কিছু দেশ আবার নানা ধরনের বিধিনিষেধও আরোপ করেছে। একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা অনুযায়ী খাদ্যের জোগান নেই, অন্যদিকে দেশে ডলারের সংকটের কারণে খাদ্য আমদানির জন্য এলসি বা ঋণপত্র খোলা সম্ভব হচ্ছে না। এতে খাদ্য আমদানি কমে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে খাদ্য আমদানি আরও কঠিন হবে। মোকাবিলা করতে হবে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ। যদিও বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদনের পরিসংখ্যান নিয়ে ইতিমধ্যেই আস্থার অভাব দেখা দিয়েছে। তবু বলা যায়, বিশ্ব খাদ্য উৎপাদন ঘাটতির প্রভাব বাংলাদেশেও পড়বে।

প্রধানমন্ত্রী, দেশের শীর্ষস্থানীয় কৃষিবিদেরাসহ অনেকেই কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তাঁরা বলেছেন, উৎপাদন বাড়িয়ে খাদ্য আমদানি কমাতে হবে। তাহলে অনেকটাই বৈশ্বিক খাদ্যসংকট থেকে দেশের স্বল্প আয়ের মানুষকে রক্ষা করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে তাঁরা দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে চলমান কর্মসংস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন। এ জন্য কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে চাঙা রাখার পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে এখনই যেখানে যে দামে সার, চাল, গম পাওয়া যায়, সেগুলো সংগ্রহ করার সুপারিশ করা হয়েছে।

বাংলাদেশে আমরা যদি খাদ্যসংকট মোকাবিলা করতে চাই, তাহলে অবশ্যই স্থানীয় উৎপাদনে নজর দিতে হবে, উৎপাদকদের প্রণোদনা দিতে হবে, ঠিক সময়ে সার-বীজ সরবরাহ এবং সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খল বজায় রাখায় সব উদ্যোগ চালিয়ে যেতে হবে। সত্যিকারের উৎপাদকেরা যাতে পণ্যের সঠিক মূল্য পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। আমদানির ক্ষেত্রে বন্ধুরাষ্ট্র চিহ্নিত করে কিংবা ব্যক্তি খাতের পরিচিত বৃহৎ আমদানিকারকদের সঙ্গে নিয়ে প্রয়োজনে তড়িৎ আমদানির ব্যবস্থা নিতে হবে। নির্ভরশীল শস্য সংরক্ষণব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে।

অনেকের সঙ্গে মতবিনিময় করে আমাদেরও মনে হচ্ছে, বাংলাদেশে খাদ্যের হয়তো খুব বেশি সংকট হবে না। তবে অবশ্যই কৃষি উৎপাদনে জোর দিতে হবে। কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে ধরে রাখতে হবে। দারিদ্র্য মানুষের জন্য খাদ্যের বিকল্প ব্যবস্থা রাখতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীকেও জোরদার করতে হবে।

সাধারণত শীতে দেশে সবজি, ধান ও গমের উৎপাদন বেশি হয়। ফলে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সরকার খাদ্য নিয়ে স্বস্তিতে থাকবে। এপ্রিলে আসবে ইরি। তখনো সরবরাহ বাড়বে। সংকটটা হবে জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত। এর জন্য আমদানি বা মজুত প্রয়োজন। চলতি অর্থবছরে দেশে ৪ কোটি ২৭ লাখ টন চাল ও গম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭ লাখ টন আউশ, ১ কোটি ৬৪ লাখ টন আমন, ২ কোটি ১৫ লাখ টন বোরো ও ১১ লাখ ৬০ হাজার টন গম। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী খাদ্য উৎপাদন হলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে আরও উদ্বৃত্ত থাকার কথা। তবে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে উৎপাদন কিছুটা কমতে পারে বলে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ তাদের এক প্রতিবেদনে আগাম পূর্বাভাস দিয়েছে। এর কারণ হিসেবে তারা মনে করছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সার, সেচের জন্য জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে কৃষির উৎপাদন খরচ বাড়বে। এতে কৃষক যথাযথ সক্ষমতার অভাবে আবাদ কমিয়ে দিতে পারেন।

গত অর্থবছরে দেশে খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৩ কোটি ৯৬ লাখ টন। উৎপাদন হয়েছিল ৩ কোটি ৮৭ লাখ টন। চলতি অর্থবছরেও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে উৎপাদন কম হবে। গত অর্থবছরে খাদ্য আমদানি করা হয়েছিল ৫০ লাখ টন। চলতি অর্থবছরে খাদ্য আমদানির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৪৭ লাখ টন। দেশীয় উৎপাদন চাঙা থাকলে ও সময়মতো আমদানি করতে পারলে খাদ্য সরবরাহে কোনো ঘাটতি হবে না বলে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয়েছে।

গত অর্থবছরে ৫০ লাখ টন খাদ্য আমদানির মধ্যে চাল ১০ লাখ টন ও গম ৪০ লাখ ১০ হাজার টন। চলতি অর্থবছরে ৪৬ লাখ ৮৯ হাজার টন খাদ্য আমদানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে চাল ১০ লাখ ৫৭ হাজার টন, গম ৩৬ লাখ ৩২ হাজার টন। সরকার চাল আমদানি করবে ৫ লাখ ৩০ হাজার টন। বেসরকারিভাবে আমদানি করা হবে ১১ লাখ ৫০ হাজার টন। সরকার গম আমদানি করবে ৬ লাখ ৫০ হাজার টন। বেসরকারিভাবে গম আমদানি হবে ২৫ লাখ টন। চলতি অর্থবছরের অক্টোবর থেকে জুনের মধ্যে সরকার ৫ লাখ ৩০ হাজার টন চাল এবং জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে ৬ লাখ ১৩ হাজার টন গম আমদানি করার কথা। একই সময়ে বেসরকারি খাতে ৩ লাখ ৩২ হাজার টন গম ও ২ লাখ ২০ হাজার টন চাল আমদানির কথা রয়েছে।

বিশ্বের গম, ভোজ্যতেল, জ্বালানির প্রায় ৩৪ শতাংশ জোগান দেয় ইউক্রেন ও রাশিয়া। রাশিয়ার আক্রমণের কারণে ইউক্রেন থেকে খাদ্যপণ্যবাহী জাহাজ আসতে পারছে না। অন্যদিকে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়াও রপ্তানি করতে পারছে না। এতে খাদ্যের সরবরাহ কমেছে, বেড়েছে দাম। ওই দুই দেশ থেকে ইউরোপে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ থাকায় সার উৎপাদন কমে গেছে। এতে সারসহ কৃষি উপকরণের দাম বেড়েছে প্রায় ৭২ শতাংশ। এতে উৎপাদন কমছে। ফলে চাহিদা অনুযায়ী খাদ্যের জোগান মিলছে না।

অন্যদিকে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোতে ডলারের সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। একই সঙ্গে টাকার বিপরীতে বেড়েছে ডলারের দাম। গত এক বছরের ব্যবধানে ডলারের দাম বেড়েছে প্রায় ২৩ শতাংশ। একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, অন্যদিকে স্থানীয়ভাবে ডলারের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে যোগ হয়েছে ডলার-সংকট। ফলে খাদ্যসামগ্রী আমদানির জন্য ডলার মিলছে না। এতে এসব পণ্যের এলসি খোলা কমেছে, আমদানিও কমেছে। আমদানি কমায় সরবরাহ-সংকটের অজুহাতে দাম বেড়ে যাচ্ছে।

চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাত লাখ টন খাদ্য আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দুই লাখ টন চাল ও পাঁচ লাখ টন গম। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাঁচ লাখ টন খাদ্যসামগ্রী সরকারি ও বেসরকারিভাবে আমদানি করা হয়েছে। তবে চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে খাদ্য আমদানি একেবারেই কম ছিল। ওই সময়ে আমদানি করা হয়েছে মাত্র দুই লাখ ছয় হাজার টন। গত অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি করা হয়েছিল ৫ লাখ ৫৮ হাজার টন।

২০২১-২২ অর্থবছরে খাদ্যসামগ্রী আমদানির এলসি খোলা হয়েছিল ৯৮৪ কোটি ডলারের। আমদানি হয়েছে ৮৬৮ কোটি ডলার। ২০২০-২১ অর্থবছরে এলসি খোলা হয়েছিল ৭৮২ কোটি ডলারের। আমদানি হয়েছে ৬৮১ কোটি ডলারের। আলোচ্য সময়ে এলসি খোলা বেড়েছে ২৬ শতাংশ। আমদানি বেড়েছে সাড়ে ২৭ শতাংশ। আমদানি ডলারের হিসাবে বাড়লেও পরিমাণে কমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার কারণে বেশি দামে কম পণ্য আমদানি হচ্ছে। ফলে সরবরাহ-সংকট দেখা দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, অক্টোবর থেকে বিশ্বব্যাপী ধানের উৎপাদন কম হবে। এর মধ্যে ভারত, পাকিস্তান, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, মিসর, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ভিয়েতনামসহ প্রধান প্রধান খাদ্য রপ্তানিকারক দেশগুলোতে উৎপাদন কমে যাবে। তবে থাইল্যান্ডে বাড়বে। কেননা, সে দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ কম। অবশ্য খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, থাইল্যান্ড, ভারত, পাকিস্তান, রাশিয়া, ইউক্রেনসহ প্রায় সব দেশেই খাদ্যের দাম বেড়েছে। ফলে রপ্তানিতেও দাম বাড়বে।

এদিকে নিজেদের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশসহ ২৫টি দেশ ৬৪টি পণ্য রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা ও বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ডাল, গম, ময়দা, সার, সবজি, ফল, চিকিৎসাসামগ্রী, মিনারেল ওয়াটার, ভোজ্যতেল, মাংস, মাছ ইত্যাদি। কোনো কোনো দেশ নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৩ সাল পর্যন্ত নিয়ে গেছে। অনেক দেশের নিষেধাজ্ঞা এই বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বহাল থাকবে।

বাংলাদেশে আমরা যদি খাদ্যসংকট মোকাবিলা করতে চাই, তাহলে অবশ্যই স্থানীয় উৎপাদনে নজর দিতে হবে, উৎপাদকদের প্রণোদনা দিতে হবে, ঠিক সময়ে সার-বীজ সরবরাহ এবং সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খল বজায় রাখায় সব উদ্যোগ চালিয়ে যেতে হবে। সত্যিকারের উৎপাদকেরা যাতে পণ্যের সঠিক মূল্য পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। আমদানির ক্ষেত্রে বন্ধুরাষ্ট্র চিহ্নিত করে কিংবা ব্যক্তি খাতের পরিচিত বৃহৎ আমদানিকারকদের সঙ্গে নিয়ে প্রয়োজনে তড়িৎ আমদানির ব্যবস্থা নিতে হবে। নির্ভরশীল শস্য সংরক্ষণব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে।

  • মামুন রশীদ অর্থনীতি বিশ্লেষক