বাংলাদেশে ‘রিকনসিলিয়েশন’ কেন প্রয়োজন

বাংলাদেশের মতো একটি গভীরভাবে বিভক্ত সমাজে রিকনসিলিয়েশন বা পুনঃসমঝোতা সহজ কিছু নয়। এক দিনে বা একটি কমিশন গঠনেও সমাজ থেকে সব বিভাজন দূর হয়ে যাবে না। কিন্তু যেটি হতে পারে, তা হলো রাজনৈতিক–সামাজিক পরিসরে বিভিন্ন দলের-মতের মানুষের মধ্যে সহাবস্থান ও সহনশীলতার চর্চার সূচনা। বাংলাদেশে রিকনসিলিয়েশন নিয়ে দুই পর্বে লিখেছেন উম্মে ওয়ারা। আজ প্রকাশিত হলো শেষ পর্ব

এ কথা সত্যি যে শুধু বাংলাদেশই নয়, গভীরভাবে বিভক্ত যেকোনো সমাজেই পুনঃসমঝোতা প্রতিষ্ঠা করা জটিল ও সময়সাপেক্ষ একটি প্রক্রিয়া। ‘রিকনসিলিয়েশন’ বা পুনঃসমঝোতা নিয়ে বিভিন্ন পেশাজীবী এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বুঝেছি, অনেকেই এর প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করলেও কেউ কেউ এটিকে বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি ‘ইউটোপিয়ান’ বা অবাস্তব ভাবনা মনে করেন। আবার কেউ কেউ বলেছেন এটি ‘সময়সাপেক্ষ’ ও ‘সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল’ একটি প্রক্রিয়া।

সাধারণ মানুষ ও বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশে পুনঃসমঝোতার সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে জনপরিসরে আলোচনা করে যেতে হবে।

আরও পড়ুন

২.

প্রথমেই এটি পরিষ্কার করা প্রয়োজন যে ‘রিকনসিলিয়েশন’ বা পুনঃসমঝোতার পদ্ধতিটি প্রচলিত বিচারপ্রক্রিয়ার বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নয়; বরং এর পরিপূরক হিসেবে কাজ করে থাকে। শুধু বিচার করলে সমাজে দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষোভ ও বিভাজন থেকে যেতে পারে। আবার শুধু সমঝোতা বা ক্ষমা করে দিলে অনেক অপরাধীরই পার পেয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই সহিংসতা-পরবর্তী সমাজে টেকসই শান্তির জন্য এই দুইয়ের সংমিশ্রণের প্রয়োজন দেখা দেয়।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, যেমন সিয়েরা লিওন, রুয়ান্ডা কিংবা আর্জেন্টিনায় একই সঙ্গে বিচার ও পুনঃসমঝোতার কার্যক্রম পাশাপাশি চালিয়ে যাওয়ার নজির রয়েছে। এমনকি রিকনসিলিয়েশন বা পুনঃসমঝোতার একটি প্রেক্ষাপট তৈরি হলে, সেখানে সব পক্ষের অংশগ্রহণ সাপেক্ষেই প্রক্রিয়াটি শুরু হয়ে থাকে। সে ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পক্ষ থেকেও সত্য প্রকাশ ও ক্ষমা প্রার্থনা করার সুযোগ থাকে।

দ্বিতীয়ত, কোনো রাজনৈতিক সরকারের আমলে বিভিন্ন পেশাজীবী অন্যায়ভাবে যে সুযোগ-সুবিধা ভোগ এবং সেই আমলের নানা অন্যায়-অপরাধকে উপেক্ষা করে গেলেও এ জন্য অনেক ক্ষেত্রে তাঁদেরকে কোনো ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত করা যায় না। কিন্তু আমরা দেখছি জুলাই অভ্যুত্থানকালে হত্যার অভিযোগ এনে আওয়ামীপন্থী বিভিন্ন পেশাজীবীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এটি একটি উভয়সংকট পরিস্থিতি। কেননা, একদিকে সাধারণ মানুষ সুবিধাভোগীদের শাস্তির বিষয়টি প্রত্যাশা করেন। অন্যদিকে খুন বা সহিংসতার মতো ফৌজদারি অপরাধ না করেও সেই অপরাধে অভিযুক্ত হয়ে বছরের পর বছর কারাবন্দী থাকাও যেকোনো নাগরিকের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী।

আমাদের ভেবে দেখা প্রয়োজন, কোনো একটি শাসনামলের সুবিধাভোগীদের শাস্তি দিতে গিয়ে কোনো অপরাধে যুক্ত ছিল না, এমন সমর্থক-কর্মীদের হয়রানি করা হচ্ছে কি না? এই উভয়সংকট এড়াতেও একটি ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন’ কমিশন কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।

সরকার পতনের পর জাতীয় সংসদের সামনে ছাত্র-জনতার বিজয় উল্লাস। ঢাকা, বাংলাদেশ, ৫ আগস্ট ২০২৪

৩.

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কয়েকটি ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন’ কমিশন ইতিমধ্যে ‘লাস্ট্রেশন’ বা সরকারি পদ থেকে অযোগ্য ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের অপসারণ এবং ভেটিং’ বা কঠোর যাচাই-বাছাইপ্রক্রিয়ার বিষয়ে স্পষ্টভাবে আলোচনা ও সুপারিশ করেছে। একই সঙ্গে এ-সংক্রান্ত বাধ্যতামূলক বা অবাধ্যতামূলক সিদ্ধান্তও গ্রহণ করেছে। কিছু দেশ যদিও স্বাধীন সংসদীয় আইনের মাধ্যমে ভেটিং’ প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করে থাকে। তবে অনেক দেশই সরকারি সেবা খাত থেকে ক্ষমতার অপব্যবহারকারী কর্মকর্তাদের অপসারণের সুপারিশ বা নির্দেশ প্রদানের ক্ষেত্রে তাদের ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশনগুলোকে আনুষ্ঠানিক তদন্তকারী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে থাকে।

উদাহরণস্বরূপ, তিউনিসিয়ায় আরব বসন্তের পর হাবিব বুরগুইবা ও জাইন এল আবিদিন বেন আলির শাসনামলে কয়েক দশক ধরে চলা পদ্ধতিগত নির্যাতন, দুর্নীতি এবং অত্যাচারের মোকাবিলা করার জন্য একটি ট্রুথ অ্যান্ড ডিগনিটি কমিশন (২০১৪-২০১৮) পরিচালিত হয়। দুর্নীতিগ্রস্ত ও নির্যাতনকারী কর্মকর্তাদের শুদ্ধিকরণ কার্যকর করার জন্য কমিশনটি সরাসরি বিচার বিভাগ এবং মন্ত্রণালয়গুলোতে ব্যাপক প্রমাণপত্র সরবরাহ করে এবং সেখানে শুদ্ধি অভিযানের ও চিহ্নিত কর্মকর্তাদের অপসারণের সুপারিশ প্রস্তাব করে। কিন্তু পুরোনো শাসনের অবশিষ্টাংশের রাজনৈতিক বাধার কারণে পরবর্তী সময়ে এসব সুপারিশের পূর্ণ বাস্তবায়ন ব্যাহত হয়।

বাংলাদেশের মতো একটি গভীরভাবে বিভক্ত সমাজে রিকনসিলিয়েশন বা পুনঃসমঝোতা সহজ কিছু নয়। এক দিনে বা একটি কমিশন গঠনেও সমাজ থেকে সব বিভাজন দূর হয়ে যাবে না। কিন্তু যেটি হতে পারে, তা হলো রাজনৈতিক-সামাজিক পরিসরে বিভিন্ন দলের-মতের মানুষের মধ্যে সহাবস্থান ও সহনশীলতার চর্চার সূচনা।

তিউনিসিয়ায় যেমন একটি নির্দিষ্ট শাসনামলকে বিচারের আওতায় আনতে বিভিন্ন ক্রান্তিকালীন পদক্ষেপের উদাহরণ রয়েছে, অপর দিকে কেনিয়ায় ১৯৬৩ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে ২০০৮ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা পর্যন্ত মানবাধিকার লঙ্ঘন, অর্থনৈতিক অপরাধ এবং রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের ঘটনা তদন্তের লক্ষ্যে একটি ‘ট্রুথ, জাস্টিস অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন’ কমিশন গঠন করা হয় ২০০৮ সালেই।

বিচার বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কমিশনটি তার প্রতিবেদনে ‘জুডিশিয়াল ভেটিং বোর্ড’ বা বিচারক যাচাই-বাছাই বোর্ডের জন্য সুনির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি করে। এই বোর্ড দুর্নীতি ও অতীতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে কর্মরত বিচারকদের যাচাই-বাছাই করে এবং এর ফলে হাইকোর্টের বেশ কয়েকজন বিচারককেও অপসারণ করা হয়।

কাজেই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, ‘রিকনসিলিয়েশন’ বা পুনঃসমঝোতার প্রক্রিয়ায় অভিযুক্ত পক্ষ ও ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ—উভয়েরই তুলনামূলকভাবে বেশি সন্তুষ্টি লাভের সুযোগ থাকে।

ছাত্র–জনতার ওপর গুলি ছুড়ছেন আওয়ামী লীগ নেতা নিজাম হাজারীর অনুসারীরা। গত ৪ আগস্ট ফেনীর মহিপাল এলাকায়
ছবি: সংগৃহীত

একদিকে ফৌজদারি অপরাধ করেননি—এমন বিতর্কিত ব্যক্তিদের সুনির্দিষ্ট একটি কাঠামোর মাধ্যমে বিকল্প শাস্তির প্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে আসা যায়; আবার অন্যদিকে সুবিধাভোগী না হয়েও বছরের পর বছর হয়রানির শিকার হওয়া থেকে রেহাই পেতে পারেন অভিযুক্ত রাজনৈতিক দলের অনেক কর্মী-সমর্থকেরা। এমনকি অভিযুক্ত সুবিধাভোগী ব্যক্তিরাও জানবেন তাঁদের নির্দিষ্ট অপরাধ কী এবং এর জন্য তাঁরা কী শাস্তি পেতে যাচ্ছেন। অনির্দিষ্টকালের জন্য আতঙ্ক ও আশঙ্কায় থাকার চেয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া তাদের জন্য শ্রেয় হবে বলে ধারণা করা যায়।

আমাদের মনে রাখতে হবে, পেশাজীবীদের রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করা কোনো অপরাধ নয়, তবে অন্যায় সুবিধা লাভ ও দলীয় অপরাধ দমনে প্রয়োজনীয় ভূমিকা না রাখাকে প্রচলিত আইনি কাঠামোতে অপরাধ হিসেবে প্রমাণ করা যায় না। প্রমাণ করা না গেলেও এ ধরনের কমিশনগুলো ‘ভেটিং’ বা ‘লাস্ট্রেশন’-এর মাধ্যমে অনেকটাই জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারে, যা শুধু এক শাসনামলের জন্য নয়, বরং পরবর্তী প্রতিটি সরকারের আমলেই জবাবদিহির সংস্কৃতি নিশ্চিত করতে একটি ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারে।

আরও পড়ুন

৪.

রিকনসিলিয়েশন বা পুনঃসমঝোতা নিয়ে প্রথম পর্বের লেখার দ্বিতীয় প্রশ্নটির উত্তর খোঁজাও ভীষণ জরুরি। বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির নির্বাচনী ইশতেহারে শুধু আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলের গুম-খুনের বিচার এবং সেই আমলের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে সমাজে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে পুনঃসমঝোতা প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে।

কিন্তু বাংলাদেশের গত ৫৫ বছরের রাজনৈতিক বিভাজনের ইতিহাস থেকে এই সাড়ে ১৫ বছরের ‘হিসাব’ কষলেই কি সমাজের নানা স্তরে বিস্তৃত বিভাজনের রেখাকে মুছে ফেলা সম্ভব? বাংলাদেশ কি শুধু গত সাড়ে ১৫ বছরেই বিভাজিত হয়েছে, নাকি এই বিভাজনের শিকড় আরও অনেক আগেই গেড়ে বসেছে? এটা খুঁজতে আমরা ১৯৭১ সালে ফিরে যেতে পারি, যে একাত্তর একটি নতুন স্বাধীন একটি দেশের জন্ম দিয়েছে, তা একই সঙ্গে এটাও বুঝিয়ে দিয়েছে যে সেই সময় থেকেই মতে-বিশ্বাসে-ভাবাদর্শে আমরা কতটা বিভাজিত!

সৈয়দ আবুল মকসুদ ‘বাঙালি জাতি, বাঙালি মুসলমান, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাংলাদেশ’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘কট্টর পাকিস্তানবাদীরা স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য জীবন উৎসর্গ করে, হত্যা করতে থাকে প্রগতিশীলদের।

পাবনায় ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে গত বছরের ৪ আগস্ট গুলিতে দুজন ছাত্র নিহত হন। তাঁদের একজনের লাশ নিয়ে শিক্ষার্থীরা মিছিল করতে গেলে ছাত্র-জনতার ওপর হামলা চালানো হয়।
ছবি: হাসান মাহমুদ

কিন্তু স্বাধীনতার পক্ষের মানুষের সংখ্যা পঁচানব্বই শতাংশের বেশি হওয়ায় তাদের নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব হয়নি।’ এই মানুষগুলো এত বছরে নানা তরিকায় সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত হয়েছে, কিন্তু তারা কখনো মুক্তিযুদ্ধকালীন তাদের ভূমিকার জন্য খুব স্পষ্টভাবে দেশের আপামর জনসাধারণের কাছে ক্ষমা চায়নি।

মুক্তিযুদ্ধের এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টি আজও অমীমাংসিত রয়ে গেছে, যা বিভিন্ন শাসনামলে বিভাজনকে জনগণের সামনে নিয়ে এসেছে, জনগণকেও বিভাজিত করেছে। বর্তমান সংসদের প্রথম অধিবেশনেও একাত্তরে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা নিয়ে অনেক তর্কবিতর্ক দেখতে পেয়েছি। কিন্তু জনগণ ফলপ্রসূ কোনো মীমাংসা দেখতে পায়নি।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

৫.

শুধু একাত্তরের অমীমাংসিত অধ্যায় নয়, একাত্তর-পরবর্তী নানা ঘাত-প্রতিঘাত এসে আমাদেরকে বারবার নাড়িয়ে দিয়ে গেছে প্রবলভাবে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর পরিবারের বেশির ভাগ সদস্যসহ হত্যা করা হয়। এ ছাড়া একই বছরে নভেম্বর মাসের ৩ তারিখে জাতীয় চার নেতা ও ৭ নভেম্বরে খালেদ মোশাররফ হত্যাকাণ্ডের কথাও আমরা জানি। এই প্রতিটি রাজনৈতিক ঘটনারই পক্ষ-বিপক্ষ আছে, আছে বিজয়ী আর পরাজিতের বয়ান। ‘৭ নভেম্বর কারও কাছে মুক্তিযোদ্ধা হত্যা দিবস, কারও কাছে সিপাহি, জনতার অভ্যুত্থান দিবস, আবার কারও কাছে বিপ্লব ও সংহতি দিবস’। (মহিউদ্দিন আহমদ, প্রথম আলো, ১৫ মে ২০২৩)

এ ছাড়া ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তদন্ত প্রতিবেদনে এ হত্যাকাণ্ডকে ‘নিরাপত্তা ও গোয়েন্দাব্যবস্থার গুরুতর ব্যর্থতার ফল’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল সে সময় গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন। (ডেইলি স্টার, ৩০ জুলাই ২০২৬)

এই প্রতিটি হত্যাকাণ্ডেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সামরিক বাহিনীর কিছু সদস্যের সংশ্লিষ্টতা দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু আমরা কি কোনো আমলেই সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা জানতে পেরেছি? আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্রমশ গভীরে প্রোথিত হওয়া বিভাজনে কি এই অসমাপ্ত অধ্যায়গুলোর দায় একটুও নেই?

এটা মানতেই হবে যে ১৯৯০, ২০০৭ ও ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে সেনাবাহিনীর ইতিবাচক ভূমিকা রয়েছে। তবে একই সঙ্গে বর্তমান প্রেক্ষাপটে পুনঃসমঝোতার আলাপে বিভিন্ন আমলে সামরিক বাহিনীসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিতর্কিত ঘটনায় সম্পৃক্ততা এবং তাদের পক্ষ থেকে পরিষ্কার ব্যাখ্যাও আলোচনায় আসা উচিত।

জুলাইয়ে ছাত্র–জনতার আন্দোলন দমনে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা। চট্টগ্রাম শহর।
ফাইল ছবি

৬.

বাংলাদেশের মতো একটি গভীরভাবে বিভক্ত সমাজে রিকনসিলিয়েশন বা পুনঃসমঝোতা সহজ কিছু নয়। এক দিনে বা একটি কমিশন গঠনেও সমাজ থেকে সব বিভাজন দূর হয়ে যাবে না। কিন্তু যেটি হতে পারে, তা হলো রাজনৈতিক-সামাজিক পরিসরে বিভিন্ন দলের-মতের মানুষের মধ্যে সহাবস্থান ও সহনশীলতার চর্চার সূচনা।

এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যম এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশীলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোরও দায় রয়েছে। শুধু নির্বাচনী ইশতেহারে পুনঃসমঝোতার প্রতিশ্রুতি দিয়েই দলগুলো নিজেদের দায়িত্ব এড়াতে পারে না; বরং তাদের পক্ষ থেকে পুনঃসমঝোতা বিষয়ে গঠনমূলক পরিকল্পনা ও দৃশ্যমান প্রচেষ্টাই বিভাজিত বাংলাদেশকে আরেকবার ঘুরে দাঁড়ানোর পথ দেখাতে পারে।

  • উম্মে ওয়ারা সহযোগী অধ্যাপক, ক্রিমিনোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

    মতামত লেখকের নিজস্ব