১৯৪৭ সালের আগস্টে ব্রিটিশ শাসনের অবসান এবং ভারত ও পাকিস্তানের জাতিরাষ্ট্র হিসেবে জন্মের পর থেকেই কাশ্মীর প্রশ্নটি দেশ দুটির গতিপথকে প্রভাবিত করে আসছে। উভয় দেশই সমগ্র কাশ্মীরের ওপর দাবি করে এ অঞ্চলকে কেন্দ্র করে একাধিক যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে এবং প্রত্যেকে ভূখণ্ডটির পৃথক একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। ঐতিহাসিকভাবে কাশ্মীর নিয়ে আলোচনা মূলত ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার বিরোধ অথবা ভারত-শাসিত কাশ্মীরের সবচেয়ে দৃশ্যমান অস্থিরতাকে কেন্দ্র করেই হয়েছে।
পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীর বিশ্ববাসীর মনোযোগ খুব কমই পেয়েছে। অথচ গত জুনে সেখানে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে ৮০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। সেখানে ভিন্ন ধরনের একটি রাজনৈতিক সংগ্রাম গতি পেয়েছে—যার মূল বিষয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়; বরং দৈনন্দিন জীবনের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। এর মধ্যে রয়েছে অসহনীয় বিদ্যুৎ বিল, খাদ্যের ক্রমবর্ধমান দাম এবং কর্মসংস্থানের সংকট।
পাকিস্তানের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংকট থেকে পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরও মুক্ত নয়। মূল্যবৃদ্ধি, রাজস্বসংকট, জ্বালানিঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে বারবার ঋণসহায়তা নিতে হওয়ায় সরকার ভর্তুকি কমাতে এবং ইউটিলিটি সেবার দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে। মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্বে আগে থেকেই চাপে থাকা এ অঞ্চলের মানুষ এসব নীতিকে আর্থিক বিচক্ষণতার পদক্ষেপ হিসেবে নয়, বরং নিজেদের জীবনকে প্রভাবিত করা সিদ্ধান্তগুলোর ওপর তাদের প্রভাব কতটা সামান্য—তারই প্রমাণ হিসেবে দেখছে।
কাশ্মীর ও একটি বিক্ষোভ আন্দোলনের উত্থান
কাশ্মীরে বেশ কয়েকটি বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প রয়েছে, যেগুলো পাকিস্তানের জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। এ অঞ্চলের অনেক বাসিন্দার যুক্তি, বিদ্যুৎ উৎপাদনে তাঁদের ভূখণ্ডের অবদানের প্রতিফলন স্থানীয় বিদ্যুতের দামে আরও ভালোভাবে থাকা উচিত। এই ক্ষোভ নতুন নয়। বিদ্যুতের দাম ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে ২০২২ সাল থেকেই সময়–সময় বিক্ষোভ হয়েছে।
এই সমস্যাগুলো সমাধানে স্থানীয় সরকারের ব্যর্থতা নতুন ধরনের রাজনৈতিক সংগঠনের জন্য সুযোগ তৈরি করে। বিভিন্ন জেলায় নাগরিক কমিটি গড়ে ওঠে, যেখানে ব্যবসায়ী, আইনজীবী, শিক্ষার্থী ও কমিউনিটি নেতারা যুক্ত হন। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে এসব কমিটি একত্র হয়ে জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি (জেএএসি) গঠন করে। এর উদ্দেশ্য ছিল পুরো অঞ্চলে আন্দোলন ও গণসংগঠনের কার্যক্রম সমন্বয় করা।
প্রাথমিকভাবে জেএএসি গম ও বিদ্যুতের দাম কমানো, মন্ত্রী ও আমলাদের সরকারি সুযোগ-সুবিধা বন্ধ করা এবং নির্বাচিত স্থানীয় সরকারকে অধিক ক্ষমতায়নের দাবি জানায়। সংগঠনটি পাকিস্তানের প্রচলিত রাজনৈতিক দলীয় ব্যবস্থার বাইরে থেকেছে। পাকিস্তান মুসলিম লিগ (নওয়াজ), পাকিস্তান পিপলস পার্টি ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের মতো প্রধান দলগুলোর সঙ্গে যুক্ত না হয়ে এটি নিজেকে একটি নির্দলীয় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
পাকিস্তান এমন একটি হাইব্রিড শাসনব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত হয়, যেখানে বেসামরিক সরকারগুলো সেনাবাহিনীর নির্ধারিত সীমারেখার মধ্যে কাজ করে। জাতীয় নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি—এমনকি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রেও সেনাবাহিনী অভিভাবকসুলভ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীর এই বৃহত্তর রাজনৈতিক ব্যবস্থারই আরও ঘনীভূত প্রতিচ্ছবি।
দলীয় বিভাজন অতিক্রম করে দৈনন্দিন অর্থনৈতিক সমস্যা ও সুশাসনের প্রশ্নে বিভিন্ন গোষ্ঠীকে একত্র করতে পারার ক্ষমতার ওপরই এ আন্দোলনের আকর্ষণ নির্ভর করছে বলে মনে হয়। জেএএসির সংগাঠনিক তৎপরতার জবাবে কর্তৃপক্ষ এর সদস্যদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগে গ্রেপ্তার করে এবং তাদের সভা-সমাবেশ সীমিত করে। কিন্তু এসব পদক্ষেপ আন্দোলন দমাতে ব্যর্থ হয়। ধর্মঘট, পরিবহন বন্ধ ও স্থানীয় বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে আন্দোলন চলতে থাকে। আন্দোলনটির শক্তি এর বিকেন্দ্রীভূত কাঠামোতে নিহিত; ছোট শহর ও গ্রামজুড়ে থাকা এর শাখাগুলো এমন একটি তৃণমূলভিত্তিক নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে, যা প্রয়োজন হলে পুরো অঞ্চলে সক্রিয় করা যায়।
২০২৪ সালের মে মাসে সরকার তাদের দাবিগুলো বিবেচনার আশ্বাস দিলেও বাস্তব কোনো ছাড় দিতে দেরি করলে জেএএসি লংমার্চ ও সর্বাত্মক ধর্মঘটের ডাক দেয়। এই কর্মসূচিতে কয়েক লাখ বিক্ষোভকারী রাজধানী মুজাফ্ফরাবাদের দিকে অগ্রসর হয়। এটি ছিল এ অঞ্চলের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ গণআন্দোলন। লংমার্চ ঠেকানোর চেষ্টা উল্টো ফল দেয় এবং আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়। গ্রেপ্তার, সড়ক অবরোধ এবং ইন্টারনেট ও মোবাইল যোগাযোগের ওপর বিধিনিষেধ সত্ত্বেও মুজাফ্ফরাবাদে বিক্ষোভ ক্রমেই বাড়তে থাকে।
২০২৪ সালের মে মাসের লংমার্চ চলাকালে সংঘর্ষে অন্তত চারজন নিহত হন, যাঁদের মধ্যে তিনজন ছিলেন বিক্ষোভকারী এবং একজন পুলিশ কর্মকর্তা। শেষ পর্যন্ত ইসলামাবাদ হস্তক্ষেপ করে প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি রুপি বা ৮ কোটি ২৯ লাখ ডলার মূল্যের একটি ত্রাণ প্যাকেজ ঘোষণা করে। এর মধ্যে ভর্তুকিযুক্ত বিদ্যুৎমূল্য ও গমের দাম কমানোর ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু সরকারের দমনমূলক প্রতিক্রিয়া ইউটিলিটি সেবার মূল্য নিয়ে শুরু হওয়া একটি আন্দোলনকে আরও বৃহত্তর প্রশ্নে পরিণত করে—পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের মানুষ আদৌ কতটা অর্থবহ রাজনৈতিক অধিকার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে।
নাগরিক, নাকি প্রজা?
২০২৪ সালের মে মাসের সমঝোতা প্রমাণ করে যে সম্মিলিত গণ–আন্দোলন ইসলামাবাদকে তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো মোকাবিলায় বাধ্য করতে পারে। কিন্তু এটি রাজনৈতিক জবাবদিহির বৃহত্তর প্রশ্নের সমাধান করেনি: পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীর আসলে কীভাবে পরিচালিত হয়?
এই ভূখণ্ডের নিজস্ব রাষ্ট্রপতি, সরকার, আইনসভা ও আদালত রয়েছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক, নিরাপত্তা ও বৈদেশিক বিষয়ে পাকিস্তান এখনো নির্ণায়ক প্রভাব বজায় রেখেছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে পরিচালিত একটি কাউন্সিল একসময় আইন প্রণয়ন, অর্থব্যবস্থা ও উন্নয়ন পরিকল্পনার ওপর ইসলামাবাদের আনুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের প্রধান উৎস ছিল; যদিও ২০১৮ সালের একটি সাংবিধানিক সংশোধনীর মাধ্যমে কাউন্সিলটির অধিকাংশ ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়; এটিকে মূলত পরামর্শমূলক সংস্থায় পরিণত করা হয়। তবু উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা এখনো ফেডারেল সরকারের হাতে রয়ে গেছে। প্রধান সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শকসহ গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেয় ইসলামাবাদ। ফলে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর ওপর আঞ্চলিক নির্বাচিত সরকারের নিয়ন্ত্রণ সীমিত।
ইসলামাবাদের জন্য শিক্ষাটি স্পষ্ট। রাজনৈতিক ক্ষমতার অন্তর্নিহিত কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে সাময়িক অর্থনৈতিক সহায়তার মাধ্যমে স্থিতিশীলতা কেনা সম্ভব নয়। একইভাবে দমন-পীড়নের মাধ্যমেও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা যাবে না; কারণ এতে মানুষের বিচ্ছিন্নতা বাড়ে, ক্ষোভ তীব্র হয় এবং পাকিস্তানি রাষ্ট্রের প্রতি আরও ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়।
যেহেতু ভূখণ্ডটির আন্তর্জাতিক মর্যাদা এখনো বিরোধপূর্ণ, কাশ্মীরের বিশেষ আন্তর্জাতিক অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে এই বিশেষ প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে প্রয়োজনীয় বলে ব্যাখ্যা করে এসেছে। কিন্তু এখানকার বাসিন্দাদের জন্য এটি রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও রাজনৈতিক ক্ষমতার মধ্যে স্থায়ী একটি ব্যবধান তৈরি করেছে। নির্বাচিত রাজনীতিকদের ভোটারদের কাছে জবাবদিহি করতে হয়, অথচ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ইসলামাবাদে।
এ অঞ্চলের নির্বাচনী ব্যবস্থাও জটিলতার আরেকটি স্তর তৈরি করেছে। পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের আইনসভায় ৫৩টি আসন রয়েছে। এর মধ্যে আটটি আসন নারী, ধর্মীয় পণ্ডিত, টেকনোক্র্যাট ও প্রবাসী নাগরিকদের জন্য সংরক্ষিত। বাকি ৪৫টি আসনের জন্য নির্বাচনের মাধ্যমে আইনপ্রণেতারা নির্বাচিত হন।
এই ৪৫ জনের মধ্যে ৩৩ জন নির্বাচিত হন অঞ্চলটিতে বসবাসকারী জনগণের ভোটে। বাকি ১২টি আসন সংরক্ষিত রয়েছে ভারত-শাসিত কাশ্মীর থেকে আসা এবং বর্তমানে পাকিস্তানের অন্যত্র বসবাসকারী শরণার্থীদের জন্য। এই ব্যবস্থা ১৯৬০-এর দশকে চালু হয় এবং ১৯৭০-এর দশকে আনুষ্ঠানিক রূপ পায়।
সমালোচকদের মতে, এই ১২টি আসন ওই ভূখণ্ডের ভোটারদের রাজনৈতিক গুরুত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয় এবং ইসলামাবাদে যে দল ক্ষমতায় থাকে, তাদের জন্য আইনসভার গঠনকে প্রভাবিত করা তুলনামূলকভাবে সহজ করে তোলে।
জুন মাসে অঞ্চলটির সর্বোচ্চ আদালত রায় দেন যে ওই ১২টি আসন আইনি সুরক্ষা ভোগ করে এবং এসব আসনে কোনো পরিবর্তন আনতে হলে আনুষ্ঠানিক সাংবিধানিক সংশোধন প্রয়োজন হবে। এই রায় সরকারের আইনি অবস্থানকে সমর্থন করলেও বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা রাজনৈতিক প্রশ্নটির কোনো উত্তর দেয়নি। যে আইনসভায় সরাসরি নির্বাচিত আসনগুলোর এক-চতুর্থাংশের বেশি ভূখণ্ডের বাইরের ব্যক্তিদের দ্বারা পূরণ করা হয়, সেটি কি সত্যিই সেখানে বসবাসকারী মানুষের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে পারে?
সামরিক আধিপত্যের সমস্যা
পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর প্রভাবশালী ভূমিকা রাজনৈতিক পরিসরকে আরও সংকুচিত করে। পাকিস্তান এমন একটি হাইব্রিড শাসনব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত হয়, যেখানে বেসামরিক সরকারগুলো সেনাবাহিনীর নির্ধারিত সীমারেখার মধ্যে কাজ করে। জাতীয় নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি—এমনকি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রেও সেনাবাহিনী অভিভাবকসুলভ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীর এই বৃহত্তর রাজনৈতিক ব্যবস্থারই আরও ঘনীভূত প্রতিচ্ছবি।
কাশ্মীর বিরোধের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। ফলে স্বাধীন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগও খুব সীমিত। একজন মেজর জেনারেলের নেতৃত্বাধীন এবং পাহাড়ি শহর মারিতে সদর দপ্তর অবস্থিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১২তম ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশন অঞ্চলটির ওপর কার্যকর সামরিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। এর ফলে নিরাপত্তা রক্ষার ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর সরাসরি ভূমিকা রয়েছে।
মানবাধিকার পর্যবেক্ষকেরা দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলে পাকিস্তানের সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রভাব এবং তাদের বিরুদ্ধে ওঠা নির্যাতন ও অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নথিবদ্ধ করে আসছেন। জেএএসি ও মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, সংগঠিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সহজেই নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, ফলে ভিন্নমতের পরিসর সংকুচিত হয়। তাঁদের মতে, নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক ক্ষেত্রে কেবল বাহ্যিক কাঠামোতে পরিণত হয়েছে, আর রাজনৈতিক অসন্তোষ প্রকাশ বা সংগঠিত হওয়ার সুযোগ থাকবে কি না, তা নির্ধারণ করে নিরাপত্তা সংস্থা।
গত গ্রীষ্মে নতুন করে শুরু হওয়া আন্দোলনের সময় এই সামরিকীকৃত দৃষ্টিভঙ্গির ফল স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জুন মাসে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় জেএএসিকে নিষিদ্ধ করে, জনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি হিসেবে ঘোষণা করে এবং ২৭ জুলাই থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত অনুষ্ঠিতব্য আঞ্চলিক আইনসভা নির্বাচনের আগে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দমন অভিযান শুরু করে।
জুলাইয়ের শেষ দিকে জেএএসির নেতাদের দাবি অনুযায়ী, নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে কয়েক ডজন বিক্ষোভকারী নিহত হন। পাকিস্তান তার নিরাপত্তা বাহিনীর কৌশলকে সমর্থন করে এবং ফেডারেল সরকারের একজন মন্ত্রী বিক্ষোভকারীদের ‘জঙ্গি’ বলে অভিহিত করেন। বেসামরিক নিহতের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ার রাজনৈতিক তাৎপর্য আরও স্পষ্ট: অর্থনৈতিক ও গণতান্ত্রিক দাবিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি মূলত শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করায় জেএএসির সমর্থকদের মধ্যে এই ধারণা আরও শক্তিশালী হয়েছে যে ইসলামাবাদ মানুষের মতামত ও রাজনৈতিক দাবি বিবেচনায় নেওয়ার চেয়ে তাদের ওপর বলপ্রয়োগ করতেই বেশি আগ্রহী।
জেএএসি নির্বাচন বর্জনের আহ্বান জানিয়েছিল এবং শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত ওই ১২টি আসন বাতিল করাকে তাদের অন্যতম প্রধান দাবি করেছিল। ভোটের প্রথম ধাপে প্রায় ৪৬ শতাংশ ভোট পড়ে, আর কর্মকর্তাদের হিসাবে দ্বিতীয় ধাপে ভোট পড়ে প্রায় ৫০ শতাংশ। এই হার ২০১৬ ও ২০২১ সালের আগের দুটি নির্বাচনে রেকর্ড হওয়া ৬০ শতাংশের তুলনায় কম। চলমান অস্থিরতার কারণে তৃতীয় ধাপের ভোট স্থগিত করা হয়।
প্রাথমিক ফলাফলে পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন দল পাকিস্তান মুসলিম লিগ–নওয়াজ ২৪টি সাধারণ আসনে এগিয়ে যায়। তবে বিলম্বিত নির্বাচনী লড়াইয়ের কারণে তখনো নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল নির্ধারিত হয়নি। এই ফলাফল জেএএসির সেই বক্তব্যকে আরও জোরালো করে যে কেবল ভোট গ্রহণের মাধ্যমে কাশ্মীরে প্রকৃত রাজনৈতিক ক্ষমতা কার হাতে থাকবে, সেই প্রশ্নের সমাধান সম্ভব নয়। বিশেষত যখন ইসলামাবাদের ক্ষমতাসীন দল রাষ্ট্রীয় সম্পদ এবং সামরিক প্রতিষ্ঠানের সমর্থন ব্যবহার করে নির্বাচনী পরিবেশ ও শেষ পর্যন্ত আইনসভার গঠনকে প্রভাবিত করতে পারে।
এ ধরনের প্রভাব বিস্তারের প্রক্রিয়া ভোটের দিনের অনেক আগেই শুরু হয়। সমালোচকদের অভিযোগ, পাকিস্তানের ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স (আইএসআই) এবং মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের কর্মকর্তারা, যাঁরা ওই অঞ্চলের সেনা কমান্ড কাঠামোর অধীনে কাজ করেন, তাঁরা চাপ ও পৃষ্ঠপোষকতার কৌশল ব্যবহার করে কাশ্মীরকে পাকিস্তানের সঙ্গে একীভূত করার পক্ষে থাকা প্রার্থীদের সুবিধা দেন। সমালোচকদের মতে, শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি আসন শুধু একটি সাংবিধানিক সমস্যা নয়; বরং রাজনৈতিকভাবে অনুগত প্রার্থীদের আইনসভায় নিয়ে আসার অতিরিক্ত একটি হাতিয়ার।
আন্দোলনটির দীর্ঘস্থায়িত্ব ইঙ্গিত করে যে এটি কেবল অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে বিরোধ নয়; বরং জীবনযাত্রার ব্যয়, রাজনৈতিক বৈধতা এবং জবাবদিহির একটি বৃহত্তর সংকটের প্রতিফলন। এ অর্থে গভীরতর পরিবর্তনটি ঘটছে মানুষের রাজনৈতিক প্রত্যাশার ক্ষেত্রে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে জেএএসির প্রতি সমর্থন দেখায় যে ভূরাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তার অজুহাতে রাজনৈতিক অধস্তনতা মেনে নেওয়ার ব্যাপারে তাদের ধৈর্য ক্রমেই কমে আসছে।
এই অস্থিরতা কাশ্মীর প্রশ্নে পাকিস্তানের সরকারি অবস্থানের একটি অস্বস্তিকর দ্বন্দ্বও সামনে নিয়ে আসে। কয়েক দশক ধরে ইসলামাবাদ, নিয়ন্ত্রণরেখার অপর পাশে ভারত-শাসিত কাশ্মীরে কাশ্মীরিদের বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ করে আসছে, যা অযৌক্তিক নয়। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো এই দাবি যে কাশ্মীরিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের একটি নৈতিক ও আইনগত ‘অধিকার’ রয়েছে এবং জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে গণভোটের মাধ্যমে কাশ্মীরের চূড়ান্ত মর্যাদা নির্ধারণ করা উচিত।
কিন্তু পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীর পরিচালনার ক্ষেত্রে ইসলামাবাদ নিজেই যখন ভারতের সমালোচনায় যে মানদণ্ডের কথা বলে, তা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়, তখন এসব দাবি টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
ইসলামাবাদের জন্য শিক্ষাটি স্পষ্ট। রাজনৈতিক ক্ষমতার অন্তর্নিহিত কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে সাময়িক অর্থনৈতিক সহায়তার মাধ্যমে স্থিতিশীলতা কেনা সম্ভব নয়। একইভাবে দমন-পীড়নের মাধ্যমেও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা যাবে না; কারণ এতে মানুষের বিচ্ছিন্নতা বাড়ে, ক্ষোভ তীব্র হয় এবং পাকিস্তানি রাষ্ট্রের প্রতি আরও ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়।
স্থিতিশীলতা নির্ভর করে স্থানীয় মানুষের কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য শাসনের দাবির যথার্থ প্রতিক্রিয়া দেওয়ার ওপর। একই সঙ্গে স্বীকার করতে হবে যে পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের মানুষ ইসলামাবাদের দয়া বা অনুদানের ওপর নির্ভরশীল প্রার্থী নন; তাঁরা রাজনৈতিক অধিকারসম্পন্ন নাগরিক।
কাশ্মীরিরা শুধু কম বিদ্যুৎ বিল ও সস্তা রুটির দাবি করছেন না, তাঁরা দাবি করছেন সম্মান ও প্রতিনিধিত্বের অধিকার। পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের শহর ও উপত্যকাগুলোতে এই আকাঙ্ক্ষাকে কেবল শক্তি প্রয়োগ করে চিরতরে দমন করা সম্ভব নয়।
আকিল শাহ মেরিল্যান্ডের ম্যাকড্যানিয়েল কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক
টাইম থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত এবং সংক্ষেপিত।