পের ধারণাপত্রে যেসব প্রস্তাব রাখা হয়েছে, তাতে আশাবাদ যেমন আছে, তেমনি আছে স্বপ্নপূরণের অঙ্গীকারও। বন বিভাগের এই প্রকল্পে যদি পুরোপুরি আস্থা রাখা যেত, ভালোই হতো। কিন্তু পারছি না। কারণ, নিকট অতীতে বন বিভাগ গৃহীত ‘নিসর্গ’ এবং ‘সুফল’সহ বিভিন্ন প্রকল্পের অনিয়ম-দুর্নীতির ক্ষত এখনো মুছে যায়নি।
এসব প্রকল্প বন সংরক্ষণে কতটা কাজে লেগেছে, তা জনসমক্ষে উপস্থাপন করা উচিত। এ ছাড়া ২৭ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, বন বিভাগের কোনো কর্মকাণ্ডই সুখকর নয়। দেশের বন-পাহাড়ের দিকে তাকালে এ কথার সত্যতা মিলবে! তবু আমরা সরকারের সদিচ্ছাকে স্বাগত জানাতে চাই। কারণ, নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকারকেই সজাগ ও তৎপর হতে হবে। না হয় এই প্রকল্প এবং প্রতিশ্রুতি প্রহসনে পরিণত হবে।
এই কর্মোদ্যোগের সঙ্গে আরও কিছু অত্যাবশ্যকীয় বিষয় এখানে উল্লেখ করতে চাই। যা শুধু পরিকল্পনা নয়, কাজটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও সহায়ক হতে পারে। বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি সুচারুরূপে সম্পাদনের জন্য প্রথমেই যথাযথ ব্যক্তিদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা উচিত। এই কমিটি স্থান নির্বাচন, প্রজাতি নির্বাচন, চারার উৎস নির্ধারণ এবং সর্বোপরি কাজটি বাস্তবায়ন ও বৃক্ষরোপণ–পরবর্তী পরিচর্যার বিষয়টি নিশ্চিত করবেন। গাছ লাগানো কঠিন কোনো কাজ নয়।
৫ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগাতে হলে প্রতিবছর গড়ে ৫ কোটি গাছ লাগাতে হবে। সংখ্যার দিক থেকে যা বিপুল। এই সংখ্যার পেছনে ছুটতে গিয়ে কোনোভাবেই দায়সারা কাজ করা যাবে না। ৫ বছরে সরকার যদি অন্তত ১০ কোটি গাছও বাঁচিয়ে রাখতে পারে তাতেই আমরা সন্তুষ্ট।
তবে সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করে বৃক্ষরোপণ এবং পরবর্তী সময়ে পরিচর্যা করে সেগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা যথেষ্ট কঠিন বৈকি। এ জন্য কমিটিতে কোনো নামসর্বস্ব অদক্ষ প্রতিষ্ঠান, বৃক্ষ ও পরিবেশ ব্যবসায়ী অসাধু ব্যক্তিদের স্থান দেওয়া যাবে না। দেশে উদ্ভিদ নিয়ে মূলধারায় কাজ করেন, এমন ব্যক্তি হাতে গোনা। তাঁদের কাজে লাগানো যেতে পারে। কারণ, উদ্ভিদ নিয়ে কাজ করতে হলে আগে উদ্ভিদ চিনতে হবে এবং এ বিষয়ে গভীর জ্ঞানও থাকতে হবে। বৃহৎ এই কর্মযজ্ঞ এককভাবে বন বিভাগের ওপর ন্যস্ত করা যাবে না।
এ ক্ষেত্রে উদ্ভিদ নিয়ে কাজ করা অন্তত ১৫ বছরের বিশেষ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সংগঠন, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানকে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। তা ছাড়া এ কাজ কোনো একক উদ্যোগের বিষয়ও নয়। এখানে মূল কাজই হলো উদ্ভিদবিজ্ঞানের—যার জন্য পুঁথিগত বিদ্যার পরিবর্তে প্রত্যক্ষ জ্ঞান প্রয়োজন। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ফরেস্টি, আরবারিকালচার এবং অ্যাগ্রিকালচারের। একাধিক যোগ্য ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগেই কেবল বিপুল এই কর্মযজ্ঞ সম্পাদিত হতে পারে।
সম্ভাব্য স্থান কী কী হতে পারে
স্বল্প আয়তনের জনবহুল এই দেশে বৃক্ষরোপণের স্থান নির্বাচনে বিশেষায়িত জ্ঞান কাজে লাগাতে হবে। সারা দেশে অসংখ্য সরকারি প্রতিষ্ঠানে ফাঁকা জায়গা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান খুঁজে বের করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, ইকোনমিক জোনগুলো বৃক্ষরোপণের সম্ভাব্য স্থান হতে পারে।
তবে যেকোনো সড়কে বৃক্ষরোপণের আগে সড়কের প্রশস্ততা এবং যানবাহনের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে উদ্ভিদ নির্বাচন করতে হবে। সব সড়ক ও বিভিন্ন স্থাপনায় বৃক্ষরোপণের কিছু নিয়ম-পদ্ধতি আছে। সব গাছ সব জায়গার জন্য উপযুক্ত নয়। তা ছাড়া সঠিকভাবে গাছ লাগাতে একদিকে যেমন পরিকল্পনা প্রয়োজন, অন্যদিকে এটি একটি শিল্পও।
এ কাজে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ জ্ঞান প্রয়োজন। আমাদের বন-পাহাড়গুলো প্রায় বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়েছে। সেখানে হেলিকপ্টার বা ড্রোনের সাহায্যে বীজ ছিটানো যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে দেশের বিলুপ্তপ্রায় শালবনগুলোতে বীজ ছিটিয়ে গাছের সংখ্যা বৃদ্ধি করার পাশাপাশি বনটির অন্যান্য উদ্ভিদপ্রজাতিও ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। তবে সব ক্ষেত্রেই নজরদারি প্রয়োজন। আইইউসিএনের সাম্প্রতিক আংশিক জরিপ অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৫০০ প্রজাতির উদ্ভিদ বিপন্ন। উদ্ভিদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে এসব বিপন্ন প্রজাতিও রাখা যেতে পারে।
গাছের নিরাপত্তা ও পরিচর্যা
গাছ রোপণে কোনো দায়সারা পদ্ধতি অবলম্বন করা যাবে না। রোপণের জন্য কমপক্ষে ৩ ফুট উঁচু চারা সংগ্রহ করতে হবে। উচ্চতায় ছোট চারাগুলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা খরায় বাঁচিয়ে রাখা যায় না। বন বিভাগের নার্সারিগুলোর ২৫ কোটি চারা সরবরাহের সক্ষমতা নেই। এ ক্ষেত্রে গাছের তালিকা চূড়ান্ত করে বেসরকারি নার্সারিগুলোতে চাহিদাপত্র পাঠানো যেতে পারে। গাছ রোপণের সময় প্রয়োজনীয় সার ও কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে। খুঁটি ও বাঁশের তৈরি বেড়া বা খাঁচা দিতে হবে।
নিরাপত্তাবেষ্টনী না থাকলে ১০ শতাংশ গাছও টিকে থাকবে না। ফলে পুরো কার্যক্রমই বিফলে যাবে। গবাদিপশুর পাশাপাশি মানুষও গাছের জন্য বড় হুমকি। এ কারণে যেসব এলাকায় গাছ লাগানো হবে সেখানকার কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করতে হবে। সার্বিক বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনকেও যুক্ত করা যায়। বৃক্ষরোপণ–পরবর্তী অন্তত দুই বছর গাছের পরিচর্যা নিশ্চিত করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা না থাকলে সবাই দায় এড়ানোর চেষ্টা করবে।
৫ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগাতে হলে প্রতিবছর গড়ে ৫ কোটি গাছ লাগাতে হবে। সংখ্যার দিক থেকে যা বিপুল। এই সংখ্যার পেছনে ছুটতে গিয়ে কোনোভাবেই দায়সারা কাজ করা যাবে না। ৫ বছরে সরকার যদি অন্তত ১০ কোটি গাছও বাঁচিয়ে রাখতে পারে তাতেই আমরা সন্তুষ্ট।
● মোকারম হোসেন উদ্ভিদ ও পরিবেশবিষয়ক লেখক
ই–মেইল: [email protected]
*মতামত লেখকের নিজস্ব