ভেনেজুয়েলায় হামলা কি নিয়মহীন বিশ্বব্যবস্থার আভাস দিচ্ছে

ভেনেজুয়েলায় আক্রমণের পর ট্রাম্পের সংবাদ সম্মেলনছবি: রয়টার্স

ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এই নয় যে তা আন্তর্জাতিক আইন ও নীতিমালা লঙ্ঘন করেছে কি না; বরং প্রশ্নটি হলো, এ ঘটনা আমাদের উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কী জানায়? কিছু ভাষ্যকার যেমনটি বলছেন, সেই ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে—বিষয়টি তেমন নয়।

ভেনেজুয়েলার ঘটনা একটি বাড়তে থাকা টানাপোড়েন স্পষ্ট করে তুলেছে। এর একদিকে আছে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফাভাবে প্রয়োগ করা ক্ষমতার দাবি, অন্যদিকে আছে সেই সহযোগিতামূলক প্রত্যাশা, যার ওপর শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব নির্ভরশীল।

দশকের পর দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার ভিত্তি ছিল সামরিক ও অর্থনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল ঘনিষ্ঠ জোটব্যবস্থা। এই কাঠামো এমন ছিল যে মার্কিন নেতৃত্বাধীন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাগুলো থেকে সরে আসা অংশীদারদের জন্য ব্যয়বহুল হয়ে উঠত। এমনকি যখন অংশীদারেরা এসব ব্যবস্থার ওপর অসন্তুষ্ট থাকত, তখনো তাদের পক্ষে সরে আসা সম্ভব হতো না। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব শুধু সম্মতির ওপর দাঁড়ানো ছিল না; বরং তা নিরাপত্তা নিশ্চয়তা, জোট সম্পর্ক এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত নেটওয়ার্কের ওপর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সৃষ্ট একধরনের নির্ভরতার কাঠামোর ভেতর দিয়ে গড়ে উঠেছিল।

দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে কেবল নিয়ম প্রয়োগকারী নয়, বরং একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রধান নিরাপত্তা ও সুযোগদাতা হিসেবে উপস্থাপন করতে পেরেছে। কিন্তু সেই ধারণা এখন চাপের মুখে।

কিন্তু প্রতিষ্ঠান যতই সুবিধা পাকাপোক্ত করুক না কেন, স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা প্রয়োগের ফলে সৃষ্ট সুনামহানি ও কৌশলগত ক্ষতি রাতারাতি পুষিয়ে দেওয়া সম্ভব হয় না। দুর্বল বা বিচ্ছিন্ন কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটি একক হস্তক্ষেপ সচরাচর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কাঠামো বদলে দেয় না। কিন্তু এমন পদক্ষেপগুলো যখন একের পর এক জমতে থাকে, তখন অন্য রাষ্ট্রগুলো তাদের প্রত্যাশা নতুন করে সাজাতে শুরু করে এবং সেখানেই এর প্রভাব গভীর হয়।

ভেনেজুয়েলার ঘটনা আগের মার্কিন হস্তক্ষেপগুলোর তুলনায় আলাদা। ইরাক, কসোভো, লিবিয়া কিংবা সিরিয়ার মতো ক্ষেত্রে যত বিতর্কই থাকুক না কেন, প্রতিটিতেই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি স্পষ্ট ‘লাল রেখা’ বা উত্তেজনার নির্দিষ্ট মুহূর্ত ছিল। অস্ত্র কর্মসূচি, গণহত্যা কিংবা চলমান যুদ্ধের মতো কিছু শক্ত অজুহাত ছিল।

কিন্তু ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্প প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাঁড়িয়েছে নানা বিচ্ছিন্ন উদ্বেগের ওপর। অভিবাসন, নিষেধাজ্ঞা এড়ানো, অপরাধী নেটওয়ার্ক, চীনের প্রভাব—এ ধরনের ইস্যুকে ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখানো হয়েছে। কোথাও পরিষ্কার করে বলা হয়নি—কোন মুহূর্তে সংযমের জায়গা ছেড়ে চাপ ও জবরদস্তির পথে হাঁটা হবে।

আরও পড়ুন

অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। কারণ, একই সময়ে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের দিকেও হুমকির ভাষা ব্যবহার করেছেন। কানাডা বা গ্রিনল্যান্ডের মতো ন্যাটো–সম্পৃক্ত দেশ বা ভূখণ্ড নিয়েও ট্রাম্প প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। এর ফলে মিত্রদেশগুলোর সার্বভৌমত্ব অন্তত যুক্তরাষ্ট্রের চাপের বাইরে থাকবে বলে যে পুরোনো ধারণা ছিল, তা ভেঙে পড়ছে। মাদুরোর মতো একজন ক্ষমতাসীন বিদেশি নেতাকে অপহরণ ও বিচারের আওতায় এনে ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের বিচারিক এখতিয়ার বিস্তৃত করছে।

ভেনেজুয়েলার নিজস্ব বিরোধী শক্তিকে পাশ কাটিয়ে তারা রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। এই সবকিছু মিলিয়ে দৃশ্যমান সীমারেখার জায়গায় বসেছে প্রশাসনিক বিবেচনা। ট্রাম্প-পূর্ব সময়ে অন্য রাষ্ট্রগুলো জানত, কোথায় সীমা ভাঙলে যুক্তরাষ্ট্র কী করবে। এখন তারা কেবল অনুমান করতে পারে। ভেনেজুয়েলা এ দৃষ্টান্তই স্থাপন করেছে।

আরও পড়ুন

দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে কেবল নিয়ম প্রয়োগকারী নয়, বরং একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রধান নিরাপত্তা ও সুযোগদাতা হিসেবে উপস্থাপন করতে পেরেছে। কিন্তু সেই ধারণা এখন চাপের মুখে।

ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের এই হস্তক্ষেপ শুধু আন্তর্জাতিকভাবে নয়, দেশের ভেতরেও খুব বেশি বাধার মুখে পড়েনি—এটাই সবচেয়ে চোখে পড়ার বিষয়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের ভূখণ্ড নিয়ে প্রকাশ্যে ঠাট্টা বা ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলা, যা আগে কল্পনাও করা যেত না, এখন আর তেমন অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে না।

  • কার্লা নরলফ কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক

    স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে অনূদিত