শুধু এই নেতারাই নন, পাঁচ বছর আগে যে তিন তরুণ নেতা কংগ্রেসের হয়ে রাজ্য দাপিয়ে বিজেপিকে নাস্তানাবুদ করেছিলেন, তাঁদের দুজন, পাতিদার কৃষক আন্দোলনের নেতা হার্দিক প্যাটেল ও ক্ষত্রিয় নেতা অল্পেশ ঠাকুরকে দলে টেনে বিজেপি শক্তি বাড়িয়েছে। মণিপুর, গোয়া, আসাম, কর্ণাটক, মধ্যপ্রদেশ, হিমাচল প্রদেশের পর গুজরাটেও কংগ্রেস ভাঙানোর কৌশল দেখে মনে হতেই পারে, স্বকীয়তা হারানো বিজেপির ‘কংগ্রেসায়ন’ পূর্ণতা পেতে চলেছে।

কিন্তু এসব নয়, আরও পাঁচ বছরের জন্য গুজরাটে বিজেপি তাদের মৌরুসি পাট্টা নিশ্চিত করবে কি না, তা-ও নয়, এবার যাবতীয় নজর কেড়েছে আম আদমি পার্টি (আপ)। গুজরাটে তারাই মূল আকর্ষণ। ছয় মাস ধরে লাগাতার রাজ্য সফরের মধ্য দিয়ে অরবিন্দ কেজরিওয়াল যে শোরগোল তুলেছেন, তা কতটা ফলদায়ী, কতটাই–বা বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়া, তা পরে বোঝা যাবে। আপাতত প্রচারের সব আলো তাঁদের মুখে। এতটাই যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও তিষ্ঠোতে পারেননি।

‘আপ’কে গুজরাটের রাজনৈতিক পরিসর দখলে সাহায্য করেছে কংগ্রেসের চরম ঔদাসীন্য। সাত মাস ধরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রতি মাসে অন্তত একবার রাজ্য সফরে গেছেন। ভোটের ঠিক আগে এক পক্ষকালে রাজ্যে গেছেন চারবার। ১ লাখ ১৬ হাজার ৭২০ কোটি টাকার সরকারি এবং ২ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকার বেসরকারি প্রকল্পের হয় উদ্বোধন করেছেন, নতুবা শিলান্যাস।

কেজরিওয়ালের রাজনীতির মূল চমক জনমুখী নীতি। নিম্নবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তের সুরাহার পাশাপাশি মধ্যবিত্তকে তিনি স্বপ্ন দেখান। গুজরাটে তা কতটা সাফল্য পাবে, তা বড় প্রশ্ন। কারণ, গুজরাটি মানসিকতা কখনো বামপন্থী মনোভাব সমর্থন করেনি। শিল্পোন্নত রাজ্য হয়েও বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়নকে কল্কে দেয়নি। সব মহলে আর্থিক প্রবৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষা জন্মাবধি প্রোথিত।

ভারতীয় সামরিক বাহিনীর জন্য টাটা ও এয়ারবাস যৌথ উদ্যোগে তৈরি করবে সি-২৯৫ পরিবহন বিমান। মহারাষ্ট্র থেকে সরিয়ে প্রকল্পটি তিনি গুজরাটে নিয়ে গেছেন। একইভাবে স্থানান্তরিত হয়েছে ফক্সকন-বেদান্ত গোষ্ঠীর সেমিকন্ডাক্টর তৈরির প্রকল্প।

আর্সেলর মিত্তল ও নিপ্পনের যৌথ উদ্যোগে গুজরাটে সম্প্রসারিত হচ্ছে ইস্পাত কারখানা। তিন হাজার কোটি টাকার রেল প্রকল্পও চালু হয়েছে ভোট ঘোষণার আগে। এই তৎপরতার পাশে কংগ্রেস মাত্রাছাড়া নিষ্প্রভ! রাহুল গান্ধী গুজরাটমুখো হননি। ‘ভারত জোড়ো যাত্রা’ও গুজরাটের মাটি ছুঁচ্ছে না।

কোনো গান্ধীই প্রচারে যাচ্ছেন না। হার্দিক প্যাটেল ও অল্পেশ ঠাকুরকে ধরে রাখতে কংগ্রেস ব্যর্থ। তৃতীয় তরুণ তুর্কি জিঘ্নেশ মেভানিকেও কাজে লাগায়নি। অথচ এই রাজ্যে পাঁচ বছর আগে বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস পেয়েছিল ৪২ শতাংশ ভোট। খুব খারাপ সময়েও তাদের ভোট শতাংশ ৩৮-এর নিচে নামেনি। এবার প্রধানত তাদের অনাগ্রহের জন্যই নেপো সেজে দই মারতে হাজির আপ!

পেশাদার সমীক্ষকদের জরিপ বলছে, ভোটচরিত্র দ্বিমুখী থেকে ত্রিমুখী হলেও গুজরাটে বিজেপির বিশেষ মাথাব্যথার কারণ নেই। লোকনীতি-সিএসডিএস জরিপ দেখাচ্ছে, বিজেপি তার ভোট শেয়ার মোটামুটি ধরে রাখবে। ভাগ হবে প্রধানত বিরোধী ভোট। কংগ্রেসের নিজস্ব হিসাব অবশ্য উল্টো।

‘আপ’-এর প্রভাব নাকি মূলত শহুরে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবর্গের ওপর। শহরের ভোট পাঁচ বছর আগে বিজেপিকে জিতিয়েছিল, গ্রাম ও আদিবাসী-উপজাতি সমর্থন করেছিল কংগ্রেসকে। কেজরিওয়ালের দাবি, তাঁরা শুধু শহরেই নন, প্রভাব ফেলেছেন মফস্‌সল ও গ্রামাঞ্চলেও। গুজরাট মডেলের জায়গায় মোদি রাজ্যে তাঁরা ‘দিল্লি মডেল’ স্থাপন করবেন। পাঞ্জাবের মতো গুজরাটেও তাঁরা সৃষ্টি করবেন বিস্ময়।

কেজরিওয়াল অ্যান্ড কোং বিস্ময় ও ইতিহাস সৃষ্টির এমন দাবি গোয়ায় করেছিলেন, উত্তরাখন্ডেও। দুই রাজ্যেই তাঁরা বিশ্রীভাবে পর্যুদস্ত। উত্তরাখন্ডে তো বলতে গেলে গোটা দলটাই বিজেপির সঙ্গে মিশে গেছে। অথচ পাঞ্জাবে তারা দুর্দান্ত সফল। এই বৈপরীত্যের ব্যাখ্যা ঠিক কী, কারও কাছেই তার সদুত্তর নেই। এ কথা সত্যি, দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন করে সাধারণ বঞ্চিত মানুষের মনে আপ একটা জায়গা পেয়েছিল। এক অন্য ধরনের রাজনীতি উপহার দিতে চেয়েছিল।

কিন্তু ক্রমেই তারা অন্যদের মতো মূল স্রোতে গা ভাসিয়েছে। যার বিরুদ্ধে লড়াই করে তাদের আবির্ভাব, সেই দুর্নীতির অভিযোগের মোকাবিলায় আজ তারা নাজেহাল। দিল্লির মতো ছোট বাজেট উদ্বৃত্ত রাজ্যে তাদের জনমুখী কর্মসূচি সফল। কিন্তু পাঞ্জাবের মতো বড় ও সমস্যাসংকুল রাজ্যে দিল্লি মডেলের সার্থক রূপায়ণ কত কঠিন, কেজরিওয়াল ও ভগবন্ত সিং মান তা বিলক্ষণ বুঝেছেন। সেই মডেল নিয়ে কেজরিওয়াল এবার গুজরাটের প্রধান চ্যালেঞ্জার। কংগ্রেসকে হটিয়ে দ্বিতীয় হতে পারলে সেটাই হবে তাঁর বড় রাজনৈতিক জয়।

নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহ অল আউট খেলছেন। গুজরাট শুধু তাঁদের ‘প্রেস্টিজ’ নয়, প্রতীকও। প্রচারে–প্রভাবে জৌলুশে তাঁদের সঙ্গে টেক্কা দিচ্ছেন কেজরিওয়াল। রাজনীতিতে দৃশ্যমান ও আলোচনায় থাকা যে জরুরি, কেজরিওয়াল তা বোঝেন। গুজরাটে তাঁরা সেটাই করছেন।

হাওয়া তুলেছেন। কিন্তু তা ভোটে পরিণত করতে যে সংগঠন দরকার, অল্প সময়ে তা আয়ত্ত করা কঠিন। কংগ্রেস কৌশল বদলেছে। হই হই করে ঢাকঢোল পিটিয়ে বিজেপিকে হটানো কঠিন উপলব্ধি করে বুথ পর্যায়ে নিঃশব্দে তারা ঘুটি সাজাচ্ছে। কংগ্রেস জানে, লড়াই কঠিন। সামর্থ্যও কম। কিন্তু এটাও জানে, ভোট শেয়ারে বিজেপির ঠিক পরে থাকতে পারলে কেজরিওয়ালদের ঘিরে গড়ে ওঠা বুদ্‌বুদ ফেটে যাবে। তাতে আখেরে লোকসান কম।

কেজরিওয়ালের রাজনীতির মূল চমক জনমুখী নীতি। নিম্নবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তের সুরাহার পাশাপাশি মধ্যবিত্তকে তিনি স্বপ্ন দেখান। গুজরাটে তা কতটা সাফল্য পাবে, তা বড় প্রশ্ন। কারণ, গুজরাটি মানসিকতা কখনো বামপন্থী মনোভাব সমর্থন করেনি। শিল্পোন্নত রাজ্য হয়েও বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়নকে কল্কে দেয়নি। সব মহলে আর্থিক প্রবৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষা জন্মাবধি প্রোথিত।

দান-খয়রাতের চেয়ে গুজরাটি সমাজ উন্নয়নের অংশীদার হয়ে শ্রীবৃদ্ধিতে বেশি আগ্রহী। গরিবপন্থী ও খয়রাতের রাজনীতির সঙ্গে সেই মানসিকতার মিল নেই। তবু প্রধানমন্ত্রী সাবধান।

দান-খয়রাতের রাজনীতি তিনিও করছেন ‘ক্ষমতায়ন’ তকমা দিয়ে। এভাবে কেজরিওয়ালকেও তিনি মান্যতা দিয়ে গেলেন।

গুজরাটের ফল বুঝিয়ে দেবে, আগামী দিনে বিজেপিবিরোধিতার ব্যাটন কার হাতে থাকবে।

  • সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি