গ্রান্ট ক্লাসে ঢুকে এসব কর্মকর্তার আস্থা অর্জনের জন্য প্রথমেই নিজের যোগ্যতাকে মেলে ধরলেন। তিনি যে কত বড় পণ্ডিত, তাঁর যে অগাধ জ্ঞান আর উজ্জ্বল একটা ক্যারিয়ার আছে, সেটার বর্ণনা দিয়ে তাঁর সেশন শুরু করলেন। কিন্তু সেশনের পর তাঁরা যে ফিডব্যাক দিলেন, সেটা মর্মঘাতী বললে কম বলা হবে, ‘শ্রোতাদের কী প্রয়োজন, বক্তা সেটা বুঝতেই পারেননি’, ‘সেশনটা করে আমার খুব সামান্যই লাভ হয়েছে’ ইত্যাদি।

এর দু–এক দিন পর উইং কমান্ডারদের সঙ্গে গ্রান্টের আরেকটা সেশন ছিল। এবার একটু ভিন্ন কৌশল নিলেন। ক্লাসে ঢুকেই তিনি মজা করে বললেন যে তিনি একজন জাদুকর এবং এখানে কে কী ভাবছে, তা পরিষ্কার বুঝতে পারছেন। তিনি বললেন, ‘আমি জানি যে আপনারা ভাবছেন, এই ১২ বছরের ছোকরা অধ্যাপকের কাছ থেকে আমরা কী শিখব!’ এ কথা শুনে সবাই আচমকা চমকে গিয়ে পরে হাসিতে ফেটে পড়ল। কেউ একজন মজা করে বলল, ‘না না, অত কম নয়, তোমার বয়স কম করে হলেও ১৩ হবে।’ পরিবেশটাই পাল্টে গেল। গ্রান্ট আগের সেই একই ক্লাস নিলেন। কিন্তু এবার ফিডব্যাক হলো, ‘বক্তার বয়স কম হলেও ক্লাসটা বেশ উপভোগ্য ছিল’, ‘আমার তো বিশ্বাসই হয়নি গ্রান্টের বয়স মাত্র ১২, ক্লাসটা দারুণ’।

নিজেকে জাহির করার বদলে নিজের দুর্বলতা স্বীকার করে ফেলতে পারলে শিক্ষার্থীদের কাছাকাছি চলে যেতে পারেন শিক্ষক; শিক্ষার্থীরাও সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং আমরা যাকে স্বশিক্ষা বলি, সেটা অর্জনের একটা পরিবেশ তৈরি হয়। যা–ই হোক, অ্যাডাম গ্রান্ট বুঝলেন, এটাই ‘দ্য পাওয়ার অব পাওয়ারলেস কমিউনিকেশন’। তিনি বুঝলেন, জোর করে সব সময় গলায় বা চোখেমুখে আত্মবিশ্বাস ঝুলিয়ে রাখার দরকার নেই।

নিজের দুর্বলতার কারণে শিক্ষককে যদি আমতা-আমতা করতে হয়, তো তিনি আমতা-আমতাই করবেন। সব সময় যে সবজান্তার মতো শিক্ষার্থীদের সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। কিছু জানার জন্য তিনি নিজেও শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করতে পারেন।

গ্রান্ট, এরিখসন, পেনিবেকার বা বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনের কথা যদি সত্যি হয়, তাহলে আমাদের শিক্ষকদের দৃষ্টিভঙ্গিতে একটু পরিবর্তন আনতে হবে। আমরা আগে যেমন সব জানি, সব বুঝি ভাব করে ক্লাস নিতাম, এখন আর সেভাবে নিলে চলবে না। সেভাবে ক্লাস নিলে এখনকার শিক্ষককেন্দ্রিক শ্রেণিকক্ষকে আর নতুন শিক্ষাক্রমের শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শ্রেণিকক্ষে রূপান্তর করা যাবে না।

মনোবিজ্ঞানী এরিখ এরিখসন বলেছেন, এতে যে লাভ হয়, তা হলো শিক্ষার্থীরা শিক্ষককে অনেক আপন ভাবে, মন খুলে কথা বলে। শিক্ষক নিজের ক্ষেত্রে হয়তো অনেক দক্ষ, কিন্তু অন্য কোনো না কোনো বিষয়ে তিনি অদক্ষ হবেনই। সেই অদক্ষতা প্রকাশেও অনেক কাজ হয়।

এরিখসন এটার নাম দিয়েছেন ‘প্র্যাটফল ইফেক্ট’। এর খুব বিখ্যাত কিছু উদাহরণ আছে। একবার এক বিতর্কে আব্রাহাম লিংকনের এক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাঁকে ঘায়েল করার জন্য বলে বসলেন, ‘আপনি একজন দুমুখো মানুষ।’ লিংকন হেসে বললেন, ‘তা হলে তো ভালোই হতো।

আমি আমার এই বিচ্ছিরি মুখটা খুলে ওটা পরে নিতে পারতাম।’ বলা হয়, এ ঘটনার পর ভোটাররা তাঁকে আরও বেশি পছন্দ করা শুরু করেন। নিজের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করার খুব ভালো দুটি উপায় হচ্ছে প্রশ্ন করা এবং উপদেশ চাওয়া। আপনি যদি সত্যিই কারও কাছে কিছু জানার জন্য প্রশ্ন করেন বা উপদেশ চান, তাহলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তিনি আন্তরিকভাবে আপনাকে তাঁর উত্তর বা উপদেশ দেবেন।

মনোবিজ্ঞানী পেনিবেকার বলেছেন, কথোপকথনকে কার্যকর করার সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে প্রশ্ন করা। কারও কাছে উপদেশ চাইলে আপনি উপদেশের সঙ্গে ‘ফাউ’ কিছু শ্রদ্ধাও পেয়ে যাবেন। বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন তো অকপটে বলেছেন, ‘যে আমার কাছে উপদেশ চাইতে আসে, তার জ্ঞান ও বিবেচনার প্রতি আমার শ্রদ্ধা বেড়ে যায়।’

গ্রান্ট, এরিখসন, পেনিবেকার বা বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনের কথা যদি সত্যি হয়, তাহলে আমাদের শিক্ষকদের দৃষ্টিভঙ্গিতে একটু পরিবর্তন আনতে হবে। আমরা আগে যেমন সব জানি, সব বুঝি ভাব করে ক্লাস নিতাম, এখন আর সেভাবে নিলে চলবে না। সেভাবে ক্লাস নিলে এখনকার শিক্ষককেন্দ্রিক শ্রেণিকক্ষকে আর নতুন শিক্ষাক্রমের শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শ্রেণিকক্ষে রূপান্তর করা যাবে না।

  • সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক মাউশি ও নায়েমের সাবেক মহাপরিচালক