সেদিন রিকশা থেকে নেমে চালককে ১০০ টাকার একটি নোট দিলাম। ফেরত পাওয়ার কথা ৫০ টাকা। তিনি একটি নোট আমার হাতে দিয়ে জানতে চাইলেন, ‘স্যার, আপনারে কি কেউ ঠকায় না?’
বললাম, ‘ঠকায় মানে?’
‘এই ধরেন, কেউ ৫০ টাকার জায়গায় ২০ টাকা দিল। তখন কী করেন?’ আমি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বুঝতে পেরে সে আমাকে এই প্রশ্নটি করল।
তাঁর প্রশ্নের উদ্দেশ্য কিছুটা আঁচ করতে পেরে বললাম, ‘কেউ আমাকে ঠকাতে পারে, কিন্তু আমি ঠকি না। আমাকে ৫০ টাকার বদলে ২০ টাকা দিলেও সেটা আমার পকেটে গিয়ে ৫০ টাকা হয়ে যায়।’
তিনি বললেন, ‘দেখান তো, আমি আপনাকে কত টাকার নোট দিয়েছি?’
আমার পকেটে আগে থেকেই একটি ৫০ টাকার নোট ছিল। তাঁর দেওয়া নোটটি না বের করে সেটিই বের করে দেখালাম।‘হায় হায়! এটা তো জাদু! কীভাবে হলো?’ তাঁর বিস্ময় কাটছে না। একটু পর বললেন, ‘স্যার, আপনাকে ঠকাতে চাইনি। এই দেখেন, ৩০ টাকা আমার হাতে। আপনাকে ২০ টাকা দিয়েছি। ভাবলাম, আপনি টাকা চেনেন কি না, একটু পরীক্ষা করি।’
বললাম, ‘ঠিক আছে, কোনো অসুবিধা নেই। তবে মনে রাখবেন, আমি ঠকলেও ঠকি না। কারণ, কেউ আমাকে ঠকালে আমি যদি বুঝতেই না পারি, তাহলে মনে কষ্টও পাই না।’
কথাটা রসিকতা করে বলেছিলাম। কিন্তু না জানলে মনের কষ্টটা হয়তো এড়ানো যায়, টাকার ক্ষতি তো এড়ানো যায় না। আর নিজের প্রাপ্যটুকু ঠিকমতো পেলাম কি না, তা বোঝার জন্য আমাকে এমন একটা কৌশল করতে হবে কেন?
সেদিনের ঘটনা একজন রিকশাচালকের সঙ্গে ঘটেছিল। কিন্তু প্রশ্নটি কোনো একটি পেশার মানুষের সততা নিয়ে নয়। দোকান, যানবাহন কিংবা অন্য যেকোনো নগদ লেনদেনে আমার কাছে ফেরত আসা নোটটি আমি নিজে চিনতে পারছি কি না, সেটিই আসল কথা। কেউ ভুল করেও কম টাকা দিতে পারেন। অন্যরা যেভাবে ফেরত টাকা মিলিয়ে নেন, আমিও সেভাবে মিলিয়ে নিতে চাই। এটি কাউকে অবিশ্বাস করার দাবি নয়। টাকা চেনার অধিকারটা আমারও আছে।
১০০ টাকার বদলে ৫০ টাকা পেলে, কিংবা ৫০ এর বদলে ২০ টাকা পেলে, হাতে ধরে তা নিশ্চিত হতে না পারার অসুবিধাটা আমার কাছে খুব বাস্তব। তখন আপত্তি জানাব কিসের ভিত্তিতে? সাহায্য নিতে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু নিজের টাকা চিনতে প্রতিবার অন্য কাউকে লাগবে—এটাই কি স্বাভাবিক ব্যবস্থা হওয়া উচিত? আমার কাছে কত টাকা আছে, সেই ব্যক্তিগত হিসাবও কেন অন্যকে জানাতে হবে?
বাংলাদেশে সমাধান ভাবতে গেলে নোটের নকশা এবং সহায়ক প্রযুক্তি—দুই দিকেই কাজ করা যায়। মূল্যমানভেদে হাতে বোঝার মতো মাপের পার্থক্য, স্বল্পদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষের জন্য আলাদা রং ও বড় স্পষ্ট সংখ্যা, টেকসই স্পর্শচিহ্ন—এসব একসঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। অস্ট্রেলিয়ার নোটে আলাদা দৈর্ঘ্য, স্পর্শচিহ্ন ও বড় সংখ্যার সমন্বয় আছে। তবে বিদেশের নকশা হুবহু নিলেই আমাদের সমস্যার সমাধান হবে, এমন নয়।
বিষয়টি শুধু আমার মতো দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের নয়। স্বল্পদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি, বয়সের কারণে যাঁদের দৃষ্টি কমেছে, কিংবা যাঁদের পক্ষে নোটের সংখ্যা পড়া কঠিন, তাঁদের প্রয়োজনও বিবেচনায় নিতে হবে। পড়তে না জানা আর দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতা এক বিষয় নয়; তবে টাকা চেনার সহজ নকশা দুই ধরনের ব্যবহারকারীরই কাজে আসতে পারে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২১ সালের জাতীয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তি জরিপ অনুযায়ী, জনসংখ্যার ২ দশমিক ৮ শতাংশের অন্তত এক ধরনের প্রতিবন্ধিতা ছিল। ওই জরিপের তথ্য উদ্ধৃত করে ২০২৪ সালে ভিজ্যুয়ালি ইম্পেয়ার্ড পিপলস সোসাইটির গবেষণা উপস্থাপনায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের হার বলা হয় শূন্য দশমিক ৪৬ শতাংশ। এগুলো নির্দিষ্ট সময়ের জরিপের হিসাব; টাকা চেনার অসুবিধায় পড়া সবার সংখ্যা নয়।
পুরোনো দিনের টাকাপয়সার কথা মনে পড়ে। সিকি, আধুলি কিংবা বিভিন্ন ধাতব মুদ্রার কিনারা, খাঁজ ও আকৃতির পার্থক্য হাতের কাছে একেকটা পরিচয় হয়ে থাকত। কিছু নোটের মাপ ও কাগজের অনুভূতিও চিনতে সাহায্য করত। ওই পার্থক্যগুলো আমার কাজে লাগত।
আর উঁচু বিন্দু মানেই ব্রেইল নয়। কানাডার কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের নোটের স্পর্শচিহ্ন সম্পর্কে স্পষ্ট বলেছে, এটি ব্রেইল নয়। সব ব্যবহারকারী ব্রেইল পড়েন না বলে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও স্বল্পদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিদের সঙ্গে পরামর্শ করে আলাদা ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে। আমাদেরও নামের চেয়ে কাজে মন দেওয়া দরকার। যে চিহ্নই থাকুক, তা যেন সহজে শেখা যায়, স্পর্শে আলাদা করা যায় এবং দীর্ঘদিন ব্যবহারেও বোঝা যায়।
এ প্রসঙ্গে ২০২৫ সালের যুক্তরাষ্ট্র সফরের একটি অভিজ্ঞতা মনে পড়ছে। স্টেট ডিপার্টমেন্টের আমন্ত্রণে আইভিএলপি ফেলো হিসেবে সেখানে গিয়েছিলাম। ছোটখাটো খরচের জন্য আমাকে কিছু নগদ ডলার দেওয়া হয়েছিল। সঙ্গে দেওয়া হয়েছিল ছোট্ট একটি যন্ত্র। নোটটি যন্ত্রে ঢোকালেই সেটি বলে দিত, কত ডলার। প্রচলিত মার্কিন নোটগুলোর মাপ একই হলেও ওই যন্ত্রের সাহায্যে মূল্যমান জানতে আমার কারও সহযোগিতা লাগেনি।
ব্যাপারটি খুব সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু রিকশাচালকের প্রশ্নের মুখে পড়া মানুষটির জন্য এর অর্থ আলাদা। হাতে থাকা টাকার মূল্য আমি নিজে জেনে নিচ্ছি। কাউকে পরীক্ষা দিতে হচ্ছে না, কাউকে বিশ্বাস বা অবিশ্বাসের প্রশ্নও আসছে না। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যুরো অব এনগ্রেভিং অ্যান্ড প্রিন্টিংয়ের ‘আইবিল’ নামের নোট শনাক্তকারী যন্ত্র বিনা মূল্যে দেওয়ার কর্মসূচিও আছে, যা নির্ধারিত যোগ্যতার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মার্কিন নাগরিক ও বৈধ বাসিন্দাদের জন্য প্রযোজ্য।
বাংলাদেশে সমাধান ভাবতে গেলে নোটের নকশা এবং সহায়ক প্রযুক্তি—দুই দিকেই কাজ করা যায়। মূল্যমানভেদে হাতে বোঝার মতো মাপের পার্থক্য, স্বল্পদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষের জন্য আলাদা রং ও বড় স্পষ্ট সংখ্যা, টেকসই স্পর্শচিহ্ন—এসব একসঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। অস্ট্রেলিয়ার নোটে আলাদা দৈর্ঘ্য, স্পর্শচিহ্ন ও বড় সংখ্যার সমন্বয় আছে। তবে বিদেশের নকশা হুবহু নিলেই আমাদের সমস্যার সমাধান হবে, এমন নয়।
কোন ব্যবস্থাটি এখানে কাজে আসবে, তা জানতে আমাদের হাতে নোট দিয়ে পরীক্ষা করতে হবে। নতুন নোটের পাশাপাশি বহুবার হাতবদল হওয়া নোটও দিতে হবে। কত দ্রুত চেনা যায়, কোথায় ভুল হয়, বয়সভেদে অভিজ্ঞতা বদলায় কি না—এসব দেখা প্রয়োজন। শুধু সভায় কয়েকজনের মতামত নেওয়ার বদলে নকশা পরীক্ষায় বিভিন্ন বয়সের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও স্বল্পদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিদের যুক্ত করা যেতে পারে। ধাতব মুদ্রার আকার ও কিনারার পার্থক্যও এই পরীক্ষার অংশ হওয়া দরকার।
প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও আমার প্রত্যাশা খুব ব্যবহারিক। বাংলায় মূল্যমান জানাবে, ইন্টারনেট ছাড়াই কাজ করবে, পুরোনো ও নতুন প্রচলিত নোট চিনবে—এমন নির্ভরযোগ্য অ্যাপ বা সহজ যন্ত্রের ব্যবস্থা করা যায় কি না, দেখা হোক। চিনতে না পারলে যন্ত্র যেন অনুমান করে ভুল অঙ্ক না বলে; স্পষ্ট জানায় যে নোটটি চেনা যায়নি। হেডফোনে শোনা বা কম্পনে সংকেত পাওয়ার সুযোগ থাকলে ব্যক্তিগত হিসাবও ব্যক্তিগত রাখা সহজ হবে।
তবে টাকা ব্যবহার করতে হলে স্মার্টফোন থাকতেই হবে, এমন শর্ত তৈরি করা চলবে না। ফোনে চার্জ না থাকলেও তো আমাকে ভাড়া দিতে হবে। নোট নিজে যতটা সম্ভব শনাক্তযোগ্য হোক; প্রযুক্তি থাকুক বাড়তি সহায়তা হিসেবে। আর কোনো ব্যবস্থা চালু হলে বাংলায় অডিও নির্দেশনা, হাতে-কলমে পরিচিতি এবং ব্যাংককর্মীদের প্রশিক্ষণও তার সঙ্গে থাকা দরকার।
এ আলোচনার একটি অধিকারগত ভিত্তিও আছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩-এর ১৬ ধারায় প্রবেশগম্যতা, অর্থনৈতিক জীবনে পূর্ণ ও কার্যকর অংশগ্রহণ এবং ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তার অধিকার স্বীকৃত। জাতিসংঘের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সনদের ১২ অনুচ্ছেদেও নিজের আর্থিক বিষয় নিয়ন্ত্রণের সমান অধিকারের কথা আছে। নিজের হাতে থাকা টাকার মূল্য নিজে বুঝতে পারার সুযোগকে আমি এসব অধিকারের বাস্তব প্রয়োগের অংশ হিসেবেই দেখি।
বাংলাদেশ ব্যাংক, নোট উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠনগুলো এ নিয়ে একসঙ্গে বসতে পারে। কোন নোটে কী ব্যবস্থা আছে, কতটা কাজে লাগে, কোথায় পরিবর্তন দরকার—তার ব্যবহারভিত্তিক মূল্যায়ন হোক। এরপর দায়িত্ব ও সময়সীমা ঠিক করে কাজ এগোক। মূল্যায়নের ফলও প্রকাশ করা হোক, যাতে আমরা জানতে পারি আমাদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কী বদলাল।
সেদিন পকেটের অন্য একটি নোট বের করে আমি রিকশাচালককে চমকে দিয়েছিলাম। কিন্তু প্রতিদিনের লেনদেনে আমার এমন ‘জাদু’ দেখানোর প্রয়োজন হওয়ার কথা নয়। আমি শুধু তাঁর দেওয়া নোটটি হাতে নিয়ে নিশ্চিত হতে চাই—হ্যাঁ, এটা ৫০ টাকা।
‘আমি ঠকলেও ঠকি না’—কথাটা গল্পে থাকুক। নিজের টাকার হিসাব রাখতে আমাকে যেন এই সান্ত্বনা নিয়ে চলতে না হয়।
ভাস্কর ভট্টাচার্য্য ডিজিটাল অ্যাকসেসিবিলিটি পরামর্শক
[email protected]*মতামত লেখকের নিজস্ব