যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ইসরায়েলের ফাঁদে পড়েছে

একেবারেই অননুমেয় মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সম্পর্কের ওপরই অনেক কিছু বাজি রেখেছেন নেতানিয়াহুছবি: রয়টার্স

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এমন একটি কাজ করেছেন, একসময় ওয়াশিংটনের অনেকেই যা ঘটতে দিতে চাননি। নেতানিয়াহু আবারও যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে টেনে এনেছেন। এর আগে এমনটি ঘটেছিল ২০০৩ সালে। যুক্তরাষ্ট্র তখন ইরাকে আক্রমণ করেছিল। সেই যুদ্ধের পেছনে ছিল নব্যরক্ষণশীলদের ‘নিউ আমেরিকান সেঞ্চুরি’ নামের রাজনৈতিক চেতনা। ইরাক আক্রমণের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই মার্কিন বাহিনী সাদ্দাম হোসেনের দুর্বল হয়ে পড়া সরকারকে উৎখাত করে।

কিন্তু প্রথমে এটাকে বিজয় মনে করা হলেও দ্রুতই বাস্তবতা ভিন্নরূপ নেয়। বাগদাদের পতন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন আধিপত্যের বদলে তা দীর্ঘ বিদ্রোহ, অস্থিরতা ও অন্তহীন যুদ্ধের সূচনা হয়ে দাঁড়ায়। এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করতে হয়েছে। হাজার হাজার মার্কিন সেনা প্রাণ হারিয়েছেন। বিশ্বের অনেক জায়গায় যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতাও কমেছে।

এই অভিজ্ঞতা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। বারাক ওবামা ক্ষমতায় এসেছিলেন ইরাক যুদ্ধের ভুল স্বীকার করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। তখন মার্কিন রাজনৈতিক অভিজাতদের বড় একটি অংশ মনে করতে শুরু করেছিল যে, ইরাক আক্রমণ ছিল গুরুতর ভুল। এমন কিছুর পুনরাবৃত্তি আর কখনো করা উচিত নয়। পরে একই অসন্তোষের ঢেউ থেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্পও ক্ষমতায় আসেন। তিনি নির্বাচনী প্রচারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্র আর মধ্যপ্রাচ্যের অন্তহীন যুদ্ধে জড়াবে না।

কিন্তু বাস্তবে এখন দেখা যাচ্ছে ভিন্নচিত্র। নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে আবার সেই জটিল মধ্যপ্রাচ্য সংকটের ভেতরেই টেনে এনেছেন। ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই তিনি চেষ্টা করে গেছেন যাতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যায়। নিয়মিত ওয়াশিংটন সফর, রাজনৈতিক চাপ এবং ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের মাধ্যমে তিনি এই লক্ষ্য এগিয়ে নেন। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহল, বিশেষ করে তাঁর জামাতা জ্যারেড কুশনারের মতো ব্যক্তিদের মাধ্যমেও এই প্রভাব কাজ করেছে।

বাগদাদে ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের ভাস্কর্যের পতন দেখছেন এক মার্কিন সেনা। ২০০৩ সালের ৯ এপ্রিলের ছবি
ছবি: রয়টার্স

ধীরে ধীরে এমন একটি ধারণা তৈরি করা হয় যে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক আঘাত হানলে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য বদলে যাবে এবং ইসরায়েলের প্রধান প্রতিপক্ষ দুর্বল হয়ে পড়বে। শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবে রূপ নেয়। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অনুমোদন দেয় এবং দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে হামলা শুরু হয়।

কিন্তু এখনই বোঝা যাচ্ছে, এই যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার নয়। নেতানিয়াহু যে সহজ বিজয়ের কথা বলেছিলেন, বাস্তবতা তা নয়। এই সংঘাত এমন পরিস্থিতি থেকেও তৈরি হয়নি, যেখানে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে আসন্ন হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ইরানের কাছে এমন কোনো কৌশলগত অস্ত্রও নেই, যা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।

২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি ইরান ও বিশ্বশক্তিগুলোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা তৈরি করেছিল। ওই চুক্তির মাধ্যমে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত করা হয়েছিল এবং আন্তর্জাতিক নজরদারি জোরদার হয়েছিল। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র সেই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগপর্যন্ত ইরান মূলত তা মেনে চলছিল। পরবর্তী আলোচনাগুলোতেও তেহরান আবার সমৃদ্ধকরণ কমাতে প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিয়েছিল। অথচ কয়েক মাস আগেই ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে মার্কিন হামলায় ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।

এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি নিরাপত্তা হুমকি থেকে জন্ম নেয়নি। বরং এটি এসেছে ইসরায়েলের কৌশলগত হিসাব এবং সেই কৌশল গ্রহণে প্রস্তুত একটি মার্কিন প্রশাসনের সমন্বয় থেকে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ প্রায় এক হয়ে গেছে। আগে ইসরায়েলের যুদ্ধগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের নিজস্ব যুদ্ধ ছিল। যুক্তরাষ্ট্র তাতে অস্ত্র, গোয়েন্দা তথ্য ও কূটনৈতিক সমর্থন দিত। কিন্তু এখন দুই দেশ একই যুদ্ধে সরাসরি অংশ নিচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের বিশৃঙ্খলা থেকে উপসাগরীয় দেশগুলোর লাভ নেই। আরব বিশ্বেরও নেই। কিন্তু একটি রাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে মনে করে, অঞ্চলে শক্তির শূন্যতা তৈরি হলে তার আপেক্ষিক শক্তি বাড়ে। সেই রাষ্ট্রটি হলো ইসরায়েল। অনেক ইসরায়েলি কৌশলবিদ মনে করেন, আশপাশের রাষ্ট্রগুলো দুর্বল হলে বা ভেঙে পড়লে ইসরায়েলের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়।

এর প্রভাব ইতিমধ্যেই উপসাগরীয় অঞ্চলে দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলের নিরাপত্তাকাঠামো একটি সহজ সমঝোতার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে বিপুল বিনিয়োগ করবে এবং নিজেদের ভূখণ্ডে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি দেবে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

এই অর্থনৈতিক সম্পর্কের পরিমাণ বিশাল। ২০২৫ সালে ট্রাম্পের উপসাগর সফরের সময় সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয়। একই সময়ে উপসাগরীয় অর্থ ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক সংশ্লিষ্ট প্রকল্পেও প্রবাহিত হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কুশনারের বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান অ্যাফিনিটি পার্টনার্স উপসাগরীয় সার্বভৌম তহবিল থেকে বিলিয়ন ডলার পরিচালনা করছে। সৌদি আরবের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড একাই সেখানে ২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে।

কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে ট্রাম্প কার্যত সেই দীর্ঘদিনের সমঝোতাকেই দুর্বল করে ফেলেছেন। কারণ, উপসাগরীয় মিত্রদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ ছাড়াই এই যুদ্ধ শুরু হয়েছে। এই যুদ্ধের ঝুঁকি সম্পর্কে অঞ্চলটির সরকারগুলো আগেই সতর্ক করেছিল এবং ওয়াশিংটনকে যুদ্ধের পথে না যেতে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তাদের কথা গুরুত্ব পায়নি।

প্রভাবশালী আমিরাতি ব্যবসায়ী খালাফ আল হাবতুর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তুলেছেন, গুলি চালানোর আগে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করা হয়েছিল কি না? কারণ, এই উত্তেজনার প্রথম ভুক্তভোগী হবে এই অঞ্চলের দেশগুলোই। তাঁর বক্তব্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ভেতরে তৈরি হওয়া এক বিস্তৃত অস্বস্তির প্রতিফলন।

উপসাগরীয় দেশগুলোর ভূখণ্ডে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র যখন যুদ্ধে জড়ায়, তখন এই দেশগুলোও স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। সেখানে হাজার হাজার সৈন্য, যুদ্ধবিমান এবং সামরিক কমান্ড কাঠামো রয়েছে। ফলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি এখন অনেকের কাছেই প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা তেল শিল্প এলাকার একটি স্থাপনায় হামলার পর সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ড ও ধোঁয়া। ফুজাইরা মিডিয়া অফিসের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতের মধ্যে গত ৪ মার্চ ফুজাইরায় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি ড্রোন ভূপাতিত করার পর এর ধ্বংসাবশেষ থেকে এ আগুনের সূত্রপাত হয়
ছবি: রয়টার্স

এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় দেশগুলোকে সরাসরি যুদ্ধে যোগ দেওয়ার চাপ দিচ্ছে। মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম প্রকাশ্যে সৌদি আরবকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামার আহ্বান জানিয়েছেন। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, এর মাধ্যমে উপসাগরীয় দেশগুলোকে সরাসরি সংঘাতে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে তা ইরান–ইরাক যুদ্ধের মতো ভয়াবহ আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের বিশৃঙ্খলা থেকে উপসাগরীয় দেশগুলোর লাভ নেই। আরব বিশ্বেরও নেই। কিন্তু একটি রাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে মনে করে, অঞ্চলে শক্তির শূন্যতা তৈরি হলে তার আপেক্ষিক শক্তি বাড়ে। সেই রাষ্ট্রটি হলো ইসরায়েল। অনেক ইসরায়েলি কৌশলবিদ মনে করেন, আশপাশের রাষ্ট্রগুলো দুর্বল হলে বা ভেঙে পড়লে ইসরায়েলের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়।

কিন্তু এ ধরনের ভাঙন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে সব সময় মেলে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে যে ভূরাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন তার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী ছিল। বিশেষ করে উপসাগর অঞ্চল তার বৈশ্বিক প্রভাবের একটি প্রধান ভিত্তি। এখানেই রয়েছে বিশ্ব জ্বালানি বাজারের কেন্দ্র, গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি এবং মার্কিন অর্থনীতিতে বড় বিনিয়োগের উৎস

আরও পড়ুন

দীর্ঘদিন ধরে এই অংশীদারত্ব একটি সহজ বোঝাপড়ার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। সহযোগিতা ও প্রবেশাধিকার থাকবে এবং বিনিময়ে থাকবে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা। কিন্তু সেই ব্যবস্থা এখন চাপের মুখে।

ইসরায়েলের কৌশলের সঙ্গে পুরোপুরি একাত্ম হয়ে ট্রাম্প প্রশাসন এমন এক পথে এগোচ্ছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের প্রভাবের ভিত্তিকেই দুর্বল করে দিতে পারে। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, তত স্পষ্ট হবে একটি বৈপরীত্য। ইসরায়েলের লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই সেই অঞ্চলে নিজের অবস্থান দুর্বল করছে, যে অঞ্চল বহুদিন ধরে তার বৈশ্বিক শক্তিকে জোরদার করেছে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে এখন একটি শিক্ষা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যে ব্যবস্থাকে তারা নিরাপত্তার গ্যারান্টি মনে করেছিল, সেটিই এখন তাদের বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। আর যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় প্রশ্ন হয়ে উঠছে ইরান নয়, বরং ইসরায়েলকে ঘিরেই। তাদের কৌশল অনুসরণ করা কি সত্যিই ওয়াশিংটনের স্বার্থ রক্ষা করছে, নাকি ধীরে ধীরে সেটিকেই দুর্বল করে দিচ্ছে।

  • সুমাইয়া ঘানুশি ব্রিটিশ-তিউনিসীয় লেখক ও মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতিবিশেষজ্ঞ

    মিডিল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত