প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বক্তব্য থেকে যা কিছু বুঝলাম

বুধবার রাতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতির উদ্দেশে প্রথম ভাষণ দেন তারেক রহমানছবি: বাসস

১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। দীর্ঘদিনের তীব্র রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, রাজপথকেন্দ্রিক আন্দোলন এবং প্রাতিষ্ঠানিক টানাপোড়েনের পর এই ক্ষমতার পরিবর্তন কেবল সরকার বদলের ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্র পুনর্গঠনের এক সন্ধিক্ষণ। এ পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছেন তারেক রহমান, যিনি নির্বাসিত বিরোধী রাজনীতিক থেকে দেশের একাদশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন।

ক্ষমতার এই রূপান্তরের সঙ্গে বদলেছে তাঁর রাজনৈতিক ভাষাও। নির্বাচনের আগে তিনি ছিলেন প্রতিরোধের কণ্ঠস্বর। সংস্কার, পুনর্গঠন ও প্রতিশোধহীন রাজনীতির প্রতিশ্রুতি ছিল তাঁর ভাষণের মূল সুর। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম ভাষণে তাঁর উচ্চারণ হয়েছে ভিন্ন। সেখানে অগ্রাধিকার পেয়েছে স্থিতিশীলতা, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা এবং তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলা।

২০২৬ সালের নির্বাচনের পটভূমি ছিল অস্থিরতায় ভরা। ২০২৪ সালের ছাত্রনেতৃত্বাধীন গণ–অভ্যুত্থান শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটায়। প্রাণহানি, প্রাতিষ্ঠানিক ভাঙন ও গভীর রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র এক অনিশ্চিত সময় অতিক্রম করে। এই প্রেক্ষাপটে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী প্রশাসন রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণীত হয়, যেখানে ভবিষ্যৎ সাংবিধানিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত ছিল।

নির্বাচনের আগে তারেক রহমানের ভাষণে এই বিপ্লবী প্রেক্ষাপটের ছাপ ছিল স্পষ্ট। তিনি রাষ্ট্র পুনর্গঠন, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও নাগরিক আস্থার পুনর্নির্মাণের কথা বলেছিলেন। তাঁর অন্যতম আলোচিত ধারণা ছিল রেইনবো নেশন, একটি বাংলাদেশ যেখানে মত, পথ, ধর্ম ও পরিচয়ের বৈচিত্র্য সহাবস্থান করবে। বিভক্ত রাজনীতির বিপরীতে এটি ছিল পুনর্মিলনের ভাষা।

তারেক রহমান প্রতিহিংসার বদলে পুনর্মিলনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, রাজনৈতিক ক্ষত সারাতে কমিশন গঠনের প্রস্তাব রেখেছেন। সংখ্যালঘু ও নারীদের অধিকার রক্ষার অঙ্গীকারও করেছেন। একই সঙ্গে উগ্র ধর্মীয় রাজনীতির প্রভাব নিয়ে সতর্ক বার্তা দিয়েছিলেন, যা তাঁকে শহুরে তরুণ ও নারী ভোটারদের কাছেও গ্রহণযোগ্য করে তোলে।

আরও পড়ুন

অর্থনীতিতেও তাঁর ভাষা ছিল উচ্চাভিলাষী। পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড, নগদ সহায়তা, ব্যাপক কর্মসংস্থান, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়ন—সব মিলিয়ে তিনি এক কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের রূপরেখা দেন। দীর্ঘ মেয়াদে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্নও তুলে ধরেন। অর্থাৎ নির্বাচনের আগে তাঁর ভাষণ ছিল রাষ্ট্র মেরামতের নকশা। কিন্তু ক্ষমতায় এসে সেই ভাষার বাস্তব রূপ পাল্টাতে শুরু করেছে।

১৮ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম ভাষণে তাঁর সুর ছিল অনেক বেশি প্রশাসনিক। তিনি আইনের শাসনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন। শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে উচ্ছৃঙ্খলতা নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় দলীয় প্রভাব নয়, আইনের শাসনই হবে চূড়ান্ত কথা। এটি প্রশাসন ও দলীয় কর্মীদের উদ্দেশে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা।

তারেক রহমানের ভাষণে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, অন্তর্ভুক্তির উচ্চারণ। তিনি বলেছেন, যাঁরা তাঁকে ভোট দেননি, তাঁরাও সমান অধিকারভুক্ত নাগরিক। এতে প্রতিহিংসামুক্ত শাসনের আশ্বাস রয়েছে।

বাংলাদেশ এখন এক সংবেদনশীল সন্ধিক্ষণে। বিপ্লবী প্রত্যাশা ও প্রশাসনিক বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষাই নির্ধারণ করবে এই অধ্যায়ের সাফল্য। এই লেখা শেষ করার আগপর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর ভাষণের বাংলা বা ইংরেজি তরজমা সরকারি ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়নি।

সম্ভবত প্রতিরোধের নেতা থেকে তারেক রহমান রাষ্ট্রের অভিভাবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে আগ্রহী। তবে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও শাসন বাস্তবতার মধ্যে কিছু ফারাক স্পষ্ট হয়েছে, বিশেষ করে অর্থনীতিতে।

নির্বাচনের আগে পরিবার কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো সরাসরি নগদ সহায়তার প্রতিশ্রুতি ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। কিন্তু ক্ষমতায় এসে সরকার ভঙ্গুর অর্থনীতি ও বাস্তবসম্মত সময়সীমার কথা বলতে শুরু করেছে। প্রাথমিক অগ্রাধিকার হিসেবে উঠে এসেছে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা স্থিতিশীল করা, বিশেষ করে রমজানকে সামনে রেখে।

এটি প্রতিশ্রুতি ও সক্ষমতার স্বাভাবিক টানাপোড়েন। কিন্তু এই ব্যবধান ব্যাখ্যা করতে না পারলে জনমানসে হতাশা তৈরি হতে পারে। সাংবিধানিক সংস্কার ইস্যুতেও একই বাস্তবতা। জুলাই সনদে বড় সংস্কারের কথা থাকলেও সরকার তাৎক্ষণিক শাসন সংকট মোকাবিলায় বেশি মনোযোগী। ফলে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার ও স্বল্পমেয়াদি স্থিতিশীলতার মধ্যে এক নীরব অগ্রাধিকার পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

তারেক রহমানের ভাষণে আন্তর্জাতিক বার্তাও স্পষ্ট। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, ডিজিটাল রূপান্তর, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ—এসব শব্দ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক আস্থা পুনর্গঠনের চেষ্টা রয়েছে। আঞ্চলিক কূটনীতিতেও নতুন প্রধানমন্ত্রীর ভাষা হয়েছে সমন্বয়মূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। তাঁর ভাষণের ধারাবাহিক একটি উপাদান হলো শহীদ স্মরণ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থান—দুই প্রজন্মের আত্মত্যাগকে একই ধারায় যুক্ত করে তিনি এক অবিচ্ছিন্ন প্রতিরোধের ইতিহাস নির্মাণের চেষ্টা করেছেন।

তবে একই সঙ্গে তারেক রহমান মব কালচার নিয়ন্ত্রণ করার কথা বলেছেন, যা বিপ্লবী রাজনীতি থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শাসনে উত্তরণের ইঙ্গিত। নির্বাচনের আগে তাঁর ভাষণে ছিল ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি, বৃহৎ অবকাঠামো, বিনিয়োগপ্রবাহের স্বপ্ন। এখন তাঁর ভাষায় বেশি জায়গা পেয়েছে নিত্যপণ্যের বাজার, বিদ্যুৎ, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা। এটি পশ্চাদপসরণ নয়, বরং অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণ।

সরকার প্রথম ১৮০ দিনের একটি কর্মপরিকল্পনার কথা বলছে। এ সময়ই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। মানুষ যদি বাজারদর, বিদ্যুৎ ও আইনশৃঙ্খলায় উন্নতি দেখতে পায়, তবে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের প্রতি আস্থা বাড়বে। তারেক রহমানের রাজনৈতিক ভাষার এই বিবর্তন তাঁর নেতৃত্বের রূপান্তরকেই প্রতিফলিত করে। বিরোধী রাজনীতিতে প্রতিবাদের শক্তি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রয়োজন ধৈর্য, সমন্বয় ও প্রতিষ্ঠাননির্ভরতা।

বাংলাদেশ এখন এক সংবেদনশীল সন্ধিক্ষণে। বিপ্লবী প্রত্যাশা ও প্রশাসনিক বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষাই নির্ধারণ করবে এই অধ্যায়ের সাফল্য। এই লেখা শেষ করার আগপর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর ভাষণের বাংলা বা ইংরেজি তরজমা সরকারি ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়নি।

তারেক রহমানের প্রেস সচিব কে, সেই তথ্যও অনুপস্থিত। মনে হচ্ছে, শুধু তথ্য মন্ত্রণালয় বা সরকারি তথ্যব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে এবং কৌশলগত যোগাযোগব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে সরকারের সুনাম বজায় রাখা অনেক চ্যালেঞ্জিং হবে। প্রথম ১৮০ দিনের কাউন্টডাউন কিন্তু শুরু হয়ে গেছে। এর মধ্যে বাজেটও পেশ করতে হবে। প্রশ্ন একটাই, প্রতিরোধের প্রতিশ্রুতি কি দায়িত্বশীল শাসনে রূপ নিতে পারবে?

  • রিজওয়ান-উল-আলম সহযোগী অধ্যাপক ও চেয়ার, মিডিয়া, কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

    *মতামত লেখকের নিজস্ব