আলোকছত্র এক রাজনৈতিক সম্প্রীতির স্বদেশ

ভোটকেন্দ্রের বাইরে বসে মেলা। মানুষ ভোট দিয়ে এসে ভীড় করে সেখানেছবি: প্রথম আলো

গ্রামের নাম আলোকছত্র। গ্রামের এমন নামটি কে রেখেছিলেন আজ আর জানা যায় না। বাংলা একাডেমির ‘বাঙলা উচ্চারণ অভিধান’ অনুযায়ী ছত্র অর্থ ছাতা, অন্নাদির বিতরণকেন্দ্র, অক্ষর-পঙ্‌ক্তি, লাইন। সোজাসুজি গ্রামের নামটির অর্থ করলে বলা যায়, আলোর ছাতা বা আলো বিতরণকেন্দ্র। এখন এই আলোকের অর্থ যদি জ্ঞান ধরা যায়, তাহলে গ্রামের নামের মানে দাঁড়ায় জ্ঞানের ছাতা বা জ্ঞান বিতরণের স্থান। অর্থ যা–ই হোক, এটা নিশ্চিত করে বলা যায়, যে ব্যক্তি গ্রামের নাম রেখেছিলেন, তিনি নিঃসন্দেহে জ্ঞানী মানুষ।

গ্রামের নামানুসারেই স্থাপন করা হয়েছে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি উচ্চবিদ্যালয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়টিতেই রয়েছে ভোটকেন্দ্র। ভোটকেন্দ্র থেকে বের হয়েই ভোটাররা এসে দাঁড়াচ্ছেন মিষ্টির দোকানে। কম করে হলেও আড়াই শ গ্রাম জিলাপি অথবা রসগোল্লা প্রত্যেকেই কিনছেন। এটি হচ্ছে এই এলাকার ভোটের ঐতিহ্য। আর উচ্চবিদ্যালয় মাঠে একদল লোক চেয়ার পেতে গোল হয়ে বসে আছেন। দোকান থেকে সেখানে চলে যাচ্ছে চা-মিষ্টি। সেই আড্ডায় বসে জানা গেল এই ভোটকেন্দ্রে কোনো দিন ছোট-বড় কোনো ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা হয়নি।

আরও মজার বিষয় হলো, যাঁরা আড্ডায় বসে চা মিষ্টি খাচ্ছেন, তাঁরা কোনো একটি দলের লোক নন। তাঁদের মধ্যে জামায়াত, বিএনপি, দলীয় পরিচয়হীন, এমনকি নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাও বসে আলাপ করছেন। তাঁরা বলছেন, এটাই এই এলাকার সংস্কৃতি। আর ভোট উপলক্ষে এত মিষ্টির দোকান রাজশাহীর আর কোনো ভোটকেন্দ্রে দেখাও যায় না। সেখানে ভোট মানে উৎসব।

এলাকাটি রাজশাহী-১ (তানোর-গোদাগাড়ী) আসনের মধ্যে পড়েছে।

এই কেন্দ্রে গোদাগাড়ী উপজেলার রিশিকুল ইউনিয়নের আলোকছত্র, প্রসাদ পাড়া, চকতাঁতীহাটি ও পলাশী গ্রামের ভোটাররা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে আসেন। আর স্থানীয় নির্বাচনের বিলাসী নামের আরও একটি গ্রামের মানুষ এই কেন্দ্রে ভোট দিতে আসেন। শুনে অবাক লাগল, কখনোই রাজনৈতিক কারণে এই এলাকার মানুষের মধ্যে কোনো বিভেদের সৃষ্টি হয়নি।

কলেজশিক্ষক ইকবাল হোসেন বললেন, ‘৯৬–এর নির্বাচনে এই কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৫৩৬টি ভোট আর বিএনপি প্রার্থী পেয়েছিল ৫৩৫টি ভোট। একটি ভোট কম–বেশি হলেও এখানকার মানুষের মধ্যে কোনো ভুল–বোঝাবুঝি হয়নি। কিন্তু তারপর থেকে এই কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। এটাই তাঁদের দুঃখ, কারণ এখানে নির্বাচন নিয়ে কোনো ঝুঁকিই নেই। কোনো দিন ছিলও না।

ভোটের দিনে আলোকছত্র উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে সর্বদলীয় আড্ডায় চলছে চা-মিষ্টি
ছবি: প্রথম আলো

একটু পরেই আড্ডায় এসে যোগ দিলেন প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা ও কাঁকনহাট পৌরসভার সাবেক মেয়র আতাউর রহমান খান। আগে থেকেই আলোকছত্র উচ্চবিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক গোপাল চন্দ্র দাস, বিএনপি সমর্থক সরনজাই উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক শফিকুর রহমান, ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি হেলাল খান, জামায়াত সমর্থক মোজাম্মেল, ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কামারুজ্জামান, আওয়ামী লীগ কর্মী হামিদ রানা, আওয়ামী লীগ সমর্থক মহসীন খান, কলেজশিক্ষক এনামুল হক, বিএনপির ইউনিয়ন নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য মো. মুজিবুর রহমান প্রমুখ। আড্ডা চলতে থাকল। দোকান থেকে এল জিলাপি। সবাই মিলে খেলেন। তারপর এল চা।

বেলা পৌনে তিনটার দিকে ৫২ শতাংশ ভোট পড়েছে, ততক্ষণে দেখা গেল মিষ্টির দোকান প্রায় খালি হওয়ার জোগাড়। দোকানগুলোতে ১০ থেকে ১৫ রকমের মিষ্টান্ন রয়েছে। এর মধ্যে দুই ধরনের রসগোল্লা দুই ধরনের কালোজাম, গোল জাম, দুই ধরনের খুরমা, চিনির জিলাপি গুড়ের জিলাপি, ছানার জিলাপি, লাড্ডু, বুন্দিয়া, সন্দেশ, বাতাসা উল্লেখযোগ্য।

একটি দোকানে মিষ্টি বিক্রি করতে ব্যস্ত কর্মী উজ্জ্বল কুমার মহন্ত জানালেন, তাঁর বাবা মিষ্টির কারিগর। তিনি একটি সিমেন্ট কোম্পানিতে চাকরি করেন। ভোটের ছুটিতে এসে বাবাকে সহযোগিতা করছেন। দেড় মণ জিলাপি ভাজা হয়েছিল। উজ্জ্বল বললেন, সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে রসগোল্লা। মানুষ দোকানে বসেও খাচ্ছেন আবার কিনে নিয়েও যাচ্ছেন। একজন সর্বোচ্চ তিন কেজি পর্যন্ত রসগোল্লা কিনেছেন।

আড্ডায় বসেই জানা গেল ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সময় প্রার্থী অনেক বেশি থাকে, তখন প্রচুর মিষ্টি বিক্রি হয়। দোকানের সংখ্যাও অনেক বেশি থাকে। সে সময় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য পদপ্রার্থীরা সবার হাতে মিষ্টি ধরিয়ে দিতেন, এমনকি কেউ না এলে বাড়িতেও পৌঁছে দিয়ে আসতেন। এবার কোনো প্রার্থী মিষ্টি কিনে দিচ্ছেন না, কিন্তু এই কেন্দ্রের রেওয়াজ অনুযায়ী সবাই ভোটকেন্দ্রে এলে মিষ্টান্ন কিনে থাকেন, তাই কিনছেন।

প্রসাদ পাড়া গ্রামের খালিদুজ্জামান একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করেন। তিনি বললেন, এখানকার এটা ঐতিহ্য যে ভোটকেন্দ্রে এলে মিষ্টি কিনবেনই। কেউ খালি হাতে ফেরেন না। তিনি এক কেজির রসগোল্লা কিনেছেন। অনিতা মহন্ত ভোট দিয়ে এসে এই দোকানের সামনে দাঁড়ালেন। কিছু কিনবেন। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিলেন রসগোল্লা। এক কেজি রসগোল্লা কিনলেন।

একটি দোকানে মালিকসহ চারজন কর্মচারী কাজ করছেন। দোকানে অনবরত জিলাপি ভেজে যাচ্ছেন কারিগর নারায়ণ চন্দ্র দাস। মালিকের ছেলে অনন্ত কুমার দাস বললেন, জিলাপি ইতিমধ্যে দেড় মণ বিক্রি হয়েছে। দুই মণ রসগোল্লা এনেছিলেন। বেশির ভাগ বিক্রি হয়ে গেছে। আলোকছত্র গ্রামের আলতাফ হোসেন আধা কেজি গুড়ের খুরমা কিনেছেন। বললেন, তাঁর স্ত্রী এবং বাচ্চারা এই গুড়ের খুরমা খুব পছন্দ করে। তাঁর কথা শুনে মনে মনে বললাম, মিষ্টি নিয়েই ব্যস্ত থাকুন এই মিষ্টি মানুষগুলো। রাজনীতির তিক্ততা তাঁদের যেন স্পর্শ না করে।

  • আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী